অতিমানসের চোখে কবি ও কবিতা || অন্তর চন্দ্র

  


অতিমানস অর্থাৎ অতীন্দ্রিয় সত্ত্বাকে জাগ্রত করে যে ভাবনার বিকাশ সাধন হয় তাকে অতিমানস বলা যায়। যখন কবির চিত্তে কল্পদৃষ্টির ওপারের খবর ক্রমান্বয়ে জমা হতে থাকে— যা ভবিষ্যৎ বলে একসময় আখ্যায়িত হয়। কিন্তু সময়ের প্রেক্ষিতে সাধারণের দৃষ্টিগোচর হয় না সেই ভাবনার অতিপ্রয়াস যিনি করেন তিনি কবি। কবি কথাটির একটি অর্থ হচ্ছে জ্ঞানী। তাই কবির সরল মানসক্ষেত্রে অতীন্দ্রিয় সত্তার বিকাশ সহজে ধরা দেয়। যে সময়টা অতিমানস Second Memory হিসেবে কাজ করে, তখন কবি বিষয়াশক্তির বাইরে চলে যান এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন শক্তির সহানুভূতি অনুভব করেন। শব্দব্রহ্ম রূপে কবির মানসক্ষেত্রে দেখা দেয় অভিনব সৌকুমার্য। তখন চিত্তক্ষেত্র থেকে যা নির্গত হয় তা পাঠক সমাজ অমৃত সুধারূপে গ্রহণ করেন। তারপরেও পাঠক সমাজে গ্রহণ এবং বর্জনের একটা ধাপ লক্ষ্য করা যায়— সেখানটায় একদল নিম্নস্তরের পাঠক শুধুমাত্র খোলস নিয়ে লাফা ঝাপা করে কিন্তু কবিতার গূঢ় অর্থ হৃদয়াঙ্গম করতে সক্ষম হন না— এইসব পাঠক বিভ্রান্ত হন বটে। এই ধরনের পাঠক‌ও কবির কাছে ফেলনা নয়। কবি সেই পাঠককে ভিন্নমাত্রায় নিয়ে যান ছোট ছোট সাধনার প্রেক্ষিতে— তাতে করে অনেকটা সময় লেগে যায় কিন্তু একটা সময় এসে পাঠক বুঝতে পারেন পূর্ব মুহূর্তের নিঃস্বতা। অন্যদল পাঠক অধ্যায়নের কারণে পূর্ব থেকেই স্বতঃসিদ্ধ থাকেন বলে তাদের খানিকটা বেগ পেতে হয় না, তারা নিজের মতো করে রসে টইটুম্বুর থাকেন। তবে তাদের ক্ষেত্রেও দু’এক জায়গায় মতানৈক্য দেখতে পাওয়া যায়; সবার ঊর্ধ্ব দৃষ্টি থাকলেও গতানুগতিকের প্রেক্ষিতে হঠাৎ করে তাদেরও কোথাও কোথাও আবছা আবছা ভাব অনুভূত হয়— ঐ সময়টায় কবি বিশ্লেষণের কথা বলেন না বরং রসাস্বাদনের মাধ্যমে একটা স্তরে পৌঁছুতে সাহায্য করেন। 


যখন আমরা কবিতা পড়ি সাধারণত সেই সময়টায় পাঠক এমন একটা স্তরে পৌঁছায় যেখানে সে নিজেকে জানতে পারে। কবিতা এক দিক থেকে হচ্ছে বোধের উদয়। চেতনাকে জাগ্রত করা। চেতনার পথ ধরে ধীরে ধীরে অতিমানসের দিকে ছুটে যাওয়ার প্রয়াসে ছন্দবদ্ধ অলংকারিক প্রতিচ্ছবির আত্মবিকাশে যে স্পন্দন তুলে কবির চিত্তক্ষেত্রে অতিমানসের অতীন্দ্রিয় সৌকুমার্য ফুটে ওঠে সেই মূহুর্তকে সৃষ্টির সেরা সময় বলে উল্লেখ করা যায়। সেই সৃষ্টিসুধা পাঠকে অমৃত দান করে আর কবিকে ব্রহ্মে স্থিত করে। পাঠক! অস্থিরতম একটা মুহূর্ত পেরিয়ে আবাবিল আনন্দে কালো অক্ষরের ভিতর নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে কেউ কেউ নিজেকে গুছিয়ে নেন আবার কেউ কেউ অনুসন্ধানী হয় কিন্তু কবিতাকে অতিক্রম করা কিংবা ভ্রান্তির দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া মোটেই সুখকর নয়! আমরা এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছেছি যখন কবিতা নিয়ে চারদিক টাল-মাতাল, কবিতে কবিতে বিদ্বেষ, হিংসা, লোভ যা ক্রমে ক্রমে গ্রাস করেছে পুর্ণত্ব লাভের তৃষ্ণা। কবিদের বেগতিক তৃষ্ণাকে বেগবান করার চেষ্টা এভাবেই ধ্বংসত্বের পথে গমন করেছে। কেউ কারো লেখা পড়তে রাজি নই! —এই যে একজন আরেকজনের প্রতি হিংসার ছায়া ফেলছি তা কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও দায়ী করে ফেলেছে। আমার জীবনে এরকম পরিস্থিতির মধ্যে কতবার যে পড়েছি তার ইয়াত্তা নেই। বারবার শুধু চোখের জল ফেলে গেছি কিন্তু কারো জন্য কাউকে ফেলে দিতে পারেনি বরং কবিতার জন্য সকলকে একটা নির্দিষ্ট স্তরে আনার চেষ্টা মনে মনে খুঁজে পেয়েছি। শেষ পর্যন্ত সবাইকে ভালোবাসার চেষ্টায় এখনো প্রহর গুনছি। সাহিত্যকে ব্যাক্তিকেন্দ্রিক দিক থেকে না দেখে যদি নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তাকানো যায় তাহলেই ভালো ফল লাভ করা যায়। কারণ সাহিত্য ব্যক্তিত্বকে স্বীকার করে না। সাহিত্য সবসময় তার আপন মহিমায় কাল যাপন করেন। সেজন্য ব্যক্তিত্বকে নয় বরং সাহিত্যকে মূল্যায়ন করা উচিত। কেউ যদি অপকর্মও করে তবে তার সাহিত্যকে নিষিদ্ধ নয় বরং সুন্দরকে সুন্দরের আলপনায় হৃদয়ের মাঝে অঙ্কিত করাই শ্রেয়। আজকে আমি যার সাহিত্য নিষিদ্ধ করার প্রয়াস করছি, একদিন সেই সাহিত্যই বিশ্বের কাছে উজ্জ্বলতম রূপে মানুষের কাছে ধরা দিতে পারে। আজ যা সত্য নয়, কাল তাই সত্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হচ্ছে জানতে হবে, জানার জন্য জানতে হবে—এই ভাবনা নিয়ে যে পাঠক অধ্যায়ন শুরু করে তার জীবনে একটা সময় সত্য উপলব্ধি হবেই কিন্তু যিনি জানার প্রয়াস করেন না অথচ কাব্যসাহিত্যে অনর্গল গলদ রচনা করেন তার জন্য আমার দুঃখ করা ছাড়া উপায় নেই। যিনি কবিতা লিখেন তাকেও সতর্ক থাকতে হবে এবং যিনি পড়েন তিনিও সতর্ক থাকবেন। কিন্তু কবিতা পড়তে হলে সরল মস্তিষ্কে অতীন্দ্রিয় সত্ত্বার জাগরণ প্রয়োজন তা না হলে কবিতার নিগূঢ় অর্থ বোঝা মুশকিল। পাঠকের দিক থেকে বলতে চাই, কৃষক যখন মাঠে কাজ করেন তখন রোদ বৃষ্টি ঝড় উপেক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, ঠিক তেমনি যিনি কবিতা পড়েন তাকেও মাথার ঝিমঝিম ভুলে রসাস্বাদনের পথ খুঁজতে হবে। তাছাড়া দুর্বল মস্তিষ্কের শিকার হয়ে কবিতার আসরে যাওয়াটাও ঠিক নয়! কারণ তখন পাঠক শ্লীলতাহানির অভিযোগ তুলে দোষারোপ করতে পারেন, তখন তার চোখে প্রকৃতির অপরূপ ভাবধারা আচ্ছাদিত থেকে যায়— পাঠক! ভুল করে বসেন, বাইরের দিকে চেয়ে চোখ জুড়াবার জায়গা পান না। কারণ তার দিব্য দৃষ্টির অভাব। সত্যকে সে জানতে চান না। এক্ষেত্রে, অতিমানস লুপ্ত হয়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, তাতে করে এগোনোর সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়। কবির দায়িত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে পাঠকের চক্ষুশূল হতে হয়। এরকম পর্যায়ে যাতে না যেতে হয় সে দিকটা পাঠক এবং কবি দুজনেই খেয়াল রাখবো।


