🎙️“ক্ষ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশপাথর।”কবিদের কেউ তৈরি করতে পারে না বরং জন্ম থেকেই সে কবি হয়ে ওঠে! কবিতা কি? —এটা যেমন কাউকে শেখানো যায় না, তেমনি হঠাৎ করে কেউ কবিও হতে পারে না। শিল্প চেতনা, সংস্কৃতি চেতনা এবং কুসংস্কার মুক্ত না হলে এই পথে এগোনো যায় না। কবিকে সবসময় ঊর্ধ্বমুখী হতে হবে। কবি হবে দক্ষিণামূর্তি। প্রেমে টইটুম্বর। কবি ইহজগতের সাধারণ জীব হলেও দূরদৃষ্টিসম্পন্নতার কারণে আমরা তাকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছি। ইংরেজি প্রবাদে আছে Knowledge has not Geography অর্থাৎ জ্ঞানের যেমন সীমারেখা নেই, ঠিক তেমনি একজন কবির কোন সীমাবদ্ধতা নেই। তিনি মুক্ত স্বাধীন। তার কবিতা সর্বজনবিদিত। কবিতার অমরত্ব প্রজ্ঞার আবরণে যাকে চিরায়ত করেছে— মহাকালের সন্ধিক্ষণ; সেই লক্ষ্যে ভাবুকের জন্মাবধি সাধনা সকল মহাপ্রাণকে কবিতার জন্য চিরদিনের মত বুকে টেনে নেন। মহাত্মা তুলসীদাস বলেন, “নিজ কবিও কেহি লাগ ন নীকা।/সরস হোউ অথবা অতি ফীকা।।/ জে পর ভনিতি সুনত হরষাহী।/ তে বর পুরুষ বহুত জগ নাহী।।” অর্থাৎ, স্বরচিত সরস—নীরস কবিতা সকলেরই ভালো বলেই মনে হয়। কিন্তু অপরের লেখা কবিতা শ্রবণ করে আনন্দ অনুভূতি লাভ করেন এমন স্বজন ব্যক্তি তো জগতে বিরল।কবিতাকে হৃদয়ে ধারণ করা অপেক্ষা চলমান ক্রিয়া অব্যাহত রাখা বড়ই কঠিন। কারণ তুলসীদাসের কথা অনুযায়ী আমরা কেউ কারো কবিতা পড়তে ভালোবাসি না বরং তার বিরোধিতা করে বসি। বর্তমান সময়ে এইসব দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। না জেনে মন্তব্য করাটাও আজ তেমন কোন ব্যাপার না— সেটা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। এভাবেই কবিতা হয়ে যায় কোণঠাসা। প্রকৃত গুণী থাকলেও গুণীর অভাববোধ লক্ষ্য করি। যাতে করে কবিতা সর্বজনবিদিত না হয়, সে চেষ্টা অনাদিকাল ধরে চলছে কিন্তু তাই বলে কবিতা একেবারেই ভেঙে পড়েনি বরং প্রজন্মের কবিরা একেকটি ধারায় একে বিন্যাস করে চলেছেন। এখন আমাদের লক্ষ্য কবিতা সম্পর্কে আমরা কী ভাবি? এবং কবিদের কি ভাবা উচিত বা অনুচিত সে সম্পর্কে আলোচনা করা যাবে। চৈতন্যবোধ জাগ্রত করতে কবিতাকে কিভাবে কাজে লাগানো যায় পাঠকের দরবারে তা বন্দোবস্ত করতে হবে। এমন কোন ফর্মুলার মাধ্যমে এগোতে হবে যাতে কবিসত্ত্বা এবং পাঠকসত্ত্বা নিভৃতকুঞ্জে জ্ঞানতৃষ্ণায় তার অতিলৌকিক সত্ত্বাকে বোঝাতে পারবেন— সময়ের সুপরিকল্পিত আহ্বান।উপরে উল্লেখিত চিত্রে যে বিষয়টি বোঝানো হয়েছে তা একে একে আলোচনা করা যাক—এই বিষয়টি একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া যার মধ্য দিয়ে কবিসত্ত্বার প্রকাশ। এই চক্রব্যূহের মধ্য থেকে কিভাবে রসতত্ত্বকে বের করে এনে ছন্দের জাদুঘরে বদ্ধ করা যাবে তার প্রক্রিয়া খুব সহজে পাঠক মননে আঁচ ফেলতে পারে। এই চিত্রটি মহাজাগতিক ক্রিয়ার সাথে একাত্মতা বোধ প্রকাশ করে। এমন কোন সময় ছিল না, যখন কবিতা ছিল না। কখনো সুপ্ত কখনো লুপ্ত এই ছিল চক্রব্যূহের মূল রহস্য। কিন্তু আমরা যে সময়টাকে কাজে লাগাবো সেই সময়টা বড় জটিল এবং সহজ কিছুর সমন্বয়। প্রধানত দুইটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, একটি ভাববার প্রয়াস অপরটি গতিশীলতা। কবিতার রূপরেখাকে তৈরি করতে গেলে এই দুটি প্রয়োজনীয় বস্তু ছাড়া এগোতে পারবো না। তাই এর উপরে ভিত্তি করে গঠিত হয়েছে অনাদিকালের চিরায়ত যতসব কল্পকাহিনীর সাম্রাজ্য। শুধুমাত্র, কল্পকাহিনীই নয় বরং এর উপর ভিত্তি করে মানবসভ্যতা, শৃঙ্খলা, সহানুভূতি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এজন্য কাব্য সমীকরণে এই দুটি সূত্র সবচেয়ে বেশি প্রণিধানযোগ্য। আর এই দুটি বস্তু থেকেই তৈরি হয় কবিসত্ত্বা, যা কল্পসৃষ্টিতে সক্ষম। যুগন্ধর চরিত্র সৃষ্টিতে যুগান্তরকারী কল্পনার অতিপ্রয়াস এই ভাবনা থেকেই উৎকর্ষ হয়। এবং কবিসত্ত্বাকে ব্যবহার করে প্রকৃতিগত কিছু নৈপুণ্যের আবহ সৃষ্টি হয়, যেগুলো একেকটি আরেকটির সাথে দ্বিধা প্রকাশ করে না বরং একসঙ্গে সমস্ত প্রক্রিয়াকে অনির্বান করে বস্তুগত চরিত্র সৃষ্টিতে অবদান রাখে। এ কারণেই মহাকাল অসম্ভব কিছুর সমন্বয় ঘটিয়ে প্রকৃতির উদার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। যাতে চিন্তাশক্তির উৎকর্ষ হতে স্বাভাবিক কল্পচিন্তার অতিমানসের অতীন্দ্রিয় ভাবধারার বিকাশ ঘটে। এই প্রক্রিয়াকে চক্রাকারে আটটি সম্পর্কে জড়িত করা হয়েছে যার মূল কেন্দ্রে রয়েছে ছন্দ। যথাক্রোমে: শব্দচয়ন, কল্পনা, বহুমাত্রিকতা, ছন্দ, চিন্তা, সারল্য, উৎকর্ষ ও সাধনা। এই আটটি বস্তু সমস্ত কাঠামোটাকে একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে উপস্থাপন করতে পারেন। আমরা ছন্দকে সবার মধ্যস্থানে বা কেন্দ্রে উপস্থাপন করেছি কারণ এটি একটি চলমান স্পন্দন ক্রিয়া যা ভিতরের দুর্বল্যভাবকে অতীন্দ্রিয় সত্ত্বায় প্রকাশ করতে পারে। যা থেকে অন্যান্য পারস্পরিক যারা আছেন তারা উৎকর্ষ লাভ করতে সক্ষম হন। এবং অন্যান্যরা এখান থেকেই উপযুক্ত সৌকুমার্য গ্রহণ করে থাকবেন। ছন্দের সাথে এই সাতটি বস্তু পারস্পরিক শত্রুতা রুখে দিয়ে মহাজাগতিক পরিকল্পনাকে মহাকালের ঊর্ধ্বতর স্থানে জায়গা করে নিতে সমসাময়িক মহিমাকেও ছুড়ে ফেলে ভবিষ্যতের দ্বার গোড়ায় উপস্থাপিত হবেন। এ যেন সূর্যকে কেন্দ্র করে সাতটি রশ্মির উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। সাতটি তারার মাঝে অসম্ভব চন্দ্রের উল্লাস। এই অসম্ভব ক্রিয়াকে চলমান সত্ত্বায় অবমানবের রূপবৈচিত্র্য রচনা হয়। তার থেকেই কবিতার সাযুজ্য লাভ বা প্রয়াগসিদ্ধ হয়। এটা গেল কবিতা রচনার সংক্ষিপ্ত উদাহরণ। কিন্তু পাঠকের কাছে হাজির করতে হলে আরো কিছু উপাচার দরকার যা পাঠককে অবমানবের কাছে নিয়ে চলে। এর মধ্যে কিছু অভ্যন্তরীণ বিষয়ও লক্ষ্য করা যায়। পাঠক এবং কবির দূরত্ব নির্ণায়ক গতিসূত্রকে সমতলে আশ্রয় দেবার মত দুই একটি কথা হয়তো পাঠকের মনে ঠাঁয় পায় কিন্তু সে অবস্থায় পাঠক নিজেকে কন্ট্রোলে নিতে খানিকটা বেহুঁশ হয়ে যায়। অতঃপর বোধ আসে, জানতে হবে, পড়তে হবে। এক জীবনে যেহেতু, পৃথিবীর সব কাব্য পড়ে ফেলা যায় না কিন্তু ধী-শক্তির মাধ্যমে কিছু কিছু কাব্য সাহিত্যকে মননে স্থান দিতে যাতে সংকোচ বোধ না করি। একথা পাঠক এবং কবির চিরকালের জন্য প্রযোজ্য। কবিতা নামক পরশপাথর খুঁজতে আমরা বের হয়েছি, কবিতা ভাবনা সেই রহস্যমেদুর কল্পজগতের ভাবনা বিলাস নিয়ে মহাকালের সন্ধিক্ষণে সার্থক চরিত্র সৃষ্টিতে আজীবনের সমগ্র মানবসত্ত্বাকে কল্পজগতে রূপায়িত করে। কবিতা ভাবনা সেই সার্থক রচনার দিকে তার প্রবাহিত ডালপালা ছেড়ে দেবেন। তাহলে চলুন জেনে আসা যাক চিন্তাচক্রের অভিনব প্রয়াসের কথা।১. ভাববার প্রয়াস: এই চক্রব্যূহের প্রথম সূত্র হচ্ছে ভাববার প্রয়াস। কবি তার ভাবনাকে কিরূপে মানসক্ষেত্রে চিন্তা করবেন এবং কোথায় সেটা স্থাপন করবেন, সে বিষয়ে আগে তৎপর হতে হবে। সৎ ও অসৎ প্রবৃত্তি কবিতার ইন্দ্রজালকে ভেঙে ফেলতে দু’একটি অপ্রীতিকর সরল চিন্তায় যথেষ্ট। মেঘদূতের কবি যখন ভাবছেন রামগিরি থেকে মেঘ উড়ে যাচ্ছে বিদিশা নামক রাজধানীতে সেখানে পাহাড়ের নীচে ঝরনা ধারার মতো বয়ে যাবে বৃষ্টির জল যেন কেউ শুয়ে আছেন সমুদ্রের উত্তাল যৌবনে কিংবা আধুনিক কালের জীবনানন্দ হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে পথ হাঁটছেন —এই আশায় যে বনলতা সেন কখন এসে বলবেন, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ —এই প্রসঙ্গগুলো একজন কবির ভেতর যখন কাজ করে তখন তার ভাববার জগত জুড়ে অতিমানস কাজ করেন। তাই প্রথমে আমরা ভাববার প্রয়াসকে ব্যক্ত করেছি যাতে কালের সত্যকে মননে স্থানে দেওয়া যায়। কবিতার ক্ষেত্রে সব ভাবনায় যথেষ্ট নয়! শাশ্বত চরিত্র অঙ্কন করতে গেলে অসৎ প্রবৃত্তিকে নিবৃত্তির দিকে নিয়ে যাওয়া দুঃসাধ্য; তবুও কবিতায় নিম্নস্তরের চরিত্রকে উচ্চ স্তরের চরিত্রের সঙ্গে উপযোগ সৃষ্টি করে কবি সৎ উদ্দেশ্যে তার আদর্শকে ব্যক্ত করেন; এ অবস্থায় সৎ চরিত্র সৃষ্টিতে গুণগত মান দরকার। ব্যবহার এবং উপযোগী এই দুটি শব্দকে ঠিক ঠিক জায়গায় কার্যকরী করে তুলতে পারলে উপর্যুক্ত ভাবনাকে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেওয়া সম্ভব। রসশাস্ত্রের পণ্ডিতগণ এইভাবকে নয়টি ভাগে বিভক্ত করেছেন, শৃঙ্গার ভাব, হাস্যভাব, করুণভাব, রৌদ্র ভাব, বীরভাব, ভয়ানক ভাব, বীভৎসৎ ভাব, অদ্ভুত ভাব এবং শান্ত ভাব। তারা বলছেন, এই নয়টি ভাব ছাড়াও আরো বহুভাবের উদ্ভব পাওয়া যায় কিন্তু তার মধ্যে এই নয়টি ভাব সর্বজনগ্রাহ্য। মনে করা হয়, রসতত্ত্বের পণ্ডিতরা তেত্রিশটি ভাবের কথা বলে গেছেন, তাছাড়াও অনেক ভাব ব্যঞ্জনা আছে। এই বহুমাত্রিকতার যুগে কখন কোন ভাবকে কোথায় কাজে লাগাতে হবে, —এটি পাঠককে উপযুক্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। কবি সেই ভাবের ব্যঞ্জনার দ্বারা পাঠকের হৃদয়ে অমৃতলোকের সুখানুভূতি এনে দেবেন। এই নয়টি স্থায়ী ভাবকে সাধনার ক্ষেত্রে একান্ত প্রয়োজন। কবিরা সেদিকে লক্ষ্য রেখে চলবেন এটাই আশা করি। কবিতায় প্রয়োজনীয় বস্তুসমগ্র অথবা নিরবিচ্ছিন্ন নির্গুন শক্তিকে সামর্থ্যে পরিণত করবার অতিপ্রয়াস— ভাবনার জগতকে ঘিরে কল্পশক্তির বিকাশ ঘটায়। কবিতার নবজীবনের প্রথম পর্যায়ে যদি ভুলবশত দিকনির্দেশনা অন্য কোথাও সংক্রমিত হয় তাহলে যাচিত সুফল পাওয়া যায় না। আমি কি ভাবছি? কেন ভাবছি? —এ বিষয়টি আগে পরিষ্কার করে নিয়ে তারপর কবিতার আসরে প্রবেশ করা উচিত। কারণ কবিতা সম্পর্কিত সমস্ত কিছুর নির্ভরতা আপনার ভাবনাকে লক্ষ্য করেই পুনর্জাগরণ সম্ভবপর হয়। তাই এ বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে কবিতাকে শুধুমাত্র শব্দের খাতিরে জীর্ণ করে তুললে পাঠক সমাজের কাছে অনর্থক বৈ অন্য কিছু আশা করা যায় না। Information technology —এর যুগে ভাবনার চিন্তা যখন যুক্ত হয়েছে যন্ত্রের সাথে তখন অনাদিকালের মানুষিক তন্ত্র হীনমন্যতায় ভুগতে পারে বলেও মনে হয়। বর্তমানে কবিতা লিখতে যন্ত্রের সাহায্য নিলেই ঝটপট হয়ে যায় কিন্তু এর কোন সুফল লক্ষ্য করা যায় না। একদিকে যেমন ক্ষতির আশঙ্কা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে কবিতার হাড়গোড় দুর্বল হয়ে যাচ্ছে— উপযুক্ত ভাবনার জগত সৃষ্টি না হওয়ার জন্য। হেমন্তের কবিরা পলাশ কিংবা শিমুল ফুলের বর্ণনা দিয়েই যেমন ক্ষান্ত হন; আমি ঠিক তেমন চাই না, আরো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অতিলৌকিক ভাবধারার বিকাশ চাই। এর জন্য কঠিন সাধনা করতে হলেও কবিকে করতে হবে। কবিতার দেহকে মসৃণ এবং সুস্থির পরিকল্পনার আবরণে গতানুগতিক দৃষ্টি রেখে পরিশুদ্ধ জগত সৃষ্টি করা। এটি ভাবনার গভীরতা সৃষ্টি করে।২. গতিশীলতা: আবহমান কাল ধরেই চিরায়ত সত্যকে লালন করে সূচিশুদ্ধ ভাবধারার বিকাশ কবিদের হাত ধরে হয়েছে। প্রধান কারণ হচ্ছে গতিশীলতা। কোন বস্তু চলমান ক্রিয়ার মধ্যে না থাকলে তা ভবিষ্যতে জীর্ণতা প্রাপ্ত হয় মাত্র। কবিতার গূঢ় সত্যকে ভবিষ্যতের কাছে মেলে ধরতে গতিশীলতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কল্পশক্তির উদার আহ্বান প্রত্যেক কবির কাছ থেকে ভবিতব্য আশা করে। এজন্য কখনো কখনো কবিতা সুপ্ত আবার কখনো কখনো লুপ্ত আকার ধারণ করলেও সময়ের বিবর্তনে কবিতার আনুষ্ঠানিকতা বিস্তৃত এবং মসৃণ হয়েছে। আধুনিককালের গণ্ডি পেরিয়েও নতুন রূপে কবিতাকে বরণ করে নেওয়ার উদ্যোগ কবি সমাজের একান্ত লক্ষ্য হলেও গতিশীলতা কোথায় নিয়ে গিয়ে কবিতার সারবস্তু ব্যক্ত করবে —এটা মহাকাল বলে দেবেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘‘কবিতার বিশেষত্ব হচ্ছে তার গতিশীলতা, এই গতির শেষ নেই।’’ আমরা বারবার একটা কথা বলেছি যে কবিতার পথ রুদ্ধ হয় না, কবিতা তার আপন মহিমায় মহিমান্বিত! কবিতার স্বরূপ সন্ধানী লোকেরা এই নিগূঢ় সত্যকে কালে কালে আবিষ্কার করে চলেছেন। তার গতিমাত্রাকে যিনি সংবেদনশীলতার মধ্যে রূপায়ণ করেছেন— তিনি পরবর্তীকালে কবিতার শ্রেষ্ঠত্বকে বিচার করবেন। বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, “জয়দেবের কবিতা, উৎফুল্লকমলজালশোভিত, বিহঙ্গমাকুল, স্বচ্ছ বারিবিশিষ্ট সুন্দর সরোবর; বিদ্যাপতির কবিতা দুরগামিনী বেগবতি তরঙ্গসঙ্কুলা নদী। জয়দেবের কবিতা স্বর্ণহার, বিদ্যাপতির কবিতা সরদ্রাক্ষমালা। জয় দেবের গান, মূরজবীণাসঙ্গিনী, স্ত্রীকন্ঠগীতি; বিদ্যাপতির গান, সায়াহ্নসমীরণের নিঃশ্বাস।” এই যে বিচার করার ক্ষমতা এটি কোত্থেকে এলো? কবিকে যখন প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয় সময়ের হাতে তখন কবিতার সৌন্দর্যের সাথে সাথে অনির্বাণ প্রয়াসও পাঠকের হৃদয়ানুভূতিকে ভাবাতে শেখায়। কবিতা যখন তার সমকালীনতাকে পেরিয়ে গেছে তখন আর আমাদের নতুন করে ভাবতে হয় না। সমকাল পেরিয়ে কবিতায় বিচারালয়ে শূচিসুদ্ধ পাঠক প্রজ্ঞার দ্বারা কবিতাকে মহাকাশে স্থাপন করবেন। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কবিতাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবেন, তার দেহকে ক্ষতবিক্ষত করবেন, গুনগ্রাহীতার অপরিসীম সমুদ্রে ফেলে মুক্তা তুলে আনবেন। এই সৎ সাহস প্রত্যেকটি কালে ছিল বলেই কবি তার সৃজনশীলসত্ত্বাকে জ্বলন্ত পিন্ডির মধ্যে রেখেও স্বপ্ন দেখেছেন নতুন কিছুর সম্ভাবনার। রবীন্দ্রনাথ চালক কবিতায় বলেছেন...“অদৃষ্টেরে সুধালেম, চিরদিন পিছেঅমোঘ নিষ্ঠুর বলে কে মোরে ঠেলিছে?সে কহিল, ফিরে দেখো। দেখিলাম থামি,সম্মুখে ফেলিতে মোরে পশ্চাতের আমি—”কবিতাটির অমোঘ সত্যকে অস্বীকার করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। জীবনের শৃঙ্খল পায়ে দিয়ে জীবনকে উপভোগ করে যাচ্ছি অনবরত। এই চলমান ক্রিয়া যতক্ষণ স্নায়ুতন্ত্রের সাহায্য গ্রহণ করছে ততক্ষণ জীবিত সত্ত্বার উৎকর্ষ লাভ করছে। আর যখন স্নায়ুতন্ত্র দুর্বল মস্তিষ্কের শিকার হচ্ছে তখন নিভন্ত চুল্লির মতো নিমিষে শেষ হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ গতিশীলতাকে রক্ষা করা গেল না। রবীন্দ্রনাথ আমাদেরকে বলতে চাচ্ছেন, তুমি তোমাকেই ব্যবহার কর গতিশীলতা রক্ষা করতে। কারণ সম্মুখ পদাবলীর যুদ্ধে একমাত্র বিবেকবোধ জাগ্রত না থাকলে সৃষ্টিকে ভোগ করা অসম্ভব। একেকটি শব্দ খন্ড খন্ড জীবনের পরিণাম। শব্দকে রথ করেই বাক্যের গতিশীলতা ছন্দের অনুকম্পার মধ্য দিয়ে সংগঠিত হবে। ঐশ্বর্যের ভাবগাম্ভীর্যের সরলরেখা ধরে চিত্তশুদ্ধির মোহ এই ধ্রুব সত্যকে বরণ করে নেবে। যতক্ষণ কবিতার রস আস্বাদনের উপায় কবির গতিশীলতাকে প্রখর না করছে ততক্ষণ কবিতার শরীররক্ষা সাধনাসাপেক্ষ। কারণ ভবিতব্য কবিতার সৃজনশীলতাকে উত্তম মর্যাদা দিতে উৎসুক। কিন্তু কালপ্রবাহে সময়কে পরাভূত না করতে পারলে, কবিতা স্বয়ংসিদ্ধ হয় না।এ তো গেল দুটি মূলসূত্রের সদ্ব্যবহার। এই পথ ধরে সৃজনশীলতার পথে এগোনোর দরজা খুলে যায়। উর্বর সাহিত্য সৃষ্টিতে সবচেয়ে নির্ভরশীল সূত্রগুলো এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাঠক মাত্রই আদর্শগত দিক থেকে সমস্তটা গ্রহণ করবেন আর যা ব্যতিক্রমী মনে হবে তা প্রাজ্ঞ মননের দিক থেকে বিচারের মাধ্যমে গ্রহণ করবেন। আদর্শ, নৈতিকতা, সামাজিকতা এবং সরলতা এই কয়েকটি বিষয় সুষম সাহিত্য সৃষ্টিতে সহায়তা করে। বহুমুখী কবিতার যুগে নতুন ভাবনার উন্মেষ ঘটানোর আগে শব্দশৈলীর মুক্তচিন্তা শৈল্পিক বিন্যাসে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে গেলে— আমি মনে করি, এই কয়েকটি ভাবনার সম্মেলন আপনার কল্পিত চরিত্র সৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি যোগান দেবে। যদিও আমরা এখনো চক্রাকার বেষ্টনীতে আবদ্ধ হয়নি, তবুও প্রত্যেকটি কাজ শুরু করার আগে কাজের ধারাবাহিক নমুনা জানতে পারলে পাঠক নিশ্চিত হন যে পরবর্তী সম্ভাবনা সম্পর্কে কতটুকু আভাস পাওয়া যাবে। সে কথা হয়তো আপনারা পূর্বেই বুঝতে পেরেছেন।কিন্তু সবকিছু অল্পতেই হয়তো শেষ হয় না। বারংবার চিন্তার জগতে নতুন কিছুর সম্ভাবনা আপনার চিন্তাকে নির্দিষ্ট পয়েন্টে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায়। স্বভাবতই, বর্তমান আকাশে প্রচন্ড মেঘ ছুটে বেড়াচ্ছে এবং তীব্র বাতাসে ঘনীভূত হচ্ছে বৃষ্টির রূপরেখা। যা পরবর্তীতে প্রকৃতিগতভাবেই তাণ্ডব শেষে সৃষ্টিশীল মহিমায় উদ্ভাসিত হবে। খাল-বিল একাকার হয়ে যাবে। কবি এই সূত্র ধরে তার কবিতার সৃষ্টিশীল সৃজনশীলতার লক্ষ্যে —মেঘ জিনিসটিকে অন্যভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। যা এই সূত্রকেও হার মানাবে সময়ের বিবর্তনে। হয়তো দেখা যাবে কেউ মেঘের উদাহরণ দিচ্ছে কিন্তু ঘটনাটা ঘটছে ভিন্ন রকম যার সঙ্গে মেঘের কোন সম্পর্কই নেই। যেমন উদাহরণস্বরূপ আমার লেখা “যানজট” কবিতাটি দিচ্ছি:“মহাকাশে যানজট নিরসনেএইসব প্রস্তুতিকবিতার মায়াজালব্লেডের সুদারুণ কাটিংয়েমেঘবতি