একটুকরো কাগজের কবিতা । অন্তর চন্দ্র

 


একটুকরো কাগজের কবিতা



সুনিল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নির্বাসন ’ কবিতার একটা ছেঁড়া পাতা মাটিতে পড়ে আছে। জানালা দিয়ে মৃদু হাওয়া ঘরে ঢুকছে। সেই হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে কাগজের এক টুকরো দুঃখ। স্মিতার পড়ার টেবিলের খুব কাছে গা ঘেঁষে এসে পড়ল। মুখের হাসিটা যেন হঠাৎ থমকে গেল। কোথাও কেউ নেই। একটা ছেঁড়া কাগজ। কাগজের উল্টো দিকে লেখা “জীবন বড় অসহায়।” চিন্তারত স্মিতার দুচোখ বেয়ে নেমে আসে ঝরণার প্রপাত। মা খেতে ডাকে খাওয়া - দাওয়া ভালো লাগে না। মাথার মধ্যে ঘুরছে ছেঁড়া পাতা, কাগজের কথা। মা লক্ষ্য করল, মেয়েটা দিনদিন অন্যমনষ্ক হয়ে পড়েছে। আসলে কি হয়েছে? “এতদিন আমাকে না বলে তো কোন কাজ করত না। হঠাৎ করেই কি নিয়ে এতো চিন্তা করছে। ” স্মিতা ফোন করে বান্ধবী শাকিলাকে পার্কে দেখা করবে। অতঃপর, দুজনার দেখা হয়। সব খুলে বলে স্মিতা। কিন্তু তাঁর কোন বন্ধু বা প্রেমিক আগে ছিল কি না তাঁর জানা নেই। কারণ দু'বছর আগে রোড এক্সিডেন্টে মস্তিষ্ক বিভ্রাট হয়ে যায়। স্মৃতির পাতা থেকে মুছে গেছে ফেলে আসা সাজানো দিন। 

রোজ বিকেলে বারান্দায় বসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে সংগীত চর্চা করে। ছোটভাই নিলয় পাশে এসে বসে। গলাটা আজ বেশ পরিস্কার নয়। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। রবীন্দ্রনাথের গানটা গলায় বেঁধেও বাঁধছে না। হালকা রাগান্বিত স্বরে বাবা বলল, “ওরকম ফাঁসা গলায় গান বাঁধলে শ্রোতা খুঁজে পাবে না। ভালো করে চর্চা কর।” এমনিতেই মনটা খারাপ একে আবার বাবার কথা। দিলে তো মনটা খারাপ করে। নিলয় উঠে পড়ল, “ আপা তুমি একটু পানি মুখে দিয়ে আসো। তোমার গলাটা বড্ড বেশি শুকিয়ে গেছে।” আজ আর গান হলো না। সংগীত চর্চা করবে বৈ কি মনের মধ্যে উতলা হয়ে উঠে সেই ঘটনা। 

ছোটবেলা থেকেই বন্ধুদের সাথে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে আড্ডা দেওয়া অন্তত মাসে একবার। প্রকৃতির ভীষণ রূপ। নদীর উত্তাল ঢেউয়ে দুলে ওঠা নৌকা। ওপারে মেঘের মতো পাহাড়ের ছাপ। একুল থেকে ওকুল দেখা যায় না। মনে হয়, ঐপাড়ে গিয়ে বসতি করি। পুরো জীবন কাটিয়ে দেই আনন্দের খেয়াপাড়ে। গাঙচিল উড়ে যায়। সন্ধ্যার তিমির নেমে আসে। আমাদের আড্ডা ঠাঁই নেয় স্মৃতিতে। স্মিতা ক্ষণিকের জন্য ভুলে যায় মনের কথা। ছেঁড়া পাতা থেকে বেশ খানিকটা দূরে বর্তমান মনের বসত। আনন্দ যেন গিলে ফেলেছে সেই স্মৃতি। চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঘরে ফিরে যায় সকলে। 

