১০০ টি মর্ডানিজম্ টুকরো-টাকরা || অন্তর চন্দ্র

 



১.


তুমি হেঁটে আসলেই, একটা আমি ফুটে ওঠে! এইসব Romanticism কথাবার্তায় মন গলানো যায় না। পাথরের সম্পর্কে এতটুকু জ্ঞান থাকা— আবশ্যক! হৈমবতি’র কান্না তাকে ভিজিয়ে যাচ্ছে, অথচ ছন্দের দ্যেদুল্যমান শরীর খসে পড়ছে হিপহপ, মানে পিনপতনের শব্দ।


বিড়িটা মুখের কাছে শুনতে চেয়েছিল, মেঘের কথা, ফুৎকারে চরৈবেতি ধরণের একটা বার্তা এমন বাদল ছড়াবে— ভাবতেই অবাক হচ্ছি! এমন নির্জন পথে বুকের ওমে শুয়ে থাকা তুই; এমনি করেই, আধাভাগ যৌবন নষ্ট করবি!


স্থোতোস্কোপ দিয়ে চেক করছি, আউটপুট-ইনপুট। কাল সকালে হাঁটতে বেড়োলে, ভেঁপু বানিয়ে নিস্! যৌবনে শৈশবের দরকার সম্পর্কে বটতলার চৌরাশিহাজার গুল্মের দিকে তাকালেই ফুটফুটে চেহারার একটা বাজপেয়ী স্বভাব মনে পড়বে, হ্যাঁ! ওটাই তো তুই! যখন হাত ধরে হেঁটেছিস, ঘাসের ডগার ভীষণ উঠে আসতো। 
নরম নিশীথের ঠোঁটে চুমু এঁকে পালিয়ে যাওয়া একটা রাত, সিনিবালির দিন খুব করে খুঁজছে— তুই ফিরে আয় প্রেমিক! যম রাজের সাথে দ্বন্দ্ব হবে। 


সাদা পাড়ের মখমলে জড়িয়ে যাচ্ছে— পৃথিবী। বিনয় করে বলছি, একটিও ফুল ছিঁড় না, জল দাও! প্রেম দাও! স্পর্শ দাও! ফুল ছিঁড় না, স্বভাবে দোষ ধরলে পরশীরা মেনে নেবে না— সে গলায় ফাঁস নেবে। না, না, না সে এমন প্রেমিকা নয়! কূলনাশার কূলে বাসর সাজাবে বলে, এমন প্রতিজ্ঞা করেনি। স্পর্শ পেতে চেয়েছিল তাই বৃষ্টি এসেছে— আমরাও ভিজে যাচ্ছি, এমন নিখুঁত চুমু খেতে খেতে বিড়িটা শেষ হয়ে গেল।


২৬ অক্টোবর ২০২৫
নারায়ণগঞ্জ 

 
২.

না, হৃদিতা ঘাইহরিণীর পদচ্ছায়া ছুঁয়ে দিও না! ওমন দীঘলকেশী আঁধার আমার বড় ভয় করে। শুধু, লেপ্টে থেকে যেতে চাই, তোর শরীরের কোমল সারস উষ্ণতায়। তুই সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে এলেই, বর্ণময় সাপের শরীর গিজগিজ করে— মা ডেকে বলে, পা বাড়ালেই বিপদ! বাবা, বিড়িটা ছুঁড়ে ফেলে কেদারা থেকে উঠে যায় বারান্দায়। 

শোন মেয়ে, মুখের ভাঁজে বর্ণের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে দিও না! বড় কাঙালিপনা লাগে, রামধনু, সৈকত, বিড়ালের কথা বলো! চলো, সমুদ্রে যাই, তিলোত্তমার রোড লাইট হিজিবিজি হর্ণ ক্লান্ত শহরের নাভিশ্বাস তোলে— চলো, ডগমগ প্রেমে উথাল তুলি, হাওয়ায় ভাসি, পার্কের ব্রেঞ্চে বসে পা দোলাই, যারা বাঁধা দেবার তাদের বাঁধন খুলে ছড়িয়ে দেবো ভালোবাসা।