সুনয়নাগতরাতে অণিমাকেপৃথিবী থেকে যেন বিদায়ের কথা বলেযানজট নিরসনে শিথিলতা দেখিয়েছেফাঁকা মাঠ ছাড়া আর হৃদিতাকেমহাকাশে যেতে হবে না—কবিতাকে কথা দেয়া সম্ভব”কবিতাটিতে যানজটের কথা তুলে ধরে আত্মহননের চেষ্টাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। প্রথমে অনেকেই যানজট কথাটি শুনে মনের মধ্যে অন্য কিছুর ভাবনা নিশ্চয়ই চলে আসবে কিন্তু কবি সেই ভাবনাকে উপেক্ষা করে নতুন মাত্রায় শব্দশৈলীর মাধ্যমে সৃজনশীল সত্ত্বার প্রকাশ করেন। এই গুণটি বর্তমান কবি কিংবা সাহিত্যিকের না থাকলে ব্যতিক্রম সাহিত্য সৃষ্টিতে আমরা অনেকটা পিছিয়ে পড়বো। উত্তরাধুনিক সাহিত্যে এই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তাই চিন্তাসূত্রের খেরোখাতা খুলে উপস্থাপনের ভঙ্গিমাকে নানারূপ ব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত করাতে হবে। সেই ব্যঞ্জনার উৎকৃষ্ট গুলো ধীরে ধীরে ব্যক্ত করতেই আপনাদের সামনে কথার ফুলঝুড়ি নিয়ে সেই মহাকালের পথে চেয়ে আছি। মহাকাল আমাকে পাঠিয়েছে সৌন্দর্যের রূপকার পৃথিবীতে প্রত্যেক পাঠককে সুষম শব্দে পরিপূর্ণ করে তুলতে— যাতে প্রাণের স্পন্দন সময়ের কলতানে আনন্দবিহ্বল চিত্তকে গ্রাস করতে না পারে।_______________________________ধরা গেল, ভাববার প্রয়াস ও গতিশীলতা দুই আপনার মাঝে বিরাজমান— তাহলেই কি আপনি কবিতা লিখতে পারবেন? না, কবিতা সৃষ্টির সরঞ্জামকে এক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে। এজন্য দরকার খুব সুচিন্তিত মস্তিষ্ক। মহাকালের অদৃষ্টে যে ধারাটি বোধগম্যতা সৃষ্টিতে সক্ষম এবং পরিশীলিত রূপ ও বৈচিত্রের উৎকর্ষ সাধনে সৎ-অসৎ বস্তুনিষ্ঠ কাঠামোর ব্যবহারিক জটিলতাকে উপেক্ষা করে; সৃষ্টিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে ও একই সাথে কবি এই অষ্টমার্গকে অর্থাৎ শব্দচয়ন, কল্পনা, বহুমাত্রিকতা, ছন্দ, চিন্তা, সারল্য, উৎকর্ষ ও সাধনাকে সুসংবদ্ধভাবে কল্পনার পরিধিতে উন্মেষের সম্মেলন ঘটায়।শব্দচয়ন: উপযুক্ত শব্দকে বেছে নেওয়া। এটি আগে ঠিক করতে হবে যে উপযুক্ত শব্দ কোনটি? কোন শব্দটি কোন জায়গায় ব্যবহার করা যাবে এবং কিভাবে ব্যবহার করা যাবে? ব্যবহারের ক্ষমতা - দক্ষতা ও উপকরণ প্রণালীর উপর ভিত্তি করে—এ সম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। শব্দকে দুইভাবে ব্যবহার করতে পারি, এক প্রত্যক্ষভাবে এবং দুই পরোক্ষভাবে। প্রত্যক্ষ অর্থাৎ শব্দকে সরাসরি ব্যবহার করা বা বাক্যের তন্ত্রীলয়ে আন্দোলিত উপাদানের সঙ্গে বাইরের পরিবেশগত ধারার সাথে একাত্মবোধ প্রকাশ করা। শব্দকে বাক্য ও ধ্বনির সাহায্যে সাধকগণ উচ্চ স্তরে নিয়ে চলেন। বাক্য ও ধ্বনির স্বয়ংক্রিয় অবস্থায় যা দৃষ্টিগোচর হয় এবং অতিভাবনাকে এড়িয়ে চলেন তাকে প্রত্যক্ষ শব্দচয়ন বলা চলে। অপরদিকে ধ্বনিতন্ত্রের উৎকর্ষ সাধনে অতীন্দ্রিয় সত্ত্বার মহামিলনের ক্ষেত্রেকে বাক্য এবং ধ্বনি দুই মহাশক্তির সম্মিলিত গতিকে আবছা ছায়ার সাথে তুলনা করে অনুভূতির জগতকে বিস্তৃত রূপদানকারী পরোক্ষ শব্দচয়ন। উদাহরণস্বরূপ: ভারতবর্ষের সাধকগণ শব্দব্রহ্মের সাধনা করতেন কিন্তু কেউই এই শব্দের অর্থ রূপবৈচিত্র্য সম্পর্কে জ্ঞাত নন! তাই শব্দকে তারা নতুন করে জীবন দান করেছেন, কল্পনার বহির্জগতে রূপবৈচিত্র্যের সন্ধান করে। তাই আমরা তাদের ঋষি বলে থাকি। প্রতিটি কবিতা কোন না কোন ঋষির সৃষ্টি যিনি লৌকিক ও অলৌকিক সৃষ্টিতে আপনার সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন। কল্পসূত্রে বেঁধে দিয়েছেন, প্রতিটি শব্দের এক একটি রূপ ও রূপের মহিমা। যে শব্দটি কবিতার জৌলুস ফিরে আনেন নতুন নতুন শব্দ কল্পের প্রেষণার বিচিত্রতা তৈরি করে গেঁথে ফেলেন রত্নহার— সেই সম্ভাবনার দুয়ার খুলে কবিকে আসতে হয় সূর্যালোকে।কল্পনা: হচ্ছে অমিত নিষ্ক্রিয় শক্তির রূপময় প্রকাশ। ভাবনার পরিধিকে ঘিরে একটা চিত্রকল্পের আনুষ্ঠানিক মত প্রকাশ। যা চেতনার বর্হিবিশ্ব জুড়ে পুনর্জাগরণ শক্তিকে উত্তপ্ত করে— সম্ভবনাকে জাগিয়ে তোলে। উদ্ভাবনী নৈপুণ্যের যথার্থ ভাব প্রকাশ এর মাধ্যমেই সম্পূর্ণ হয়। এটি মূলত, কাঠামোটিকে দীর্ঘ চিন্তার আবরণে একটি চিরকালীন রূপ দেওয়া। ভাবনার জগৎ ঘিরে শব্দকল্পের নিষ্ক্রিয় অবস্থাকে বর্হিসূত্রে রূপময় সত্ত্বার বিকাশের যে অবকাঠামো বাগ্মীগণ রচনা করেন তাঁর মাধ্যমেই কবিতার নৈপুণ্য গড়ে ওঠে! এবং দৃশ্য থেকে দৃশান্তরে যাওয়ার অভিনব প্রকাশ কল্পনা সূত্রের দীর্ঘ প্রচেষ্টা।কল্পনা শব্দটিকে মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, পুনর্গঠন করা বা গঠনমূলক রূপ দান করা। এটি দুইভাবে সম্পন্ন হতে পারে, স্বেচ্ছা ভিত্তিক স্বাভাবিক কল্পনা ও স্বতঃস্ফূর্ত বিরোধী কল্পনা।প্রথমত, স্বেচ্ছা ভিত্তিক স্বাভাবিক কল্পনা হলো, যা স্ব-জ্ঞানে বাইরের বস্তু সমূহের বাইরে গিয়ে চিন্তা করা বা কল্পনা করা। এরকম দৃশ্যকল্প ভাববার প্রয়াসকে স্বেচ্ছা ভিত্তিক স্বাভাবিক কল্পনা বলে। এরকম কর্মকাণ্ডকে মনোবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন, মানসিক সমন্বয়। কারণ মানসক্ষেত্রের অভিনব কায়দায় মানসিক সত্বকে ব্যক্তি সত্ত্বায় রূপান্তর করে ইচ্ছামত রূপ দান করা যায়। যা ব্যক্তির বাইরের দৃশ্যমান চারিত্রিক ভিত্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।দ্বিতীয়ত, চৈতন্যহীন যে কল্পনা মানসক্ষেত্রে সংগঠিত হয়, সেটিই স্বতঃস্ফূর্ত বিরোধী কল্পনা। বোধশক্তির পুনর্দয় না হলে মৌলিক চিন্তার অবকাঠামো গড়ে ওঠে না। প্রত্যেকটি চিন্তা স্ব স্ব ভাবনার অতিপ্রয়াসকারী স্বত্ত্বার কল্পিত উপাদান। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে সব কল্পনা ব্যক্তি স্বতন্ত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়! কারণ যখন কেউ ঘুমের মধ্যে থাকেন এবং স্বপ্নে কল্পনার জগত সৃষ্টি করেন ও মনোময় জগতের বিচার করার ক্ষমতা হ্রাস পায়— তবুও কল্পিত চলমান প্রক্রিয়া সংঘটিত হতে থাকে নিজের অজান্তে তাকে স্বতঃস্ফূর্ত বিরোধী কল্পনা বলা হয়।এই দুটি কল্পনা মনের দৃষ্টিতেই সংগঠিত হয়। রূপকথার জগৎ জুড়ে যে দৃশ্যমান পটভূমিকা রচিত হয় তা কল্পনার দৃষ্টিতেই হয়ে থাকে। কবি যখন তাঁর কল্পিত উপাদান দ্বারা মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করেন এবং অনুকরণ/অনুসরণের মাধ্যমে কবিতার সমগ্রকে পাঠকবৃন্দ নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। তখন তাঁর কাছে কল্পনা ও বাস্তবতা দুইই এক বস্তুুতে ধরা দেয়। এই ধরা দেওয়ার ব্যাপারটা মোটেও সহজ ব্যাপার না, চিরকালীন সাধনার কিঞ্চিৎ ফল মাত্র।রূপকল্প কবির কাছে একরকম হতে পারে এবং সাধারণের কাছে আর একরকম হতে পারে। কারণ কবি যে অর্থে শব্দের দ্যোতনা সৃষ্টি করে, সেই অর্থে সৃষ্টিকল্পের ব্যঞ্জনাকে উৎকৃষ্ট করে তোলে— যা পাঠকের হৃদয়ে ঝনঝন করে বাজে তা যে কোন অবস্থাতেও তাই পাঠক বা সাধারণেরা শব্দকে সেই অর্থে গ্রহণ না করে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ যুক্ত করে। এজন্য সাধারণেরা উৎকৃষ্ট ফসলের গ্রহণযোগ্যতা নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণ করে। আর যখন কবির কবিত্বময় ও কল্পকাহিনী নির্ভর ব্যঞ্জনা দ্বারা কোন চিত্র ভেসে ওঠে তা অস্বাভাবিকভাবেই হয়ে থাকে— এই ধরনের অদ্ভুত প্রাণশক্তি কবিতার ক্ষেত্রে ঘটে। তাই কবিতার কল্পনার উৎকর্ষ শুধুমাত্র কল্পনার বৈচিত্রেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি নানা প্রক্রিয়ার সুফল মাত্র। কবি যখন অবচেতন মনের সম্ভাবনার কথা বলেন, তখন তিনি স্বাভাবিক মানুষ নন! কবিকে হতে হয় অস্বাভাবিক এবং দৃষ্টিপ্রতিদ্বন্দ্বী।এই কল্পনাকে আবারও দুই ভাগে ভাগ করা যায়— মানবিক কল্পনা ও যান্ত্রিক কল্পনা। আধুনিকায়নতন্ত্রে যখন বিশ্ব চলছে তখন কল্পনা সূত্রও নতুন মোড় নিয়েছে। কি করব! এর জন্য চর্বিত চর্বন ভাবনার আর প্রয়োজন হয় না, যান্ত্রিক কল্পনার সাহায্য নিলেই তা দ্রুত হয়ে থাকে। দেখা যাচ্ছে আমরা যত আধুনিকায়নতন্ত্রে পা রাখছি ততই আয়ু ক্ষয়রোগ ভারি হয়ে উঠেছে। মানুষের চিন্তাকে নিয়ে ছেলে খেলা হচ্ছে, এর জন্য মানুষেই দায়ী। চিন্তাকেও হাতেনাতে বাঁধা যায় তার প্রমাণ হচ্ছে আধুনিকায়নতন্ত্র। তবে এও জেনে রাখা ভালো যে, যার প্রয়োজন যেখানে তাকে সেখানে লাগানো উচিত।প্রথমত, মানবিক কল্পনার বিষয়গুলো যা মানবসৃষ্ট অতি-লৌকিক ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ। এই বিষয়গুলো প্রথম দিকেই আমরা আলোচনা করে এসেছি, তারপরেও এই সূত্রটিকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ হচ্ছে আধুনিকায়নতন্ত্র। দেখা শোনা ও অনুভবের সৃষ্টিকে আমরা অস্বীকার করতে পারিনা। মানুষের কার্যকলাপ দিন দিন অধঃপাতে যাচ্ছে কি না তা নিয়ে পাঠকবৃন্দ নিশ্চয়ই যথেষ্ট জানেন। আমরা জানি, অবচেতন মনের সাহায্য নিয়ে মানবিক কল্পনার সৃষ্টিকল্প রচনা হয়। কিন্তু এই অভিযানটা কবি ও কবিতার জন্য মোটেও সহজ ব্যাপার না, সাধারণদের দৃষ্টিগোচর এড়িয়ে নতুন ভাবনাকে আয়ুষ্মান করে তোলা— এটি কবি সত্ত্বার দারুণ প্রকাশ। মানবিক কার্যাবলীতে কল্পনার বহিঃসূত্র রচনা করে অমৃতের স্বপ্ন দেখা কবির পক্ষে অস্বাভাবিক কিছু নয়। সত্য এবং অসত্যের সংমিশ্রণে রূপকথার শিরোনামে বাস্তবতার রূপরেখা তৈরীর অভিনব কারিগর কবি। কিন্তু যখন এই কথাগুলি অবহেলিত বা আপেক্ষিত কথা অর্থে প্রকাশিত হয় তখন কল্পনার বা চিন্তাশক্তির জগৎজুড়ে বিন্দু পরিমাণ আশা জাগানিয়া ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু মানবিক কল্পনা এই গুলিকে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম। মানুষের চিন্তার ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক বৈচিত্রতার সামঞ্জস্য থাকে— যার মাধ্যমে অণিমা ও লঘিমার গুরুত্বকে অতিলৌকিক করে তোলা যায়। অযোগ্য বস্তুকেও যোগ্যবস্তুতে রূপান্তর করে শ্রেণী ব্যবধানের ভিত্তিতে ঊর্ধ্বমুখী ভাবের দোদুল্যমান অবস্থায় পৌঁছে— মানসিক স্বভাবগত যেকোনো কল্পনা সূত্রের চিন্তা করা যেতে পারে।দ্বিতীয়ত, যান্ত্রিক কল্পনা মূলত অন্তর্জাল ভিত্তিক একটি বৃহৎ ভাবের সমাবেশ। আজকের যুগে এআই, ইউটিউব, ফেসবুক, চ্যাট জিপিটি, এক্স ইত্যাদির মাধ্যমে নতুন নতুন কল্পনার সৃষ্টি করা যায়। যেটি যান্ত্রিক পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়। এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ভয়াবহ এবং কিছু ক্ষেত্রে আমাদের উপকারী বটে। এ আই বা চ্যাট জিপিটিকে আমরা যখন যা ভাবতে বলতেছি তা মানুষের মস্তিষ্কের চেয়ে খুব দ্রুত করে দিচ্ছে— তাতে করে মানুষ তার চিন্তাশক্তিকে অকার্যকর বলে ঘোষণা করছে। দূর্বলতা যখন জেঁকে বসেছে তখন অন্তর্জাল ভিত্তিক প্রক্রিয়াগুলো সতেজ মানুষের মতো কাজ করছে। এক্ষেত্রে সুষম সৃষ্টিকে এড়িয়ে অতিরঞ্জিত বিষয়বহির্ভূত কল্পকাহিনীর সৃষ্টি হচ্ছে, যা আমাদের মনের খোরাক মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। এবং চিরকালীন ভাবনার সাথে একাত্ম প্রকাশ করে না। এরকম কল্পনা আমাদের ক্ষতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু আমরা তা থাকতে চাইলেও ছাড়তে পারছিনা? তার কারণ হচ্ছে প্রযুক্তির প্রতি আমাদের মনোবলের দুর্বলতা প্রকাশ। তবে এর মাধ্যমে কিছু কিছু অস্থায়ী সমাধান সম্পূর্ণ করা যেতে পারে। তা হতে পারে সৃজনশীল অথবা উৎকৃষ্ট রকমের কিছু কার্যাবলীর স্বয়ংক্রিয় সমাধান। হঠাৎ করেই, মন থেকে কিছু স্মৃতি মুছে গেলে বা ধোঁয়াশার মধ্যে থেকে গেলে, পুনরায় তা গ্রহণযোগ্য করতে অন্তর্জাল থেকে কিছু কল্পনার ধার নিতে পারি। সেটি হতে পারে যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধ। যা প্রজ্ঞার মাধ্যমে বিচার বিশ্লেষণের দ্বারা সঙ্গত এবং অসঙ্গত জায়গাগুলির বিবেচনা ভিত্তিক গ্রহণ করা। তবে যান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ হতে দিন এবং আপনার মস্তিষ্কগত চিন্তাকে প্রসিদ্ধ করুন।