| কবিতা ভাবনা |
কবিতা কালের কোকিল। সময়ের
কহুতান। কালে কালে জন্ম নেয় নতুন রূপে নতুন ভাবে। কবির মানসক্ষেত্র থেকে উৎপন্ন হয়
যে ভাবনার বিকাশ এবং যা কালের বিচারে অবক্ষয়প্রাপ্ত হয় তাকে কবিতা বলা যেতে পারে।
চর্যাপদের কাল থেকে বাঙালির মননে যে কবিতার ধারা বয়ে আসছে তা লালন করে বর্তমানের কবিগণ
নতুন উন্মেষ রচনা করেছেন। এখনকার কবিতায় বহুমাত্রিকতা এমনভাবে জেঁকে বসেছে, পূর্বকার
কবিতাগুলো যতটা সহজ মনে হয়, বর্তমান সময়ের কবিতার ক্ষেত্রে তা একটু জটিল বটে। কিন্তু
কবিতার এ দূরাভিযান যাত্রা ভবিষ্যতের দিকপ্রান্ত উন্মোচন করে, তার বিরাট দেহ পরিপুষ্ট
করেছেন। সময় যেখানে চলমান কবিতা সেখানে একঘেয়ে হয়ে বসে থাকতে পারে না। কবিতার এই
যে বহমানতা চর্যাপদের কাল থেকে ধীরে ধীরে পরিবর্ধিত হয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন বটে।
কিন্তু কবিতার ভাবনাটা এখনো দ্বারপ্রান্তে আছে, সেজন্য আমাদের চিন্তাশক্তির প্রখরতা
তিন দিন নতুন চিন্তার বিকাশ ঘটায়। আমরা শুধু ভাবনাটাকে একটু অন্যভাবে ভাবতে শিখছি।
কবিতায় সরলতা থাকা সত্ত্বেও কখনো কখনো দুর্বোধের মত মনে করছি কারণ কবিতায় বহুমাত্রিকতা
আর নবভাবনা পুরো বিষয়টাকে এমন করে গড়ে তুলেছে, যা আমাদের ভাবনার কলকাঠি নাড়াতে যথেষ্ট।
কালের বিবর্তনে যেমন আমরা
চর্যাপদের ভাষা বুঝতে পারি না ঠিক তেমনি রবীন্দ্রনাথের কাল পেরিয়ে উত্তরাধুনিক কালের
কবিগনের সারল্য ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারিনা। আধুনিক কবিতার মর্ম গাঁথার কাল রবীন্দ্রনাথের
সময়েই কবি জীবনানন্দ দাশের হাত ধরে ধীরে ধীরে এগিয়েছে বলে মনে করি, পরবর্তীতে উৎপল
কুমার বসু এবং অন্যান্যরা এই বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে বর্তমান সময়কে ঋণী করে গেছেন।
এই যে কবিতার বহুমুখীতা এখন আপনার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে
বা শুদ্ধ পাঠকের কাছে যে মায়াজাল বিস্তার করছে তা এখনো উপলব্ধি করার সময় আসেনি। তবে
আমরা এটুকু বলতে পারি একটা বিরাট পরিবর্তন আসছে, সেটি শুধু কবিতার ক্ষেত্রেই নয় বরং
গল্প, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ, গদ্য এবং অন্যান্য সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য।
বেশ কয়েকদিন আগে এক তরুণ গল্পকারের সাথে আড্ডা দিতে গিয়ে, তার গল্পের ভিতর একটা দারুণ
পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলাম। গল্পের ছোট্ট একটি অংশ পড়ে মনে হচ্ছিল আমি যেন কোন দীর্ঘ
উপন্যাস পড়ছি। দু-চারটি কথায় যে এতগুলো বিষয় বলা যায়, তার লেখা দেখে চমকে গিয়েছিলাম, এতদিন ভাবছিলাম
কবিতার ক্ষেত্রেই মনে হয় দু-চারটি কথায় অনেক কিছু করা যায় কিন্তু না তার গল্পে বহুমাত্রিকতার
রেখা এতোটা প্রখর যে সাধারণ পাঠকের ক্ষেত্রে একটু অন্যরকম মনে হলেও সময়ের বিবর্তনে
তা নতুন মাত্রার যোগ করেছে। বাংলা সাহিত্যের যে একটা বড় পরিবর্তন আসছে তা আমরা হাড়ে
হাড়ে টের পাচ্ছি। এই সময়টায় কোন সাহিত্যিক বা কবিকে টিকে থাকতে হলে বুদ্ধিমত্তাকে
আরো প্রখর করতে হবে। কল্পনার জগৎটাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে বাস্তবতার পরিখে মানুষের
মননে একটা স্পন্দন সৃষ্টি করা যায়।
চর্যাপদে ভুসুকুপাদের একটা
পদে তিনি বলেছেন, ‘আই অণুঅনা এ জগ রে ভাংতিঁ এঁ সো পড়িহাই। রাজসাপ দেখি জো চমকিই যারে
কিং বোড়ো খাই।।’ চর্যাপদ আধ্যাত্মিকতার রসে টইটুম্বুর। এই পদটিতে কবি এমন একটি কথা
বলেছেন যা আমাদের চিন্তা শক্তিকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যায় যা পাঠক মাত্রই অনুভব
করতে পারেন। এখানে তিনি বলেছেন যে, এই জগত কখনো সৃষ্টি বা উৎপন্নই হয়নি কিন্তু আমরা
মনে করছি যে জগৎটা মনে হয় কেউ সৃষ্টি করেছেন বা সৃষ্টি হয়েছে। পরক্ষণেই, আবার বলছেন
দড়ি দেখে সাপ মনে হতে পারে কিন্তু আসলে সে কাউকে দংশন করে না ঠিক তেমনি জগতের সম্বন্ধে
মিথ্যা জ্ঞান হতে পারে কিন্তু এই সংসার অসার। এই কথাগুলো একবার নীরব মস্তিষ্কে ভাবুন,
দেখবেন আপনার ভেতরে যে স্পন্দন অনুভূত হচ্ছে তা অতিমানসের দ্বারগোড়ায় পৌঁছেছে। আসলে
কবিতা এমনই, কবিতা যা নয় তাই, কবিতাকে বিচার করবেন মহাকাল, মহাকালের স্রোতে তার বয়ের
চলা সাধনার পরিপন্থী। সাধক যেমন তার সাধনায় ব্রতী হয়ে যতক্ষণ না ঊর্ধ্ব স্তরে বা
লক্ষ বস্তুতে না পৌঁছেছেন ততক্ষণ পর্যন্ত থেমে থাকেন না ঠিক তেমনি একজন কবি তার কবিতার
সাধনায় ডুবে যেতে যেতে তার লক্ষ্যকে যতক্ষণ না পর্যন্ত অতিক্রম করে যাচ্ছেন ততক্ষণ
তার নিস্তার নেই। কবিতার যে ঘর সংসার তা ইহ-জগতের সাধারণ মানুষের মতো নয়, কবিতার প্রকৃতি
সহজ নিরুপমা মনে হলেও ভেতরে ভেতরে গভীর তত্ত্বকে ধারণ করে সূর্যের মতো প্রকাশ হন। অন্ধকারের
ভেতর যেই আলোর প্রকাশ সেই ধারাকে পরিশুদ্ধ করে কবিতার দেহ পরিপুষ্ট করেন। কবি যেন সেখানে
ভেলা মাত্র অন্ধকারকে আলোর সঙ্গে মিলিত করে সেতু তৈরি করে দেন যাতে মানুষের সাথে মানসের
জটিল সব অংকের পরিসমাপ্তি হয়।
রবীন্দ্রনাথ আমাদেরকে শিখিয়েছেন
সাহিত্য কি জিনিস! নজরুল সেই ভাবনাকে নতুন করে শেখালেন বিদ্রোহের মাত্রা কি! এবং জীবনানন্দ
নির্জন অন্ধকারের ভেতরে প্রেমের যে বহুমুখীতার প্রকাশ ঘটালেন তা পাঠকের জীবনবোধের দিকে
প্রকৃতিপুরুষের মহা-মিলনের জন্ম দেয়। আমরা
যখন কবিতা বা বাংলা সাহিত্যের প্রতি উদাসীন বোধ করি তখন আমাদের এই তিন মহাপুরুষের কাছে
যেতে হয়। যে জীবনানন্দ অবহেলায় থেকেও যত্নে তার কবিতাকে বড় করে তুলেছেন, নজরুল সাহসের
সঞ্চার করেছেন এবং রবীন্দ্রনাথ ভাবনার জগৎটাকে নতুন করে গড়ে তুলেছেন। সেই রবীন্দ্রনাথকে
এখন আমরা যেভাবে মাথায় চড়ে নাচাচ্ছি সেটা মোটেও ঠিক না এমনকি নজরুল, জীবনানন্দ এবং
সবার ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য। নিশ্চয়, সকলকে শ্রদ্ধা করা একান্ত কাম্য কিন্তু শ্রদ্ধার
নামে সাহিত্যের মহাযাত্রাকে স্তব্ধ করার দুঃসাহসিকতা আমাদের নেই। গুরু তার শিষ্যকে
পথ দেখিয়ে ঊর্ধ্বে নিয়ে যাবেন এটাই কাম্য। সাহিত্যের দোহাই দিয়ে একঘেয়ে ভাবনাকে
যতদিন দূরীভূত করতে না পারি, ততদিন সাহিত্যের শুদ্ধ ভাব মনের ভেতর যোগাতে সক্ষম হব
না। কবিতার প্রসার করতে হলে, কবি তার কৌতুহলী মনের কল্পনার জগতকে বিস্তৃত করে ভাবনার
জগতকে উদ্ভাসিত করতে হবে। সাধারণ থেকে অসাধারনের পথে এই যে যাত্রা তা কবিতার কালউত্তীর্ণ
ধারাকে আহ্বানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। রবীন্দ্র গবেষক ডক্টর সন্ জীদা খাতুন বলেছেন,
“পুনর্বার স্মরণ করা ভালো, কবিতার সৃষ্টির কালে কবি-আত্মার দীপ্ত শিখাটি স্বভাবতই উপযুক্ত
ধ্বনি-অঙ্গে আত্মসমর্পণ করে। কোন্ ব্যঞ্জন বা স্বর কটি করে ব্যবহার করে সৃষ্টিসম্পন্ন
করতে হবে, এ বিবেচনায় কবিকে কালক্ষেপণ করতে হয় না। উপস্থিত ধরনের কৌতুহলী বিশ্লেষণ
কাব্যের অবয়বের সঙ্গে আত্মার নিগূঢ় সম্পর্ক উদঘাটন করে যুক্তিবাদী রসিক চিত্তকে তৃপ্ত
ও তার রসাস্বাদনকে পূর্ণাঙ্গ করতে পারে।”—এটাই কবির আত্মার সাথে কবিতার সম্পর্ক। কবিতার বয়ে
চলার ধারাটির দিকে যথেষ্ট লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন কারণ কবিতা সময়ে সময়ে ভিন্ন রূপ ধারণ
করে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। সাধারণত কেউ যখন হাঁপিয়ে যায়, সেখানেও নিঃশ্বাসের
শ্বা শ্বা ধন্নি থেকেও আমি কবিতার গন্ধ পাই।
সুবোধ সরকারের একটা কবিতা আছে ‘মঙলেস দবরাল’ সেখানে তিনি বলছেন, তিনি যখন রুটি খাচ্ছেন
তখন তিনি মনে মনে ভাবছেন যে তিনি অনর্গল কবিতা পড়ে চলছেন কিন্তু যখন তিনি কবিতা পড়ছেন
তখন ভাবছেন তিনি রুটি খেয়ে চলেছেন। ভাববিমুখ মানুষ এই কথাটি সহজে বুঝতে পারবেন না,
রুটির মধ্যেও যে তিনি কবিতার গন্ধ পাচ্ছেন এটাই কবিত্বের লক্ষণ। সবকিছুর মধ্যে কবিতার
গন্ধ পাওয়া, কবিতায় ডুবে যাওয়া, এভাবে যদি কবিতার সংসারী হওয়া যায় তবে কবিতাকে
নতুন করে পাওয়া আমাদের পক্ষে খুব সহজ হয়ে যাবে। নিম্মে সুবোধ সরকারের ‘মঙলেশ দবরাল’
কবিতাটি দেওয়া হল—
"যিনি রুটি বানান তিনি
কবিতা লেখেন না
যিনি কবিতা লেখেন তিনি রুটি
বানান না
দুজনের মধ্যে কোন সম্পর্ক
দেখতে পাইনি।
কিন্তু ব্যাপারটা কি ?
যখন একটা রুটি খাচ্ছিলাম
আমি, মনে হল
কবিতা পড়ছি
আর যখন কবিতা পড়ছিলাম মনে
হল
আমি একটা রুটি খেয়ে চলেছি।"
কবিতা সবসময় কালোত্তীর্ণ
কথা বলে, আমার এই কথাটি প্রসঙ্গে আপনাদের ভিন্ন মত থাকতে পারে। কিন্তু এই কথাটি এড়িয়ে
যাবার পথ নেই। বর্তমান সময়ের কবিরা এমন একটা মায়াজাল রচনা করেছেন যে সেখানে নিজেকে
বর্তমান দেখে এই কথা বলতে আমার দ্বিধা হচ্ছে না। নিশ্চয়ই আমি সেই সময়কে স্মরণ করি,
যে সময়ের কাছে আমরা আজীবন ঋণী বিশেষ করে মধ্যযুগ সেই সময়টাকে আমি কি বলে ভাববো তা
যদিও মুখের পরিভাষায় বলতে সক্ষম নই তবুও কিন্তু সেই সময়টাকে এড়িয়েও আমরা পরিধির
দিকে হাত বাড়াতে পারব না। এখন আমরা কি করতে পারি? এই প্রশ্নের জবাবে এটুকু বলতে পারি
যে, প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে বর্তমান অবধি ভালো ভালো কবিতাগুলো পড়া উচিত কারণ সেই
অমূল্যরত্ন থেকে আমরা বর্তমান সময়ের ভিত শক্ত করতে পারি। আজকে কবিতা বিষয়ে যেসব অভিযোগ
আছে, সেই অভিযোগগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হলে নিশ্চয়ই আমাকে পূর্বপুরুষদের কবিতার কাছে
যেতে হবে। কবিতার ভাবনাকে সেখান থেকে বর্তমানের যে রূপান্তর, সেই রূপান্তরের ধারাটি
বোঝার চেষ্টা করতে হবে। এমন একটি সময়ের কাছে আমরা পৌঁছেছি, যখন কবিতা, গদ্য, প্রবন্ধ,
গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি ক্রমেই আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে ( অন্যভাবে
কথাটি নেবেন না, আমি সাধারণদের দিকে লক্ষ্য রেখে বলছি)। এই সময়টায় আমাদের একঘেয়ে
হয়ে বসে থাকা ঠিক হবে না, শুধু কবি বা সাহিত্যিকদের উঠে দাঁড়ালেই চলবে না, সাথে সাথে
পাঠকদেরও সঙ্গে করে নিতে হবে। পাঠকদেরকে বর্তমান সাহিত্য যেভাবে ঋদ্ধ করে চলেছে আগামী
দিনগুলোতে সাধারণ পাঠকেরা একটু হাঁপিত্যেস বোধ করতে পারে। সেজন্য আমাদের ভাবনাটাও সেদিক
থেকে একটু গতিশীল হতে হবে।
মধ্যযুগীয় সাহিত্যের দিকে
যদি আমরা লক্ষ্য রাখি, তখন দেখতে পাব, কৃত্তিবাস, কাশীরাম দাস, বৃন্দাবন দাস, জ্ঞানদাস,
চন্ডীদাস, বিপ্রদাস পিপিলাই, জৈনুদ্দিন, শাহ মুহম্মদ সগীর, দৌলত কাজী, ফকির গরীবুল্লাহ,
শাকের মাহমুদ, দ্বিজ পশুপতি, চন্দ্রাবতী, রামপ্রসাদ সেন, ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর এবং
অন্যান্য সাহিত্যিক মধ্যযুগের সাহিত্যকে এমন ভাবে সমৃদ্ধ করেছেন যা আমাদের এখনো ভাবায়।
তাই মধ্যযুগকে বাদ দিয়ে আমরা সাহিত্য ভাবতে পারিনা বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রে তো মোটেও
না। কবিতা ভাবতে হলে আমাদের প্রথমেই কবিতার দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হতে হবে, দেখতে হবে
সেখানকার পরিবেশ, ভারসাম্য এবং গতিশীলতা। বর্তমানকে পূর্বের কাছে যদিও টেনে নেয়া সম্ভব
নয় তবুও পূর্ব ভাবনাকে পরিবর্ধিত করে নতুন অবয়বের মানসক্ষেত্র তৈরি করতে পারি। যাতে
করে যকের ধন পাওয়ার মত দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিতে পারব। বর্তমান সময়ের কবিদের এটাও
মনে রাখতে হবে যে, বহুমাত্রিকতার নাম করে যাতে পাঠকের কাছে ভুল বার্তা না পৌঁছায়।
চর্যাপদে যেরকম আধ্যাত্মিকতা আমরা দেখেছি, বর্তমান সময়ের কবিতাতেও আধ্যাত্মিকতা জেঁকে
বসেছে কিন্তু আমরা সহজে তা উপলব্ধি করতে পারছি না কারণ এই সময়ের কবিতাগুলোর গঠন নতুন
মাত্রায় পরিশীলিত এবং ভাববিলাসিতায় পরিপূর্ণ।
মধ্যযুগের কবিতা মূলত প্রেম-বিচ্ছেদ
এবং ধর্মবিষয়ক বিদ্যাপতির লেখায় রাধা-কৃষ্ণের যে ভাবের উন্মেষ হয়েছে, চন্ডীদাসের
লেখায় তার মাধুর্য পূর্ণতা পেয়েছে। বিদ্যাপতি বাংলার লোক না হয়েও বাঙালিদের মধ্যে
যেভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে অন্য কবির ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। বাংলায় চৈতন্যদেবের
(১৪৮৬-১৫৩৩ ) জন্মের পর কবিতার প্রভাব এতটা বিস্তার করতে শুরু হয় যে ওই সময়ে ভিন্নভাষী
কবিরাও বাংলায় কবিতা রচনা শুরু করে দিয়েছিলেন। যেমনটা রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক কবিতা মুসলিমরাও
নাম বদলিয়ে লেখা শুরু করে দিয়েছিলেন। ওই সময়কার কবিতাগুলোকে মূলত মঙ্গলকাব্য বলা
হয়। কারণ ঐ গ্রন্থগুলি ধর্মবিষয়ক দিকনির্দেশনা দ্বারা রচনা করা হয়েছিল। প্রতিটা