তুই আছিস বল, রাঙা মেয়ে! চোখের জলে ডোবাবো তাদের আত্মগৌরব। ভিজিটিং কার্ড, মেয়াদ উত্তীর্ণ প্লাজা, ট্র্যাজিডি, জাত পুরুষ, সিংহাসন সব টলিয়ে দিয়ে— ভাঙা আকাশের নিচে পাঠ নিব অথবা পাহাড় হব, ঝর্ণার প্রবল আকর্ষণে নিজেরাই রচনা করব এক অযুত পৃথিবী।

বট গাছের নিচে শুয়ে থাকবে, ঘোড়সওয়ার, ঘাইহরিণী,মেঘমল্লিকা তার পাশে যুথচারী হৃদিতা তুই, খিল খিল করে হেসে, মেজাজে তুখোড় হবি! বসন্তে মাতাল হবি! দখিনা বাতাসের ঢেউ খেলানো স্নিগ্ধতার স্পর্শ পেয়ে ব্রহ্মপুত্র গর্জে উঠবে! ঠোঁটে ঠোঁট রাখি চল... শূন্যতায় ফেটে পড়া জোৎস্না চৌচির হয়ে ফেটে পড়ুক— দারুচিনি দ্বীপের লাজুক কুড়ানো বিকেলে তুমি-আমি ও এবং....

কিন্তু বর্ণের রক্তাভ শরীর খুঁচিয়ে জেগে ওঠা অজগর ছোবল মারে অস্তিত্বে‌ গলা দিয়ে নেমে আসে— অতীত! তখন স্ব-হন্তারক মনে হয়, হৃদিতা। ফিরে যেতে চাই, মাতৃকোষের তুমুল উত্তেজনায় কিন্তু মহাকালের টাইম ট্রাভেল এতটা কঠোর যে তোকে বিশ্বাসঘাতিনী উপাখ্যানের চরিত্র মনে হয়। ডুবে যাই, অসার আনন্দে, সমুদ্রে ভীষণ উথাল; কোথাও কেউ নেই, চারদিকে বর্ণের দুর্গন্ধ, উন্মাদ সময়, অভিশপ্ত জীবন, মৃত্যুর পাড়ে দেখা যায়।

০৭ নভেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 
নারায়ণগঞ্জ 


৩.

ঢেঁড়সের প্রেমে কুহেলিকার হিহিপিপি সারারাত ধরে পার্টি স্প্রে, বিজাতীয় নৃত্য, শুটিং, কন্টেন্ট হেমন্তের মাঠে ফুলে ফেঁপে উঠেছে; গোলাভরা হেমন্তের মুখোমুখি সংঘর্ষে কালচে টক রাঙা বধূর ষড়ৈশ্বর্য্য! পায়ে জড়ানো শিশিরের নূপুর, আলপথ, বিবাগী সূর্য, পড়ন্ত বিকেল উত্তরীয় হাওয়ার দোলায় দুলে দুলে ছি-বুড়ি খেলার আসর ভেঙে দিল।

সাঁতাও এলে বিন্দু, বিসর্গ, অনুস্বার পর্যন্ত কেঁপে কেঁপে ওঠে! মুখের শ্রী ভ্যাঁচকানো চেহারাটা পৌনমাসিক নিয়মের মতো কুহু ও সিনিবালির পর মিলিয়ে যায়! বধূ, মুখের কথা কেড়ে নিয়ে জলদগম্ভীর তোলে গলায়, দিনের আলসিয়া চেহারার মধ্যে একটা লাজুক বিকেল ওদের বাড়ির ছাদে উঠেছিল, চোখের কারিশমার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সে বলল... ‘কেমন আছেন?’ তখনই জলদগম্ভীর রেওয়াজটা আরও তীব্র জানান দিল, ‘বধূ, কি একলা বসে হেমন্ত কুড়াবে, বসন্ত এলো বলে.....’

শীত থৈ থৈ রোদ এবার কল্পতরু উৎসবের দিন, অন্ততঃ ঢেঁড়সের প্রেমে জোয়ান বেজের সুর বাজাবে....

১০ নভেম্বর ২০২৫
নারায়ণগঞ্জ 

৪.