এবার যদি পাঠক রসের বদলে কবিতার বিশ্লেষণে ব্যস্ত হয়ে যায় তখন আমাদেরও কিছু কথা থাকে যেমন— কেউ যদি মনোরঞ্জনের জন্য কবিতা পড়ে তাহলে সে কবিতার মূল ধারা থেকে ছিটকে পড়বে— এটি সত্য কথা! কবিতায় সুখ লাভ হয় বটে কিন্তু সেটা যদি নিজের অস্তিত্বকে স্বীকার করে ঊর্ধ্বমুখী চেতনার বিকাশসাধন হয়— তাহলে নতুন কিছু আশা করা যায়। সাহিত্যের সবচেয়ে জটিল এবং বিশ্লেষণধর্মী শাখা হচ্ছে কবিতা। আমরা কবিতাকে সাধারণ হিসেবে মেনে নিতে পারি না— তাই আমি কবিতাকে অতিমানসের বাহন বলে চিহ্নিত করতে চাই; কল্প-শক্তির অতীন্দ্রিয় প্রয়াস যখন ঊর্ধ্বমুখী ছন্দবদ্ধ অলংকারিক প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলতে সমর্থ হয় এবং গতানুগতিক দৃষ্টিকে পেরিয়ে ভবিষ্যৎকেও আঁকড়ে ধরে মহাকালকে নির্দিষ্ট স্তরে রেখে অতীত ও ভবিষ্যৎ কল্পনার চাবিকাঠি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। পাশাপাশি, কল্পনাপ্রসূত যে ভাবগুলো শব্দের দোলনায় দোল খেতে খেতে অন্তর্হিত শক্তিতে রূপান্তরিত হয় তখন কবিতার যৌবনকাল উপস্থিত হয়। কবিতার ধারণাটা আমাদের মনে এমন ভাবে তৈরি হয়েছে যা মানুষের কল্পশক্তিকে অতিমানসের পথে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। যিনি লিখেন তিনি হয়তো নিজেও জানেন না যে কবিতা কিভাবে তৈরি হয়! এই সত্যটি জানার জন্য আমাদের পাঠকের দরবারে হাজির হতে হয়। পাঠক মাত্রই প্রজ্ঞার মাধ্যমে গ্রহণ এবং বর্জনের বস্তুটুকু রেখে দেন। ‌


কবিতার মধ্যে একরৈখিক যে ভাবনাগুলো আমাদের ভেতরে কাজ করে তা হলো পূর্বপূর্ব অনুশীলনের চর্চার ফল। দেখা যাচ্ছে অনুকরণ এবং অনুসরণের মাধ্যমেই নতুন লেখকেরা তার পরিধি ব্যপ্ত করছেন। একটা সময় দেখা যাচ্ছে, হাপিত্যেশ নিয়ে কাতরাতে হচ্ছে।‌ কারণ তারা বুঝতে পারছে না কল্পনাশক্তির গুরুত্ব সম্পর্কে। কেউ কেউ হয়তো বলবেন এর জন্য অনেক পড় পড় এবং পড় কিন্তু আমি কাউকে পড়ার বোঝা চাপিয়ে দিতে চাইনা। আমি বলব এর জন্য অনেক ভ্রমণ কর, প্রকৃতির মাঝে নিজের স্বরূপ খোঁজ তাহলেই কবিতার কল্পনার সূত্রটুকু আবিষ্কার করতে বেগ পেতে হবে না। অতিমানসের প্রথম পর্যায় হলো নিজের সম্পর্কে কতটুকু জানি সেটা বের করা। আবার‌ও বলতে হয়, কবি শব্দের একটি অর্থ হলো জ্ঞানী অর্থাৎ জ্ঞানের কলেবরে পূর্ণত্বের অভিলাষ না থাকলে কবিত্বের প্রয়াগ সিদ্ধ হয় না। কবিতায় আবেগ চলে কিন্তু আবেগের মূল্যবোধ চলে না। কবিতা যখন অতিমানস সিদ্ধ তখন আবেগের কড়ানাড়া মানে পুরো একটা Stricture নষ্ট করে দেওয়া। কবিতায় আবেগ থাকবে না সেটা