আমরা চাচ্ছি কল্পসূত্রের বিস্তার ঘটানো তা যেকোনো প্রক্রিয়ায় সংগঠিত হতে পারে। এক্ষেত্রে সুষম কল্পনাই যথেষ্ট! চর্বিত-চর্বন ভাবনা পুরো স্ট্রাকচারকে নষ্ট করে দেয়। কেবলমাত্র, প্রতিশ্রুতি ভিত্তিক কল্পনা ঠিক লক্ষ্যে নিয়ে যেতে সক্ষম। এর দ্বারা পূর্বাপর অসঙ্গতিগুলোর অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া যাবে। স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন বলেন, “কল্পনা জ্ঞানের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞান সীমাবদ্ধ, কল্পনা সারা বিশ্ব ঘিরে।” এই কল্পনা যখন অস্বাভাবিকভাবে মানুষকে চালনা করতে শেখায় তখন কিছু লোক সৃষ্টিকারীকে পাগল বলে সম্বোধন করেন। কোন কোন ক্ষেত্রে এরকম ব্যক্তিকে নির্বাসনের মতো ব্যবস্থা করে দেন। এরকমটা তখনই হয় যখন মানুষ তার আত্মউপলব্ধি থেকে বিচ্যুতির পথে হাঁটেন এবং নতুন করে নিজেকে জানার প্রয়াস করেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষ স্বভাবতই পাগল হয়ে যায়। এটি তীব্র কল্পশক্তির মৌলিক প্রভাব। যা নিজের মস্তিষ্ককে গ্রাস করে। এজন্য অতিরঞ্জিত কল্পনা মোটেই ঠিক হলে মেনে নেওয়া যায় না। মানা এবং না মানার বিষয়টিও কল্পকারীর একান্ত বিষয় বলে বিবেচ্য। কল্পনাকে কাজে লাগাতে হলে ধীরে ধীরে এগোতে হয় কিন্তু আমাদের দ্রুতগামীতা মূল লক্ষ্য থেকে ছিনিয়ে নেয় এবং শেষে স্বভাবত পাগল উপাধিকে ভূষিত করে। অনেকক্ষেত্রে, এরকম পাগলের প্রয়োজন; কারণ সাধনার উৎকৃষ্ট লাভ করতে হলে যথেষ্ট পাগল হওয়া প্রত্যেক সৃজনশীল মানুষের ব্যক্তিগত স্বভাব। এটিই কল্পশক্তির শেষ কথা নয়! এর বাইরেও অকল্পনীয় বলে কিছু একটা আছে বলে ধরে নেওয়া হয়। যা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না কিন্তু আমরা সেটাকে বাদ দিয়েও মূল লক্ষ্যে চলতে পারি না। তাই কল্পশক্তির বিস্মৃতি প্রয়োজন। এটি যেকোনোভাবে সংঘটিত হতে পারে।বহুমাত্রিকতা: কবিতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন পাঠক যখন তার চিন্তাশক্তিকে নানা উৎকর্ষে ব্যঞ্জনাময় করে তোলেন এবং কবিতার মুখ্য প্রসঙ্গের থেকেও ভিন্ন ভিন্ন চিত্রকল্পের দৃশ্যাবলী পাঠকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে! পাঠক দেখতে পান কবিতার আনুষাঙ্গিক অবকাঠামোর ভেতর অদৃশ্যত অসংখ্য চিত্রকল্প সেই চিত্রকল্পকেই কবিতায় বহুমাত্রিকতা বলে।এরকম কবিতাকে স্বভাবসিদ্ধ কবিতা বলা যায়। কারণ স্রষ্টা এখানে নিজের সৃষ্টির সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞাত নন! বরং বিষয়বস্তু দৈবভাবে নিজেই নিজেকে তুলে ধরেন, তখন স্রষ্টা মূলত গৌণ প্রসঙ্গ? স্রষ্টা সৃজনশিল্পের বিষয়বস্তুকে পাঠকের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে দায়ভার মুক্ত হন! পাঠক নিজ নিজ স্থান থেকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রহণ ও বর্জনের সুবিধা পান। অর্থাৎ এটি পাঠকের স্বাধীনতা। পাঠকের চিন্তার যথাযথ মূল্যায়ন। যা বহুমাত্রিকতার প্রথম স্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এরকম কবিতা পাঠে স্থান-কাল-পাত্রভেদ যথেষ্ট নয়! কবিতা স্বত্বসিদ্ধভাবে তার স্থান-কাল বুঝে নিবেন— যাতে পাঠকের স্বস্তিবোধ হয়।ধরুন, চলন্ত ট্রেনে আপনি একটি কবিতা পড়ছেন, ঠিক একই কবিতা নদীর পাড়ে বসে কিংবা প্রেমিকার হাত ধরে পড়তে পড়তে চলছেন কিন্তু ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন স্থান পরিবর্তন স্বত্বেও কবিতার মর্মগাঁথা এক এক স্থানে একেক প্রশস্তি দেয়— ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে, —এই যে একটি কবিতায় ভিন্ন ভিন্ন চিত্রকল্প সৃষ্টি হয় যা বোধের সৃষ্টি করে মানসক্ষেত্রে অতিমানসের পরিচয় দেয়— তখন জানবেন কবিতাটি বহুমাত্রিকতায় পরিণত হয়েছে।এই যে একের মধ্যে বহুত্বের বিন্যাস; কেবলমাত্র বাংলা সাহিত্যে কবিতার মধ্যেই সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। অন্যান্য জায়গায় এর ভাবগাম্ভীর্য তেমন একটা ফুটে ওঠে না! কিন্তু কবিতার বেলায় ব্যতিক্রম দেখা যায়— বহুমাত্রিকতার কবিতাগুলোই একসময় কালোত্তীর্ণ হয়েছে নয়তো সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে; ধরা যাক, আপনি জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশলীনা’ পড়ছেন কিংবা বনফুলের ‘নিমগাছ’ পড়ছেন, প্রথমটি আমরা কবিতা বলেই জানি কিন্তু দ্বিতীয়টি কবিতার মতো করে হলেও গদ্য হিসেবেই স্বীকৃতি পেয়েছে। আমি যখন ‘আকাশলীনা’ পড়ব, তখন মনে হবে প্রেমিকার যেন আকাশে লীন হয়ে যাচ্ছে, মিলিয়ে যাচ্ছে তৎক্ষণাৎ আবার চিরঞ্জীবী ঘাসের হৃদয় জুড়ে নিজেকে মেলে ধরছে; এটি যখন আমি ফাঁকা মাঠে বসে একা পড়ব তখন মনে হবে— সত্যিই তো সুরঞ্জনা সবুজ প্রকৃতির সাথে মিশে আছে; আর যখন প্রেমিকার হাতে হাত রেখে গুণগুণ করব, তখন হৃদয়ে অন্যমাত্রা যোগ হবে। তেমনি বনফুলের ‘নিমগাছ’ গল্পটির কথা বলা যায়; কবিতা বললেও মনে হয় অসুবিধা হবে না, কি দারুণ শিল্পকর্ম! এই কবিতাটিতে বনফুল নিমগাছের গুণগানের কথা বলে ক্লান্ত হয়ে— একদম শেষ পর্যায়ে এসে বললেন, সেই বাড়িটির গৃহবধূর অবস্থা এবং নিমগাছের অবস্থা প্রায় সমান কারণ ওদের যত্ন নেওয়ার মতো লোক কেউ নেই, অথচ ওরা কাছাকাছি থাকলে যে চারদিকটা উজ্জ্বল মনে হয়— সে কথাও আমাদের ভাবিয়ে তোলে। তখনই কবিতা হয়ে ওঠে পূর্ণত্বের প্রকাশ! কবিতার হৃদয় ছুড়ে বাজতে থাকে মানুষের হাঁটাচলা, স্নেহ-প্রেম, দয়া-দাক্ষিণ্য, ভালোবাসা-অবহেলা ইত্যাদি।কবিতাকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নতি করাতে বহুমাত্রিকতা দার্শনিকতার পরিচয় দেয়। শুধুমাত্র শব্দের বিন্যাস, অভিজ্ঞতা কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে কবিতা হতে পারে না; কবিতার জন্য দরকার নির্মোহ বিশ্লেষণ, বহুমাত্রিকতা ও আত্মদার্শনিকতা এই তিনটি একজন কবির সৃষ্টিকে কালোত্তীর্ণ উপাধি দেয়। কবিতার এই আত্মজিজ্ঞাসা ও বহুমাত্রিকতা তাকে এক অনন্য শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। একেকজন পাঠকের কাছে একই কবিতা একেকভাবে প্রতিভাত হয়, এবং এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে কবিতার সৌন্দর্য ও শক্তি।রবীন্দ্রনাথের কবিতার জীবনবোধ এবং জীবনানন্দের কবিতার জীবনবোধ ও নিঃসঙ্গতা এক নয়! রবীন্দ্রনাথ চেয়েছেন কবিতার মাধ্যমে ঈশ্বরের প্রতি অনুগত থেকে মুক্তির চেতনা আর জীবনানন্দ নিঃসঙ্গতাকে আঁকড়ে ধরে কবি তার জীবনবোধের গতিসূত্রকে আত্মস্থ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ পড়লে শুধুমাত্র ভালবাসার ঐকান্তিক মোহ নয়! বরং এর অভ্যন্তরে জীবনবোধের নির্মোহ বিশ্লেষণ দেখতে পাব কিংবা ‘কর্ণ-কুন্তীসংবাদ’ কাব্য পড়লে শুধুমাত্র ছেলে কিংবা মায়ের বিচ্ছেদের কথা নয় বরং ভালোবাসা ও অবহেলার ভেতরেও যে জীবনের অস্তিত্বের সন্ধান রয়েছে তার একঝলক দেখতে পাব। তেমনি জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ পড়লে শুধুমাত্র একজন মানবী কিংবা ভালোবাসার প্রতি মোহ অনুভব নয়! বরং এর পেছনের শৈল্পিক উপাদানকে জীবনের অস্তিত্ববাদের প্রকরণে সকল অস্থিরতাকে পেরিয়ে একটি জীবনবোধের সূচনা দেখতে পাই। যা অস্তিত্ববাদী দর্শন বা সাধনার সারসংক্ষেপ মাত্র নয়! অভিজ্ঞতা ও অর্ন্তদৃষ্টির প্রকরণ।কিছু কিছু কবিতা শব্দের শরীর থেকে মুছে গিয়ে নতুন করে কল্পনার বহির্জগত সৃষ্টি করেন— এই কল্পনা প্রতীক এবং রূপকের বৈচিত্রে আন্দোলিত কিংবা অর্থের বহুমুখীতা, ভাষার স্তরভেদ কিংবা পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে সংগঠিত হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের অনেকগুলো কবিতা আছে তার মধ্যে একটি কবিতাকে যদি বেছে নেওয়া যায় শুধুমাত্র একটি প্রবাহমান সময়ের জন্য অথবা একটি জীবনানন্দ দাশের কবিতা দেখা যাবে— বহুমাত্রিকতার হৈ রবে কোনোটিই তার স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের বাইরে গিয়ে তার সময়কে দাবি করতে চায় না, অথচ সময়কে ব্যাবহার করে উৎকৃষ্ট শিল্পশৈলীতে পাঠকের অভিজ্ঞতার কাছে আপন ইচ্ছায় ধরা দেয়। ধরা যাক, সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ পড়তে পড়তে আপনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন জনতার সংগ্রামে, সমাজ চেতনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে চান; অন্যদিকে আপনারই মতো অন্য একজন একই কবিতা পড়ে নিজের সন্তানকে জগতের শ্রেষ্ঠ আসনে বসাতে চান বা পৃথিবীর সকল শিশুকে সুস্থ-সবল মস্তিষ্কের অধিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে চান। দু'জনের দৃষ্টিভঙ্গি এক না হলেও কবিতাটি কিন্তু দুজনের মধ্যে একটা সেতু তৈরি করে দিচ্ছে, এই সেতুটি হচ্ছে বহুমাত্রিকতার মেলবন্ধন বা BRIDGE POINT.
চিন্তা: হচ্ছে কবির অন্তর্দৃষ্টি। অদ্ভুত জগৎ। মানসক্ষেত্র। মুক্তির পথ। মানসপটে ভ্রমণ করার একমাত্র জায়গা। মনসংযোগের একমাত্র যোগানদাতা। বাহ্যিক ও ঐহ্যিক অনুভূতির স্পন্দন জাগানো ছন্দময় জগত। চিন্তা দুই প্রকারের হতে পারে— এক, ঘুমন্ত চিন্তা, যা বোধদয় হয় না বা যার শরীর নিরুপণ সম্ভব নয়! দ্বিতীয়ত, জাগ্রত চিন্তা, যার দ্বারা সৎ ও অসৎ প্রবৃত্তির মাত্রানুসন্ধান বোধদয় হয়। এসব চিন্তা ব্যক্তিসত্ত্বাকে অনুপম শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে পারে। কবিতার ক্ষেত্রে অতিমানস যেভাবে তার পরিধির যোগান দেয়; ঠিক একইভাবে চিন্তা অতিমানসের যোগানদাতা।
আমরা চিন্তার শরীর থেকে অতিমানসকে ছিনিয়ে নিই! কারণ চিন্তা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলোর উপযোগ সৃষ্টি করে— একটা ঘোরতর মানসপট সৃষ্টি হয়! সেখানে একদল ভাবুক গোষ্ঠী যৎসামান্য উপলব্ধি করে চলে যায় এবং অপরদল চিন্তাকে খাটিয়ে সৃজনশীলতা সৃষ্টিকারী শব্দের শরীর গঠন করে, কবিতায় এদের বৈশিষ্ট্য হলো অবসম্ভাবী।
কিন্তু কেন চিন্তা করতে হবে? শুধুই কি কবিতার জন্য নাকি বোধের শান দেওয়ার জন্য? আদিতে যখন সংস্কৃতিপ্রবণ মানুষজন চিন্তা করা শুরু করেছিল, তখন নতুন নতুন সৃজনশীলতার জন্ম হয়েছিল। এই সৃজনশীলতা একদিনে আসেনি, গভীর চিন্তা, সারল্য ও উৎকর্ষের নিরন্তর সংগ্রাম। চিন্তা মানুষকে বদ্ধ পাগল করে দেয়, যাদের পাগলামি সৃজনশীলতার পর্যায়ে হয়, সহনশীলতার পর্যায়ে, সংস্কৃতির পর্যায়ে, মানব-মুক্তির পর্যায়ে তারাই সবসময় সহজ মানুষের, সহজ লোকের ভিড়ে কাঠামোগত জীবনের হদিশ পেয়েছেন। কিন্তু চিন্তাকে যখন মস্তিষ্কের খোরাক বলব, তখন চিন্তা হয়ে উঠবে সূদরপ্রসারী; যে চিন্তা মানবেতিহাসের অন্ধকার স্তরকে প্রজ্জলিত করেছিল। সেই চিন্তার নাম শিক্ষা। অক্ষরের সাথে পরিচয়। বর্ণের সাথে বর্ণের মিলন। শব্দের সাথে ভাব-ব্যঞ্জনা।