বৈদ্যুতিক পাখার মতো অনর্গল মিথ্যা আশ্বাস সর্দি, কফ্, কোষ্ঠকাঠিন্য নানা ব্যাধি‌; ‘তুই কি আমার মেঘ?’ এমন নিথর দিন কয়লার ত্বকে ম্লান, চোখ ফোলা আকাশ, এই বুঝি বৃষ্টি এলো! বৃষ্টি এলে কাঁদতে জানি, দুজনার চোখের ভাষা প্রকৃতির নিয়মতান্ত্রিক মগ্নতার প্রতিচ্ছবি; এড়াতে পারিনা মহাকালের হিরণ্যগর্ভের নিয়ম-কানুন....

একটা তুই জন্মালে, একটা আমির জন্ম হয়! আমিটা কে? তুইই বা কে? দুইয়ের মধ্যে যে বিভাজন তাকে ভালোবাসার সৌজন্য দিতে পারি।

—কাছে এসো‌। হুমড়ে পড়া মেঘের লাগামছাড়া মত্ততায়।

—এসো স্নান করি, এসো তীব্র কঠিন মগ্নতা।
তুমিইই আমি আমিই তুই!
এখন তুমুল বৃষ্টি! রাতভর তোর নামে ভিজে যায় বারান্দা।

—আয়, মেঘ! পাঁজরের হাড়ে তোর সমস্ত অতীন্দ্রিয় লুকিয়ে আছে, ভয় নেই! 

—ওটা মেঘ নয় চুল, পাহাড়ের কান্না দেখে ভালো লাগে?

—মস্ত, একটা সত্য লুকিয়ে আছে ঠোঁটের মাইলফলকে; এই যে বিদ্যুৎ চমকানোর মগ্ন উন্মাতাল, চারদিকে মাটির ঘ্রাণ তার মধ্যে আমরা দুজন কি দারুণ! কি দারুণ!

—কামুক! নিরন্তর থাক! প্রকৃতির উদার আমন্ত্রণ গ্রহণ কর।

নূপুরের ছন্দে ছন্দে জাকির হুসাইনের তালে তালে কি অপূর্ব উঠে আসছে, দিগন্ত প্রসারিত মুগ্ধতার ত্রাটক চোখে, চারদিকে ঝুমুরের নিরন্তর বসন্ত রক্তকরবীর মতো রাঙা হয়ে, তোমার পায়ের লেপ্টে গিয়েছে; আহা! নিশীথের ঠোঁটে চুমু এঁকে যায় কে? তাকে, চিনি! একটা তুই জন্মালে যা বুঝি, একটা আমি তাইইই....

১১ নভেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 
নারায়ণগঞ্জ 

৫.

বাবার যে-বার ক্যান্সার হলো, হ্যাঁ! সে-বার‌ই প্রথম বুঝেছিলাম, মাধবাচার্যের দ্বৈতবাদ কীভাবে নুয়ে পড়ে। গা ঝিকোয় উঠেছিল পাড়ার নাভি। ঊনপঞ্চাশ বায়ু। দশ ইন্দ্রিয়। শঙ্করের অদ্বৈতবাদ‌ও পেরে ওঠেনি! পাড়াতুতো বোনদের অঝোর কান্নায়। হ্যাঁ, সেদিন মায়ের চোখের কোণেও দেখেছিলাম, দক্ষিণের ভেজানো কপাট।

ধূলিধূসর ঘাসের ওমে বাবার হৃদপিণ্ড! মাটিতে পুঁতে দেওয়া নাভির স্পন্দন। পাড়ার আলপথে, ধানে লেপ্টে থাকা ঘামে বাবার অর্ধশতাব্দীর নশ্বর দেহ ঘুরে বেড়ায়। শতাব্দীর সেরা মানুষ তিনি।

ছাত্রদের পড়াচ্ছেন, অদ্বৈতবাদ। তুমি-আমি-ওরা সবাই এক।
না, বাবা মাটির হাঁড়িতে পিণ্ডের উথাল উঠলে সব মিথ্যে মনে হয়। 
তবে কি দ্বৈতবাদ? না, তোমার বিপক্ষে দাঁড়াতে পারি না। 

১৫ নভেম্বর ২০২৫
বাড়িতে 

০৬.

ব্রহ্মপুত্র সাঁতরে এসে দাঁড়িয়ে যায় বুকের উপর, বুক মানে মাটি, ভিটেমাটি। ভিটে আর মাটির সাথে অব্যক্ত মিশে গেছে, চোখে যে দারুণ ওঠে! বুকে যে কাঁছার ভাঙে তার নাম ব্রহ্মপুত্র। আমার পূর্বপুরুষ! আমার অস্তিত্ব‌!