আমি বলছি না, কবিতায় আবেগ থাকবে তবে সেটা যেন অতিরঞ্জিত হয়ে না ওঠে! সব জায়গাতেই আবেগ চলে কিন্তু কবিতার বেলায় আবেগ সর্বসিদ্ধ হলেও পরিত্যাজ্য। কারণ আবেগ বিষয়টি এখন খাপছাড়া মনে হয়, কবিতা হবে সর্বপরিণামদর্শী রাগ-বিরাগে ট‌ইটম্বুর। তার আদর্শের বস্তুনিষ্ঠ কাঠামো যদি ভাবনার জগতকে নতুন করে গড়ে তুলতে না পারে তাহলে একটা সময়ে এসে আবার‌ও পিছনে ফিরে তাকাতে হয়। চৈতন্যবোধ যদি জাগ্রত না হয়, একটা সময়ে গিয়ে নিজেকে অসহায় ঠিকই মনে হবে তাই এখন থেকেই চিন্তাসূত্রের গতিবিধিকে কাজে লাগিয়ে কবিতার আয়ু দীর্ঘান্বিত করতে হবে। পাঠক! যতই উদ্বুদ্ধ হবে ততই কবিতার জন্ম নেবে। এর জন্য অতিমানসের কল্পিত সম্ভারের তীর্যক স্বর্গভেদী বার্তা প্রয়োজন। 


 ‌কবিতার সাথে সাথে অতিমানস কথাটি কেন যোগ করলাম? আমরা যাকে অতিমানস বা কল্পনার অতীত বলে জানি সেটাকে কীভাবে কবিতায় রূপান্তর ঘটানো যায় তার প্রক্রিয়ার ভাবনাটা হঠাৎ মনের মাঝে কেন উঁকি দিচ্ছে তা তালাস করে দেখা দরকার। অতিমানসের যে ধারণাটা ইতিমধ্যেই আমাদের কল্পজগতকে ঘিরে ফেলেছে তাঁর বাস্তব রূপকার হচ্ছেন জীবনানন্দ দাশ এবং বর্তমান সময়ের বিশ্লেষণধর্মী কবিতার প্রেক্ষাপট। জীবনানন্দ যে বিষয়টি প্রায় একশো বছর আগে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছেন সেই বিষয়টি আজও কেন অত্যাশ্চার্য! —এ সমন্ধে বর্তমান কবিদের ভাবনা এড়িয়ে গেলে চলে না। জীবনানন্দের ঘোরপ্যাঁচ কাটতে গেলে প্রাণবায়ুর সঙ্কট পড়ে যায় তাই আমরা কেউ ওদিকে এগোতে চাই না। আমরা এটা ভেবে বসে আছি যে, কবিতা একটা নির্দিষ্ট পথরেখা ধরে চলবে। আমি এর পক্ষপাতী। কবিতা কোন কিছুর উপর ভিত্তি করে চলতে পারে না— একটি পথ দিয়ে সবার প্রবেশ করার রুচিবোধ না থাকতেও পারে। হাজার হাজার পথের সম্মিলনে কবিরা তাঁদের কাঙ্ক্ষিত পথ খুঁজতে থাকুন। তাতে বাঁধা দেবার আমরা কে? আমি নিজের পক্ষে কোনো কথা বলছি না। অতিমানসের চোখে কল্পভেদী কবিতার প্রয়াগের সন্ধিস্থল খুঁজে চলছি। 


কবিতায় অতিমানস নিয়ে চিন্তা করতে করতে অনেকগুলো বই পড়া হয়ে গেছে— এর মাঝেই সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছি বুদ্ধদেব বসুর এই কথাটি পরে, তিনি বললেন, “কবি— তিনি কখনো অবিকল সামাজিক বা স্বভাবিক মানুষ হ’তে পারেন না— তাকে হ’তে হবে কোন-না-কোন দিক থেকে অভাবগ্রস্ত, যে— অভাবের ক্ষতিপূরণ করে ‘দৈব’ অথবা অবচেতনের ক্ষমতা। এই কথাটা আধুনিক মানুষের, আর এই কথাটাই চিরকালীন।” বুদ্ধদেব বসুর এই কথাটাই আমাদের জানিয়ে দেয় কি করে অবচেতনের ক্ষমতা চিরকালীন কবিতার কার্যকে সম্পন্ন করে! তিনি এই সম্পর্কে বেশি কিছু বলতে চাননি। কিন্তু কেন বলেননি আমরা কেউ জানি না। তিনি হয়তো অতিমানসের অতীন্দ্রিয় ক্রিয়া বুঝতে পেরেছিলেন। কবির আদি পিতা পুরোহিত ছিল এ কথা বুদ্ধদেব