ভোরের ঝাঁপসা আলোয় আলোকিত হ‌ওয়ার আগে ঘুম ভেঙে যায় স্মিতার। জানালার পাশে পড়ে থাকা একটি কাগজ। আজকেও এরকম দেখে স্মিতা সৃষ্টিকর্তার কাছে আর্তি করে। “ কি হচ্ছে আমার সাথে?” কোনো উত্তর নেই। বিরহের প্রেমানলে জ্বলে ওঠা কবিতার পাতা। 

“সাধ হয় মরে/ যাই পৃথিবীর/ ঘোলা জলে 

এক টুকরো চাঁদ/ জোৎস্না স্বরূপ/ ভেসে ওঠে!

নীল খাম কালো/ অক্ষর জুড়ে/ বেদনার ছাপ

তবুও কেউ/ কেউ প্রেমের নাম/ রাখে সন্তাপ।”

আসলে কে এমন করে নিয়ত আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে? কিন্তু কেন কাছে আসে না। চারদিকে খোঁজ খবর নেয়ার জন্য ছুটে বেড়ায়, স্মিতা। কোথাও কোন দিশা খুঁজে পাওয়া যায় না। শাকিলাকে জিজ্ঞেস করে, করজোড়ে বলে কিন্তু কেউ কিচ্ছু বলে না। স্মিতা বুঝতে পারে শাকিলা কিছু একটা লুকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু কেন বলছে না? নিজেকে প্রশ্ন করে। বারবার শুধু কবিতার পাতা মনে পড়ে। কাণ যেন ঝালাপালা হয়ে যায়। এবার কি করবে ভেবে পায় না। ছেলেটি কেন কাছে আসে না, এই চিন্তা প্রতিনিয়ত গ্রাস করেছে। জানালার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবনাকে দূরে যেতে বলে। জীবনের কালচক্রে বাঁধা নিয়তির ঠিকানা। আবারো চিঠি আসে কবিতার ছন্দে। বন্ধুরা রসিকতা ছেড়ে দিয়েছে সেই কবে। এখন তাঁরা বস্ত ভীষণ কাজে। মাঝে মাঝে দেখা হয়, কথা হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে থেকে কেউ আমার জন্য ভাবে না। কেন বৃথা চিন্তা করি? মনকে শান্তনা দেওয়া বড় মুশকিল।

আজ হঠাৎ করেই শাকিলার ফোন । একটা নির্জন জায়গায় ডেকে নিয়ে গেল। তখন বিকেলের সূর্য খানিকটা হেলে পড়েছে। শাকিলার চোখ স্মিতার চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে। স্মিতা ক্ষণিকের জন্য অবাক হয়ে গেল। এদিকে বাড়িতে বাবার প্রচণ্ড রাগ। আজকাল ঠিকমতো কোথাও গেলে বাড়ি ফিরতে দেরী। অন্যমনস্ক এবং কোনো কাজ ছাড়া রাত জাগা। সবসময় পড়ার টেবিলে একটা কাগজ নিয়ে বসে থাকি। বাবা পেছন থেকে এসে কেঁড়ে নিয়ে দেখে ফেলে এবং ক্রোধান্বিত হয়। এরকম ভয়ঙ্কর রূপে আগে কখনো দেখেনি। ভয়ে ভয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে যায়। শাকিলার চোখেও কেমন যেন বহ্নি শিখা জ্বলে উঠেছে। স্মিতা জানে না, মনের অন্ধকার আজ দূর হয়ে সূর্য প্রকাশ পাবে। 

শাকিলাকে বলে...“তুই কি কিছু বলবি আমায়? ওরকম ভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?” 

“হ্যাঁ, তোকে কিছু বলার জন্য‌ই তো তাড়াহুড়ো করে আসতে বলেছি। আজ তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। জানিনা রে, তুই সেটা গ্রহণ করতে পারবি কি না।”

“তাহলে বল...”