তিব্বতের বুক ফেটে কেঁদে ওঠা শিশু লৌহিত্য! আসামের চোখের জলে তীব্র দিহাঙ! চিলমারী’র হৃদয় কেড়ে নিয়েছে— না, তাকে ব্রহ্মপুত্র বলতে দ্বিধা হয়! সেকি জানে, দুপাড়ের বিস্তৃর্ণ কান্নার শব্দ? রাতের পকেটে দ্বিধা নিয়ে ফেরা কারিগরের ইতিহাস?.....
পড়ার টেবিলের ওপর বাবার হাস্যোজ্জ্বল মুখ, প্রদীপের আলো ও ধূপের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন! বাবা, বলছেন... এক আকাশ হৃদয়ের ঘণীভূত তেজস্ক্রিয়ার কথা, জলের অপেরা ও পূর্বপুরুষের রক্ত-মাংস ও অস্তিত্বের সারাৎসার।‌

ঈশ্বর যেখানে থাকেন, তার পাশে যুথচারী নিঃস্ব কিছু লোক হেঁটে বেড়ায়।
তারা দেখে, দুঃখীদের কবর ভাসিয়ে নিয়ে যায় ব্রহ্মপুত্র!
বাবা বলেন, বস্তুতঃ চিহ্নের প্রয়োজন নেই; বরং একবুক আকাশ লিখ! ঈশ্বর সেখানে থাকেন।

কয়েক লক্ষ দিন পর.....

বিস্তৃর্ণ বালির স্তুপ জমা হলে ঘাই দেই পাষাণের বুকে, ডানার চিল মেলে ধরে পাখা, পানকৌড়ির অজানা ভাষা স্রোতে ভেসে যায়, দূর সমুদ্দূর....

সমুদ্রে দুঃখ মিশে গেলে ঈশ্বর হয়ে যায়। আমাদের অভিযোগ নেই।
মহাকালে ভেসে ওঠা চোখের দু'পাড় ইতিহাস হয়ে যায়।

একদিন হঠাৎ....
ভোরের রেওয়াজ কমে এলে বাবার গোছানো বাড়িটি একমুঠো বালির দ্বীপ হয়ে যায়। বাবার অনুতাপ নেই, আছে অবর্ণনীয় আদর! 
ঈশ্বরপুত্রের কাছে রেখে আসা বাবার অলিখিত ইতিহাস। স্বয়ং ঈশ্বর!

একদিন হঠাৎ বাবাকে নিয়ে....
বিস্তৃর্ণ বালির স্তুপের ইতিহাসের পাতায় পাতায় ঘুরে বেড়াচ্ছি।

বাবা, তোমাদের বাড়ির উঠোনে গজানো কাশফুল, সাজিয়ে দেওয়া দুঃখ ফুলে ফেঁপে উঠেছে হেমন্তের মুখোমুখি; দুঃখগুলো উড়ে বেড়ায় হাসির চরে, সদ্যজাত শিশুর কান্না মনে হলে, বিস্তৃর্ণ চরের কথা মনে পড়ে আর দু’পাড়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কারা যেন ভুলে থাকে ইতিহাস। হ্যাঁ, এখানেই সমাপ্তি নয়! আর‌ও কিছু বিলাসী দুঃখের চারা রোপণ করে নিয়তির নির্মম, নিঃস্ব নির্বাক চেহারার পাশে ভেসে ওঠা ব্রহ্মপুত্র তখন অস্পর্শনীয়। 

১৭ নভেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 
বাড়িতে 

০৭.

জলছবি আঁকা ছিপছিপে গড়নের কেউ পাশ ফিরে শুয়ে। ওপারের মেঘের লাগামছাড়া মত্ততায় ফেটে পড়া চিত্রকলা; নদী ও ঈশ্বর এঁকে চলছে...