বসু স্বীকার করেন এবং তিনি যথার্থ সত্য বলে ব্যক্ত করেছেন। ‌ পুরোহিত বলতে এখানে প্রাজ্ঞ মনীষাকে বুঝানো হয়েছে। সংস্কৃত সাহিত্য থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্য পর্যন্ত যতগুলো গ্রন্থ-শাস্ত্র রচনা হয়েছে সবগুলোই কোন না কোন প্রাজ্ঞ মনীষীর অবচেতন মনের অতীন্দ্রিয় সত্ত্বার প্রকাশ। হোমার কিংবা মিলটন অন্ধ ছিলেন কিন্তু সাহিত্যের প্রতি দুর্বলতা কখনো তাদের গ্রাস করতে পারেনি; তেমনি মধ্যযুগের কবি সনাতন গোস্বামী প্রথম জীবনে ( সাকর মল্লিক নামে যখন পরিচিত ছিলেন) অত্যাচারী ছিলেন কিন্তু পরবর্তী জীবনে দেখা যাচ্ছে তিনি‌ই সুন্দরের প্রকাশ ঘটাচ্ছেন এবং মানুষ তার পথ অনুসরণ করছেন— ঋষি কবি বাল্মিকির ক্ষেত্রেও এরূপ রত্নাকর দস্যুর কথা প্রযোজ্য। অথচ তাদের অবচেতন মন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুন্দরের প্রয়োজনে ব্যবহারের দিকনির্দেশনা ব্যক্ত করেন— এ বিষয়টি অতিমানসের ক্ষেত্রেই একমাত্র ঘটে; মানুষ তখন স্বাভাবিক থাকে না, তখন সে ঊর্ধ্বে উঠতে থাকে— শব্দব্রহ্মের কল্পজগতের মাঝে দুলতে দুলতে কবি তখন চিরায়ত সত্যের পথে গমন করেন। অসত্য থেকে সত্যে নয় বরং সত্য থেকে সত্যের পথে যাত্রা। এ যাত্রা কবির অনাদিকালের যাত্রা। অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাওয়ার সাধনা। ইতিহাস বলে, ৭০,০০০ বছর পূর্বে কল্পিত সত্ত্বা সৃষ্টিতে সক্ষম ভাষার আবির্ভাব অর্থাৎ গল্প কথার সূচনা— সেই সূচনার বিপ্লবের পর থেকে ধীরে ধীরে নানান কল্পনার মধ্যদিয়ে মূলত লোকসাহিত্যের ছড়াছড়ির ভেতর দিয়ে ক্রমে ক্রমে কবিতা-গল্প-উপন্যাস-প্রহসন-নাটকের অন্যান্য ধারাগুলোকে যখন আমরা এক মলাটে পেয়েছি, তখন আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দিকগুলি উন্মোচন হতে থাকে— বুঝতে পারি ভবিষ্যৎ আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে; বিশেষ করে কবিদের ক্ষেত্রে আগাম খবর পাওয়াটা সহজ ব্যাপার কারণ কবিদের মানসক্ষেত্রে সত্যের উদয় ঠিকই হয়েছিল কিন্তু প্রাচীনেরা তাদের ব্যাখ্যাটা ঠিকঠাক উপস্থাপন করতে পারেনি; “বেদান্ত বলেন, বনের মানুষের ধারণাই ঠিক; তাহার দৃষ্টি সত্য, কিন্তু ব্যাখ্যা ভুল।” প্রথমত লিখিত কোন লিপি না থাকায় সে সময় কবিতা মুখে মুখে ছড়িয়ে যেত একজন থেকে আরেকজনে— তখনকার যুগে মনে রাখার কৌশলটা এভাবেই পূর্ণ হত; তবে নিশ্চয়ই তারা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন নয়তো হাজার বছর পরেও কেন আমরা তাদেরকে মেনে নেব! কবিসত্ত্বা যেখান থেকে উদ্ভাসিত হয়, সেই পরম লক্ষ্য থেকে প্রাচীনেরা পথ দেখিয়েছেন— আজ সেই পথ ধরে হেঁটে হেঁটে বর্তমান সময়ের কাছে এসে পৌঁছেছে সাহিত্যের মহৎ উদ্দেশ্য; চিরযৌবনা কবিতার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়নি বরং উপনিষদের