কাব্যের ভিতর ট্রাজেডি যেমনটা ছিল অনুরূপ রোমান্টিকতাও বেশ জমেছিল।
একটু ইতিহাসের দিকে চোখ রাখলে
দেখতে পাব, চর্যাপদ রচিত হওয়ার পরেই বাংলা সাহিত্যের জগতে নেমে আসে অন্ধকার যুগ ১২০০
অব্দ থেকে ১৩৫০ —এই দেড়শো বছর সময়ের মধ্যে আমরা কোন সাহিত্যের হদিস
পাইনি। এই সময়টাকে পন্ডিতগণ অন্ধকার যুগ বলে আখ্যায়িত করেছেন। মধ্যযুগের ওই সময়টির
বর্বরতা সম্পর্কে আমরা কম-বেশি সকলেই অবগত আছি, তাই নতুন করে বলার অবকাশ রাখি না। যেহেতু,
আমরা বাংলা কবিতা সম্পর্কে কথা বলব তাই ঐতিহাসিক বর্বরতা সম্পর্কে খুব কম বলাটাই শ্রেয়
মনে করি। যারা এই সময়টা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী তারা মধ্যযুগীয় ঐতিহাসিক গ্রন্থ খুলে
পড়তে পারেন। আমরা কবিতার দিকটায় যাব। ১৩৫০ সালের পরেই আমরা চন্ডীদাসের মতো আরো অনেক
কবিকে খুঁজে পাই এবং তাদের গ্রন্থগুলি আমাদের সম্পদ। যেহেতু, অন্ধকার যুগ সম্পর্কে
বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে তেমন একটা খোঁজখবর পাওয়া যায় না তাই —এ সময়টাকে বাংলা সাহিত্যের কৃষ্ণগহ্বর বলে। চন্ডীদাস আমাদেরকে দিলেন
‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য’ এরপরেই যত হইচই। এটি মূলত লিরিক কাব্য অর্থাৎ গাওয়ার জন্য
গ্রন্থটি রচনা করা হয়েছে। সেদিক থেকে বডু চন্ডীদাস হচ্ছে গীতি কবিতার জনক। মধ্যযুগের
প্রথম কাব্যটি তার হাত ধরেই রচিত হয়। গ্রন্থটি আবিষ্কার করেন বসন্ত রঞ্জন রায় বিদ্বলভ।
বাঁকুড়া জেলার বনবিষ্ণুপুরের নিকটে কাকিল্যা নামক গ্রামে দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের
বাড়ির গোয়ালঘর থেকে ১৯০৯ সালে আবিষ্কৃত হয়।
১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ নামে বসন্ত রঞ্জন
রায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় । ওই সময়
চন্ডীদাসের লেখা এতটা জনপ্রিয় ছিল যে মহাপ্রভু চৈতন্যদেবও চন্ডীদাসের গানের ভক্ত
ছিলেন। এদিকে চৈতন্যদেবের ভক্তি আন্দোলন যখন প্রখর হচ্ছে, ঠিক তেমনি চন্ডীদাসের গাঁথাও
যেন চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের যে রোমান্টিকতা তা পারমার্থিক
জগতের সাথে যুক্ত। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের এক জায়গায় আছে, “বিণি দোষে কেহো নাহিঁ
তেজে রমণী। সিতা রামে দুখ পাইল সুণ চক্রপাণী।।” এই হচ্ছে দুঃখের ছড়াছড়ি। যেমন প্রেমের
জন্য রাধারানী কাঙাল তেমনি বিরহ যেন এই কাব্যকে আরো ঊর্ধ্বমুখী করেছেন। ডক্টর নীলিমা
ইব্রাহিম বলেছেন, “এ কবির নিসর্গপ্রীতি ও চেতনা সম্পর্কে আমরা শ্রদ্ধার্ঘ্য না দিয়ে
পারি না। বডু চন্ডীদাস কাহিনী চিত্রণ ও চরিত্র রূপায়ণ সম্পর্কে যে—বাস্তব সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন, নিসর্গ-বর্ণনাতেও তার সেই বস্তুনিষ্ঠ
মনের পরিচয় পাই। এখানে স্বর্গ বৃন্দাবনের পরিজাত নেই—আছে মর্ত্যের যুথী, মাহলী, মালতী। কবির বাস্তব জীবনে দুচোখ ভরে যে ফুল-ফলের
সৌন্দর্য তিনি উপভোগ করেছিলেন, তারই রূপ পরিগ্রহ করেছে তার শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের
সৌন্দর্য অনুশীলনে।”
এদিকে আমরা পাই, মনসামঙ্গল
কাব্যের জনক কানাহরি দত্তকে। মনসামঙ্গল কাব্যের আদি কবি তিনি। বিজয় গুপ্ত হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ
কবি। তার পরবর্তীতে আমরা পাই, নারায়ন দেব, দ্বিজ বংশীদাস, বিপ্রদাস পিপলাই, কেতুকা
দাস, ক্ষেমানন্দ প্রমুখ। মনসামঙ্গল কাব্যে উঠে এসেছে বাঙালি সমাজের সমাজ ব্যবস্থা, স্বর্গপুরী থেকে মর্ত্য অব্দি দেবতাদের
জয়গান, আচার অনুষ্ঠান এবং দীর্ঘ ট্রাজেডি। এই কাব্যের মূল দেবতা হচ্ছে মনসা দেবী।
তিনি সর্প দেবী নামেও খ্যাত। বলা হয়ে থাকে, চাঁদ সওদাগরের হাত ধরেই বাংলায় মনসা পূজার
সূচনা হয়। তাছাড়া গ্রামবাংলায় মনসামঙ্গল গানের আয়োজন আমরা দেখেছি, যেখানকার মূল
জায়গাটা জুড়ে বেহুলা-লক্ষিন্দর, চাঁদ সওদাগর এবং মনসার চরিত্র স্থান পেয়েছে। গ্রামবাংলায়
এখনো মনসামঙ্গল গানের আয়োজন দেখতে পাওয়া যায়। মনসামঙ্গল বাঙালিকে এমনভাবে আকৃষ্ট
করেছিল যে পরবর্তীতে পুরো বাংলা জুড়ে মনসা পূজার প্রচলন বেগবান হয়।
তারপর আসে চন্ডীমঙ্গলের কথা,
চন্ডীমঙ্গলের জনক মানিক দত্ত। ১৪ শতকে কাব্যগ্রন্থটি রচিত হয়। এই গ্রন্থটিতে মূলত দেবী চণ্ডীর রূপ বর্ণনা, গুণকীর্তন
এবং পূজা প্রচারের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। চন্ডীমঙ্গল কাব্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি মুকুন্দরাম
চক্রবর্তী এবং সর্বশেষ কবি অকিঞ্চন চক্রবর্তী।
বিদ্যাপতি ছিলেন ব্রজবুলি
কাব্যের জনক। মিথিলায় ছিল তার আবাস। চৈতন্যদেব থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত
তার গানে মুগ্ধ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন, ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ ‘মরণ
রে তুহু মম শ্যাম সমান’ ইত্যাদি।
এভাবেই ধীরে ধীরে রচিত হতে
থাকে অন্যান্য মঙ্গলকাব্যগুলো, যেমন, ময়ূরভট্টের ‘ধর্মমঙ্গল’, কবিকঙ্কনের ‘কালিকামঙ্গল’,
কৃত্তিবাস ওঝার ‘রামায়ণ’, বৃন্দাবন দাসের ‘শ্রীচৈতন্য ভগবত’ , শাহ মুহম্মদ সগীরের
‘ইউসুফ-জুলেখা’, শেখ ফয়জুল্লাহর ‘সত্যপীর বিজয়’ ‘গোরক্ষবিজয়’ , ‘ফকির গরীবুল্লাহর
‘ইউসুফ জোলেখা’ ‘জঙ্গনামা’ ‘সোনাভান’ রামকৃষ্ণ দাসের ‘রায়মঙ্গল’, রুদ্র দেবের ‘রায়মঙ্গল’,
ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের ‘অন্নদা মঙ্গল’ , রামপ্রসাদ সেনের ‘চৌতিশাস্তব’ ইত্যাদি মঙ্গলকাব্যগুলো
পাওয়া যায়। এই মঙ্গলকাব্যগুলো থেকেই আমরা সাহিত্যের ধারাকে ঋদ্ধ রূপে পেয়েছি। তাই
আমরা বলতে পারি যে, বাংলা কবিতার দ্বার প্রান্ত এই মধ্যযুগ। মধ্যযুগের বাংলা কবিতা
পূর্ণরূপে তার দেহের বিকাশ গড়ে কিন্তু তা শুধু ধর্মবিষয়ের উপরই আবদ্ধ ছিল।
মধ্যযুগীয় কবিতা থেকে বের
হয়ে আমরা একটু বর্তমানের দিকে দৃষ্টি স্থাপন করব, বাংলা কবিতার এমন একটি কাল যাচ্ছে
যা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি, একবিংশ শতাব্দীতে এসে সবকিছুই যেন ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে।
আমূল বদলে যাচ্ছে। শুরু হচ্ছে নব-প্রলয়। এখন মহাকালের কাছে আমাদের নিবেদন যেন ধীরে
ধীরে আরো পুষ্ট হচ্ছে। আধুনিকতা পেরিয়ে এ সময়কার কবিরা নিজেদের মস্তিষ্কে এমন একটি
ধারণার আনয়ন করেছেন, যেখানটায় স্বত্বঃসিদ্ধ পাঠক ছাড়া আর যেন কাউকেই পাওয়া যায়
না। অনেক পূর্বেই জীবনানন্দ দাশ বলে গেছেন, “কবিতার শিক্ষিত ও সুস্থির পাঠক হয়েও কোন
লাভ নেই— এইসব মুষ্টিমেয় পাঠকদের এই উপলব্ধির ফলে একদল বিভ্রান্ত,
স্বতঃসিদ্ধ পাঠক ছাড়া কেউ আর বড় বেশি থাকে না কবিতা পড়বার জন্য। কতকগুলি লোকপ্রিয়
বা তেমনি আলোকপ্রিয় অস্পষ্ট কবিতা বা এদের মাঝামাঝি অনেক কবিতাসঙ্কর পড়তে পড়তে অবশেষে
মনে হতে পারে দেশে কবিতার যুগ খুব সম্ভব শেষ হয়ে গেছে। বড় কবিরা অসৎ সমালোচনা অগ্রাহ্য
করে প্রায়ই বিপদ উত্তীর্ণ হতে জানে, কিন্তু যেসব কবিরা ততটা সৎ হতে পারেনি— হয়তো হতে পারত, তাদের সম্ভাবনা যাতে নষ্ট না হয়ে যায়, পাঠকদের দিক থেকেও
খারাপ কবিতার থেকে ভালো কবিতা এবং সব কবিতার থেকেই মহৎ কবিতা চিনে নেবার আগ্রহ যাতে
ক্রমেই শিক্ষিত, এবং চিনে নেওয়ার প্রয়োজন আছে— এই বোধ যাতে
ক্রমেই নির্দিষ্ট স্বভাবে পরিণত হতে পারে এজন্যে কোনও—এক যুগে বা দশকে-দু-দশকে কাব্য সম্বন্ধে পরিষ্কার কথা বলা, কী কবিতা পাওয়া
যাচ্ছে না, বা যা পাওয়া যাচ্ছে তাদের কী মূল্য— অভিজ্ঞ কবিদেরই
এসব স্থির করা দরকার। কবিতা লেখবার জন্য দরকারি অনুভূতি ও জ্ঞান থেকে সমালোচনার বেলায়
তেমনই জ্ঞানপরিসরের ও তার গভীরতার কিছু বেশি স্পষ্ট, যুক্তি-আলোকিত, দ্বিতীয় স্বরূপের
দিকে মাঝে-মাঝে নিজেকে নিবিষ্ট করে রাখা দরকার কবির।” জীবনানন্দ দাশের এই সূত্র ধরে
আমরা আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি তা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে। তাহলে কি আমরা এই সময়টাকে
বাংলা কবিতার হাপিত্যেশের কাল বলে মনে করব? না, সে সময় এখনো আসেনি এবং আসবেও না। যদি
আমরা আমাদের মস্তিষ্ক চালনা ঠিকঠাক ত্রাটক দৃষ্টি রেখে কবিতার স্বপ্নকে ভেতরের লালন
করতে পারি। আহামরি বিষয় ভেবে, কবিতাকে যাতে ক্ষতির দিকে অগ্রসর না হতে দেই। অবধী
ভাষার কবি তুলসীদাস বর্তমান সময় সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এ সময় বদ কবিদের উৎপাত বেড়ে
যাবে।’ কয়েক শত বছর আগের সে কথা সত্য হয়েছে। কিন্তু তবুও আমরা দমে যাইনি, এখন আমাদের
একটা বিন্দু অর্থাৎ পয়েন্ট দরকার যেখানটায় দাঁড়ানো যাবে। আমাদের খুঁজতে হবে নির্দিষ্ট
একটি পথ। যেতে হবে বহুদূর। কবিতার কলকব্জা নিয়ে শুধু টানাহেঁচড়া করলেই চলবে না। কবিতার
স্বরূপ সম্পর্কে অবগত না হওয়া পর্যন্ত সেই সাধনায় আত্মব্রতী হতে হবে। যেহেতু, কবিতা
আত্মারবন্ধন, মানুষের সাথে অবাধ বয়ে চলা। কাল-কালান্তর অতিক্রম করে বিরাট দেহপুষ্ট
করা। আমাদের বয়ে চলার পথ যত মসৃণ হচ্ছে, আমরা
ততই ঋদ্ধ হচ্ছি।
এখন তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে আমরা
কবিতা কেন পড়ব? শুধুই কি মনোরঞ্জন, প্রেম, বিলাসিতা নাকি শখ করে পড়ব? আগে আমাদের
এটা পরিষ্কার করা উচিত যে কবিতা বলতে আমরা কি বুঝি? অনেককেই বলতে শোনা যায় যে কবিতা
বুঝিনা বুঝিনা বুঝিনা অনেক কথা, কিন্তু কবিতা সম্পর্কে সামান্যতম যদি ধারণা কারো মধ্যে
স্থান পায় তাহলে সে কখনো বলবে না যে কবিতা বুঝি না। কবিতা একটি ধ্বনি, অজস্র শব্দমালার
মধ্যে লুকায়িত স্পন্দন। কবিতা মূলত প্রাণের স্পন্দন।
বর্তমান -১:
কবিতা আসলে কি আমরা কেউ জানিনা!
কবিতার জন্ম কাহিনী নিয়ে আমরা অনেক আলাপ আলোচনা শুনেছি কিন্তু কবিতা জন্মের নির্দিষ্ট
কোন প্রেক্ষাপট খুঁজে পাওয়া যায়নি। কবিতা নিয়ে সবচেয়ে মূল্যবান কথাটা হচ্ছে, আমরা
কি ভাবছি এবং কেন ভাবছি? —এই প্রশ্নের সংশোধন করে তবে কবিতার আসরে মনোনিবেশ করাটা
সমীচীন।
বর্তমান সময়ে বাংলা কবিতা
এমন একটি স্তরে এসে পৌঁছেছে যা মানুষের মনে বোধগম্যতা সৃষ্টি করতে খানিকটা লড়াই করছে।
সব সময় সবকিছু এক থাকে না, প্রত্যেকটি বস্তুরই পরিবর্তন অনিবার্য। কবিতার বোধের জায়গাটা
জুড়ে মনোজগতের চিরকালীন সম্বন্ধ করাতে না পারলে পূর্ণত্ব প্রাপ্তি আশা করা যায় না।
সন্তানের জন্মের পর পিতা-মাতা যেমন— সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন
অসীম সাহসের পাহাড়; ঠিক তেমনি কবিতা জন্মের পর লালন-পালনের জন্য পাঠকের কাছে পৌঁছে
দেয়া এবং বাক্যের দোলনায় ধাবমান কালচক্রে ভবিষ্যতের গন্ডি পেরিয়ে অমৃতে রূপান্তরিত
করার চেষ্টা করা। মানুষের ভাবনাকে একটা ঠিকঠাক
রূপ দেয়া।
ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে
প্রাচীন যে কাব্য দুটির নাম আমরা জানি রামায়ণ এবং মহাভারত সেখান থেকে কবিতা সম্পর্কিত
কয়েকটি তথ্য এবং উপস্থাপন করব। রামায়ণে কবিতা জন্মের উপাখ্যান রয়েছে কিন্তু সেটিকেই
চিরায়ত ভেবে যাতে আমরা ভুল না করি —সে দিকটা খেয়াল রাখতে হবে। কারণ রামায়ণ মহাভারতের
আগেও মিশরে গিলগামেশ কাব্য রচিত হয়েছে বলে ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে। তাছাড়া ইলিয়াড,
ওডিসি সে যুগের অন্যতম কাব্য-সাহিত্য। রামায়ণকার মহর্ষি বাল্মিকী কবিতার জন্মের যে
দৃশ্যটি ব্যক্ত করেছেন, সেখানে দুটি পাখি প্রফুল্ল
মনে খেলা করতে ছিল কিন্তু পরক্ষণেই ব্যাধ একটি পাখিকে হত্যার উদ্দেশ্যে তীর ছুড়ছেন, পাশেই স্নান করতেছিলেন
মহর্ষি বাল্মিকী হঠাৎ করেই তীর গিয়ে বিধলো একটি পাখির বুকে সঙ্গে সঙ্গে পাখিটির মৃত্যু
হলো। এবং অন্য পাখিটি শোকে চিৎকার করে দু চোখের জল ফেলল। এই মর্মান্তিক ঘটনা স্বচক্ষে
দেখে মহর্ষি রাগান্বিত হলেন এবং ব্যাধকে অভিশাপ দিলেন। বাল্মীকির দু’চোখ বেয়ে শোকের
অশ্রু ঝরে পড়ল। তার কন্ঠ থেকে ধ্বনিত হল, “মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং...” এই বাক্যটি হলো
প্রথম কবিতার স্তবক। তিনি মনে মনে ভাবলেন এই চমৎকার কথাটি কি? যা উচ্চারণ করার সাথে
সাথে আমার হৃদয়ে স্পর্শ অনুভূত হল। তখন তিনি ঠিক করলেন এবং শিষ্যকে বললেন...
“পাদবদ্ধোহক্ষরসমস্তন্ত্রীলয়সমন্বিতঃ।
শোকার্তস্য প্রবৃত্তো মে শ্লোকো ভবতু নান্যথা।।”
অর্থাৎ, ‘এই বাক্য পাদবদ্ধ,
এর প্রতি পদে সমাক্ষর, ছন্দের তন্ত্রীলয়ে এ আন্দোলিত; আমি শোকার্ত হয়ে একে উচ্চারণ
করেছি, এর নাম শ্লোক হোক।’
সংস্কৃতে যেটি শ্লোক বাংলায়
সেটিই কবিতা। এই হল রামায়ণকারের বক্তব্য। এটিই যে প্রণিধানযোগ্য সেটিও বিবেচ্য নয়!
