সহজ পাঠ: মনুষ্যত্বের যাপনে স্বার্থ ।। অন্তর চন্দ্র

 




মানুষকে মানুষ বলে ডাক দেবার সময় আমরা কখনো পাইনি। মানুষকে যারা শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসিয়েছেন, তাদের হয়তো কেউ মানুষের ভেতরের জানোয়ারটাকে দেখতে পাননি অথবা না জানার ভান ধরে অভিনয় করে গেছেন।‌ শিক্ষা ক্ষেত্রে বলুন আর তর্কশাস্ত্রে বলুন মানুষের সবচেয়ে খারাপ গুন শৃঙ্খলা বজায় না রাখা। ইউভাল নোয়া হারারি বলেছেন... “HOMO SAPIENS হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বিশৃঙ্খলা প্রবণ প্রাণী।” এদের জন্মের পর থেকেই টানাহেঁচড়ার মধ্যে জীবনের সারাৎসার। তাই তারা উঠে দাঁড়ানো তো দূরে থাক নিজের অস্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে এখন উন্মত্ত উল্লাসে মেতে উঠেছে। 

মানুষকে চার পায়ে গরুর সাথেও তুলনা করতে ভয় হয়। যদি গরুরা আমার বিরুদ্ধে ছাইলিপি পেশ করে স্টেডে স্টেডে গলা ফাটিয়ে নিউজের পর নিউজ করে কিছু মানুষের মাথা গুলিয়ে খায়। ধরপাকড় মেরে উত্তম-মধ্যম দেয়। এই ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার মানুষ‌ও নির্বাকের ভূমিকা পালন করে। তখন দেখা যায়— ঐ গরুগুলোর লেজে সর্ষে তেল মালিশ করার জন্য কয়েক বালতি জোগাড় হবে। এটা নতুন কোনো বিষয় না, এর প্রতিরূপ বারবার আমাদের আহত করেছে— জীবিত করেছে চেতনার বর্হিবিশ্ব।

আমি নিজের মনকে শান্তনা দেওয়ার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা বক্তব্য রাখছি না। কারণ মানুষ সাধারণত স্বভাবের দাস। যাকে যে বাক্যটি শেখাবেন সে সেই বাক্য ছাড়া অন্যটি বুঝবার মতো নয়, বাংলাদেশে এমন অনেক মানুষ পাবেন যারা টাকার বিনিময়ে নিজের সম্মান বিক্রি করে, অথচ মানুষের উপকারের জন্য হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সৎ সাহস জাগ্রত হয়নি। আমাদের মনুষ্যত্বের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে আঘাত করা। কি করে অন্যের অনিষ্ঠ সাধন করা যায়— তাঁর একটা নিখুঁত ছক নিমিষেই তৈরি করা যায়। রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষের হাতে হাত রেখে দাঁড়ানোর শক্তি জোগানোর ক্ষমতা আমাদের হয়ে ওঠেনি! তাঁর কারণ আমাদের সঠিক জ্ঞানের অভাব। 

মনুষ্যত্ব হলো জীবনের সরলতা। বটবৃক্ষ। যার প্রত্যেক ডালে ডালে তৃষ্ণা প্রাপ্ত পাখির অবাধ বিচরণ। কিন্তু যখন যুগের হাওয়া বদলে যায়, মানুষ তখন নিজেদের একটা অবস্থানে দাঁড় করার জন্য নিজের স্বার্থটুকু নিয়ে টানাহেঁচড়া করতে দ্বিধাবোধ করে না। এমন কোন্ কারণের সম্মুখীন হয়েছি আমরা যখন আমাদের শ্বাস নিতেও ভয় পেতে হয়। নিজেরা যখন নিজের ধী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াই তখন আমাদের চেতনাকে বলিদান দিতে হয়। অনেক মানুষ দেখেছি, পরের অবলম্বন ছাড়া চলতে পারে না। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য এর বাধ্য বাধকতা বেশি‌। এর উদাহরণ হিসেবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দায়বদ্ধ। নারীদের ঘরবন্দি করে মানসিক প্রতিবন্ধী করে তোলা হচ্ছে— বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে এর ব্যাপকতা প্রচুর। অথচ নারীরা চাইলে বিশ্বের তাবড় তাবড় কাজ নিমিষেই করে দিতে পারে। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ নতুন করে দিতে হবে না। শুধু আমরা নিজেদের স্বার্থের জন্য বাচালতার প্রদর্শন করে থাকি—যা আমাদেরকে হীনমন্য জাতিতে রূপান্তর করেছে।

স্বার্থের স্থানটুকু আমরা বদলাতে পারলাম না। উঁচু-নীচুর পার্থক্যকে প্রাধান্য দিয়ে, নিজেকে এক শ্রেণীর জানোয়ারের সাথে তুলনা করতে মানুষের দ্বিধাবোধ হয় না। আপনি যাকে কাণ্ডারী ভাবেন সে যখন আপনার সর্বস্ব লুটানোর চেষ্টা করে, তখন ধূর্ত মানুষের পূর্ত কথার আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকে তার আসল চেহারার মানুষটা।