“এতো অধৈর্য্য কেন, দাঁড়াও আর একটু অপেক্ষা কর....।”

পেছন থেকে হঠাৎ একটা ছেলে এসে উপস্থিত। শাকিলা বলল, “চিনতে পারছিস।”

 “না, পারছি না।”

এতদিন যাকে খুঁজে হয়রান । আজ তাকে দেখেও চিনতে পারছে না। ছেলেটির কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ। তাতে কিছু কাগজ, কলম আর কবিতার ব‌ই । স্মিতা নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে, ও....কে?। “অপূর্ব, অনেক দূরের একটা পাখি উড়তে উড়তে তোমার বাগানে এসে ঢুকছে।” স্মিতা, শাকিলার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখ থেকে বুলি বের হয় না। অন্যরকম লাগছে শরীরটা এক্কেবারে শিরশির করছে। লোকটা স্মিতার চোখের দিকে তাকালো। এবার আরও বেশি ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু মনের গহীনে উদয় হতে লাগলো কোথায় যেন লোকটাকে দেখেছি। বড্ড অস্থির মন। হাওয়ায় যেন পরাণটা দুলে উঠছে। কি অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গি! শাকিলা দাঁড়িয়ে থেকে তাদের খুনসুটি দেখছে আর মনে মনে মুচকি হাসি দিচ্ছে। ছেলেটি অর্থাৎ অপূর্ব, স্মিতাকে একটা কবিতা ব‌ই উপহার দিয়ে সোজা চলে গেল। স্মিতার মুখে কোনো কথা নেই ‌। এক্কেবারেই বোবা হয়ে গেছে। মুখ ফুটে কথা বেরোচ্ছে না। এবার শাকিলা সহ গাড়িতে বাড়ি র‌ওনা পথে কথা। 

“ঐ ছেলেটাই তোকে রোজ কবিতার পাতা জানালার ফাঁক দিয়ে পাঠাত। তুই ওকে ভালোবাসতিস আগে। তোর এক্সিডেন্ট হ‌ওয়ার পর থেকে সব ভুলে গেছিস। তোকে আগেও এভাবে কবিতা উপহার দিত। তোর মনে নেই।” 

এই বলে থেমে গেল শাকিলা। স্মিতা মনে মনে ভাবতে লাগল, “আজ হাতে পেয়েও তাকে হারালাম। হায়রে কপাল।” এভাবে বাড়ি পৌঁছে গেল কিন্তু শাকিলা আর কথা বলল না। বাই, বলে ও চলে গেল। 

বাড়ির গেটে পৌঁছামাত্র নিলয় আপুর হাত টেনে নিয়ে গেল‌। বাবা - মা তাঁর জন্মদিনের আয়োজন করছে। পুরো বাড়ি যেন স্বর্গরাজ্য করে ফেলেছে। হঠাৎ মনে পড়ল তাহলে অপূর্ব আমার জন্মদিন জেনেই আজকে ব‌ইটা উপহার দিল। স্মিতার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল প্রণয়ের চিন্তা তাই সে নিজের জন্মদিনের কথাও ভুলে গিয়েছিল। কেক কেটে জন্মদিন পালন হলো। কিন্তু মন দখল করা মানুষটার দেখা পেল না। অনুষ্ঠানে সঙ্গী হলো না। শাকিলা‌ও এলো না এবং অন্য বন্ধুরাও। পারিবারিক ভাবে জন্মদিনের আয়োজন হলো। মা-বাবার মুখে হাসি। স্মিতার মাথাটা ঝিমঝিম করছে।‌ টেনশন পাগল করে তুলছে। ভাবতে ভাবতে চোখে ঘুম এসে পড়ল। 