অতএব, কবিতা শব্দব্রহ্ম যা ছন্দের তন্ত্রীলয়ে আন্দোলিত হয়ে মনন সত্তাকে উৎকর্ষ সাধনে
সহায়তা করে। সৃষ্টির প্রারম্ভে কবিতার সৃষ্টি। কারণ ছন্দবদ্ধ শব্দের ঝংকার পূর্বকাল
হতেই প্রকট ছিল তাই আমরা কবিতা সৃষ্টির ব্যাপারে কোন কিছুই মনে করতে পারি না। শুধু
যুগের প্রেক্ষিতে কবিতাকে সেই সময়কার প্রতিষ্ঠিত বলে নতুন নতুন ভাবনার উন্মেষ ঘটায়।
যখন কবির মানসক্ষেত্রে অতিমানসের উপলব্ধ হয় তখনই কবিতার জন্মকাল ধরা যেতে পারে।
কোন জৈবিক সারবত্তা বিকাশের লক্ষ্যে গন্তব্যস্থলে পৌঁছালেও কবিতা যখন সংক্রামিত হয়,
মানুষিক চরিত্র সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়— সেসব সমাধান
আজীবন ধরে মানসপটে গঠনমূলক প্রক্রিয়ার অধীন। কাব্যের সৃষ্টি সকলের হৃদয়ে সাম্যবাদ
নিয়ে আসে। বর্ণনাহীন স্পন্দন স্বল্পমাত্রা পেয়ে তা গঠন মূলক অভিব্যক্তি ব্যক্ত করে— স্বভাব শৈল্পিক মস্তিষ্কে স্বপ্নাতুর হয়ে ক্রোম বিকাশের লক্ষ্যে চিরায়ত
ভাবনা দোলায়িত হতে থাকে— বিগত যুগের সূচনা ভবিষ্যতের কাছে উপযুক্ত করে একটি
পরিমিত সাধনা উপহার দেওয়া যেতে পারে। কবিতা তার লক্ষ্যেই কাজ করে আসছে আজীবন।
যুগের যখন সন্ধ্যা কাল উপস্থিত
হয় তখন কবিতার সূচনা কাল সাধিত হয়। শনি তখন কবিদের সাথে যুক্তিবিদ্যার কাল কাটান।
পরম করুণা লাভ করে শনিও পিছু হটতে বাধ্য হন। যখন মহাপ্রলয় আসে কবিতা তখন ফুলে ফেঁপে
ওঠেন! বর্তমান সময়ে এসে আমরা লক্ষ্য করছি একটি মহাপ্রলয়ের। কবিরা এখন প্রবৃত্তি মার্গ
থেকে নিবৃত্তি মার্গে ধীরে ধীরে এগোচ্ছেন। এক সময় দেখা যাবে সকল স্তর ভেদ করে কবি
তার পূর্ণ লক্ষ্যে উপস্থিত হয়েছেন। সুধীন্দ্রনাথের ভাষায়, “সাত্ত্বিক কবিদের মধ্যে
অত্যাধিক বিষয়াশক্তির নিদর্শন বিরল”তিনি আরো বলেন, “কাব্য সমুদ্রের মতো এবং কবি নদী
মাত্র।” এখনকার কবিরা বিষয়াশক্তি থেকে বের হয়ে নতুন কিছু ভাবনার Structure গড়েছেন।
আগামী দশকে আমরা এমন কিছু পেতে চলেছি যা আমাদের ভাবনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। কল্পদৃষ্টির
প্রখরতা এমনভাবে উজ্জীবিত করছে যে গৌরবের সাথে সেই মহাপ্রলয়কে বরণ করতে চলছি। সমকালীন
কবিতা প্রতি দশকে-দশকে এমন রূপ নিয়েছে যা সাহিত্যকে ঋদ্ধ করেছে। যারা সাহিত্যের প্রতি
উদাসীন তারাও সাহিত্যকে আপন মনে গ্রহণ করেছেন। সমকালীন সাহিত্যের বিরুদ্ধে কিছু কিছু
লোক আওয়াজ তুললেও তা কোন নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে থাকেনি বরং বারিধারার মতো অবিরাম
বয়ে চলেছে মহাকালের স্রোতে। মহাকাল কোথায় নিয়ে গিয়ে রাখবেন আমরা কেউ জানিনা! এখনই
আমাদের এগিয়ে চলার সময়, থেমে গেলে চলবেনা। স্বভাব চৈতন্যকে জাগ্রত করে নতুন কিছুর
সন্ধানে কবিতার অরণ্যে প্রবেশ করতে হবে। খুঁজতে হবে কবিতার চিরায়ত রূপ। কবিতার স্বরূপ।
প্রেম-বেদনা-প্রহসন-ট্রাজেডি ইত্যাদির মধ্য থেকে রত্ন তুলে এনে সাজাতে হবে ভবিষ্যতের
দোলনা। তাই সমকালীন কবিতা একটি মায়াজাল বিস্তার করেছেন, সেখানে রূপ গৌরবের বিষয়টি
লক্ষ্য করার মতো। মধুসূদন থেকে শুরু করে জীবনানন্দ , নজরুল, আল মাহমুদ, হেলাল হাফিজ,
আহসান হাবিব, শামসুর রহমান, সৈয়দ হক ইত্যাদি কবিরা পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছেন বর্তমানের
কাছে। তখনকার সাহিত্য এবং বর্তমান সাহিত্য দুটোই ভিন্নধারার ভিন্নমাত্রার— কাল প্রবাহের গন্ডিতে তা মহাযাত্রা রুপে আবির্ভূত হয়েছিলেন তখনকার সময়ে
কিন্তু এখন তা নতুন করে কালের সাক্ষী স্বরূপ নিজ গুণের পরিপূরক হিসেবে সন্ধ্যা-তিমিরকে
গ্রাস করেছে।
সমকালীন কবিতার প্রথম দিকটা
জীবনানন্দ দাশের আদলে তৈরি হয়েছে। তিনি যা দিতে চেয়েছেন তা নির্দিষ্ট কোন গন্ডিতে
আটকে থাকেনি। এখন জনমানুষের জীবন প্রবাহে জীবনানন্দ যেন আনন্দ রূপে বিরাজমান। তার কবিতার
রূপরেখা ধরে আজকের কাব্য-বিন্যাস কবিসত্তাকে ঊর্ধ্বমুখী করেছেন। কবিতায় প্রভুত্ব নেই,
আছে প্রেম আর মানুষের চিরায়িত কল্পদৃষ্টির অতিমানস। আজকালকার কবিতাকে যদি অতিমানস
বলা হয় তাতে কিছু ভুল বলা হবে না। কারণ কবিতার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছে।
আসলে আমরা যা ভাবছি, কবিতা সেই সময়টাকে অতিক্রম করে নিজের বিরাট দেহ বিস্তার করেছেন।
এজন্যই কবিতা মহান। লোকলালসার ভয়ে কবিতা হয় না, কবিতা লিখতে গেলে যে শ্রম ব্যয় হয়
তা অপেক্ষা জীবনের অত্যাচার্য কিছু নেই। একটি জীবনের গতিবিধিকে সমগ্র জীব সত্তার গতিবিধিতে
রূপান্তর করার সাধনার লকেট গলায় দিয়ে কবিতার ইন্দ্রজাল রচনা হয়। সেই ইন্দ্রজাল যখন
পাঠকের হৃদস্পন্দন জায়গাতে সাহায্য করে— উৎফুল্ল কবিতা বৃষ্টি হয়, তখন কাব্যজগতের প্রয়াস
সাধিত হয়। আদর্শের দিক থেকে কবিতা স্বতন্ত্র এবং উদ্ভাসিত। প্রত্যেক কবিতার নিজস্ব
স্বতন্ত্র আছে। ছন্দকলার বহুমুখীতা এবং পাঠক শুদ্ধতা সবমিলিয়ে কবিতা রচনার ক্ষেত্রে
আলংকারিক দৃষ্টির দিকে চোখ রাখলে বুঝতে পারব— শুধুমাত্র ছন্দ এবং অলংকার দিয়েই কবিতা রচনা করা
সম্ভব নয়। বর্তমানের কবিরা তা সহজে মেনে নেন না। শুধুমাত্র ছন্দ এবং অলংকার দিয়ে
যদি কবিতা হতো তাহলে কাঙ্খিত মনের সকল অভিব্যক্তি শূন্যতা থেকে পূর্ণত্বে নামিয়ে আনা
যেত না। ছন্দ এবং অলংকার যে ব্যবহার করব না সেটাও একপক্ষীয় হীনমন্যতা। ছন্দ এবং
অলংকারের ব্যবহার থাকবে, অতীতেও তা চিরায়ত রূপে ব্যবহৃত হয়েছিল। একদিকে ছন্দ এবং
অলংকার বাদ দিলে আমাদের সঠিক রূপবৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে যাবে। তাই ছন্দ-অলংকার
কবিতায় অনিবার্য। কিন্তু বর্তমানে সেটিকেও আমরা অতিক্রম করে নতুন ভাবধারার সৃষ্টি
করেছি— এটা কেউ মেনে নিতে হবে। কেউ ওগুলোর বিপক্ষে কথা বলেনি
কিন্তু একপক্ষীয় কথাও শুনতে দেখা যায়নি— শুধুমাত্র ভাবনা বিলাসের পরিধি ব্যক্ত হয়েছে গতানুগতিক
ভাবধারাকে লক্ষ্য রেখে। এখনকার কবিতায় যে বিষয়টি সবচেয়ে দেখা যায় সেটি হচ্ছে,
কল্পদৃষ্টির প্রখরতা যা সাধারণ পাঠকের মস্তিষ্কে আন্দোলিত হয়। পাঠক সহজে বুঝতে পারেনা
যে তিনি কি পড়ছেন এবং কি বুঝছেন! এটি একটি সবচেয়ে বড় সমস্যা। কবিতা কখনোই সহজ
ছিল না, পূর্বেও না, এখনো না। যারা কবিতা বোঝেন না তারা আজীবন বোঝেন না। আমরা বর্তমানকে
কেউ কেউ দোষী সাব্যস্ত করে কবিতাকে অস্বীকার করছি কিন্তু দেখা যাবে ভবিষ্যৎ বর্তমান
সময়কে একসময় মেনে নেবে— তখন পূর্ববর্তী কবিতার প্রেক্ষাপট নিয়ে যেমনটা আগ্রহ
বর্তমান দেখা যায় ঐ সময়েও এরকম আগ্রহ লক্ষ্য করা যাবে। বর্তমান সময়ে যেটা অবহেলিত
ভবিষ্যৎ সময়ে সেটি অনিবার্য।
কবির মানসপটে লুকিয়ে থাকা
নিয়তির আদি সরঞ্জাম সমূহ একত্রিত করে কল্পনার সূত্রপাত থেকে ঘনিষ্ট জীবনের সম্পূর্ণ
লীলায়িত রূপ চিত্রিত হয়ে ছন্দ ব্যঞ্জনার ধ্বনিতে ঝনঝন করে ওঠে! সেখানেই কবির চিরকালের
সার্থকতা। এই সার্থকতা শুধু আবেগ ও অনুভূতির দ্বারা ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। কবি মাত্রই
জানেন নিজের মধ্যে সমুদ্রকে ধারণ করা এবং সমুদ্রের রূপবৈচিত্র্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে
কি করে সামগ্রিক বিষয়কে দুই একটি সূত্রে ফেলে দীর্ঘ গল্প বলা যায়— একটি কথার গভীরতা মতানৈক্যকে শুভানুধ্যেয়ী রূপে হাজির করা এবং তার ভিতরে
নিজেকে আবিষ্কার করে চিন্তাশক্তির বিকাশকে জনকলাহলে লালন করা —এটাই কবির একমাত্র স্বার্থকতা।
১। অতিমানসের চোখে কবি এবং কবিতা
অতিমানস হচ্ছে অতীন্দ্রিয়
সত্ত্বাকে জাগ্রত করে যে ভাবনার বিকাশ সাধন হয় তাকে অতিমানস বলা যায়। যখন কবির চিত্তে
কল্পদৃষ্টির ওপারের খবর ক্রমান্বয়ে জমা হতে থাকে— যা পূর্ব
ভবিষ্যৎ বলে একসময় আখ্যায়িত হয়। কিন্তু সময়ের প্রেক্ষিতে সাধারণের দৃষ্টিগোচর হয়
না সেই ভাবনার অতিপ্রয়াস যিনি করেন তিনি কবি। কবি কথাটির একটি অর্থ হচ্ছে জ্ঞানী।
তাই কবির সরল মানসক্ষেত্রে অতীন্দ্রিয় সত্তার বিকাশ সহজে ধরা দেয়। যে সময়টা অতিমানস
Second Memory হিসেবে কাজ করে, তখন কবি বিষয়াশক্তির বাইরে চলে যান এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন
শক্তির সহানুভূতি অনুভব করেন। শব্দব্রহ্ম রূপে কবির মানসক্ষেত্রে দেখা দেয় অভিনব সৌকুমার্য।
তখন চিত্তক্ষেত্র থেকে যা নির্গত হয় তা পাঠক সমাজ অমৃত সুধারূপে গ্রহণ করেন। তারপরেও
পাঠক সমাজে গ্রহণ এবং বর্জনের একটা ধাপ লক্ষ্য করা যায়— সেখানটায় একদল নিম্নস্তরের পাঠক শুধুমাত্র খোলস নিয়ে লাফা ঝাপা করে
কিন্তু কবিতার গূঢ় অর্থ হৃদয়াঙ্গম করতে সক্ষম হন না— এইসব পাঠক বিভ্রান্ত হন বটে। এই ধরনের পাঠকও কবির কাছে ফেলনা নয়। কবি
সেই পাঠককে ভিন্নমাত্রায় নিয়ে যান ছোট ছোট সাধনার প্রেক্ষিতে— তাতে করে অনেকটা সময় লেগে যায় কিন্তু একটা সময় এসে পাঠক বুঝতে পারেন
পূর্ব মুহূর্তের নিঃস্বতা। অন্যদল পাঠক অধ্যায়নের কারণে পূর্ব থেকেই স্বতঃসিদ্ধ থাকেন
বলে তাদের খানিকটা বেগ পেতে হয় না, তারা নিজের মতো করে রসে টইটুম্বুর থাকেন। তবে তাদের
ক্ষেত্রেও দু’এক জায়গায় মতানৈক্য দেখতে পাওয়া যায়; সবার ঊর্ধ্ব দৃষ্টি থাকলেও গতানুগতিকের
প্রেক্ষিতে হঠাৎ করে তাদেরও আবছা আবছা ভাব অনুভূত হয়— ঐ সময়টায় কবি বিশ্লেষণের কথা বলেন না বরং রসাস্বাদনের মাধ্যমে একটা
স্তরে পৌঁছুতে সাহায্য করেন।
যখন আমরা কবিতা পড়ি সাধারণত
সেই সময়টা পাঠক এমন একটা স্তরে পৌঁছায় যেখানে সে নিজেকে জানতে পারে। কবিতা এক দিক
থেকে হচ্ছে বোধের উদয়। চেতনাকে জাগ্রত করা। চেতনার পথ ধরে ধীরে ধীরে অতিমানসের দিকে
ছুটে যাওয়ার প্রয়াসে ছন্দবদ্ধ অলংকারিক প্রতিচ্ছবি আত্মবিকাশে যে স্পন্দন তুলে ধারাবাহিক
জীবনের সন্ধ্যা পেরিয়ে ব্রহ্মমুহূর্তের সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করেন এবং কবির চিত্তক্ষেত্রে
অতিমানসের অতীন্দ্রিয় সৌকুমার্য ফুটে ওঠে! পাঠক অস্থিরতম একটা মুহূর্ত পেরিয়ে আবাবিল
আনন্দে কালো অক্ষরের ভিতর নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে কেউ কেউ নিজেকে গুছিয়ে নেন আবার কেউ
কেউ অনুসন্ধানী হন বটে কিন্তু কবিতাকে অতিক্রম করে কিংবা ভ্রান্তির দোহাই দিয়ে এড়িয়ে
যাওয়া মোটেই সুখকর নয়। আমরা এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছেছি যখন কবিতা নিয়ে চারদিক
টাল-মাতাল, কবিতে কবিতে বিদ্বেষ, হিংসা, লোভ যা ক্রমে ক্রমে গ্রাস করেছে পুর্ণত্ব লাভের
তৃষ্ণা। কবিদের বেগতিক তৃষ্ণাকে বেগবান করার চেষ্টা এভাবেই ধ্বংসত্বের পথে গমন করে।
কেউ কারো লেখা পড়তে রাজি নই! —এই যে একজন আরেকজনের প্রতি হিংসার ছায়া ফেলছি তা কিন্তু
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও দায়ী করে ফেলছে। আমার জীবনে এরকম পরিস্থিতির মধ্যে কতবার যে পড়েছি
তার ইয়াত্তা নেই। বারবার শুধু চোখের জল ফেলে গেছি কিন্তু কারো জন্য কাউকে ফেলে দিতে
পারেনি বরং কবিতার জন্য সকলকে একটা নির্দিষ্ট স্তরে আনার চেষ্টা মনে মনে খুঁজে পেয়েছি।
শেষ পর্যন্ত সবাইকে ভালোবাসার চেষ্টায় এখনো প্রহর গুনছি। সাহিত্যকে ব্যাক্তিকেন্দ্রিক দিক থেকে না দেখে যদি
নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তাকানো যায় তাহলেই ভালো ফল লাভ করা যায়। কারণ সাহিত্য ব্যক্তিত্বকে
স্বীকার করে না। সাহিত্য সবসময় তার আপন মহিমায় কাল যাপন করেন। সেজন্য ব্যক্তিত্বকে
নয় বরং সাহিত্যকে মূল্যায়ন করা উচিত। কেউ যদি অপকর্মও করে তবে তার সাহিত্যকে নিষিদ্ধ
নয় বরং সুন্দরকে সুন্দরের আলপনায় হৃদয়ের মাঝে অঙ্কিত করাই শ্রেয়। আজকে আমি যার
সাহিত্য নিষিদ্ধ করার প্রয়াস করছি, একদিন সেই সাহিত্যই বিশ্বের কাছে উজ্জ্বলতম রূপে
মানুষের কাছে ধরা দিতে পারে। আজ যা সত্য নয়, কাল তাই সত্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা
হচ্ছে জানতে হবে, জানার জন্য জানতে হবে—এই ভাবনা নিয়ে যে পাঠক অধ্যায়ন শুরু করে তার জীবনে
একটা সময় সত্য উপলব্ধি হবেই কিন্তু যিনি জানার প্রয়াস করেন না অথচ কাব্যসাহিত্যে
অনর্গল গলদ রচনা করেন তার জন্য আমার দুঃখ করা ছাড়া উপায় নেই। যিনি কবিতা লিখেন তাকেও
সতর্ক থাকতে হবে এবং যিনি পড়েন তিনিও সতর্ক থাকবেন। কিন্তু কবিতা পড়তে হলে সরল মস্তিষ্কে
অতীন্দ্রিয় সত্তার জাগরণ প্রয়োজন তা না হলে কবিতার গূঢ় হওয়া অর্থ বোঝা মুশকিল।
পাঠকের দিক থেকে বলতে চাই, কৃষক যখন মাঠে কাজ করেন তখন রোদ বৃষ্টি ঝড় উপেক্ষা করে
সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, ঠিক তেমনি যিনি কবিতা পড়েন তাকেও মাথার ঝিমঝিম
ভুলে রসাস্বাদনের পথ খুজতে হবে। তাছাড়া দুর্বল মস্তিষ্কের শিকার হয়ে কবিতার আসরে
যাওয়াটাও ঠিক নয়! কারণ তখন পাঠক শ্লীলতাহানির অভিযোগ তুলে দোষারোপ করতে পারেন, তখন
তার চোখে প্রকৃতির অপরূপ ভাবধারা আচ্ছাদিত থেকে যায়— পাঠক ভুল করে বসেন, বাইরের দিকে চেয়ে চোখ জুড়াবার জায়গা পান না। অতিমানস
লুপ্ত হয়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, তাতে করে এগোনোর সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়। কবির দায়িত্ব
বৃদ্ধির সাথে সাথে পাঠকের চক্ষুশূল হতে হয়। এরকম পর্যায়ে যাতে না যেতে হয় সে দিকটা
পাঠক এবং কবি দুজনেই খেয়াল রাখবো।
এবার যদি পাঠক রসের বদলে
কবিতার বিশ্লেষণে ব্যস্ত হয়ে যায় তখন আমাদেরও কিছু কথা থাকে, যেমন— কেউ যদি মনোরঞ্জনের জন্য কবিতা পড়ে তাহলে সে কবিতার মূল ধারা থেকে ছিটকে
পড়বে। এটি সত্য কথা। কবিতায় সুখ লাভ হয় বটে কিন্তু সেটা যদি নিজের অস্তিত্বকে স্বীকার
করে ঊর্ধ্বমুখী চেতনার বিকাশসাধন হয়, তাহলে নতুন কিছু আশা করা যায়। সাহিত্যের সবচেয়ে
জটিল এবং বিশ্লেষণধর্মী শাখা হচ্ছে কবিতা। তাই আমরা কবিতাকে সাধারণ হিসেবে মেনে নিতে
পারি না। তাই কবিতাকে আমি অতিমানসের বাহন বলে চিহ্নিত করতে চাই। কল্প-শক্তির অতীন্দ্রিয়
প্রয়াস যখন ঊর্ধ্বমুখী ছন্দবদ্ধ অলংকারিক
প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলতে সমর্থ হয়— গতানুগতিক দৃষ্টিকে পেরিয়ে ভবিষ্যৎকেও আঁকড়ে ধরে
মহাকালকে নির্দিষ্ট স্তরে রেখে অতীত এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার চাবিকাঠিতে নিয়ন্ত্রণ করতে
পারেন এবং কল্পনাপ্রসূত যে ভাবগুলো শব্দের
দোলনায় দোল খেতে খেতে অন্তর্হিত শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, বিচক্ষণ ভালোবেসে এর ধারা
নির্দ্বিধায় এগোতে পারে; ওই সময়টায় কবিতার যৌবনকাল উপস্থিত হয়। কবিতার ধারণাটা
আমাদের মনে এমন ভাবে তৈরি হয়েছে যা মানুষের কল্পশক্তিকে অতিমানসের পথে নিয়ে যেতে
সাহায্য করে। যিনি লিখেন তিনি হয়তো নিজেও জানেন না যে কবিতা কিভাবে তৈরি হয়! এই সত্যটি
জানার জন্য আমাদের পাঠকের দরবারে হাজির হতে হয়। পাঠক মাত্রই প্রজ্ঞার মাধ্যমে গ্রহণ
এবং বর্জনের বস্তুটুকু রেখে দেন।
কবিতার মধ্যে একরৈখিক যে
ভাবনাগুলো আমাদের ভেতরে কাজ করে তা হলো পূর্বপূর্ব অনুশীলনের চর্চার ফল। দেখা যাচ্ছে
অনুকরণ এবং অনুসরণের মাধ্যমেই নতুন লেখকেরা তার পরিধি ব্যপ্ত করছেন। একটা সময় দেখা
যাচ্ছে, হাপিত্যেশ নিয়ে কাতরাতে হচ্ছে। কারণ তারা বুঝতে পারতেছেনা কল্পনাশক্তির গুরুত্ব
সম্পর্কে। কেউ কেউ হয়তো বলবেন এর জন্য অনেক পড় পড় এবং পড় কিন্তু আমি কাউকে পড়ার
বোঝা চাপিয়ে দিতে চাইনা। আমি বলব এর জন্য অনেক ভ্রমণ কর, প্রকৃতির মাঝে নিজের স্বরূপ
খোঁজ তাহলেই কবিতার কল্পনার সূত্রটুকু আবিষ্কার করতে বেগ পেতে হবে না। অতিমানসের প্রথম
পর্যায় হলো নিজের সম্পর্কে কতটুকু জানি সেটা বের করা। আবারও বলতে হয়, কবি শব্দের
একটি অর্থ হলো জ্ঞানী অর্থাৎ জ্ঞানের কলেবরে পূর্ণত্বের অভিলাষ না থাকলে কবিত্বের প্রয়াগ
সিদ্ধ হয় না। কবিতায় আবেগ চলে কিন্তু আবেগের মূল্যবোধ চলে না। কবিতা যখন অতিমানস
সিদ্ধ তখন আবেগের কড়ানাড়া মানে পুরো একটা Stricture নষ্ট করে দেওয়া। কবিতায় আবেগ
থাকবে না সেটা আমি বলছি না, কবিতায় আবেগ থাকবে তবে সেটা যেন অতিরঞ্জিত হয়ে না ওঠে!