প্রত্যেকটি ঘটনার আড়ালে কয়েকটি জানোয়ার থাকে, শুকর বলে লোকে যদিও ডাকে না বরং সভাপতির আসনে ঠিকই আসীন করে। যারা একটু বোকা শ্রেণীর লোক তারা এইসব লোকের স্বার্থের বলিদান। এদের অস্তিত্বের যোগানদাতা কিছু খুনি মস্তিষ্ক। না, আমি সবাইকে বলছি না, স্বার্থান্বেষী মহলের কিছু ধূর্ত লোকের চরিত্রের সাথে ইতর শ্রেণীর লোকেদের সঙ্গপনের কথা বলছি। মানুষ যখন তার মনুষ্যত্বের কাছে নিজেই নিজের বিরোধী, ঠিক তখনই ভয় হয়, মানুষ অমানুষত্বে পরিণত হয়। 

মানুষ শব্দটিকে আমরা যে অর্থে ব্যবহার করতে চাই, যে কারণে শ্রেষ্ঠত্বের ভাগীদার হতে চাই, তা কিছু কিছু অসৎ প্রকৃতির মানুষের কারণে সমস্ত প্রাণীকুলের কাছে মানুষ ব্যভিচারী বলে প্রমাণিত হচ্ছে— এ দায় কে নেবে? হিংস্র হায়নার চেয়েও মানুষের থাবার গর্ত অনেক গভীর। যে বিচারিক ক্ষমতা শুধুমাত্র মানুষের জন্য স্রষ্টা কর্তৃক সমর্থিত সেই ভাবনাকেও আজ ভুলে যেতে বসেছি। কারণ আমরা স্বার্থান্বেষী, স্বার্থের জন্য নিজের ঈশ্বরকেও বেচে দিতে রাজি। লজ্জাতে আমাদের মাথা নত হয় না, চক্ষুশূল হয় না বরং দ্বিমত পোষণ করি। এই অবস্থাকে প্রত্যক্ষ দেখে ভালো মানুষেরা কত না কেঁদে কেঁদে চোখের জলে দুঃখকে স্বীকার করছেন— তাঁরাও পথের হদিস পাচ্ছেন না।

মানুষের সাথে ধর্মের যা মেলবন্ধন তা চরিত্র গঠনে নয়! কারণ যে অর্থে যে শব্দ আমরা ব্যবহার করি, সে অর্থে আমরা উপযুক্ত নই! মানুষ যখন তাঁর নিজের কাজের কথা ভুলে যায়— ঠিক তখনই মানুষ মরে যায়। এখানে ধর্মকে ব্যবহার করে কিছু লোক নীরবতার ভঙ্গিতে মানুষের কায়দাগুলোকে আয়ত্ব করে মস্তিষ্কের উন্নতির দিকগুলো ছিঁড়ে খায়। মানুষের সাথে ধর্মের সম্পর্ক মুখের, আত্মার নয়! কারণ মানুষের প্রবৃত্তিগুলোর যোগানদাতার সঙ্গে নিবৃত্তির তুলনা করতে গেলে যে বিষয় দাঁড়ায় তা অবশ্য কয়েকটি বিষফোঁড়া।  

আমাকে যদি কেউ এসে মনুষ্যত্বের সঙ্গা জিজ্ঞেস করেন, আমি বলব, চেয়ারের তলায় মাথা ঢুকিয়ে দাও! কেননা তাতে করে উপরের দৃষ্টিভঙ্গি নীচের দিকে টানবে। ছোটবেলায় শিক্ষক যখন পড়া না দেওয়ার অপরাধে কান ধরিয়ে টেবিলের তালায় মাথা ঢুকিয়ে দেদারছে মারতেন, তখন মনে হতো মানুষ হতে হবে। যে প্রেক্ষাপটের সৃজনশীলতা নিয়ে আমাদের জীবনের সূচনা হয়েছিল, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বের বিক্রি হচ্ছে, এটা আমাদের কাছে নতুন নয়। কিন্তু স্বার্থের জন্য মানুষ এত উদগ্রীব, তার পেছনের সত্যকে আবিষ্কার করার চেষ্টা কেউ কখনো করেছি। স্বার্থকে নিজস্ব পরিধির আস্তরণে ফেলে যুবক বয়সেই নিজেকে অন্ধকূপে ফেলে দেওয়া কি অপরাধ নয়? মানুষ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করতে ভয় পায় কারণ সে স্বার্থান্বেষী।

মানুষকে যখন শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসানো হয়, আমি তখন পশুদের হিংস্রতা খুঁজি। বিগতদিনের সাথে কয়েকটি কথা হয়েছিল, সেখানে ছিল স্বার্থ এবং নামী হ‌ওয়ার আকাঙ্ক্ষা। কেউ উঁচু-নীচুর পার্থক্যে মেতে উঠেছিল। সেই জালে আটকা পড়েছিলাম। অবশেষে, নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বৃষ্টির জলে সমস্ত দুঃখ ভাসিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। স্বার্থকে আরও কাছে থেকে দেখলাম। নাম ও নামীর কত উল্লাস। 