মনের অজান্তেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো। আজ বারান্দায় রোদ তাপায়। নিলয় বল নিয়ে বন্ধুদের সাথে মাঠে খেলছে। সরল হাস্যমুখী স্মিতা দেখছে আর ভাইয়ের পক্ষে জোর দিচ্ছে। মাঠে বসে হাততালি দিচ্ছে। চোখের মণিকোঠায় জয়ের উল্লাস। কিন্তু হঠাৎ করেই দলটা নুয়ে পড়তে শুরু করল। তৎক্ষণাৎ আনন্দ বেদনায় রুপান্তরিত হয়। কিছুক্ষণ পর নিলয়ের সৎ সাহস তাকে এগিয়ে দিল। ক্রোমেই আবার সতেজ হতে শুরু করল নিলয়ের দল। সবাই দেখল হারতে থাকা দলটা হঠাৎ জিতে গেল। খুশি মনে নিলয় দৌড়ে এলো। স্মিতা বলল, চল আজকে তোকে মেলায় নিয়ে যাব। বটতলা চত্ত্বরে মেলা বসেছে। জমজমাট মেলা। দু'দিন ধরে মেলা হচ্ছে। আজ শেষ দিন বাড়ি গিয়ে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও। আর শোন, মেলায় আজকে তুমি যা চাইবে তাই কিনে দিব।

ভারি মজা হলো। চারদিকে মানুষের ছড়াছড়ি। এক বিশাল মাঠ সবুজের সমারোহে মেতে উঠেছে। পাশে সার্কাসের প্যান্ডেল। কি যে ভয়ঙ্কর সব খেলা বুকটা ধরফর করে ওঠে! দোকান থেকে অনেক কিছু ক্রয় করা হলো। নিলয়ের পছন্দ মতো নাগরদোলাতেও ওঠা বাকি র‌ইল না। অন্যান্য দিনের চেয়ে আজকে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। বাড়ি ফেরার পথে মাটি থেকে চোখ তুলতেই সেই লোকটি। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম...“ আপনি কি সেই?” কোন কথা না বলে লোকটি ফাঁকা একটা ব্রেঞ্জের দিকে এগিয়ে গিয়ে বসে পড়ল। নিলয় কিছু আন্দাজ করতে পারল না। আপুকে বাড়ি যাওয়ার জন্য বারবার ডাকে কিন্তু স্মিতার সেদিকে কোন খেয়াল নেই। বাড়িতে বাবা আজকেও রাগ হবে। নিলয়ের আর যেন তর সইছে না। স্মিতা লোকটির কাছে গিয়ে বসল। বুকের ভেতর কেমন যেন ধকধক শব্দ ক্রোমশঃ বাড়তে লাগলো। গলা কাঁপা স্বরে যখন‌ই কিছু বলতে যাবেন মুখের কথা কেড়ে নিয়ে....

“আপনি মনে হয় কিছু খাননি। সাথে কে ছোট ভাই?”

“হ্যাঁ।”

“কিছু বলতে চান?”

“হ্যাঁ।”

“লজ্জা না করে বলে ফেলুন।”

“আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন।”

“না। আমি একাকিত্বের বড় দাস। আপনি হয়তো জানেন, আমি কবিতা লিখি।”

“কেন লিখেন?”

“মনের ভিতরের সিংহটিকে বশে আনার জন্য। অনেকদিন ধরে জ্বালাতন করছে। আর স‌ইতে পারছি না। ভাবছি, গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাব। প্রকৃতির আচ্ছাদনে নিজেকে জড়িয়ে নিব।”

“আপনার কথা কিচ্ছুটি বুঝলাম না। পরিষ্কার করে বলুন।”

স্মিতার মনে এবার টিপটিপ বৃষ্টির ছন্দের মতো কিছু একটা খেলে যাচ্ছে। এ ভাষা বড় কঠিন বলে বোঝানো যাবে না। নিলয় অনেকক্ষণ পর বুঝতে পারলো আপু নিশ্চয়ই প্রেমে পড়ে গেছে। স্মিতা একটা রহস্যপাকে ঢুকে পড়েছে এতক্ষণে। অপূর্ব মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। স্মিতা, চাতকের মতো কাৎরাচ্ছে। কিন্তু কি বলবে কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারছে না।প্রেম তো অবহেলার বস্তু নয়। প্রেম মানে স্বর্গ। তবুও যেন হাপিত্যেশ খেলে যাচ্ছে মন। প্রেম যেন দরজায় এসে কড়া নেড়ে আবার কোথায় হারিয়ে যায়। থাক, সেসব কথা, ছেলেটি খুব শান্তশিষ্ট। রুপে গুনে নামে ঠিক অপূর্ব।