যুগে তা আরো প্রবল হয়ে উঠেছিল এবং চর্যাপদের যুগে এসে নতুন করে দিকউন্মোচন করে। তারও অনেক পরে মধ্যযুগীয় মঙ্গলকাব্য আদিরসের বিস্তারে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল। যা এখনো মানুষের মুখেমুখে প্রচলিত ধারার মতো বয়ে চলছে এবং গুণকীর্তনের মহিমায় মানুষ মুখরিত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেটাকেও ছেড়ে আসতে হয়েছে আধুনিক কবিতার কাছে ভাব ব্যঞ্জনার সৌকুমার্য্যে! কিন্তু সেটাও আমাদের সহ্য হয়নি, আমরা চলে এসেছি উত্তরাধুনিক সময়ে— এখন গভীর বিশ্লেষণের সময় পাঠককেও শক্ত পায়ে দাঁড়াতে হচ্ছে; চিন্তার খেরোখাতা খুলে যেতে হবে অতিমানসের অতীন্দ্রিয় সত্ত্বার কাছে। 


কবি হলেন সেই মন্ত্র দ্রষ্টা; যিনি সাধনার উৎকৃষ্ট সর্বজন সম্মুখে বিস্তার করে দেবেন। বাইরে তিনি অভাবগ্রস্থ কিন্তু ভেতরে পূর্ণ সত্ত্বার বিকাশ। সীমাহীন কাব্যের জগতে রসতত্ত্বের গুণের চেয়ে শব্দার্থময় গুণ সবচেয়ে বেশি জরুরি! শব্দকে তিনি কিভাবে প্রয়াগসিদ্ধ করাবেন তা তার ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের উপর নির্ভর করে। কিন্তু পাঠকের চৈতন্য না হওয়া অবদি সর্বজনবিদিত বলে স্বীকৃত হয় না। যারা মহাকালের কাছে অভিযোগ এনে দাঁড় করে, কবিতার পরম সত্যকে অস্বীকার করে তারা শুধুমাত্র গতানুগতিক দৃষ্টিকেই প্রাধান্য দিতে চায়; কবিতার শরীরবিদ্যা সম্পর্কে জ্ঞাত নন।



কবিতার মায়াজাল নতুন করে রচিত হয়েছে ভবিষ্যতেও হবে— এখন উত্তরাধুনিক কালের সাহিত্যের অবকাঠামো‌ খেয়াল করলে কবিতার শরীরবিদ্যা সম্পর্কে খানিকটা অবচেতনের ধারা লক্ষ্য করা যায়। যারা উত্তরাধুনিক কালের ভাবগাম্ভীর্যের সরলরেখা বোঝেন না, তাদের ত্রাটক দৃষ্টি উত্তরাধুনিক Culture মেনে নিতে চান না। কিন্তু একদল এই ধারাকেই সর্বসিদ্ধ বলে পাঠকের কাছে ছেড়ে দিয়েছেন। পাঠকের কাছে যা নতুন ও সুন্দরের প্রকাশ পাঠক তা গ্রহণ এবং বর্জনের মাধ্যমে রেখে দেন। মহাকালের বিচারে আমরা সেই বস্তুর মায়াময় জগতের সুললিত সুন্দরের প্রকাশ একসময় লক্ষ্য করতে সক্ষম হব বলে মনে করি। কবিরা পূর্ববস্তুকে নতুন মাত্রায় ব্যঞ্জনার মধ্য দিয়ে পূর্ণ করে তোলেন— অনেকে নতুন কিছুর সৃষ্টিকে স্বীকার করেন না বরং নতুন মাত্রাকে প্রাধান্য দিয়ে পূর্ব পরিণামের সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করেন। সেই ব্যাখ্যা একসময় আবার জীর্ণদশা প্রাপ্ত হয়; তখন মেরামতের প্রয়োজন পড়ে, সমকালের কবিরা সেটাকে নতুন করে গড়ে তোলেন— ভাঙা গড়ার এই ক্রিয়া চিরকালীন এবং সত্য। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায়, “কবিতা হলো কবির পূর্বপুরুষ, কবি কাব্যের জন্মদাতা নন!” —এই কথাটি বর্তমান সময়ের কবিদের বোঝানো কোনোমতেই সম্ভব নয়! তাঁরা মৌলিক কিছু খুঁজতে চান অথচ অতিমানসের চোখে মৌলিক বলতে কিছু নেই; ইতিপূর্বে যা ছিল, তার‌ই নতুন সংস্করণ বলা যেতে পারে। শুধুমাত্র, গতানুগতিক দৃষ্টিতে ব্যঞ্জনার ভিন্নতামাত্র। তাছাড়া পূর্ব সৃষ্টিকে অস্বীকার করার সাহস হয়তো কেউ করবে না। তারপরেও যারা লোকমুখে স্বীকার করে না কিন্তু মনে মনে প্রাধান্য দেয়— সেই লোকেরা মূলত সুযোগ সন্ধানী হয়। প্রত্যেকটা কবিতা পূর্ব চিন্তার ফল, এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। কবিতা চিরকালীন, চির কিশোর, চিরযৌবনা, সুনয়না কবিতায় আছে রসতত্ত্বের নিগূঢ় ভাবনা। 


বর্তমান সময়ের খ্যাতনামা কবি মাসুদ খান বলেছেন, “কবিতা-অরণ্য হলো সেই রহস্যমেদুর রেইন ফরেস্ট, যেখান থেকে অক্সিজেন নেয় বহু-বহু বিষণ্ণ ফুসফুস আর ত্যাগ করে খেদ ও নির্বেদ, গ্লানি ও কার্বন ডাই- অক্সাইড, এমনকি কখনো-কখনো মনোক্সাইডও। আর সেই বৃষ্টিবন ওইসব বিষ ও বিষাদকে ফের রূপান্তরিত করে ফেলে দ্রুত অম্লজানে। কবিতার রয়েছে সেই অভিনব সালোক-সংশ্লেষণী ক্ষমতা।”এই কথাটির পর আমার মনে হয় আর অন্য কোন কথা থাকতে পারে না। কবিতাকে তিনি অল্প কথায় এত বিস্তরভাবে তুলে ধরেছেন যা প্রাণের সাথে যুক্ত হয়ে কবিতার ভাবতত্ত্বের সহজ অনুভূতিকে জাগ্রত করে। এই লেখাটিকে হঠাৎ করে কেউ কবিতা বলেও ভুল করতে পারে। কারণ পুরো লেখাটি গদ্য হলেও কবিতার মত দূরদর্শিতার ভূমিকা রাখে। এখন আমি যদি এটাকে কবিতা বলে ধরে নিই, তাতেও মনে হয় কবি‌ রাগ করবেন না। ‌ এটাকেই বলে পরিবর্তন। শুধু কবিতার ক্ষেত্রেই নয়, গদ্যের ক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাই এই পরিবর্তনের ধারা। এক লাইনেই একটি কবিতা লেখা যায়। এ কথা সত্য। অতিমানস শুধু কবিতাকে নয়, গদ্যের ধারাকেও ভিন্নমাত্রায় নিয়ে গিয়ে নির্মাল্য দান করে। মাসুদ খানের এই লেখাটি দেখে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো নতুন কিছুর সূচনা এনে দিতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের কবি সুবীর সরকারের গদ্যের মধ্যেও এরকমটা লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই আছে যারা উত্তরাধুনিক সময়ে এসে অভিনব নতুনের প্রয়াস করে যাচ্ছেন। কবিতার ক্ষেত্রে তা অহরহ দেখতে পাই। আলোচনা-সমালোচনা যে যাই করুক না কেন, বর্তমান সময়টাকে আগলে রাখতে না পারলে তাকে ভবিষ্যত মেনে নিতে পারবে না —এই কথাটা বারবার বলি। কবিতার একটা ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে, সেটাকেই মূলত অতিমানস বা অবমানব বলি।‌ কবিতার এই ক্ষমতা দ্বারা পুরো সাহিত্য জগতকে একটা Structure —এ শীঘ্রই নিয়ে আসা যাবে। গদ্যের ক্ষেত্রেও তা এসে যাচ্ছে। আমরা অনুভব করতে পারছি বর্তমান কবিতা কতটা পরিপক্ক। যা কিনা অন্যান্য সাহিত্যকেও নিজের আঙ্গিকে প্রস্তুত করছে । এই পর্যায়ক্রমটা খুব দরকার। 

Post a Comment

0 Comments