আমি আপনাকে বিশ্বাস করি না কথাটি মাধ্যমে বোঝা যায় সে নিজের প্রতি অবিশ্বাসের ভার ক্রমশ জাগিয়ে তুলছে। এর কারণ হিসেবে যখন কেউ নিজের অন্তরাত্মার সন্ধিৎসু উপলব্ধি করার কথা ভাবে— তখন কয়েকটি ভুলের বোঝা তাঁর কাঁধে চেপে। সমাজতন্ত্র, রাষ্ট্রযন্ত্র, অর্থনীতি  সবকিছুর সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে আসে বিশ্বাস কথাটি। এর মাধ্যমে প্রথমত, অজ্ঞ লোকেদের ক্ষতি হয়েছে এবং দ্বিতীয়ত, স্বার্থান্বেষী মহলের চত্ত্বরে পড়ে কিছু শিক্ষিত সমাজ চেতনার জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের মহত্ত্বকে হত্যা করেছে।

আজকাল আমি অবশ্য বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে ভাবি না কারণ কিছু লোক বিশ্বাসের জন্মদেয় ব্যাক্তিকেন্দ্রিক মতামত প্রতিষ্ঠান জন্য। যেমন- ইশ্বরকে আমরা ব্যাক্তিকেন্দ্রিক দিক থেকেই বিবেচনা করি, ঠিক তেমনি কতকগুলো বিশ্বাসের কারণে মানুষের মস্তিষ্কের জটিলতা কুটিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেগুলো আপনারা স্ব স্ব বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখুন। ধর্মের পাঠ বাড়িতে করুন। মানুষের পাঠ সর্বত্র করুন। নয়তো মাটিতে জন্মাবার আগে প্রজন্মের কাছে অপরাধী মনে হবে।

এখন যে হারে বাল্যবিয়ে এবং প্রেমপাঠের আয়োজন তা দেখে চমকে উঠি। বয়সটা নেহাতই ধুতুরার ফল। যে সময়টা মস্তিষ্কের গঠনের সময় ঠিক সেই সময়েই কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয় বিষয় জ্বালা। তার কারণ হিসেবে চারটি প্রসঙ্গ আনা যায়— এক. সমাজের অসৎ প্রবৃত্তির লোকেরা, যারা মেয়েদের দেখলেই খোচলাতে শুরু করে। স্কুল-কলেজে, মাঠে-ময়দানে মেয়েরা বারবার ইভটিজিং —এর শিকার হয়। দুই. পিতা কিংবা মাতা কোনো স্বার্থ হাসিলের জন্য মেয়ে বা ছেলেকে অতি অল্প বয়সে সংসারের ভার নিতে বলেন। তিন. যৌতুক প্রথা এবং ঊর্ধ্বগতি বাজারদরের সময়ে মেয়েকেও বিক্রিযোগ্য করে ফেলেছেন অনেকে তাই গোপনে অল্প যৌতুক দিয়ে বাল্যবিয়ে দেয়া ছাড়া উপায় থাকছে না। এইসব অপ্রীতিকর সমাজ রচনা আমাদের পক্ষে সুখকর নয়! চার. সাংসারিক অভাব এবং ৪-৫ জনের ভার বহনে হিমসিম খেয়ে— অনেকক্ষেত্রে এর সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু এর অন্যদিকে সবচেয়ে স্বার্থকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। যা মনুষ্যত্বের দিক থেকেওগ্রহণযোগ্য নয়। একদিন হয়তো আমাদের কীর্তিকলাপ দেখে বাঁদর‌ও ফোকলা হাসি দেবে।

 বাঙালির মুখে এক কাজের বেলা আরেক এই হলো বাঙালির মন। আমরা যতদিন না ভেতরে লুকিয়ে থাকা ধী শক্তি সঞ্চয় করতে পারি, ততদিন আমাদের উন্নতি নেই। দুর্বলতা আমাদের ক্রোমে ক্রোমে গ্রাস করছে। এই রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি পেতে আমাদের তীব্র লড়াই করে যেতে হবে। মনুষ্যত্বের পাঠ ছড়িয়ে দিতে হবে প্রান্তিক জনপদ থেকে শহর বন্দর অব্দি। পৃথিবীর সমস্ত কিছু মনুষ্যত্বের পাঠে যুক্ত হয়ে সুশৃংখল একটি সমাজ যেদিন আমাদের উপহার দেবে— সেদিনই আমি সার্থকজন্ম বলে মেনে নিতে পারি।

আমাদের উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে নয়তো যে সুখের আশায় বুক বেঁধেছি তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিজেকে ছোট করে ফেলবে। মানুষ শব্দটিকে আজ বড় ক্লান্ত মনে হয়। ক্লান্ত মনে হয়— কিছু আবাল-বোদ্ধাদের যাদের তদারকি দেখলে লজ্জায়, ঘৃণায়, আক্রোশে সম্মানটুকু বেচতে হয়। নিজেকে প্রশ্ন করতে শিখুন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আপনার অবদান কতোটুকু।....

Post a Comment

0 Comments