“ একাকী এ পথে কতদিন রাত্রি জাগরণ করেছি। শুধু মাত্র একটা চাঁদের অপেক্ষায়। কিন্তু সে চাঁদ এখন আর আগের মতো বারান্দায় এসে দাঁড়ায় না। নিজেকে ছুটি দিয়েছি তার থেকে আর অন্ধকার বরণ করে নিয়েছি।  তুমি বলেছিলে না ভালোবাসার কথা, ভালোবাসা.... হা হা হা! ভালোবাসা অন্ধ। ভালোবাসা একাকীত্ব ছাড়া কিছুই দিতে পারে না। সারাক্ষণ কবিতার পাতা জুড়ে আমার বিরহের বিচরণ।”

“আমি তোমার হয়ে থাকতে চাই। দুঃখের পরিধির ইতি টেনে নতুন করে জীবন সাজাতে চাই।”

“ সে সুযোগ আর নেই।”

“ তাহলে জানালার ফাঁক দিয়ে কবিতা পাঠাতে কেন? খুব ভালোবাসতে?”

“ধরে নাও, পৃথিবীরটা আজব কারখানা।”

বলেই হঠাৎ ৫০০ টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে খেতে বলে পেরিয়ে গেল মেলার মাঠ। ক্রোমেই যেন ঝলসে উঠছে চারদিক। কেন তার সাথে বারবার এমন হয়। নিলয় আপুকে নিয়ে শীঘ্র বাড়ি পৌঁছে গেল। মা - বাবা তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ঝিমিয়ে উঠেছে ফুলগাছটা। বড় ক্লান্তি গিয়েছে মেয়েটার। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব‌ইখাতা নিয়ে পড়ার টেবিলে বসল। বারবার কবিতার বইয়ের পাতা উল্টিয়ে দেখে। কবিতার শরীর জুড়ে বিরহের ঘনছাপ। বন্ধু সুজন ও শাকিলা আমাদের বাড়িতে এসেছে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টিতে অর্ধ শরীর ভিজে গেছে। স্মিতার হাস্য মুখটা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। বাড়ির সবাই খুব খুশি। অনেকদিন পর সুজন এসেছে। ওর হাতে সময় নেই, ও বিদেশে থাকে ওখানে‌ই ওর যাপন। তাছাড়া ওর আত্মীয় বলতে কেউ নেই, প্রবাস থেকে ফিরলে বন্ধুদের বাড়িতে আড্ডা জমায়। কিছুক্ষণ পর, স্মিতা তাঁর অন্য বন্ধুদের‌ও ডেকে নিল। সবমিলিয়ে আজকে ভারি আনন্দ আড্ডা হলো। পরদিন, সকালে সবাই খাওয়া-দাওয়ার পর বাড়ি গেলেন। 

এদিকে মনঃকষ্টে দিন রাত যায় স্মিতার। মুখে হাসি, অন্তরে ব্যাথা। প্রিয়তম ভুলেছে প্রিয়মুখ। নিত্য দুঃখের চিতা জ্বলে। তবুও স্বপ্ন গুলোকে বাঁচিয়ে রাখে। পাখির ডানার মতো উড়ে যায় সুখ। কোথায় সুখের সীমানা অথবা দুঃখের মতো আনন্দ। নিতান্তই মনে হয়, মরীচিকার পিছে পিছে ছুটে হচ্ছি ম্লান। জীবনটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। জীবনের গহীনে লুকিয়ে আছে কি সত্য? তা জানার জন্য‌ই সেই কবে থেকে ছুটছি।