শুশুকের স্বর ভেঙে আসে। 
শিল্প ও কার্তুজের মানানসই হবে না, কন্ঠে সা রে গা মা পা ধা নি.... 
গাধার ভাষায় শুরু করা যাক; কোকিলের ভাষায় হলে ভালো কিন্তু ময়ূর কন্ঠী কেউ কেউ মন খারাপ করে মঞ্চ ছেড়ে যাবেন। হ্যাজাকের পুরাতন আলো দরকার ওদের গলগণ্ড ফেটে সুর খসানো যাবে না, নরম নিশীথের কোকিলের বাহবা দিতে নেই; আজকাল সেও গাধার ভাষায় কথা বলে.....

সমস্ত গাধারা প্রথমে নারীর কাছে যায়, সুর তোলে, ভালোবাসে তারপর ব্যথিত হয়ে ফিরে আসে নিজের কাছে। ভোকাল কট ফেটে গেলেও কোকিলকন্ঠীরা যেমন গাধার কাছে আসে, ঠিক তেমনি সমস্ত গাধাও নিজের কাছে আসে। ঠিক ‘হরিণা মাংস আপনা বৈরী।’

নারীর রূপের রহস্যের দুনিয়ায় একজন গাধা আমি। কখনো নদী আঁকি বা কখনো বিস্তৃর্ণ আকাশ আঁকি, আঁকাআঁকির দুনিয়ায় ঘুরে ঘুরে বুঝে ফেলি নারীর প্রহসনের জমকালো আয়োজন; পুরুষের প্রহসনের থিয়েটার। মেদ চর্বিযুক্ত শরীরের হাড়ে খুঁচিয়ে দেওয়া সুঁই, চামড়ার নিচে ঠেলে দেওয়া ইনজেকশন, ফাঁসির দড়িতে দেয়া মোমের পুতুল, গাধাদের রাজ্যে থাকতে পারে না। গাধারা প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বী।

গাধারা নারীর বিরহের কাছে সুর তোলে না, সুর আর সুরা মিলেমিশে পুরুষের জীবন শেষ। হরিৎ সুরা গেলাসে গেলাসে পান করা যায় কিন্তু প্রেমের প্রহসনের থিয়েটার কলা কিংবা বিজ্ঞান যা ইচ্ছা বলতে পার সুরটা ঠিকঠাক আসে না। সুরটা এলে চিত্রকলা প্রসিদ্ধ হতো না। নদী ও ঈশ্বর এঁকে চলে কেউ কেউ আজীবন।
১৯ নভেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 
বাড়িতে 

০৮.

বন-জঙ্গলে হাঁটতে অভ্যস্ত পা গুলো ঘন সরু পথ ধরে বোধিবৃক্ষের নিচে দাঁড়ালে দেখতে পাই, এক অসীম হৃদয় নিয়ে ধ্যানরত গৌতম বুদ্ধের মূর্তি; বুদ্ধ শেখাচ্ছেন, ‘দুঃখ আছে, নির্বাণ‌ও আছে।’ আমি এক পরম হৃদয়ের খোঁজে বহুদিন হেঁটে গেছি তোমাদের কাছে কিন্তু তোমরা দিয়েছ পাথরের সম্পর্ক, আগুন ও কালকূটের শরীর।

একটা হৃদয় খুঁজি বহুদিন.... যে হৃদয় মানুষের, দেবতার, সম্পর্কের গহীনে যার অতীন্দ্রিয় বিশ্বাস; ক‌ই তার প্রাচুর্য? শীতল স্পর্শ? চারিদিকে অন্ধকারের গভীর উত্তাল, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে; অবিশ্বাসের সম্পর্ক মেনে নিতে পারি না, ফিরে আসি প্রাকৃতিক সংস্পর্শে, সেখানে অপরূপ ভঙ্গিমায় রহস্যের পারদ নামছে— এ যেন নটরাজের প্রকৃতিপুরুষ খেলার অসম্ভব পরিণতি। যে-দিকে তাকাই চঞ্চল ঘোরের ভেতর কোন আগন্তুক সর্বনাম।
হে বুদ্ধ, আমাকে পাগল করে তোলো— নির্বাণ চাই না, একটা হৃদয় চাই, যে হৃদয় মানুষের, সকলের এমন একটা হৃদয়ের মোহে ডুবে যেতে ইচ্ছে করে কিন্তু কোথায় যেন ভঙ্গুর নেমে আসে? কীভাবে? জানিনা।