কবিতা এক ধরনের সঞ্চারশক্তি, যা শব্দের গভীরে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে। এটা শুধু ভাষার খেলা নয়, বরং এক অনির্বচনীয় অনুভব, যা পাঠকের হৃদয়ে নতুন এক জগৎ সৃষ্টি করে। এই সৃষ্টির প্রকাশ কবির ব্যক্তিগত কিন্তু এর উপাদান সর্বময় জগৎজুড়ে। সমালোচনার খাতিরে যদিও বলা যায়, কবিতা তার প্রাণশক্তি জোগাতে শুধুমাত্র বোধ ও ছন্দময় দ্যোতনার উপরেই নির্ভরশীল নয়! তাহলে এর বিপরীতে কি থাকতে পারে অথবা ভিন্নমাত্রিক বহুবিধ উপাদান? কিন্তু সেই উপাদানগুলোর উৎকর্ষের যোগানদাতা হিসেবে প্রথমত সরলচিন্তার ব্যাপকতার দিকেই লক্ষ্য রাখতে হয়।
আমাদের বাংলা কবিতার সহজসূত্র কিন্তু চিন্তার গভীরতা লক্ষ্য করেই; তারুণ্য তার চিন্তাকে ঠেলে দিয়েছে শব্দের গভীরে, বোধের বেড়াজালে আর নিপুণ গতিসূত্রের অস্থিরতার মধ্যে এক ডুবন্ত কাব্যিক প্রতিশ্রুতির জগতে। সেখানে ছন্দের কোন বালাই নাই, আছে গভীর চিন্তার উৎকর্ষতা, সাধনের বিকাশ ও বিষ্ময় শব্দের কোলাহল। কখনো কবিতা হয় নীরবতা, কখনো প্রতিধ্বনি। কখনো প্রশ্ন হয়ে উঠে দাঁড়ায়, কখনো উত্তর হয়ে হারিয়ে যায় বাতাসে।
এবার আসুন, আমি কেন চিন্তা করি? শুধুমাত্র দু’বেলা ওষুধ খাওয়ার জন্য যে চিন্তা সে চিন্তার আলাপ এখানে হচ্ছে না। আমার চিন্তা অতিমানসের অতীন্দ্রিয় সত্ত্বা। এই সত্ত্বার সংজ্ঞা পূর্বেই দেওয়া হয়েছে। পাঠক ও লেখকের মিলনস্থলে কীভাবে অতিমানস কাজ করে তা নিয়েই আমার যৎসামান্য উপলব্ধি। সৃজনশীলতার এই চিন্তাকে কেন্দ্র করে যখন আমি ঘুরপাক খাচ্ছি, তখন আমি আমাকে কিভাবে আবিষ্কার করতে পারি তার একটা স্ট্রাকচার সহজেই বের করতে পারি। কিসের মাধ্যমে? চিন্তা। এরকম চিন্তা আপনাকে করতে বলছি, যাতে আপনি সহজ লোকের ভিড়ে, বিস্ময়কর কিছু খুঁজে পান, যা দ্বারা আপনার বোধশক্তি অতিমানসের দ্বারগোড়ায় গিয়ে উপস্থিত হবে। শুধুমাত্র, ভাবতে শিখুন, পিঁপড়ের সংসার, দাঁড়িয়ে থাকা গাছের জীবন, মৌমাছির জীবন, ভোরের ফুল, ছাপানো অক্ষর কীভাবে আপনাকে চিন্তার গভীরে ডুব দিতে সাহায্য করে। এই ডুবে যাওয়ার মধ্যে একটা প্রশান্তি আছে তার নাম আনন্দ।
কবিতার পাঠকেরা বা কবিরা প্রথমত সেই কাজটিই করেন; যে কাজের সহজসূত্র ধরে মনসংযোগ ঘটে, যাকে বলে টেলিপ্যাথি। এ জগতে কবি ও পাঠক যতদিন প্রবেশ করেননি, ততদিন সৎ ও অসৎ প্রবৃত্তির মাত্রানুসন্ধান চলবে। কবিরা সেদিক থেকে নিবৃত্তি মার্গের সাধক বলা যায়, যেহেতু পাঠকমাত্রেই বিষয়ব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত। কিছু পাঠকের ক্ষেত্রে খুব অল্পতেই কার্যসিদ্ধি হয়! কিন্তু কাব্যপ্রতিভা এবং কাব্যপাঠ সৎ পাঠকের জন্যই প্রসিদ্ধ তাই বলে অসৎ পাঠকের মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন নয়! এজন্যই কবি প্রথমেই এসব পাঠককে চিন্তার খোরাক যোগাতে বলেন।
মননশীল চিন্তা কাব্যপ্রবাহের দার্শনিক দিককে তুলে ধরে, তাই বলে দর্শন মাত্রই কবিতা নয়! কবিতার বৈশিষ্ট্য আচার-আচরণ, উপাদান, ছন্দময়তা এবং বৈচিত্র্যতা সবমিলে সর্বজনীন পারিপার্শ্ব ও সময়সমিধ রূপায়নে চিন্তা বা মনশীলতা সুচারু কাব্যসৃষ্টিতে মৌলিক অধিকার রাখে। চিন্তা কখনো দুর্জ্ঞেয় রহস্যময়তা নয় বরং বারবার চেষ্টার মাধ্যমে সংবেদনশীল প্রক্রিয়া ও অচিন্ত্য অলৌকিকতা রূপায়নে কাজ করে।
চিন্তাসূত্র কখনো কখনো অনির্বচনীয় ভূমিকা পালন করে, নীরবতার ও সংবেদনশীল। কোলরিজ বলেছেন, ‘যখন সম্পূর্ণরূপে না-বুঝে সাধারণভাবে বুঝা যায়, তখনই সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়।’ —এই যে বোঝা এবং না বোঝার ব্যাপারটা কোত্থেকে আসে? নিঃসন্দেহে চিন্তাশক্তির সংস্পর্শে এসে— কবিতার ব্যাখ্যা, আলোচনা, রুপায়ন, সৃজনশীলতা, কাব্য-বিচার এসব অস্তিত্বের ধরা পড়ে। অর্ন্তদৃষ্টিতে ভবিষ্যৎ কাঠামোকে বর্তমানের কাছে মেলে ধরা এবং অতিমানসের অতিলৌকিক অনুভবশক্তি ও কাল্পনিক অবকাঠামোকে বাস্তবিক সত্য ও অসত্যের সংমিশ্রনে রসময় জগতের নিজস্ব শিল্পসমৃদ্ধ সৌকুমার্য্য দ্বারা বেষ্টিত করতে পারলে চিন্তাসূত্রের বিশুদ্ধ স্বর তৈরি করা সম্ভব। কবিতার ক্ষেত্রে যা সুন্দর, শ্বাশ্বত ও পরিণামদর্শী।
নিপুন শিল্পসৃষ্টিতে বোধগম্যতা, রুচিশীলতা ও শিল্পদক্ষতা এই তিনটি জিনিস একান্ত প্রয়োজন। এটি সকলক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বিশ্বজোড়া পাঠশালায় আমাদের বিচরণ কিন্তু শ্বাশ্বত চিন্তার ক্ষেত্রে বাঙালি অনেকাংশে দুর্বল। তার কারণ লঘুচিন্তা; এসব চিন্তাকে মুষ্টিবদ্ধ কয়েকটি মতবাদ ঘিরে আছে, নির্দিষ্ট কাল প্রবাহে তা গতিশীল কিন্তু বাস্তবিক সহজসূত্রে কখনোই তার সাথে সম্পর্ক নেই; উৎকর্ষ সৃষ্টিতে অক্ষম, রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা, সংঘাত দ্বন্দ্ব, প্রতিঘাত, সাংস্কৃতিক অবচেতন, ধর্মান্ধতা ইত্যাদি ঝঞ্ঝামুখর টালমাতাল অবস্থায় ক’জন উঠে দাঁড়াতে পেরেছে সেটিও দেখার অবকাশ রইলো।
আমরা কি চাই? আমরা চাই নিপুন শিল্প বিকাশ। সাহিত্য সমৃদ্ধ। ছন্দময় বৈচিত্রতা। প্রেম। ভালোবাসা। স্মৃতিকাতরতা। বর্ণিল ক্যানভাস ও নিরীক্ষাপ্রবণ সাহিত্য সমৃদ্ধির পথ। শুধুমাত্র চারদিকে অ্যালকোহলের ছড়াছড়ি হলে কবিতাকে বাঁচানো যায় না; মানুষের মনজগতের সাথে সাথে কবিতারও মৃত্যু হয়, এটি মানসিক অ্যালকোহল। এই উত্তাল পর্ব থেকে সরে গিয়ে— রুচিশীল শিল্পদক্ষতার মাধ্যমে চিন্তাসূত্রের রূপময় বৈচিত্র্য ঘটাতে হবে। —এজন্যই চিন্তাসূত্রের প্রয়োজন।

0 Comments