সব জায়গাতেই আবেগ চলে কিন্তু কবিতার বেলায় আবেগ সর্বসিদ্ধ হলেও পরিত্যাজ্য। কারণ
আবেগ বিষয়টি এখন খাপছাড়া মনে হয়, কবিতা হবে সর্বপরিণামদর্শী রাগ-বিরাগে টইটম্বুর।
তার আদর্শের বস্তুনিষ্ঠ কাঠামো যদি ভাবনার জগতকে নতুন করে গড়ে তুলতে না পারে তাহলে
একটা সময়ে এসে আবারও পিছনে ফিরে তাকাতে হয়। চৈতন্যবোধ যদি জাগ্রত না হয়, একটা সময়ে
গিয়ে নিজেকে অপরাধীবোধ ঠিকই মনে হবে তাই এখন থেকেই চিন্তাসূত্রের গতিবিধিকে কাজে লাগিয়ে
পাঠকের আয়ু দীর্ঘান্বিত করতে হবে। পাঠক যতই উদ্বুদ্ধ হবে ততই কবিতার জন্ম নেবে। আবেগ
বিষয়টি থেকে দূরে সরে এসেও আমরা নতুন করে ভাবতে শিখেছি । সেজন্য নতুন করে আবেগ তাড়িত
জীবনকে নতুনের পথ দেখায় বর্তমান সময়। তাই বর্তমান সময়ে আবেগের স্থান নেই। —এর জন্য অতিমানসের কল্পিত সম্ভারের তীর্যক স্বর্গভেদী বার্তা প্রয়োজন।
কবিতার সাথে সাথে অতিমানস কথাটি কেন যোগ করলাম?
আমরা যাকে অতিমানস বা কল্পনার অতীত বলে জানি সেটাকে কীভাবে কবিতায় রূপান্তর ঘটানো
যায় তার প্রক্রিয়ার ভাবনাটা হঠাৎ মনের মাঝে কেন উঁকি দিচ্ছে তা তালাস করে দেখা দরকার।
অতিমানসের যে ধারণাটা ইতিমধ্যেই আমাদের কল্পজগতকে ঘিরে ফেলেছে তাঁর বাস্তব রূপকার হচ্ছেন
জীবনানন্দ এবং বর্তমান সময়ের বিশ্লেষণধর্মী কবিতার প্রেক্ষাপট। জীবনানন্দ যে বিষয়টি
প্রায় একশো বছর আগে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছেন সেই বিষয়টি আজও কেন অত্যাশ্চার্য!
—এ সমন্ধে বর্তমান কবিদের ভাবনা এড়িয়ে গেলে চলে না।
জীবনানন্দের ঘোরপ্যাচ কাটতে গেলে প্রাণবায়ুর সঙ্কট পড়ে যায় তাই আমরা কেউ ওদিকে এগোতে
চাই না। আমরা এটা ভেবে বসে আছি যে, কবিতা একটা নির্দিষ্ট পথরেখা ধরে চলবে। আমি এর পক্ষপাতী।
কবিতা কোন কিছুর উপর ভিত্তি করে চলতে পারে না, একটি পথ দিয়ে সবার প্রবেশ করার রুচিবোধ
না থাকতেও পারে। হাজার হাজার পথের সম্মিলনে কবিরা তাঁদের কাঙ্ক্ষিত পথ খুঁজে নেউক।
তাতে বাঁধা দেবার আমরা কে? আমি নিজের পক্ষে কোনো কথা বলছি না। অতিমানসের চোখে কল্পভেদী কবিতার প্রয়াগের সন্ধিস্থল
খুঁজে চলছি।
কবিতায় অতিমানস নিয়ে চিন্তা
করতে করতে অনেকগুলো বই পড়া হয়ে গেছে— এর মাঝেই সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছি বুদ্ধদেব বসুর এই
কথাটি পরে, তিনি বললেন, “কবি— তিনি কখনো অবিকল সামাজিক বা স্বভাবিক মানুষ হ’তে পারেন
না— তাকে হ’তে হবে কোন-না-কোন দিক থেকে অভাবগ্রস্ত, যে— অভাবের ক্ষতিপূরণ করে ‘দৈব’ অথবা অবচেতনের ক্ষমতা। এই কথাটা আধুনিক মানুষের,
আর এই কথাটাই চিরকালীন।” বুদ্ধদেব বসুর এই কথাটাই আমাদের জানিয়ে দেয় কি করে অবচেতনের
ক্ষমতা চিরকালীন কবিতার কার্যকে সম্পন্ন করে! তিনি এই সম্পর্কে বেশি কিছু বলতে চাননি।
কিন্তু কেন বলেননি আমরা কেউ জানি না। তিনি হয়তো অতিমানসের অতীন্দ্রিয় ক্রিয়া বুঝতে
পেরেছিলেন, তাই আমাদের জানানোর জন্য দু’একটি কথাতেই সমস্তটা বলে গেছেন। এই সময়টায়
অতিমানস নিয়ে কথা বলতে গেলে আপনাকে লোকে পাগল ভাবতে পারে— দূরদৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ রটনা-ঘটনা ঈর্ষাপরায়ণ ভঙ্গিতে দেখে কবিতার
পুরোহিত মনীষা দেখতে অক্ষম হয়; কবির আদি পিতা পুরোহিত ছিল এ কথা বুদ্ধদেব বসু স্বীকার
করেন এবং তিনি যথার্থ সত্য বলে ব্যক্ত করেছেন। পুরোহিত বলতে এখানে প্রাজ্ঞ মনীষাকে
বুঝানো হয়েছে। সংস্কৃত সাহিত্য থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্য পর্যন্ত যতগুলো গ্রন্থ-শাস্ত্র
রচনা হয়েছে সবগুলোই কোন না কোন প্রাজ্ঞ মনীষীর অবচেতন মনের অতীন্দ্রিয় সত্ত্বার প্রকাশ।
হোমার কিংবা মিলটন অন্ধ ছিলেন কিন্তু সাহিত্যের প্রতি দুর্বলতা কখনো তাদের গ্রাস করতে
পারেনি; তেমনি মধ্যযুগের কবি সনাতন গোস্বামী প্রথম জীবনে ( সাকর মল্লিক নামে যখন পরিচিত
ছিলেন) অত্যাচারী ছিলেন বটে কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যাচ্ছে তিনিই সুন্দরের প্রকাশ ঘটাচ্ছে
এবং মানুষ তার পথ অনুসরণ করছেন— ঋষি কবি বাল্মিকির ক্ষেত্রেও এরূপ রত্নাকর দস্যুর
কথা প্রযোজ্য। অথচ তাদের অবচেতন মন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুন্দরের প্রয়োজনে ব্যবহারের
দিকনির্দেশনা ব্যক্ত করেন— এ বিষয়টি অতিমানসের ক্ষেত্রেই একমাত্র ঘটে; মানুষ
তখন স্বাভাবিক থাকে না, তখন সে ঊর্ধ্বে উঠতে থাকে— শব্দব্রহ্মের
কল্পজগতের মাঝে দুলতে দুলতে কবি তখন চিরায়ত সত্যের পথে গমন করেন। অসত্য থেকে সত্যে
নয় বরং সত্য থেকে সত্যের পথে যাত্রা। এ যাত্রা কবির অনাদিকালের যাত্রা। অন্ধকার থেকে
আলোর পথে যাওয়ার সাধনা। ইতিহাস বলে, ৭০,০০০ বছর পূর্বে কল্পিত সত্ত্বা সৃষ্টিতে সক্ষম
ভাষার আবির্ভাব অর্থাৎ গল্প কথার সূচনা— সেই সূচনার বিপ্লবের পর থেকে ধীরে ধীরে নানান কল্পনার
মধ্যদিয়ে মূলত লোকসাহিত্যের ছড়াছড়ির ভেতর দিয়ে ক্রমে ক্রমে কবিতা-গল্প-উপন্যাস-প্রহসন-নাটকের
অন্যান্য ধারাগুলোকে যখন আমরা এক মলাটে পেয়েছি, তখন আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দিকগুলি
উন্মোচন হতে থাকে— বুঝতে পারি ভবিষ্যৎ আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! বিশেষ
করে কবিদের ক্ষেত্রে আগাম খবর পাওয়াটা সহজ ব্যাপার কারণ তখনো কবিদের মানসক্ষেত্রে
সত্যের উদয় ঠিকই হয়েছিল কিন্তু প্রাচীনেরা তাদের ব্যাখ্যাটা ঠিকঠাক উপস্থাপন করতে
পারেনি; “বেদান্ত বলেন, বনের মানুষের ধারণাই ঠিক; তাহার দৃষ্টি সত্য, কিন্তু ব্যাখ্যা
ভুল।” প্রথমত লিখিত কোন লিপি না থাকায় সে
সময় কবিতা মুখে মুখে ছড়িয়ে যেত একজন থেকে আরেকজনে— তখনকার যুগে মনে রাখার কৌশলটা এভাবেই পূর্ণ হত; তবে নিশ্চয়ই তারা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন
মানুষ ছিলেন নয়তো হাজার বছর পরেও কেন আমরা তাদেরকে মেনে নেব! কবিসত্ত্বা যেখান থেকে
উদ্ভাসিত হয়, সেই পরম লক্ষ্য থেকে প্রাচীনেরা পথ দেখিয়েছেন— আজ সেই পথ ধরে হেঁটে হেঁটে বর্তমান সময়ের কাছে এসে পৌঁছেছে সাহিত্যের
মহৎ উদ্দেশ্য; চির যৌবনা বলে কবিতার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়নি বরং উপনিষদের যুগে তা আরো
প্রবল হয়ে উঠেছিল এবং চর্যাপদের যুগে এসে নতুন করে দিকউন্মোচন করে। তারও অনেক পরে
মধ্যযুগীয় মঙ্গলকাব্য আদিরসের বিস্তারে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল। যা এখনো মানুষের মুখেমুখে
প্রচলিত ধারার মতো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে এবং গুণকীর্তনের মহিমায় মানুষ মুখরিত। কিন্তু
পরবর্তী সময়ে সেটাকেও ছেড়ে আসতে হয়েছে আধুনিক কবিতার কাছে ভাব ব্যঞ্জনার সৌকুমার্য্যে।
কিন্তু সেটাও আমাদের সহ্য হয়নি, আমরা চলে এসেছি উত্তরাধুনিক সময়ে, এখন মনস্তাত্ত্বিক
ব্যাপারগুলোকে প্রাধান্য দেওয়ার সময়— গভীর বিশ্লেষণের কালে এসে পাঠককে শক্ত পায়ে দাঁড়াতে
হচ্ছে; চিন্তার খেরোখাতা খুলে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হচ্ছে অতিমানসের অতীন্দ্রিয় সত্ত্বা।
কবি হলেন সেই মন্ত্র দ্রষ্টা;
যিনি সাধনার উৎকৃষ্ট সর্বজন সম্মুখে বিস্তার করে দিবেন। বাইরে তিনি অভাবগ্রস্থ কিন্তু
ভেতরে পূর্ণ সত্ত্বার বিকাশ। সীমাহীন কাব্যের জগতে রসতত্ত্বের গুণের চেয়ে শব্দার্থময়
গুণ সবচেয়ে বেশি জরুরি। শব্দকে তিনি কিভাবে প্রয়াগসিদ্ধ করাবেন তা তার ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের
উপর নির্ভর করে। কিন্তু পাঠকের চৈতন্য না হওয়া অবদি সর্বজনবিদিত বলে স্বীকৃত হয় না।
কাব্য-শাস্ত্রে কোন অস্বীকৃত বস্তু এড়িয়ে ভিন্নকালের বা ভিন্নমাত্রার সংযোজনা সম্ভব
নয়— কাব্য সৃষ্টিতে উপযুক্ত শব্দই বিবেচ্য! যারা মহাকালের
কাছে অভিযোগ এনে দাঁড় করে তারা শুধুমাত্র গতানুগতিক দৃষ্টিকেই প্রাধান্য দিতে চায়।
সবকিছুর প্রতি তাদের একটা মায়া কাজ করে যা কাব্য সৃষ্টিতে সুখকর বলে প্রতীয় হয় কিন্তু
বিচারের দিক থেকে খানিকটা অগোছালো হয়ে পড়ে। উত্তরাধুনিক কালের ভাবগাম্ভীর্যের সরলরেখা
তার দিকেই ত্রাটক দৃষ্টি রাখে— তাই অনেকে উত্তরাধুনিক Culture মেনে নিতে চান না।
কিন্তু একদল এই ধারাকেই সর্বসিদ্ধ বলে পাঠকের কাছে ছেড়ে দিয়েছেন। পাঠকের কাছে যা
নতুন পাঠক তাই গ্রহণ এবং বর্জনের মাধ্যমে রেখে দেন। মহাকালের বিচারে আমরা সেই বস্তুর
মায়াময় জগতের গাম্ভীর্যের উৎকৃষ্ট সুফল একসময় লক্ষ্য করতে সক্ষম হব বলে মনে করি।
তার জন্য এত উদগ্রীব হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ কবিরা পূর্ববস্তুকে নতুন মাত্রায় ব্যঞ্জনার
মধ্য দিয়ে পূর্ণ করে তোলেন— কেউ নতুন কিছুর সৃষ্টিকে স্বীকার করেন না বরং নতুন
মাত্রাকে প্রাধান্য দিয়ে পূর্ব পরিণামের সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করেন। সেই ব্যাখ্যা একসময়
আবার জীর্ণদশা প্রাপ্ত হয়; তখন মেরামতের প্রয়োজন পড়ে, সে সময়কার কবিরা সেটাকে নতুন
করে গড়ে তোলেন— ভাঙা গড়ার এই ক্রিয়া চিরকালীন এবং সত্য। সুধীন্দ্রনাথ
দত্তের ভাষায়, “কবিতা হলো কবির পূর্বপুরুষ, কবি কাব্যের জন্মদাতা নন!” —এই কথাটি যে বর্তমান সময়ের কবিদের বোঝানো কোনোমতেই সম্ভব নয়। তাঁরা মৌলিক
কিছু খুঁজতে চান অথচ অতিমানসের চোখে মৌলিক বলতে কবিতায় কিছু নেই। শুধুমাত্র গতানুগতিক
দৃষ্টিতে ব্যঞ্জনার ভিন্নতামাত্র; তাছাড়া পূর্ব সৃষ্টিকে অস্বীকার করার সাহস হয়তো
কেউ করবে না। তারপরেও যারা লোকমুখে স্বীকার করে না কিন্তু মনে মনে প্রাধান্য দেয়— সেই লোকেরা মূলত সুযোগ সন্ধানী হয়। প্রত্যেকটা কবিতা পূর্ব চিন্তার ফল,
এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। যদি কেউ কবিতার মৌলিক
প্রেক্ষাপট নিজের দাবি করে গর্জে ওঠেন শুধু তাঁর জন্য আমার আবেদন থাকবে পুরাতনকে নতুন
করে রঙে ঢঙে সাজিয়ে দিলেই তা নতুন হয়ে ওঠে না। কবিতা চিরকালীন, চির কিশোর, চির যৌবনা,
সুনয়না তাই কবিতায় মৌলিকত্ব নাই, আছে রসতত্ত্বের নিগূঢ় ভাবনা। কবিতায় মৌলিকত্ব
খুঁজতে যাওয়া মানে পেছনে ফেরার পালা। যা কোনমতেই সম্ভব নয়!