মনে হয়, সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে মানুষের হৃদয়ে— বুঝি না, হৃদিতা, ঘাইহরিণীর পদচ্ছায়া; অতিন্দ্রীয় উল্লাস আমাকে গিলে খাচ্ছিল, শৃঙ্গার রসে ভাসিয়ে দিচ্ছিল কিন্তু কোথায় যেন ডানার ছটফটানি, জলদগম্ভীর তোলে— প্রকৃতিপুরুষ খেলায় মেতে উঠি।

প্রকৃতির কাছে প্রশ্ন করি, জীবনের মানে কি? সে বলে, তাকানোর চোখ পেয়েছো কি? গৌতম বুদ্ধের কাছে জেনেছি, দুঃখ‌ই মহান! এর চেয়ে পরম সত্য নেই। দুঃখের ওপারে নির্বাণ। 
অপলক চোখে চোখ রাখলে তাকে ত্রাটক দৃষ্টি বলে, সে দৃষ্টি ফেলবার মতো মহৎপাত্র খুঁজে পাওয়া মুশকিল! অথচ হৃদিতা’র চোখের বাঁ পাশে ফেলে আসা ঝর্ণার তীব্রতা, আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় দূর সমুদ্দূর....

তুই কি নদী? নদীর মতো একটা তুই? 
দাও, আমাকে ভাসিয়ে দাও, হৃদিতা।
ভেসে কোথায় যাব? বাউল হব? 
তোকে, পাব?
আমার ভেতর যে বাউল উথলে ওঠে তাকে পর করে দিয়ে আপন করে নে।

এই দেখ, চর্যাপদের হরিণের খোঁজে বহুদিন হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর খাতার পাতা তছনছ করে, তোর নাম খুঁজে পেয়েছি? তুই-ই সত্য। নেপালের রাজ দরবারের লাইব্রেরীতে সেদিন তোকে পোড়ানো হলো, আমরা দুছত্র কষ্ট লিখলাম তোর নামে কিন্তু তুই-ই এখন নির্বাণ পেয়ে গেছিস! তোর মধ্যে যে ঈশ্বর বেঁচে আছেন তাকে আমার কবিতা উপহার দিস।

চাঁদনী রাতের জোয়ারে জোয়ারে তীব্র হবে সে হৃদয়। কেউ বলবে... বর্ষিয়ান দুঃখীর পাশে প্রয়াত দুঃখ'রা বেঁচে থাকুন। ব্রহ্মপুত্র মুক্তি দেবে, ভাসাবে, অকুল স্রোতে দূর সমুদ্দূর...

বাতাসের কাছে যে দুঃখরা থাকে তাকেও ফুলের সুরভী দাও! মৌ গন্ধে আকুল কর সমস্ত হৃদয়! বৃষ্টির কাছে চোখের জল আর সময়ের কাছে ঘর্মাক্ত শরীরের দুর্গন্ধ নিয়ে যারা এখনও তীব্র বোহেমিয়ান তাদের ট্রাজেডি রচিত হোক; জীবনের জলসা ঘরে। 
বিস্তর সময় পড়ে আছে যাদের হৃদয়ে তারা যেন প্রদীপ নিভিয়ে ফিরে না আসে। ঐ জ্বলজ্বল শিখাটিই ধক্ ধক্ করে বাঁচিয়ে রাখে যতসব ইতিহাস।
নিজের জীর্ণ কুটিরে ব্যামো ধরিয়ে দিলে তার আর কোন মূল্য থাকে না। একটু গুছিয়ে নিয়ে সময়ের সাথে তাল মেলাতে হয়। চল, হৃদিতা, মানবযোগের ধ্যানে মগ্ন হয়ে যাই! পৃষ্ঠা মেলে ধরি, চল, একটু দাঁড়াই।
 
ঐ একজন আসছেন....
ওঁর নাম হৃদয়, চল, পাগলের সংলাপ বলি। আমরা সবাই পাগল।
ফাল্গুনী হৃদয়ের মর্মর কুড়াতে ব্যস্ত ন‌ই।
ব্রহ্মপুত্রের নিবিড় উঠে আসে অস্তিত্বে অস্তিত্বে।
এই বুঝি নির্বাণ?....

২০২৪ / পুনঃ পর্যালোচনা ২০২৫ নভেম্বর 

Post a Comment

0 Comments