নিলয় এবার স্কুলে বৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে। খুব আনন্দে বাড়ি ফিরে আসে। প্রচণ্ড বেগে ছুটে মায়ের কাছে যায়। হঠাৎ পা পিছলে আছাড় খায়। মা...মা... বলে চিৎকার করে। রক্তে রক্তে কচি ঠোঁটটা লাল হয়ে গেল। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। স্মিতা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ঔষধ লাগিয়ে দেওয়া হলো। অতঃপর ধীরে ধীরে সুস্থ হলো নিলয়। বেশ কয়েকদিন চলে গেল। কত অমাবস্যা, কত পূর্ণিমা চলে গেল। অপূর্বের কোনো খোঁজ নেই, বহুদিন ধরে আর কবিতার ছেঁড়া পাতাও জমা হয় না জানালার পাশে। সেই কবে একদিন দেখা হয়েছিল। এখন ঘরের কোণে জমা হয় ধুলো আর বালি। 

দীর্ঘ একমাস পর। শাকিলার ফোন।

“হ্যাঁরে,‌স্মিতা কোথায় আছিস? বহুদিন ধরে কথা হয় না।”

“বাড়িতেই আছি।”

“যেকোনো সময় দেখা করতে পারবি?”

“কেন রে?”

“এসেই দেখনা কেন?”

অপূর্ব এসেছে শাকিলাদের বাড়িতে। জমে উঠেছে মান্না দের গান। ঝিরিঝিরি হাওয়ায় কন্ঠ ভেসে আসছে। বাইরে থেকে শোনা যায় মধুর আকুতি। স্মিতা এসে উপস্থিত হলো। অপূর্ব জানতো না, হঠাৎ স্মিতার আগমন ঘটবে। কারণ শাকিলা তো তাকে বলেনি। খানিকটা খুনসুটি। হৃদয়ে জমে উঠেছে চিরচেনা আবেগ। অপূর্ব তাকে ভালোবাসে কিন্তু কিছুদিন পর জানতে পায় স্মিতার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। তাঁর বাবা গোপনে পাত্র ঠিক করেছে। স্মিতাও তা জানে না। আগামী শুক্রবার স্মিতার বিয়ে। কিন্তু বিয়ে আটকানোর সাধ্য ছিল না অপূর্বের। বড় একটা ফাঁরাক ছিল ওদের সাথে। অপূর্ব নিজের একটা জগৎ তৈরি করে নিয়েছিল তাঁর নাম একাকীত্ব। শাকিলাদের বাড়ি থেকে ফিরে গেলেন দুজনে।

 বিয়ের একদিন আগে আবারও জানালার ফাঁক দিয়ে একটা কাগজ এলো। তবে এটা প্রতিবারের মতো কবিতা ছিল না, দুঃখভরা একটা চিঠি এলো। চিঠিতে লেখা....“তোমাকে বলেছিলাম না, আমি একাকিত্বের বড় দাস। আমার নিজস্ব একটা পৃথিবী আছে। আজ আমি চলে যাচ্ছি অনেক দূরে। তোমার জীবন সাজানো বারান্দা। ওখানে আমার অধিকার নাই। তুমি সুখে থাকলেই আমি সুখে থাকব। চোখের জল মুছে ফেল প্রিয়। এটাই আমার শেষ এবং প্রথম সম্বোধন, প্রিয়। চলে যাচ্ছি....আমাদের গ্রামে। তোমাদের থেকে উত্তরের সীমানার খুব কাছে কুড়িগ্রামে। এইপথে আর ফিরবনা কোনদিন। তুমি সুখে থেকো প্রিয়। আমাকে মন থেকে মুছে ফেল। ট্রাজেডি ছাড়া জীবন সম্পূর্ণ হয় না। শুধু জেনে রেখো, জীবন বড় অসহায়।”



০১ মে ২০২৩ - ০২ মে ২০২৩

কাঠেরপুল, শিবুমার্কেট, নারায়ণগঞ্জ।






Post a Comment

0 Comments