বর্তমান সময়ের জনপ্রিয়
কবি মাসুদ খান বলেছেন, “কবিতা-অরণ্য হলো সেই রহস্যমেদুর রেইন ফরেস্ট, যেখান থেকে অক্সিজেন
নেয় বহু-বহু বিষণ্ণ ফুসফুস আর ত্যাগ করে খেদ ও নির্বেদ, গ্লানি ও কার্বন ডাই- অক্সাইড,
এমনকি কখনো-কখনো মনোক্সাইডও। আর সেই বৃষ্টিবন ওইসব বিষ ও বিষাদকে ফের রূপান্তরিত করে
ফেলে দ্রুত অম্লজানে। কবিতার রয়েছে সেই অভিনব সালোক-সংশ্লেষণী ক্ষমতা।”এই কথাটির পর
আমার মনে হয় আর অন্য কোন কথা থাকতে পারে না। কবিতাকে তিনি অল্প কথায় এত বিস্তরভাবে
তুলে ধরেছেন যা প্রাণের সাথে যুক্ত হয়ে কবিতার ভাবতত্ত্বের সহজ অনুভূতিকে জাগ্রত করে।
এই লেখাটিকে হঠাৎ করে কেউ কবিতা বলেও ভুল করতে পারে। কারণ পুরো লেখাটি গদ্য হলেও কবিতার
মত দূরদর্শিতার ভূমিকা রাখে। এখন আমি যদি এটাকে কবিতা বলে ধরে নিই, তাতেও মনে হয় কবি
রাগ করবেন না। এটাকেই বলে পরিবর্তন। শুধু কবিতার ক্ষেত্রেই নয়, গদ্যের ক্ষেত্রেও
আমরা দেখতে পাই এই বিশ্লেষণের ধারা। যত দূরে থাকতে চাই, ঠিক ততই যেন কাছে আসতে থাকি।
এক লাইনেই একটি কবিতা লেখা যায়। এ কথা সত্য। অতিমানস শুধু কবিতাকে নয়, গদ্যের ধারাকেও
ভিন্নমাত্রায় নিয়ে গিয়ে নির্মাল্য দান করে। মাসুদ খানের এই লেখাটি দেখে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি
হয়তো নতুন কিছুর সূচনা এনে দিতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের কবি সুবীর সরকারের গদ্যের মধ্যেও
এইরকম অতিমানস লক্ষিত এবং সুখকর। এরকম অনেকেই আছে যারা উত্তরাধুনিক সময়ে এসে অভিনব
প্রয়াস করে যাচ্ছেন। কবিতার ক্ষেত্রে তা অহরহ দেখতে পাই। আলোচনা-সমালোচনা যে যাই করুক
না কেন, বর্তমান সময়টাকে আগলে রাখতে না পারলে তাকে ভবিষ্যত মেনে নিতে পারবে না। এই
কথাটা বারবার বলি। কবিতার একটা ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে, সেটাকেই মূলত অতিমানস বা অবমানব
বলি। কবিতার এই ক্ষমতা দ্বারা পুরো সাহিত্য জগতকে একটা Structure —এ শীঘ্রই নিয়ে আসা যাবে। গদ্যের ক্ষেত্রে তা এসে গেছে। আমরা অনুভব করতে
পারছি বর্তমান কবিতা কতটা পরিপক্ক। যা কিনা অন্যান্য সাহিত্যকেও নিজের আঙ্গিকে প্রস্তুত
করছে । এই পর্যায়ক্রমটা খুব দরকার।
______________________&&&_____________________________
কবিতা ভাবনা:
“ক্ষ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে
পরশপাথর।”
কবিদের কেউ তৈরি করতে পারে
না বরং জন্ম থেকেই সে কবি হয়ে ওঠে! কবিতা কি? —এটা যেমন কাউকে
শেখানো যায় না, তেমনি হঠাৎ করে কেউ কবিও হতে পারে না। শিল্প চেতনা, সংস্কৃতি চেতনা
এবং কুসংস্কার মুক্ত না হলে এই পথে এগোনো যায় না। কবিকে সবসময় ঊর্ধ্বমুখী হতে হবে।
কবি হবে দক্ষিণামূর্তি। প্রেমে টইটুম্বর। কবি ইহজগতের সাধারণ জীব হলেও দূরদৃষ্টিসম্পন্নতার
কারণে আমরা তাকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছি। ইংরেজি প্রবাদে আছে Knowledge has
not Geography অর্থাৎ জ্ঞানের যেমন সীমারেখা নেই, ঠিক তেমনি একজন কবির কোন সীমাবদ্ধতা
নেই। তিনি মুক্ত স্বাধীন। তার কবিতা সর্বজনবিদিত। কবিতার অমরত্ব প্রজ্ঞার আবরণে যাকে
চিরায়ত করেছে— মহাকালের সন্ধিক্ষণ; সেই লক্ষ্যে ভাবুকের জন্মাবধি
সাধনা সকল মহাপ্রাণকে কবিতার জন্য চিরদিনের মত বুকে টেনে নেন। মহাত্মা তুলসীদাস বলেন,
“নিজ কবিও কেহি লাগ ন নীকা।/সরস হোউ অথবা অতি ফীকা।।/ জে পর ভনিতি সুনত হরষাহী।/ তে
বর পুরুষ বহুত জগ নাহী।।” অর্থাৎ, স্বরচিত সরস—নীরস কবিতা
সকলেরই ভালো বলেই মনে হয়। কিন্তু অপরের লেখা কবিতা শ্রবণ করে আনন্দ অনুভূতি লাভ করেন
এমন স্বজন ব্যক্তি তো জগতে বিরল।কবিতাকে হৃদয়ে ধারণ করা অপেক্ষা চলমান ক্রিয়া অব্যাহত
রাখা বড়ই কঠিন। কারণ তুলসীদাসের কথা অনুযায়ী আমরা কেউ কারো কবিতা পড়তে ভালোবাসি
না বরং তার বিরোধিতা করে বসি। বর্তমান সময়ে এইসব দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। না
জেনে মন্তব্য করাটাও আজ তেমন কোন ব্যাপার না— সেটা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। এভাবেই কবিতা হয়ে যায়
কোণঠাসা। প্রকৃত গুণী থাকলেও গুণীর অভাববোধ লক্ষ্য করি। যাতে করে কবিতা সর্বজনবিদিত
না হয়, সে চেষ্টা অনাদিকাল ধরে চলছে কিন্তু তাই বলে কবিতা একেবারেই ভেঙে পড়েনি বরং
প্রজন্মের কবিরা একেকটি ধারায় একে বিন্যাস করে চলেছেন। এখন আমাদের লক্ষ্য কবিতা সম্পর্কে
আমরা কী ভাবি? এবং কবিদের কি ভাবা উচিত বা অনুচিত সে সম্পর্কে আলোচনা করা যাবে। চৈতন্যবোধ
জাগ্রত করতে কবিতাকে কিভাবে কাজে লাগানো যায় পাঠকের দরবারে তা বন্দোবস্ত করতে হবে।
এমন কোন ফর্মুলার মাধ্যমে এগোতে হবে যাতে কবিসত্ত্বা এবং পাঠকসত্ত্বা নিভৃতকুঞ্জে জ্ঞানতৃষ্ণায়
তার অতিলৌকিক সত্ত্বাকে বোঝাতে পারবেন— সময়ের সুপরিকল্পিত আহ্বান।
উপরে উল্লেখিত চিত্রে যে
বিষয়টি বোঝানো হয়েছে তা একে একে আলোচনা করা যাক—
এই বিষয়টি একটি চক্রাকার
প্রক্রিয়া যার মধ্য দিয়ে কবিসত্ত্বার প্রকাশ। এই চক্রব্যূহের মধ্য থেকে কিভাবে রসতত্ত্বকে
বের করে এনে ছন্দবদ্ধ করা যাবে তার প্রক্রিয়া খুব সহজে পাঠক মননে আঁচ ফেলতে পারে।
এই চিত্রটি মহাজাগতিক ক্রিয়ার সাথে একাত্মতা বোধ প্রকাশ করে। এমন কোন সময় ছিল না,
যখন কবিতা ছিল না। কখনো সুপ্ত কখনো লুপ্ত এই ছিল চক্রব্যূহের মূল রহস্য। কিন্তু আমরা
যে সময়টাকে কাজে লাগাবো সেই সময়টা বড় জটিল এবং সহজ কিছুর সমন্বয়। প্রধানত দুইটি
বিষয়কে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, একটি ভাববার প্রয়াস অপরটি গতিশীলতা।
কবিতার রূপরেখাকে তৈরি করতে গেলে এই দুটি প্রয়োজনীয় বস্তু ছাড়া এগোতে পারবো না।
তাই এর উপরে ভিত্তি করে গঠিত হয়েছে অনাদিকালের চিরায়ত যতসব কল্পকাহিনীর সাম্রাজ্য।
শুধুমাত্র, কল্পকাহিনীই নয় বরং এর উপর ভিত্তি করে মানবসভ্যতা, শৃঙ্খলা, সহানুভূতি
ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এজন্য কাব্য সমীকরণে এই দুটি সূত্র সবচেয়ে বেশি প্রণিধানযোগ্য।
আর এই দুটি বস্তু থেকেই তৈরি হয় কবিসত্ত্বা, যা কল্পসৃষ্টিতে সক্ষম। যুগন্ধর চরিত্র
সৃষ্টিতে যুগান্তরকারী কল্পনার অতিপ্রয়াস এই ভাবনা থেকেই উৎকর্ষ হয়। এবং কবিসত্ত্বাকে
ব্যবহার করে প্রকৃতিগত কিছু নৈপুণ্যের আবহ
সৃষ্টি হয়, যেগুলো একেকটি আরেকটির সাথে দ্বিধা প্রকাশ করে না বরং একসঙ্গে সমস্ত
প্রক্রিয়াকে বস্তুগত চরিত্র সৃষ্টিতে অবদান রাখে। এ কারণেই মহাকাল অসম্ভব কিছুর সমন্বয়
ঘটিয়ে প্রকৃতির উদার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। যাতে চিন্তাশক্তির উৎকর্ষ হতে স্বাভাবিক
কল্পচিন্তার অতিমানসের অতীন্দ্রিয় ভাবধারার বিকাশ ঘটে। দুইটি সূত্রের পথ ধরে এই প্রক্রিয়াকে
চক্রাকারে আটটি সম্পর্কে জড়িত করা হয়েছে যার মূল কেন্দ্রে রয়েছে ছন্দ। যথাক্রমে:
শব্দচয়ন, কল্পনা, বহুমাত্রিকতা, ছন্দ, চিন্তা, সারল্য, উৎকর্ষ ও সাধনা। এই আটটি বস্তু
সমস্ত কাঠামোটিকে একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে উপস্থাপন করতে পারেন। আমরা ছন্দকে সবার মধ্যস্থানে
বা কেন্দ্রে উপস্থাপন করেছি কারণ এটি একটি চলমান স্পন্দন ক্রিয়া যা ভিতরের দুর্বল্যভাবকে অতীন্দ্রিয় সত্ত্বায় প্রকাশ
করতে পারে। যা থেকে অন্যান্য পারস্পরিক যারা আছেন তারা উৎকর্ষ লাভ করতে সক্ষম হন। এবং
অন্যান্যরা এখান থেকেই উপযুক্ত সৌকুমার্য গ্রহণ করে থাকবেন। ছন্দের সাথে এই সাতটি বস্তু
পারস্পরিক শত্রুতা রুখে দিয়ে মহাজাগতিক পরিকল্পনাকে মহাকালের ঊর্ধ্বতর স্থানে জায়গা
করে নিতে সমসাময়িক মহিমাকেও ছুড়ে ফেলে ভবিষ্যতের দ্বার গোড়ায় উপস্থাপিত হবেন। এ
যেন সূর্যকে কেন্দ্র করে সাতটি রশ্মির উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। সাতটি তারার মাঝে অসম্ভব
চন্দ্রের উল্লাস। এই অসম্ভব ক্রিয়ার চলমান সত্ত্বায় অবমানবের রূপবৈচিত্র্য রচনা হয়।
তার থেকেই কবিতার সাযুজ্য লাভ বা প্রয়াগসিদ্ধ হয়। এটা গেল কবিতা রচনার সংক্ষিপ্ত
উদাহরণ। কিন্তু পাঠকের কাছে হাজির করতে হলে আরো কিছু উপাচার দরকার যা পাঠককে অবমানবের
কাছে নিয়ে চলে। এর মধ্যে কিছু অভ্যন্তরীণ বিষয়ও লক্ষ্য করা যায়। পাঠক এবং কবির
দূরত্ব নির্ণায়ক গতিসূত্রকে সমতলে আশ্রয় দেবার মত দুই-একটি কথা হয়তো পাঠকের মনে
ঠাঁয় পায় কিন্তু গভীর বিশ্লেষণ ও কথার গাম্ভীর্যতায় পাঠক নিজেকে কন্ট্রোলে নিতে
খানিকটা বেহুঁশ হয়ে যায়। অতঃপর বোধ আসে, জানতে হবে, পড়তে হবে। এক জীবনে যেহেতু,
পৃথিবীর সব কাব্য পড়ে ফেলা যায় না কিন্তু ধী-শক্তির মাধ্যমে কিছু কিছু কাব্য সাহিত্যকে
মননে স্থান দিতে যাতে সংকোচ বোধ না করি— একথা পাঠক এবং কবির চিরকালের জন্য প্রযোজ্য। কবিতা
নামক পরশপাথর খুঁজতে আমরা বের হয়েছি; কবিতা ভাবনা সেই রহস্যমেদুর কল্পজগতের ভাবনা
বিলাস নিয়ে মহাকালের সন্ধিক্ষণে সার্থক চরিত্র সৃষ্টিতে আজীবনের সমগ্র মানবসত্ত্বাকে
কল্পজগতে রূপায়িত করে। কবিতা ভাবনা সেই সার্থক রচনার দিকে তার প্রবাহিত ডালপালা
ছেড়ে দেবেন। তাহলে চলুন জেনে আসা যাক চিন্তাচক্রের অভিনব প্রয়াসের কথা।
১. ভাববার প্রয়াস: এই চক্রব্যূহের
প্রথম সূত্র হচ্ছে ভাববার প্রয়াস। কবি তার ভাবনাকে কিরূপে মানসক্ষেত্রে চিন্তা করবেন
এবং কোথায় সেটা স্থাপন করবেন, সে বিষয়ে আগে তৎপর হতে হবে। সৎ ও অসৎ প্রবৃত্তি কবিতার
ইন্দ্রজালকে ভেঙে ফেলতে দু’একটি অপ্রীতিকর সরল চিন্তায় যথেষ্ট। মেঘদূতের কবি যখন ভাবছেন
রামগিরি থেকে মেঘ উড়ে যাচ্ছে বিদিশা নামক রাজধানীতে সেখানে পাহাড়ের নীচে ঝরনা ধারার
মতো বয়ে যাবে বৃষ্টির জল যেন কেউ শুয়ে আছেন সমুদ্রের উত্তাল যৌবনে কিংবা আধুনিক কালের
জীবনানন্দ হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে পথ হাঁটছেন —এই আশায় যে
বনলতা সেন কখন এসে বলবেন, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ —এই প্রসঙ্গগুলো
একজন কবির ভেতর যখন কাজ করে তখন তার ভাববার জগত জুড়ে অতিমানস কাজ করেন। তাই প্রথমে
আমরা ভাববার প্রয়াসকে ব্যক্ত করেছি যাতে কালের সত্যকে মননে স্থানে দেওয়া যায়। কবিতার
ক্ষেত্রে সব ভাবনায় যথেষ্ট নয়! শাশ্বত চরিত্র অঙ্কন করতে গেলে অসৎ প্রবৃত্তিকে নিবৃত্তির
দিকে নিয়ে যাওয়া দুঃসাধ্য; তবুও কবিতায় নিম্নস্তরের চরিত্রকে উচ্চ স্তরের চরিত্রের
সঙ্গে উপযোগ সৃষ্টি করে কবি সৎ উদ্দেশ্যে তার আদর্শকে ব্যক্ত করেন; এ অবস্থায় সৎ চরিত্র
সৃষ্টিতে গুণগত মান দরকার। ব্যবহার এবং উপযোগী এই দুটি শব্দকে ঠিক ঠিক জায়গায় কার্যকরী
করে তুলতে পারলে উপর্যুক্ত ভাবনাকে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেওয়া সম্ভব। রসশাস্ত্রের
পণ্ডিতগণ এইভাবকে নয়টি ভাগে বিভক্ত করেছেন, শৃঙ্গার ভাব, হাস্যভাব, করুণভাব, রৌদ্র
ভাব, বীরভাব, ভয়ানক ভাব, বীভৎসৎ ভাব, অদ্ভুত ভাব এবং শান্ত ভাব। তারা বলছেন, এই নয়টি
ভাব ছাড়াও আরো বহুভাবের উদ্ভব পাওয়া যায় কিন্তু তার মধ্যে এই নয়টি ভাব সর্বজনগ্রাহ্য।
মনে করা হয়, রসতত্ত্বের পণ্ডিতরা তেত্রিশটি ভাবের কথা বলে গেছেন, তাছাড়াও অনেক ভাব
ব্যঞ্জনা আছে। এই বহুমাত্রিকতার যুগে কখন কোন ভাবকে কোথায় কাজে লাগাতে হবে, —এটি পাঠককে উপযুক্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। কবি সেই ভাবের ব্যঞ্জনার
দ্বারা পাঠকের হৃদয়ে অমৃতলোকের সুখানুভূতি এনে দেবেন। এই নয়টি স্থায়ী ভাবকে সাধনার
ক্ষেত্রে একান্ত প্রয়োজন। কবিরা সেদিকে লক্ষ্য রেখে চলবেন এটাই আশা করি। কবিতায় প্রয়োজনীয়
বস্তুসমগ্র অথবা নিরবিচ্ছিন্ন নির্গুন শক্তিকে
সামর্থ্যে পরিণত করবার অতিপ্রয়াস— ভাবনার জগতকে ঘিরে কল্পশক্তির বিকাশ ঘটায়। কবিতার
নবজীবনের প্রথম পর্যায়ে যদি ভুলবশত দিকনির্দেশনা অন্য কোথাও সংক্রমিত হয় তাহলে যাচিত
সুফল পাওয়া যায় না। আমি কি ভাবছি? কেন ভাবছি? —এ বিষয়টি
আগে পরিষ্কার করে নিয়ে তারপর কবিতার আসরে প্রবেশ করা উচিত। কারণ কবিতা সম্পর্কিত সমস্ত
কিছুর নির্ভরতা আপনার ভাবনাকে লক্ষ্য করেই পুনর্জাগরণ সম্ভবপর হয়। তাই এ বিষয়টি এড়িয়ে
গিয়ে কবিতাকে শুধুমাত্র শব্দের খাতিরে জীর্ণ করে তুললে পাঠক সমাজের কাছে অনর্থক বৈ
অন্য কিছু আশা করা যায় না। Informational technology —এর যুগে ভাবনার চিন্তা যখন যুক্ত হয়েছে যন্ত্রের সাথে তখন অনাদিকালের
মানুষিক তন্ত্র হীনমন্যতায় ভুগতে পারে বলেও মনে হয়। বর্তমানে কবিতা লিখতে যন্ত্রের
সাহায্য নিলেই ঝটপট হয়ে যায় কিন্তু এর কোন সুফল লক্ষ্য করা যায় না। একদিকে যেমন
ক্ষতির আশঙ্কা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে কবিতার হাড়গোড় দুর্বল হয়ে যাচ্ছে— উপযুক্ত ভাবনার জগত সৃষ্টি না হওয়ার জন্য। হেমন্তের কবিরা পলাশ কিংবা
শিমুল ফুলের বর্ণনা দিয়েই যেমন ক্ষান্ত হন; আমি ঠিক তেমন চাই না, আরো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন
অতিলৌকিক ভাবধারার বিকাশ চাই। এর জন্য কঠিন সাধনা করতে হলেও কবিকে করতে হবে। কবিতার দেহকে মসৃণ এবং সুস্থির পরিকল্পনার আবরণে
গতানুগতিক দৃষ্টি রেখে পরিশুদ্ধ জগত সৃষ্টি করা। এটি ভাবনার গভীরতা সৃষ্টি করে।
২. গতিশীলতা: আবহমান কাল ধরেই চিরায়ত সত্যকে লালন করে সূচিশুদ্ধ
ভাবধারার বিকাশ কবিদের হাত ধরে হয়েছে। প্রধান কারণ হচ্ছে গতিশীলতা। কোন বস্তু চলমান
ক্রিয়ার মধ্যে না থাকলে তা ভবিষ্যতে জীর্ণতা প্রাপ্ত হয় মাত্র। কবিতার গূঢ় সত্যকে
ভবিষ্যতের কাছে মেলে ধরতে গতিশীলতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কল্পশক্তির উদার আহ্বান
প্রত্যেক কবির কাছ থেকে ভবিতব্য আশা করে। এজন্য কখনো কখনো কবিতা সুপ্ত আবার কখনো কখনো
লুপ্ত আকার ধারণ করলেও সময়ের বিবর্তনে কবিতার আনুষ্ঠানিকতা বিস্তৃত এবং মসৃণ হয়েছে।
আধুনিককালের গণ্ডি পেরিয়েও নতুন রূপে কবিতাকে বরণ করে নেওয়ার উদ্যোগ কবি সমাজের
একান্ত লক্ষ্য হলেও গতিশীলতা কোথায় নিয়ে গিয়ে কবিতার সারবস্তু ব্যক্ত করবে —এটা মহাকাল বলে দেবেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘‘কবিতার বিশেষত্ব হচ্ছে তার
গতিশীলতা, এই গতির শেষ নেই।’’ আমরা বারবার একটা কথা বলেছি যে কবিতার পথ রুদ্ধ হয় না,
কবিতা তার আপন মহিমায় মহিমান্বিত! কবিতার স্বরূপ সন্ধানী লোকেরা এই নিগূঢ় সত্যকে
কালে কালে আবিষ্কার করে চলেছেন। তার গতিমাত্রাকে যিনি সংবেদনশীলতার মধ্যে রূপায়ণ করেছেন— তিনি পরবর্তীকালে কবিতার শ্রেষ্ঠত্বকে বিচার করবেন। বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন,
“জয়দেবের কবিতা, উৎফুল্লকমলজালশোভিত, বিহঙ্গমাকুল, স্বচ্ছ বারিবিশিষ্ট সুন্দর সরোবর;
বিদ্যাপতির কবিতা দুরগামিনী বেগবতি তরঙ্গসঙ্কুলা নদী। জয়দেবের কবিতা স্বর্ণহার, বিদ্যাপতির
কবিতা সরদ্রাক্ষমালা। জয় দেবের গান, মূরজবীণাসঙ্গিনী, স্ত্রীকন্ঠগীতি; বিদ্যাপতির
গান, সায়াহ্নসমীরণের নিঃশ্বাস।” এই যে বিচার করার ক্ষমতা এটি কোত্থেকে এলো? কবিকে
যখন প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয় সময়ের হাতে তখন কবিতার সৌন্দর্যের সাথে সাথে অনির্বাণ প্রয়াসও
পাঠকের হৃদয়ানুভূতিকে ভাবাতে শেখায়। কবিতা যখন তার সমকালীনতাকে পেরিয়ে গেছে তখন
আর আমাদের নতুন করে ভাবতে হয় না। সমকাল পেরিয়ে কবিতায় বিচারালয়ে শূচিসুদ্ধ পাঠক
প্রজ্ঞার দ্বারা কবিতাকে মহাকাশে স্থাপন করবেন।
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কবিতাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবেন, তার দেহকে ক্ষতবিক্ষত করবেন, গুনগ্রাহীতার
অপরিসীম সমুদ্রে ফেলে মুক্তা তুলে আনবেন। এই সৎ সাহস প্রত্যেকটি কালে ছিল বলেই কবি তার সৃজনশীলসত্ত্বাকে জ্বলন্ত পিন্ডির মধ্যে রেখেও স্বপ্ন দেখেছেন নতুন
কিছুর সম্ভাবনার। রবীন্দ্রনাথ চালক কবিতায় বলেছেন,
“অদৃষ্টেরে সুধালেম, চিরদিন
পিছে
অমোঘ নিষ্ঠুর বলে কে মোরে ঠেলিছে?
সে কহিল, ফিরে দেখো। দেখিলাম থামি,
সম্মুখে ফেলিতে মোরে পশ্চাতের
আমি—”
কবিতাটির অমোঘ সত্যকে অস্বীকার
করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। জীবনের শৃঙ্খল পায়ে দিয়ে জীবনকে উপভোগ করে যাচ্ছি অনবরত।
এই চলমান ক্রিয়া যতক্ষণ স্নায়ুতন্ত্রের সাহায্য গ্রহণ করছে ততক্ষণ জীবিত সত্ত্বার
উৎকর্ষ লাভ করছে। আর যখন স্নায়ুতন্ত্র দুর্বল মস্তিষ্কের শিকার হচ্ছে তখন নিভন্ত চুল্লির
মতো নিমিষে শেষ হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ গতিশীলতাকে রক্ষা করা গেল না। রবীন্দ্রনাথ আমাদেরকে
বলতে চাচ্ছেন, তুমি তোমাকেই ব্যবহার কর গতিশীলতা রক্ষা করতে। কারণ সম্মুখ পদাবলীর যুদ্ধে
একমাত্র বিবেকবোধ জাগ্রত না থাকলে সৃষ্টিকে ভোগ করা অসম্ভব। একেকটি শব্দ খন্ড খন্ড
জীবনের পরিণাম। শব্দকে রথ করেই বাক্যের গতিশীলতা ছন্দের অনুকম্পার মধ্য দিয়ে সংগঠিত
হবে। ঐশ্বর্যের ভাবগাম্ভীর্যের সরলরেখা ধরে চিত্তশুদ্ধির মোহ এই ধ্রুব সত্যকে বরণ করে
নেবে। যতক্ষণ কবিতার রস আস্বাদনের উপায় কবির গতিশীলতাকে প্রখর না করছে ততক্ষণ কবিতার
শরীররক্ষা সাধনাসাপেক্ষ। কারণ ভবিতব্য কবিতার সৃজনশীলতাকে উত্তম মর্যাদা দিতে উৎসুক।
কিন্তু কালপ্রবাহে সময়কে পরাভূত না করতে পারলে, কবিতা স্বয়ংসিদ্ধ হয় না।
এ তো গেল দুটি মূলসূত্রের
সদ্ব্যবহার। এই পথ ধরে সৃজনশীলতার পথে এগোনোর দরজা খুলে যায়। উর্বর সাহিত্য সৃষ্টিতে
সবচেয়ে নির্ভরশীল সূত্রগুলো এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাঠক মাত্রই আদর্শগত দিক থেকে
সমস্তটা গ্রহণ করবেন আর যা ব্যতিক্রমী মনে হবে তা প্রাজ্ঞ মননের দিক থেকে বিচারের
মাধ্যমে গ্রহণ করবেন। আদর্শ, নৈতিকতা, সামাজিকতা এবং সরলতা এই কয়েকটি বিষয় সুষম সাহিত্য
সৃষ্টিতে সহায়তা করে। বহুমুখী কবিতার যুগে নতুন ভাবনার উন্মেষ ঘটানোর আগে শব্দশৈলীর
মুক্তচিন্তা শৈল্পিক বিন্যাসে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে গেলে— আমি মনে করি, এই কয়েকটি ভাবনার সম্মেলন আপনার কল্পিত চরিত্র সৃষ্টিতে
সবচেয়ে বেশি যোগান দেবে। যদিও আমরা এখনো চক্রাকার বেষ্টনীতে আবদ্ধ হয়নি, তবুও প্রত্যেকটি
কাজ শুরু করার আগে কাজের ধারাবাহিক নমুনা জানতে পারলে পাঠক নিশ্চিত হন যে পরবর্তী সম্ভাবনা
সম্পর্কে কতটুকু আভাস পাওয়া যাবে। সে কথা হয়তো আপনারা পূর্বেই বুঝতে পেরেছেন।
কিন্তু সবকিছু অল্পতেই হয়তো
শেষ হয় না। বারংবার চিন্তার জগতে নতুন কিছুর সম্ভাবনা আপনার চিন্তাকে নির্দিষ্ট পয়েন্টে
নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায়। স্বভাবতই, বর্তমান আকাশে প্রচন্ড মেঘ ছুটে বেড়াচ্ছে এবং
তীব্র বাতাস ও মেঘে মেঘে ঘনীভূত হচ্ছে বৃষ্টির রূপরেখা। যা পরবর্তীতে প্রকৃতিগতভাবেই
তাণ্ডব শেষে সৃষ্টিশীল মহিমায় উদ্ভাসিত হবে। খাল-বিল একাকার হয়ে যাবে। কবি এই সূত্র
ধরে তার কবিতার সৃষ্টিশীল সৃজনশীলতার লক্ষ্যে —মেঘ জিনিসটিকে
অন্যভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। যা এই সূত্রকেও হার মানাবে সময়ের বিবর্তনে। হয়তো দেখা
যাবে কেউ মেঘের উদাহরণ দিচ্ছে কিন্তু ঘটনাটা ঘটছে ভিন্ন রকম যার সঙ্গে মেঘের কোন সম্পর্কই
নেই। যেমন উদাহরণস্বরূপ আমার লেখা “যানজট” কবিতাটি দিচ্ছি:
“মহাকাশে যানজট নিরসনে
এইসব প্রস্তুতি
কবিতার মায়াজাল
ব্লেডের সুদারুণ কাটিংয়ে
মেঘবতি সুনয়না
গতরাতে অণিমাকে
পৃথিবী থেকে যেন বিদায়ের
কথা বলে
যানজট নিরসনে শিথিলতা দেখিয়েছে
ফাঁকা মাঠ ছাড়া আর হৃদিতাকে
মহাকাশে যেতে হবে না—
কবিতাকে কথা দেয়া সম্ভব”
কবিতাটিতে যানজটের কথা তুলে
ধরে আত্মহননের চেষ্টাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। প্রথমে অনেকেরই যানজট কথাটি শুনে মনের
মধ্যে অন্য কিছুর ভাবনা নিশ্চয়ই চলে আসবে কিন্তু কবি সেই ভাবনাকে উপেক্ষা করে নতুন
মাত্রায় শব্দশৈলীর মাধ্যমে সৃজনশীল সত্ত্বার প্রকাশ করেন। এই গুণটি বর্তমান কবি কিংবা
সাহিত্যিকের না থাকলে ব্যতিক্রম সাহিত্য সৃষ্টিতে আমরা অনেকটা পিছিয়ে পড়বো। উত্তরাধুনিক
সাহিত্যে এই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তাই চিন্তাসূত্রের খেরোখাতা খুলে উপস্থাপনের
ভঙ্গিমাকে নানারূপ ব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত করাতে হবে। সেই ব্যঞ্জনার উৎকৃষ্ট গুলো ধীরে
ধীরে ব্যক্ত করতেই আপনাদের সামনে কথার ফুলঝুড়ি নিয়ে সেই মহাকালের পথে চেয়ে আছি।
মহাকাল আমাকে পাঠিয়েছে সৌন্দর্যের রূপকথার পৃথিবীতে প্রত্যেক পাঠককে সুষম শব্দে পরিপূর্ণ
করে তুলতে— যাতে প্রাণের স্পন্দন সময়ের কলতানে আনন্দবিহ্বল চিত্তকে
গ্রাস করতে না পারে।
_______________________________
ধরা গেল, ভাববার প্রয়াস
ও গতিশীলতা দুই আপনার মাঝে বিরাজমান— তাহলেই কি আপনি কবিতা লিখতে পারবেন? না, কবিতা সৃষ্টির
সরঞ্জামকে এক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে। এজন্য দরকার খুব সুচিন্তিত মস্তিষ্ক। মহাকালের
অদৃষ্টে যে ধারাটি বোধগম্যতা সৃষ্টিতে সক্ষম এবং পরিশীলিত রূপ ও বৈচিত্রের উৎকর্ষ সাধনে
সৎ-অসৎ বস্তুনিষ্ঠ কাঠামোর ব্যবহারিক জটিলতাকে উপেক্ষা করে; সৃষ্টিশীল পরিবেশ সৃষ্টি
করে ও একই সাথে কবি এই অষ্টমার্গকে অর্থাৎ শব্দচয়ন, কল্পনা, বহুমাত্রিকতা, ছন্দ, চিন্তা,
সারল্য, উৎকর্ষ ও সাধনাকে সুসংবদ্ধভাবে কল্পনার পরিধিতে উন্মেষের সম্মেলন ঘটায়।
শব্দচয়ন: উপযুক্ত শব্দকে বেছে নেওয়া। এটি আগে ঠিক করতে
হবে যে উপযুক্ত শব্দ কোনটি? কোন শব্দটি কোন জায়গায় ব্যবহার করা যাবে এবং কিভাবে ব্যবহার করা যাবে? ব্যবহারের ক্ষমতা
- দক্ষতা ও উপকরণ প্রণালীর উপর ভিত্তি করে—এ সম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। শব্দকে দুইভাবে ব্যবহার করতে পারি, এক প্রত্যক্ষভাবে
এবং দুই পরোক্ষভাবে। প্রত্যক্ষ অর্থাৎ শব্দকে সরাসরি ব্যবহার করা বা বাক্যের তন্ত্রীলয়ে
আন্দোলিত উপাদানের সঙ্গে বাইরের পরিবেশগত ধারার সাথে একাত্মবোধ প্রকাশ করা। শব্দকে
বাক্য ও ধ্বনির সাহায্যে সাধকগণ উচ্চ স্তরে নিয়ে চলেন। বাক্য ও ধ্বনির স্বয়ংক্রিয়
অবস্থায় যা দৃষ্টিগোচর হয় এবং অতিভাবনাকে এড়িয়ে চলেন তাকে প্রত্যক্ষ শব্দচয়ন বলা
চলে। অপরদিকে ধ্বনিতন্ত্রের উৎকর্ষ সাধনে অতীন্দ্রিয় সত্ত্বার মহামিলনের ক্ষেত্রেকে
বাক্য এবং ধ্বনি দুই মহাশক্তির সম্মিলিত গতিকে আবছা ছায়ার সাথে তুলনা করে অনুভূতির
জগতকে বিস্তৃত রূপদানকারী পরোক্ষ শব্দচয়ন। উদাহরণস্বরূপ: ভারতবর্ষের সাধকগণ শব্দব্রহ্মের
সাধনা করতেন কিন্তু কেউই এই শব্দের অর্থ রূপবৈচিত্র্য সম্পর্কে জ্ঞাত নন! তাই শব্দকে
তারা নতুন করে জীবন দান করেছেন, কল্পনার বহির্জগতে রূপবৈচিত্র্যের সন্ধান করে। তাই
আমরা তাদের ঋষি বলে থাকি। প্রতিটি কবিতা কোন না কোন ঋষির সৃষ্টি যিনি লৌকিক ও অলৌকিক
সৃষ্টিতে আপনার সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন। কল্পসূত্রে বেঁধে দিয়েছেন, প্রতিটি শব্দের
এক একটি রূপ ও রূপের মহিমা। যে শব্দটি কবিতার জৌলুস ফিরে আনেন নতুন নতুন শব্দ কল্পের
প্রেষণার বিচিত্রতা তৈরি করে গেঁথে ফেলেন রত্নহার— সেই সম্ভাবনার
দুয়ার খুলে কবিকে আসতে হয় সূর্যালোকে।
কল্পনা: হচ্ছে অমিত নিষ্ক্রিয় শক্তির রূপময় প্রকাশ। ভাবনার
পরিধিকে ঘিরে একটা চিত্রকল্পের আনুষ্ঠানিক মত প্রকাশ। যা চেতনার বর্হিবিশ্ব জুড়ে পুনর্জাগরণ
শক্তিকে উত্তপ্ত করে— সম্ভবনাকে জাগিয়ে তোলে। উদ্ভাবনী নৈপুণ্যের যথার্থ
ভাব প্রকাশ এর মাধ্যমেই সম্পূর্ণ হয়। এটি মূলত, কাঠামোটিকে দীর্ঘ চিন্তার আবরণে একটি
চিরকালীন রূপ দেওয়া। ভাবনার জগৎ ঘিরে শব্দকল্পের নিষ্ক্রিয় অবস্থাকে বর্হিসূত্রে
রূপময় সত্ত্বার বিকাশের যে অবকাঠামো বাগ্মীগণ রচনা করেন তাঁর মাধ্যমেই কবিতার নৈপুণ্য
গড়ে ওঠে! এবং দৃশ্য থেকে দৃশান্তরে যাওয়ার অভিনব প্রকাশ কল্পনা সূত্রের দীর্ঘ প্রচেষ্টা।
কল্পনা শব্দটিকে মনোবিজ্ঞানীরা
বলেন, পুনর্গঠন করা বা গঠনমূলক রূপ দান করা। এটি দুইভাবে সম্পন্ন হতে পারে, স্বেচ্ছা
ভিত্তিক স্বাভাবিক কল্পনা ও স্বতঃস্ফূর্ত বিরোধী কল্পনা।
প্রথমত, স্বেচ্ছা ভিত্তিক
স্বাভাবিক কল্পনা হলো, যা স্ব-জ্ঞানে রূপময় সত্তার বৈচিত্র্যময় চরিত্র সৃষ্টিতে বস্তু
সমূহের চিন্তা করা বা কল্পনা করা। এরকম দৃশ্যকল্প
ভাববার প্রয়াসকে স্বেচ্ছা ভিত্তিক স্বাভাবিক কল্পনা বলে। এরকম কর্মকাণ্ডকে মনোবিজ্ঞানীরা
বলে থাকেন, মানসিক সমন্বয়। কারণ মানসক্ষেত্রের অভিনব কায়দায় মানসিক সত্বকে ব্যক্তি
সত্ত্বায় রূপান্তর করে ইচ্ছামত রূপ দান করা যায়। যা ব্যক্তির অতীন্দ্রিয় সত্ত্বার
বহুমুখী দৃশ্যমান চারিত্রিক ভিত্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
দ্বিতীয়ত, চৈতন্যহীন যে
কল্পনা মানসক্ষেত্রে সংগঠিত হয়, সেটিই স্বতঃস্ফূর্ত বিরোধী কল্পনা। বোধশক্তির পুনর্দয়
না হলে মৌলিক চিন্তার অবকাঠামো গড়ে ওঠে না। প্রত্যেকটি চিন্তা স্ব স্ব ভাবনার অতিপ্রয়াসকারী
স্বত্ত্বার কল্পিত উপাদান। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে সব কল্পনা ব্যক্তি স্বতন্ত্রের
উপর প্রতিষ্ঠিত নয়! কারণ যখন কেউ ঘুমের মধ্যে থাকেন এবং স্বপ্নে কল্পনার জগত সৃষ্টি
করেন ও মনোময় জগতের বিচার করার ক্ষমতা হ্রাস পায়— তবুও কল্পিত
চলমান প্রক্রিয়া সংঘটিত হতে থাকে নিজের অজান্তে তাকে স্বতঃস্ফূর্ত বিরোধী কল্পনা বলা
হয়।
এই দুটি কল্পনা মনের দৃষ্টিতেই
সংগঠিত হয়। রূপকথার জগৎ জুড়ে যে দৃশ্যমান পটভূমিকা রচিত হয় তা কল্পনার দৃষ্টিতেই
হয়ে থাকে। কবি যখন তাঁর কল্পিত উপাদান দ্বারা মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করেন এবং
অনুকরণ/অনুসরণের মাধ্যমে কবিতার পাঠকবৃন্দ নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। তখন তাঁর কাছে কল্পনা
ও বাস্তবতা দুইই এক বস্তুুতে ধরা দেয়। এই ধরা দেওয়ার ব্যাপারটা মোটেও সহজ ব্যাপার
না, চিরকালীন সাধনার কিঞ্চিৎ ফল মাত্র।
রূপকল্প কবির কাছে একরকম
হতে পারে এবং সাধারণের কাছে আর একরকম হতে পারে। কারণ কবি যে অর্থে শব্দের দ্যোতনা
সৃষ্টি করে, সেই অর্থে সৃষ্টিকল্পের ব্যঞ্জনাকে উৎকৃষ্ট করে তোলে— যা পাঠকের হৃদয়ে ঝনঝন করে বাজে তা যে কোন অবস্থাতেও; তার পরেও পাঠক বা
সাধারণেরা শব্দকে সেই অর্থে গ্রহণ না করে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ যুক্ত করে। সেজন্য সাধারণেরা
উৎকৃষ্ট ফসলের গ্রহণযোগ্যতা নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণ করে। আর যখন কবির কবিত্বময়
ও কল্পকাহিনী নির্ভর ব্যঞ্জনা দ্বারা কোন চিত্র ভেসে ওঠে তা অস্বাভাবিকভাবেই হয়ে থাকে— এই ধরনের অদ্ভুত প্রাণশক্তি কবিতার ক্ষেত্রে ঘটে। তাই কবিতার কল্পনার
উৎকর্ষ শুধুমাত্র কল্পনার বৈচিত্রেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি নানা প্রক্রিয়ার সুফল মাত্র।
কবি যখন অবচেতন মনের সম্ভাবনার কথা বলেন, তখন তিনি স্বাভাবিক মানুষ নন! কবিকে হতে হয়
অস্বাভাবিক এবং দৃষ্টিপ্রতিদ্বন্দ্বী।
এই কল্পনাকে আবারও দুই ভাগে
ভাগ করা যায়— মানবিক কল্পনা ও যান্ত্রিক কল্পনা। আধুনিকায়নতন্ত্রে
যখন বিশ্ব চলছে তখন কল্পনা সূত্রও নতুন মোড় নিয়েছে। এর জন্য চর্বিত-চর্বন ভাবনার
আর প্রয়োজন হয় না, যান্ত্রিক কল্পনার সাহায্য নিলেই তা দ্রুত হয়ে থাকে। আমরা যত
আধুনিকায়নতন্ত্রে পা রাখছি ততই আয়ু-ক্ষয়রোগ ভারি হয়ে উঠেছে। মানুষের সৃজনশীল চিন্তাকে
নিয়ে ছেলে খেলা হচ্ছে, এর জন্য মানুষেই দায়ী। চিন্তাকেও হাতেনাতে বাঁধা যায় তার
প্রমাণ হচ্ছে আধুনিকায়নতন্ত্র। তবে এও জেনে রাখা ভালো যে, যার প্রয়োজন যেখানে তাকে
সেখানে লাগানো উচিত। কারণ সেখানেই তার প্রয়াগসিদ্ধ হবে।
প্রথমত, মানবিক কল্পনার বিষয়গুলো
যা মানবসৃষ্ট অতি-লৌকিক ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ। এই বিষয়গুলো প্রথম দিকেই আমরা আলোচনা করে
এসেছি, তারপরেও এই সূত্রটিকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ হচ্ছে আধুনিকায়নতন্ত্র। দেখা
শোনা ও অনুভবের সৃষ্টিকে আমরা অস্বীকার করতে পারিনা। মানুষের কার্যকলাপ দিন দিন অধঃপাতে
যাচ্ছে কি না তা নিয়ে পাঠকবৃন্দ নিশ্চয়ই যথেষ্ট জানেন। আমরা জানি, অবচেতন মনের সাহায্য
নিয়ে মানবিক কল্পনার সৃষ্টিকল্প রচনা হয়। কিন্তু এই অভিযানটা কবি ও কবিতার জন্য মোটেও
সহজ ব্যাপার না, সাধারণদের দৃষ্টিগোচর এড়িয়ে নতুন ভাবনাকে আয়ুষ্মান করে তোলা— এটি কবি সত্ত্বার দারুণ প্রকাশ। মানবিক কার্যাবলীতে কল্পনার বহিঃসূত্র
রচনা করে অমৃতের স্বপ্ন দেখা কবির পক্ষে অস্বাভাবিক কিছু নয়। সত্য এবং অসত্যের সংমিশ্রণে
রূপকথার শিরোনামে বাস্তবতার রূপরেখা তৈরীর অভিনব কারিগর কবি। কিন্তু যখন এই কথাগুলি
অবহেলিত বা আপেক্ষিক কথা অর্থে প্রকাশিত হয় তখন কল্পনার বা চিন্তাশক্তির জগৎজুড়ে
বিন্দু পরিমাণ আশা জাগানিয়া ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু মানবিক কল্পনা এই গুলিকে
বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম। মানুষের চিন্তার ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক বৈচিত্রতার সামঞ্জস্য থাকে— যার মাধ্যমে অণিমা ও লঘিমার গুরুত্বকে অতিলৌকিক করে তোলা যায়। অযোগ্য
বস্তুকেও যোগ্যবস্তুতে রূপান্তর করে শ্রেণী ব্যবধানের ভিত্তিতে ঊর্ধ্বমুখী ভাবের দোদুল্যমান
অবস্থায় পৌঁছে— মানসিক স্বভাবগত যেকোনো কল্পনা সূত্রের চিন্তা করা
যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, যান্ত্রিক কল্পনা
মূলত অন্তর্জাল ভিত্তিক একটি বৃহৎ ভাবের সমাবেশ। আজকের যুগে এআই, চ্যাট জিপিটি, এক্স
ইত্যাদির মাধ্যমে নতুন নতুন কল্পনার সৃষ্টি করা যায়। যেটি যান্ত্রিক পদ্ধতিতে সম্পন্ন
হয়। এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ভয়াবহ এবং কিছু ক্ষেত্রে আমাদের উপকারী বটে। এ আই বা চ্যাট
জিপিটিকে আমরা যখন যা ভাবতে বলতেছি তা মানুষের মস্তিষ্কের চেয়ে খুব দ্রুত করে দিচ্ছে— তাতে করে মানুষ তার চিন্তাশক্তিকে অকার্যকর বলে ঘোষণা করছে। দূর্বলতা
যখন জেঁকে বসেছে তখন অন্তর্জাল ভিত্তিক প্রক্রিয়াগুলো সতেজ মানুষের মতো কাজ করছে।
এক্ষেত্রে সুষম সৃষ্টিকে এড়িয়ে অতিরঞ্জিত বিষয়বহির্ভূত কল্পকাহিনীর সৃষ্টি হচ্ছে,
যা আমাদের মনের খোরাক মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। এবং চিরকালীন ভাবনার সাথে একাত্ম প্রকাশ
করে না। এরকম কল্পনা আমাদের ক্ষতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু আমরা তা ছাড়তে
চাইলেও ছাড়তে পারছিনা? তার কারণ হচ্ছে প্রযুক্তির প্রতি আমাদের মনোবলের দুর্বলতা প্রকাশ।
তবে এর মাধ্যমে কিছু কিছু অস্থায়ী সমাধান সম্পূর্ণ করা যেতে পারে। তা হতে পারে সৃজনশীল
অথবা উৎকৃষ্ট রকমের কিছু কার্যাবলীর স্বয়ংক্রিয় সমাধান। হঠাৎ করেই, অন্তর্জালে সংরক্ষিত
কিছু স্মৃতি মুছে গেলে বা ধোঁয়াশার মধ্যে থেকে গেলে, পুনরায় তা গ্রহণযোগ্য করতে অন্তর্জাল
থেকে রিকভার করতে পারি এবং প্রাসঙ্গিক ধারণা ও তথ্য সংগ্রহের জন্য এটি হতে পারে চিন্তাসূত্রের
কার্যকর প্রক্রিয়া। সেটি হতে পারে যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধ। যা প্রজ্ঞার মাধ্যমে
বিচার বিশ্লেষণের দ্বারা সঙ্গত এবং অসঙ্গত জায়গাগুলির বিবেচনা ভিত্তিক গ্রহণ করা।
তবে যান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ হতে দিন এবং আপনার মস্তিষ্কগত চিন্তাকে প্রসিদ্ধ
করুন।
আমরা চাচ্ছি কল্পসূত্রের
বিস্তার ঘটানো তা যেকোনো প্রক্রিয়ায় সংগঠিত হতে পারে। এক্ষেত্রে সুষম কল্পনাই যথেষ্ট!
চর্বিত-চর্বন ভাবনা পুরো স্ট্রাকচারকে নষ্ট করে দেয়। কেবলমাত্র, প্রতিশ্রুতি ভিত্তিক
কল্পনা ঠিক লক্ষ্যে নিয়ে যেতে সক্ষম। এর দ্বারা পূর্বাপর অসঙ্গতিগুলোর অবস্থান সম্পর্কে
জ্ঞাত হওয়া যাবে। স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন বলেন, “কল্পনা জ্ঞানের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
জ্ঞান সীমাবদ্ধ, কল্পনা সারা বিশ্ব ঘিরে।” এই কল্পনা যখন অস্বাভাবিকভাবে মানুষকে চালনা
করতে শেখায় তখন কিছু লোক সৃষ্টিকারীকে পাগল বলে সম্বোধন করেন। কোন কোন ক্ষেত্রে এরকম
ব্যক্তিকে নির্বাসনের মতো ব্যবস্থা করে দেন। এরকমটা তখনই হয় যখন মানুষ তার আত্ম-উপলব্ধি
পথে হাঁটেন এবং নতুন করে নিজেকে জানার প্রয়াস করেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষ স্বভাবতই
পাগল হয়ে যায়। এটি তীব্র কল্পশক্তির মৌলিক প্রভাব। যা নিজের মস্তিষ্ককে গ্রাস করে।
এজন্য অতিরঞ্জিত কল্পনা মোটেই ঠিক নয় বলে মেনে নেওয়া যায় না। মানা এবং না মানার
বিষয়টিও কল্পকারীর একান্ত বিষয় বলে বিবেচ্য। কল্পনাকে কাজে লাগাতে হলে ধীরে ধীরে
এগোতে হয় কিন্তু আমাদের দ্রুতগামীতা মূল লক্ষ্য থেকে ছিনিয়ে নেয় এবং শেষে স্বভাবত
পাগল উপাধিকে ভূষিত করে। অনেকক্ষেত্রে, এরকম পাগলের প্রয়োজন; কারণ সাধনার উৎকৃষ্ট
লাভ করতে হলে যথেষ্ট পাগল হওয়া প্রত্যেক সৃজনশীল মানুষের ব্যক্তিগত স্বভাব। এটিই কল্পশক্তির
শেষ কথা নয়! এর বাইরেও অকল্পনীয় বলে কিছু একটা আছে বলে ধরে নেওয়া হয়। যা আমাদের
দৃষ্টিগোচর হয় না কিন্তু আমরা সেটাকে বাদ দিয়েও মূল লক্ষ্যে চলতে পারি না। তাই কল্পশক্তির
বিস্মৃতি প্রয়োজন। এটি যেকোনোভাবে সংঘটিত হতে পারে।
বহুমাত্রিকতা: কবিতার মুখোমুখি
দাঁড়িয়ে একজন পাঠক যখন তার চিন্তাশক্তিকে নানা উৎকর্ষে ব্যঞ্জনাময় করে তোলেন এবং
কবিতার মুখ্য প্রসঙ্গের থেকেও ভিন্ন ভিন্ন চিত্রকল্পের দৃশ্যাবলী পাঠকের চোখের সামনে
ভেসে ওঠে! পাঠক দেখতে পান কবিতার আনুষাঙ্গিক অবকাঠামোর ভেতর অদৃশ্যত অসংখ্য চিত্রকল্প
সেই চিত্রকল্পকেই কবিতায় বহুমাত্রিকতা বলে।
এরকম কবিতাকে স্বভাবসিদ্ধ
কবিতা বলা যায়। কারণ স্রষ্টা এখানে নিজের সৃষ্টির সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞাত নন! বরং
বিষয়বস্তু দৈবভাবে নিজেই নিজেকে তুলে ধরেন, তখন স্রষ্টা মূলত গৌণ প্রসঙ্গ? স্রষ্টা
সৃজনশিল্পের বিষয়বস্তুকে পাঠকের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে দায়ভার মুক্ত হন! পাঠক নিজ নিজ
স্থান থেকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রহণ ও বর্জনের সুবিধা পান। অর্থাৎ এটি পাঠকের স্বাধীনতা।
পাঠকের চিন্তার যথাযথ মূল্যায়ন। যা বহুমাত্রিকতার
প্রথম স্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এরকম কবিতা পাঠে স্থান-কাল-পাত্রভেদ যথেষ্ট
নয়! কবিতা স্বত্বসিদ্ধভাবে তার স্থান-কাল বুঝে নিবেন— যাতে পাঠকের স্বস্তিবোধ হয়।
ধরুন, চলন্ত ট্রেনে আপনি
একটি কবিতা পড়ছেন, ঠিক একই কবিতা নদীর পাড়ে বসে কিংবা প্রেমিকার হাত ধরে পড়তে পড়তে
চলছেন কিন্তু ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন স্থান পরিবর্তন স্বত্বেও কবিতার মর্মগাঁথা এক এক
স্থানে একেক প্রশস্তি দেয়— ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে, —এই যে একটি কবিতায় ভিন্ন ভিন্ন চিত্রকল্প সৃষ্টি হয় যা বোধের সৃষ্টি
করে মানসক্ষেত্রে অতিমানসের পরিচয় দেয়— তখন জানবেন কবিতাটি বহুমাত্রিকতায় পরিণত হয়েছে।
এই যে একের মধ্যে বহুত্বের
বিন্যাস; কেবলমাত্র বাংলা সাহিত্যে কবিতার মধ্যেই সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। অন্যান্য
জায়গায় এর ভাবগাম্ভীর্য তেমন একটা ফুটে ওঠে না! কিন্তু কবিতার বেলায় ব্যতিক্রম দেখা
যায়— বহুমাত্রিকতার কবিতাগুলোই একসময় কালোত্তীর্ণ হয়েছে
নয়তো সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে; ধরা যাক, আপনি জীবনানন্দ দাশের
‘আকাশলীনা’ পড়ছেন কিংবা বনফুলের ‘নিমগাছ’ পড়ছেন, প্রথমটি আমরা কবিতা বলেই জানি কিন্তু
দ্বিতীয়টি কবিতার মতো করে হলেও গদ্য হিসেবেই স্বীকৃতি পেয়েছে। আমি যখন ‘আকাশলীনা’
পড়ব, তখন মনে হবে প্রেমিকা যেন আকাশে লীন হয়ে যাচ্ছে, মিলিয়ে যাচ্ছে তৎক্ষণাৎ আবার
চিরঞ্জীবী ঘাসের হৃদয় জুড়ে নিজেকে মেলে ধরছে; এটি যখন আমি ফাঁকা মাঠে বসে একা পড়ব
তখন মনে হবে— সত্যিই তো সুরঞ্জনা সবুজ প্রকৃতির সাথে মিশে আছে;
আর যখন প্রেমিকার হাতে হাত রেখে গুণগুণ করব, তখন হৃদয়ে অন্যমাত্রা যোগ হবে। তেমনি
বনফুলের ‘নিমগাছ’ গল্পটির কথা বলা যায়; কবিতা বললেও মনে হয় অসুবিধা হবে না, কি দারুণ
শিল্পকর্ম! এই কবিতাটিতে বনফুল নিমগাছের গুণগানের কথা বলে ক্লান্ত হয়ে— একদম শেষ পর্যায়ে এসে বললেন, সেই বাড়িটির গৃহবধূর অবস্থা এবং নিমগাছের
অবস্থা প্রায় সমান কারণ ওদের যত্ন নেওয়ার মতো লোক কেউ নেই, অথচ ওরা কাছাকাছি থাকলে
যে চারদিকটা উজ্জ্বল মনে হয়— সে কথাও আমাদের ভাবিয়ে তোলে। তখনই কবিতা হয়ে ওঠে
পূর্ণত্বের প্রকাশ! কবিতার হৃদয় ছুড়ে বাজতে থাকে মানুষের হাঁটাচলা, স্নেহ-প্রেম,
দয়া-দাক্ষিণ্য, ভালোবাসা-অবহেলা ইত্যাদি।
কবিতাকে শিল্পের পর্যায়ে
উন্নতি করাতে বহুমাত্রিকতা দার্শনিকতার পরিচয় দেয়। শুধুমাত্র শব্দের বিন্যাস, অভিজ্ঞতা
কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে কবিতা হতে পারে না; কবিতার জন্য দরকার নির্মোহ বিশ্লেষণ,
বহুমাত্রিকতা ও আত্মদার্শনিকতা এই তিনটি একজন কবির সৃষ্টিকে কালোত্তীর্ণ উপাধি দেয়।
কবিতার এই আত্মজিজ্ঞাসা ও বহুমাত্রিকতা তাকে এক অনন্য শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত
করেছে। একেকজন পাঠকের কাছে একই কবিতা একেকভাবে প্রতিভাত হয়, এবং এর মধ্যেই লুকিয়ে
থাকে কবিতার সৌন্দর্য ও শক্তি।
রবীন্দ্রনাথের কবিতার জীবনবোধ
এবং জীবনানন্দের কবিতার জীবনবোধ ও নিঃসঙ্গতা এক নয়! রবীন্দ্রনাথ চেয়েছেন কবিতার মাধ্যমে
ঈশ্বরের প্রতি অনুগত থেকে মুক্তির চেতনা আর জীবনানন্দ নিঃসঙ্গতাকে আঁকড়ে ধরে কবি তার
জীবনবোধের গতিসূত্রকে আত্মস্থ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ পড়লে শুধুমাত্র
ভালবাসার ঐকান্তিক মোহ নয়! বরং এর অভ্যন্তরে জীবনবোধের নির্মোহ বিশ্লেষণ দেখতে পাব
কিংবা ‘কর্ণ-কুন্তীসংবাদ’ কাব্য পড়লে শুধুমাত্র ছেলে কিংবা মায়ের বিচ্ছেদের কথা নয়
বরং ভালোবাসা ও অবহেলার ভেতরেও যে জীবনের অস্তিত্বের সন্ধান রয়েছে তার একঝলক দেখতে
পাব। তেমনি জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ পড়লে শুধুমাত্র একজন মানবী কিংবা ভালোবাসার প্রতি
মোহ অনুভব নয়! বরং এর পেছনের শৈল্পিক উপাদানকে জীবনের অস্তিত্ববাদের প্রকরণে সকল অস্থিরতাকে
পেরিয়ে একটি জীবনবোধের সূচনা দেখতে পাই। যা অস্তিত্ববাদী দর্শন বা সাধনার সারসংক্ষেপ
মাত্র নয়! অভিজ্ঞতা ও অর্ন্তদৃষ্টির প্রকরণ।
কিছু কিছু কবিতা শব্দের শরীর
থেকে মুছে গিয়ে নতুন করে কল্পনার বহির্জগত সৃষ্টি করেন— এই কল্পনা প্রতীক এবং রূপকের বৈচিত্রে আন্দোলিত কিংবা অর্থের বহুমুখীতা,
ভাষার স্তরভেদ কিংবা পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে সংগঠিত হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের
অনেকগুলো কবিতা আছে তার মধ্যে একটি কবিতাকে যদি বেছে নেওয়া যায় শুধুমাত্র একটি প্রবাহমান
সময়ের জন্য অথবা একটি জীবনানন্দ দাশের কবিতা দেখা যাবে— বহুমাত্রিকতার হৈ-রবে কোনোটিই তার স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের বাইরে গিয়ে তার
সময়কে দাবি করতে চায় না, অথচ সময়কে ব্যাবহার করে উৎকৃষ্ট শিল্পশৈলীতে পাঠকের অভিজ্ঞতার
কাছে আপন ইচ্ছায় ধরা দেয়। ধরা যাক, সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ পড়তে পড়তে
আপনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন জনতার সংগ্রামে, সমাজ চেতনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে
চান; অন্যদিকে আপনারই মতো অন্য একজন একই কবিতা পড়ে নিজের সন্তানকে জগতের শ্রেষ্ঠ আসনে
বসাতে চান বা পৃথিবীর সকল শিশুকে সুস্থ-সবল মস্তিষ্কের অধিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে চান।
দু'জনের দৃষ্টিভঙ্গি এক না হলেও কবিতাটি কিন্তু দুজনের মধ্যে একটা সেতু তৈরি করে দিচ্ছে,
এই সেতুটি হচ্ছে বহুমাত্রিকতার মেলবন্ধন বা BRIDGE POINT ।
রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বহুমাত্রিকতা:
★
রাত্রে যদি সূর্যশোকে ঝরে অশ্রুধারা
সূর্য নাহি ফেরে, শুধু ব্যর্থ
হয় তারা— (ধ্রুবানি তস্য নস্যন্তি)
★
কতবার আমি ভেবেছিনু, ‘উঠি উঠি
আলস ত্যজিয়া পথে বাহিরাই
ছুটি।’
উঠিনু যখন তখন গিয়েছ চলে—
দেখা বুঝি আর হলো না তোমার
সাথে— ( স্বপ্ন/ গীতাঞ্জলি)
★
আপনারে তুমি দেখিছ মধুর রসে
আমার মাঝারে নিজেরে করিয়া
দান— (প্রতিসৃষ্টি/ গীতাঞ্জলি)
★আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।
এ জীবন পুণ্য করো দহন-দানে ॥
আমার এই দেহখানি
তুলে ধরো,
তোমার ওই দেবালয়ের
প্রদীপ করো--
নিশিদিন আলোক-শিখা জ্বলুক গানে ॥
আঁধারের গায়ে গায়ে পরশ তব
সারা রাত ফোটাক তারা নব নব।
নয়নের দৃষ্টি হতে ঘুচবে কালো,
যেখানে পড়বে সেথায় দেখবে আলো--
ব্যথা মোর উঠবে জ্বলে ঊর্ধ্ব পানে ॥ ( পরশমণি/ গীতালি)
★
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা
চলো রে।
একলা চলো, একলা চলো,
একলা চলো, একলা চলো রে ॥
যদি কেউ কথা না কয়, ওরে ওরে ও অভাগা,
যদি সবাই থাকে মুখ ফিরায়ে সবাই করে ভয়--
তবে পরান খুলে
ও তুই মুখ ফুটে তোর মনের কথা একলা বলো রে ॥
যদি সবাই ফিরে যায়, ওরে ওরে ও অভাগা,
যদি গহন পথে যাবার কালে কেউ ফিরে না চায়--
তবে পথের কাঁটা
ও তুই রক্তমাখা চরণতলে একলা দলো রে ॥
যদি আলো না ধরে,
ওরে ওরে ও অভাগা,
যদি ঝড়-বাদলে আঁধার রাতে দুয়ার দেয় ঘরে--
তবে বজ্রানলে
আপন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে একলা জ্বলো রে ॥ (গীতিকাব্য)
...............................................
....................................
চিন্তা: হচ্ছে কবির অন্তর্দৃষ্টি। অদ্ভুত জগৎ। মানসক্ষেত্র।
মুক্তির পথ। মানসপটে ভ্রমণ করার একমাত্র জায়গা। মনসংযোগের একমাত্র যোগানদাতা। বাহ্যিক
ও ঐহ্যিক অনুভূতির স্পন্দন জাগানো ছন্দময় জগত। চিন্তা দুই প্রকারের হতে পারে— এক, ঘুমন্ত চিন্তা, যা বোধদয় হয় না বা যার শরীর নিরুপণ সম্ভব নয়! দ্বিতীয়ত,
জাগ্রত চিন্তা, যার দ্বারা সৎ ও অসৎ প্রবৃত্তির মাত্রানুসন্ধান বোধদয় হয়। এসব চিন্তা
ব্যক্তিসত্ত্বাকে অনুপম শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে পারে। কবিতার ক্ষেত্রে অতিমানস যেভাবে তার
পরিধির যোগান দেয়; ঠিক একইভাবে চিন্তা অতিমানসের যোগানদাতা।
আমরা চিন্তার শরীর থেকে অতিমানসকে
ছিনিয়ে নিই! কারণ চিন্তা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলোর উপযোগ সৃষ্টি করে— একটা ঘোরতর মানসপট সৃষ্টি হয়! সেখানে একদল ভাবুক গোষ্ঠী যৎসামান্য উপলব্ধি
করে চলে যায় এবং অপরদল চিন্তাকে খাটিয়ে সৃজনশীলতা সৃষ্টিকারী শব্দের শরীর গঠন করে,
কবিতায় এদের বৈশিষ্ট্য হলো অবসম্ভাবী।
কিন্তু কেন চিন্তা করতে হবে?
শুধুই কি কবিতার জন্য নাকি বোধের শান দেওয়ার জন্য? আদিতে যখন সংস্কৃতিপ্রবণ মানুষজন
চিন্তা করা শুরু করেছিল, তখন নতুন নতুন সৃজনশীলতার জন্ম হয়েছিল। এই সৃজনশীলতা একদিনে
আসেনি, গভীর চিন্তা, সারল্য ও উৎকর্ষের নিরন্তর সংগ্রাম। চিন্তা মানুষকে বদ্ধ পাগল
করে দেয়, যাদের পাগলামি সৃজনশীলতার পর্যায়ে হয়, সহনশীলতার পর্যায়ে, সংস্কৃতির পর্যায়ে,
মানব-মুক্তির পর্যায়ে তারাই সবসময় সহজ মানুষের, সহজ লোকের ভিড়ে কাঠামোগত জীবনের
হদিশ পেয়েছেন। কিন্তু চিন্তাকে যখন মস্তিষ্কের খোরাক বলব, তখন চিন্তা হয়ে উঠবে সূদরপ্রসারী;
যে চিন্তা মানবেতিহাসের অন্ধকার স্তরকে প্রজ্জলিত করেছিল। সেই চিন্তার নাম শিক্ষা।
অক্ষরের সাথে পরিচয়। বর্ণের সাথে বর্ণের মিলন। শব্দের সাথে ভাব-ব্যঞ্জনা।
কবিতা এক ধরনের সঞ্চারশক্তি,
যা শব্দের গভীরে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে। এটা শুধু ভাষার খেলা নয়, বরং এক
অনির্বচনীয় অনুভব, যা পাঠকের হৃদয়ে নতুন এক জগৎ সৃষ্টি করে। এই সৃষ্টির প্রকাশ কবির
ব্যক্তিগত কিন্তু এর উপাদান সর্বময় জগৎজুড়ে। সমালোচনার খাতিরে যদিও বলা যায়, কবিতা
তার প্রাণশক্তি যোগাতে শুধুমাত্র বোধ ও ছন্দময় দ্যোতনার উপরেই নির্ভরশীল নয়! তাহলে
এর বিপরীতে কি থাকতে পারে অথবা ভিন্নমাত্রিক বহুবিধ উপাদান? কিন্তু সেই উপাদানগুলোর
উৎকর্ষের যোগানদাতা হিসেবে প্রথমত সরলচিন্তার ব্যাপকতার দিকেই লক্ষ্য রাখতে হয়।
আমাদের বাংলা কবিতার সহজসূত্র
কিন্তু চিন্তার গভীরতা লক্ষ্য করেই; তারুণ্য তার চিন্তাকে ঠেলে দিয়েছে শব্দের গভীরে,
বোধের বেড়াজালে আর নিপুণ গতিসূত্রের অস্থিরতার মধ্যে এক ডুবন্ত কাব্যিক প্রতিশ্রুতির
জগতে। সেখানে ছন্দের কোন বালাই নাই, আছে গভীর চিন্তার উৎকর্ষতা, সাধনের বিকাশ ও বিষ্ময়
শব্দের কোলাহল। কখনো কবিতা হয় নীরবতা, কখনো প্রতিধ্বনি। কখনো প্রশ্ন হয়ে উঠে দাঁড়ায়,
কখনো উত্তর হয়ে হারিয়ে যায় বাতাসে।
এবার আসুন, আমি কেন চিন্তা
করি? শুধুমাত্র দু’বেলা ওষুধ খাওয়ার জন্য যে চিন্তা সে চিন্তার আলাপ এখানে হচ্ছে না।
আমার চিন্তা অতিমানসের অতীন্দ্রিয় সত্ত্বা। এই সত্ত্বার সংজ্ঞা পূর্বেই দেওয়া হয়েছে।
পাঠক ও লেখকের মিলনস্থলে কীভাবে অতিমানস কাজ করে তা নিয়েই আমার যৎসামান্য উপলব্ধি।
সৃজনশীলতার এই চিন্তাকে কেন্দ্র করে যখন আমি ঘুরপাক খাচ্ছি, তখন আমি আমাকে কিভাবে আবিষ্কার
করতে পারি তার একটা স্ট্রাকচার সহজেই বের করতে পারি। কিসের মাধ্যমে? চিন্তা। এরকম চিন্তা
আপনাকে করতে বলছি, যাতে আপনি সহজ লোকের ভিড়ে, বিস্ময়কর কিছু খুঁজে পান, যা দ্বারা
আপনার বোধশক্তি অতিমানসের দ্বারগোড়ায় গিয়ে উপস্থিত হবে। শুধুমাত্র, ভাবতে শিখুন,
পিঁপড়ের সংসার, দাঁড়িয়ে থাকা গাছের জীবন, মৌমাছির জীবন, ভোরের ফুল, ছাপানো অক্ষর
কীভাবে আপনাকে চিন্তার গভীরে ডুব দিতে সাহায্য করে। এই ডুবে যাওয়ার মধ্যে একটা প্রশান্তি
আছে তার নাম আনন্দ।
কবিতার পাঠকেরা বা কবিরা
প্রথমত সেই কাজটিই করেন; যে কাজের সহজসূত্র ধরে মনসংযোগ ঘটে, যাকে বলে টেলিপ্যাথি।
এ জগতে কবি ও পাঠক যতদিন প্রবেশ করেননি, ততদিন সৎ ও অসৎ প্রবৃত্তির মাত্রানুসন্ধান
চলবে। কবিরা সেদিক থেকে নিবৃত্তি মার্গের সাধক বলা যায়, যেহেতু পাঠকমাত্রেই বিষয়ব্যঞ্জনায়
অভিষিক্ত। কিছু পাঠকের ক্ষেত্রে খুব অল্পতেই
কার্যসিদ্ধি হয়! কিন্তু কাব্যপ্রতিভা এবং কাব্যপাঠ সৎ পাঠকের জন্যই প্রসিদ্ধ তাই
বলে অসৎ পাঠকের মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন নয়! এজন্যই কবি প্রথমেই এসব পাঠককে চিন্তার খোরাক
যোগাতে বলেন।
মননশীল চিন্তা কাব্যপ্রবাহের
দার্শনিক দিককে তুলে ধরে, তাই বলে দর্শন মাত্রই কবিতা নয়! কবিতার বৈশিষ্ট্য আচার-আচরণ,
উপাদান, ছন্দময়তা এবং বৈচিত্র্যতা সবমিলে সর্বজনীন পারিপার্শ্ব ও সময়সমিধ রূপায়নে
চিন্তা বা মনশীলতা সুচারু কাব্যসৃষ্টিতে মৌলিক অধিকার রাখে। চিন্তা কখনো দুর্জ্ঞেয়
রহস্যময়তা নয় বরং বারবার চেষ্টার মাধ্যমে সংবেদনশীল প্রক্রিয়া ও অচিন্ত্য অলৌকিকতা
রূপায়নে কাজ করে।
চিন্তাসূত্র কখনো কখনো অনির্বচনীয়
ভূমিকা পালন করে, নীরবতা ও সংবেদনশীল। কোলরিজ বলেছেন, ‘যখন সম্পূর্ণরূপে না-বুঝে সাধারণভাবে
বুঝা যায়, তখনই সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়।’ —এই যে বোঝা এবং না বোঝার ব্যাপারটা কোত্থেকে আসে? নিঃসন্দেহে
চিন্তাশক্তির সংস্পর্শে এসে— কবিতার ব্যাখ্যা, আলোচনা, রুপায়ন, সৃজনশীলতা, কাব্য-বিচার
এসব অস্তিত্বের ধরা পড়ে। অর্ন্তদৃষ্টিতে ভবিষ্যৎ কাঠামোকে বর্তমানের কাছে মেলে ধরা
এবং অতিমানসের অতিলৌকিক অনুভবশক্তি ও কাল্পনিক অবকাঠামোকে বাস্তবিক সত্য ও অসত্যের
সংমিশ্রনে রসময় জগতের নিজস্ব শিল্পসমৃদ্ধ সৌকুমার্য্য দ্বারা বেষ্টিত করতে পারলে চিন্তাসূত্রের
বিশুদ্ধ স্বর তৈরি করা সম্ভব। কবিতার ক্ষেত্রে যা সুন্দর, শ্বাশ্বত ও পরিণামদর্শী।
নিপুন শিল্পসৃষ্টিতে বোধগম্যতা,
রুচিশীলতা ও শিল্পদক্ষতা এই তিনটি জিনিস একান্ত প্রয়োজন। এটি সকলক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
বিশ্বজোড়া পাঠশালায় আমাদের বিচরণ কিন্তু শ্বাশ্বত চিন্তার ক্ষেত্রে বাঙালি অনেকাংশে
দুর্বল। তার কারণ লঘুচিন্তা; এসব চিন্তাকে মুষ্টিবদ্ধ কয়েকটি মতবাদ ঘিরে আছে, নির্দিষ্ট
কাল প্রবাহে তা গতিশীল কিন্তু বাস্তবিক সহজসূত্রে কখনোই তার সাথে সম্পর্ক নেই; উৎকর্ষ
সৃষ্টিতে অক্ষম, রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা, সংঘাত দ্বন্দ্ব, প্রতিঘাত, সাংস্কৃতিক অবচেতন,
ধর্মান্ধতা ইত্যাদি ঝঞ্ঝামুখর টালমাতাল অবস্থায় ক’জন উঠে দাঁড়াতে পেরেছে সেটিও দেখার
অবকাশ রইলো।
আমরা কি চাই? আমরা চাই নিপুন
শিল্প বিকাশ। সাহিত্য সমৃদ্ধ। ছন্দময় বৈচিত্রতা। প্রেম। ভালোবাসা। স্মৃতিকাতরতা। বর্ণিল
ক্যানভাস ও নিরীক্ষাপ্রবণ সাহিত্য সমৃদ্ধির পথ। শুধুমাত্র চারদিকে অ্যালকোহলের ছড়াছড়ি
হলে কবিতাকে বাঁচানো যায় না; মানুষের মনজগতের সাথে সাথে কবিতারও মৃত্যু হয়, এটি
মানসিক অ্যালকোহল। এই উত্তাল পর্ব থেকে সরে গিয়ে— রুচিশীল শিল্পদক্ষতার
মাধ্যমে চিন্তাসূত্রের রূপময় বৈচিত্র্য ঘটাতে হবে। —এজন্যই চিন্তাসূত্রের প্রয়োজন।
সারল্য: সারল্য বা সরলতা
কবিতার বিশেষ একটি অঙ্গ। কবিতার বিষয়বস্তু
নির্বাচন যেমন গুরুত্বপূর্ণ; ঠিক তেমনি, পাঠকের রুচি অনুযায়ী শিল্প-সৃষ্টির দক্ষতাও
অনিবার্য। শব্দের গভীরতা এবং বাক্য নির্বাচন অত্যন্ত জরুরী! একজন কবি তাঁর কাব্যপ্রতিভার
বয়ান দিতে গিয়ে— বোধদয়ের উন্মেষ যদি না ঘটাতে পারে তাহলে পাঠক বরাবর
পৌঁছানো সম্ভব নয়!
প্রসঙ্গতঃ কবীরের কথা উল্লেখ
করা যায়, তিনি তাঁর কবিতায় বলেছেন, ‘সংস্কৃত কূপজল, কবীরা ভাষা বহতা নীর’ অর্থাৎ
কবীর অন্য ভাষায় নয় বরং নিজের কথ্য ভাষায় তাঁর কবিতার সারমর্ম বলতে চান। লোক সাধারণের
ভাষাকেই তিনি কবিতায় স্থান দিয়েছেন। এই সরলতা নদীর জলের মতো স্বচ্ছ, বহমান, ক্রিয়াশীল।
পাঠকের আবেদন সরলতা কিন্তু
সরলতা কখনো কবিতার প্রয়োজনীয় বস্তু হতে পারে না। অঙ্গাঙ্গিভাবে সরলতা কবিতার সাথে
জড়িত। সরলতা বলতে এখানে আমি শব্দভারকে বোঝাচ্ছি না, সরলতা হচ্ছে কবি ও পাঠকের মধ্যে
মিলন সূত্র। কবি কীভাবে পাঠকের চৈতন্য জাগিয়ে তুলবে তা একান্ত জরুরী! স্থান, কাল,
চরিত্র নির্ণয় ও বাস্তবিক প্রেক্ষাপট কেমন হবে তা কবিতার প্রাক্কালে পাঠক বরাবর কীভাবে
প্রেরণ করা যায় তা নিয়ে গভীর চিন্তার অবকাশ প্রয়োজন।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতায়
সারল্য আছে; যেটা এখন ভাষাগত দিক থেকে খুব কঠিন মনে হচ্ছে কিন্তু জীবনানন্দ দাশের বেলায়
জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, এই জটিলতা কিসের? বোধের নাকি শব্দভারের? কথাটির উত্তর পাঠক নিশ্চয়ই
বলবেন, বোধের; কিন্তু সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার জটিলতা শব্দের ক্ষেত্রে; এটা আমাদের
মেনে নিতে কষ্ট হয় না। ঘটা করে বলতেও দ্বিধা নেই সারল্যের চাবিকাঠি একমাত্র পাঠের
সৎ প্রবৃত্তি; একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পাঠের জন্য নিজেকে যোগ্য করে তোলা। এসব কথায়
কারো কারো জ্বর এসে যেতে পারে কিন্তু উচিৎ কথা বলতে দ্বিধাবোধ করি না। বাংলা কবিতার
পাঠকমাত্রই জানেন, কবিতা শুধুমাত্র বোধের খোরাক নয় বরং এটি বাস্তবিকতা, সমাজচেতনা
ও নির্মল রোমান্টিকতারও প্রতীক। রোমান্টিকতার বিরুদ্ধেও অনেক অভিযোগ রয়েছে; রোমান্টিকতা
বিরোধীরাও রোমান্টিকতার ছোঁয়া থেকে বের হতে পারেননি। পাঠকশ্রেণীর দুর্বল গোষ্ঠী সমালোচনা
সহ্য করতে পারে না, অপরটির সাথে আবার কারো যোগসূত্র স্থাপন করা সম্ভব হয় না কিন্তু
মনোযোগের দিক থেকে বা চিন্তার দিক থেকে কেউ কম নয়! আমরা কেউ এতো গভীর তাৎপর্য খুঁজতে
চাই না, খুঁজেই বা লাভ কি? যারা মন মতো রবীন্দ্র-ভাবনার থেকে বেরিয়ে পড়েছেন, তারা
সম্প্রতি ফের রবীন্দ্রনাথেই ডুবে যাচ্ছেন, এক কথায় এই ঘোরপ্যাঁচ থেকে বেরোনোর পথ খুঁজে
পাওয়া মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। একদল গবেষক বলছেন, রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গে নিব কিন্তু তার
পথে হেঁটে সময় নষ্ট করব না কিন্তু সারল্যের কি হবে? তাই বলে রবীন্দ্রনাথের কবিতার
সারল্যের কথা বলছি না, যেমনটা জসীম উদ্ দীনের ব্যাপারে বলা যতটা সম্ভব ততটা মধ্যযুগীয়
কবিদের ক্ষেত্রেও বলা যায় না, কারণ ভাষাগত গভীরতা ও শ্রুতিমধুর উৎকর্ষের ভেতরেও জটিলতা
দুর্বল পাঠকের অস্বস্তি ছাড়া কিছুই দেয় না। উত্তরাধুনিক কালে এসেও বাস্তবতার মুখোমুখি
দাঁড়িয়ে কোন কবিকে বলতে শোনা যায় না, একমাত্র তার কবিতাই সর্ব সাধারণের জন্য বরদান
স্বরূপ।
সাধনা: কবিতা। তিন অক্ষরের সম্মিলিত এই বাক্যে লুকিয়ে
আছে কত মননশীল সাধনার উৎকর্ষ। সাধনা কথাটির দ্বারা বোঝা যায় সাধকের প্রজ্ঞা। কবিতার
সাধকগণ নিবিড় ভাবনার সম্মেলন ঘটিয়ে ছন্দোবদ্ধ স্পন্দনের সূচনা করেন। সৎ প্রবৃত্তির
লোকেরাই কবিতার মাধ্যমে চিরন্তন প্রতিকৃতি মনমানচিত্রে ধারণ করেন। কবিতার জন্য চাই
সাধনা, উৎকর্ষ ও বোধশক্তির নিবিড় নীরিক্ষা। উৎকৃষ্ট সাহিত্য সৃষ্টিতে সাধনা অত্যন্ত
প্রয়োজনীয়।
একজন কবি হতে গেলে প্রথমেই
জ্ঞানের সন্ধান করতে হয়। এই জ্ঞান লৌকিক-অলৌকিক কিংবা কল্পনা-স্বপ্ন, জীবন বন্দনা,
সামাজিকতা ইত্যাদি যে কোনোভাবেই সংগঠিত হতে পারে। অপ্রয়োজনীয় উপাদানও কবিতার বিষয়বস্তু!
বর্তমান সময়ের কবিগণের নীরিক্ষা থেকে এইসব দৃষ্টান্ত অহরহ দেখা যায়। শ্লীলতা-অশ্লীলতা
কোন কিছুই কবিতাকে রুদ্ধ করতে পারেনি! কারণ কবিতা জীবনের অংশ, প্রবাহমান জীবনের অস্তিত্ববাদের
বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে— যেসব ছাপার অক্ষরে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, সেটি শ্লীলতাও
হতে পারে আবার অশ্লীলতাও হতে পারে কিন্তু তা সত্ত্বেও কবিতাকে দোষী সাব্যস্ত করা যায়
না, সে যুগ চলে গেছে। এখন প্রবাহমান যাপনই জীবনে অংশ, সেখান থেকেই কবিতা বীজ বপন, এজন্য
বর্তমানের সাহিত্য কোন বাঁধাকে তোয়াক্কা না করে, আপন মহিমায় স্বয়ংসিদ্ধ হচ্ছেন।
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ,
আল মাহমুদের সময়ের কবিতার স্রোতকে এ যুগের কবিদের মধ্যে সমান্তরাল রাখতে তার বহুমুখী
বেগকেও ধারণ করার সক্ষমতা পুরাতনী কবিদের থাকা উচিত। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে বর্তমানের
সাহিত্যিক বা কবিরা কতটা গভীরতা সৃষ্টিতে সক্ষম?... যেহেতু দ্বিতীয় কাউকেই রবীন্দ্রনাথ
কিংবা নজরুল হতে হবে না কিংবা কেউ যদি জীবনানন্দও হয়ে যায়, তবুও সে গ্রহণযোগ্য নয়!
তাহলে বাংলা কবিতার আধুনিকায়ন কিংবা উত্তরাধুনিকায়ন নিয়ে যারা কথা বলছেন তাদের কাছে
সময়ের তাৎপর্য কি? এটি কি শুধু একটি প্রশ্ন নাকি বিস্ময়সূচক কিছু! আসলে, আমাদের যতটুকু
প্রচেষ্টা দরকার, সাধনা দরকার, উৎকর্ষ দরকার ততটুকু কি আমরা দিতে পেরেছি!
আমরা শুধুমাত্র কবিতার হাপিত্যেশের
কথাকেই প্রাধান্য দিয়েছি; এর থেকে উত্তরণের উপায় খোঁজার চেষ্টা করি না, বাংলা কবিতার
ভবিষ্যৎ নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই! আমার আছে, কেন আছে?... এই প্রশ্নটি এড়িয়ে গেলেও
তেমন কিছু হবে না জানি, কারণ বাঙালির অস্থি-মজ্জায় সুনন্দিত সৃজনশীলতা থাকলেও অবজ্ঞা
করার প্রবণতাই বেশি, এইসব কথা তাদের কানে পৌঁছাবে না। প্রাণবান সাহিত্যসৃষ্টি হয় বটে
কিন্তু সমাদৃত হয় না। কবিতার উপর বাহাদুরি করার শখ খুব কম মানুষেরই আছে। অমৃতের লোভে
পড়ে কতজনই বিষপান করে। কতজন মরে পড়ে থাকে। নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় কবিতাকে আঁকড়ে
ক’জন বাঁচে। কবিতার ধর্ম কি বলে? বোধের পেরেকে দগ্ধ হওয়ার শখ কতজনের ভাগ্যে হয়েছে,
ভাগ্যের দোষই বা কি? মানুষ মনুষ্যত্বের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, কবিতার বদলে রক্তপাত
হচ্ছে, মৃত্যুর সাইরেন বাজছে কিন্তু আমাকে তো লিখতে হবে অসংখ্য দিনরাত্রির অসংখ্য ফেলে
আসা পঙ্ক্তির বিন্যাস; অক্ষরের যাঁতাকলে মসৃণ করতে হবে সময়ের চাকা।
অসমাপ্ত
প্রুফ দেখা হয়নি।

0 Comments