গদ্য — ০১
সকাল সকাল হাপিত্যেশ কাজ করলে— সুপ্রভাত হারিয়ে যায়। জানাশোনা জীবনের গল্পগুলো এডিট করে পুনরায় রেখে দিতে হয়। যাহোক মাত্র তো একটাই জীবন।
বন-জঙ্গল পার হয়ে এখনো জীবন দেখি, অপরূপ ভঙ্গিমায় রহস্যের পারদ নামছে। এ যেন নটরাজের প্রকৃতিপুরুষ খেলার অসম্ভব পরিণতি। যেদিকে তাকাই চঞ্চল ঘোরের ভেতর কোন আগন্তুক সর্বনাম।
আয়ু ক্ষয়ের যেসব গল্প হাতের আঙ্গুলে হিসেব রেখে করতে হয় তাও ভেবে দেখেছি স্বার্থপরতার আবরনে। যারা চলে যায়, প্রেম নিয়ে প্রকৃতির কাছে মাঝে মাঝে ফিরে এসে ফাল্গুনী হৃদয়ের মর্মর কুড়াতে হয়। প্রেমিক মাত্রই গোটা গোটা সূর্য পকেটে ঢুকিয়ে বের করে আনে শান্ত-স্নিগ্ধ চাঁদের ঝলকি জোৎস্না। সেদিন ব্রহ্মপুত্রের নিবিড় ঢেউয়ে মন বসিয়ে দেখেছি, কীভাবে ফেলে আসা যায় সুদূর অতীতের অর্বাচীন স্মৃতি। মাঝে মধ্যে লুকাতে চাওয়া ছোট ছোট গল্প ধীরে ধীরে সময়ের কাছ হার মেনে নেয়। যখন যা ইচ্ছে হয়, তা অবশ্য করা হয়ে ওঠে না। প্রকৃতি আপন বেগে নিজকে নিয়ে ছুটে চলে অজানার প্রান্তরে। আর আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে জীবনের আমলনামা গুছিয়ে রাখি।
মনে হয়, সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে মানুষের হৃদয়ে তাই তো মানুষ বড় বড় অভিযানের সাক্ষী হতে পেরেছে। এলোপাথাড়ি জীবন নিয়েও মাঝে মধ্যে অতিমানসের কাজ করে বসে। এসব ভাবতে ভাবতে চোখ জুড়িয়ে আসে। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ।
প্রকৃতির কাছে গিয়ে যারা প্রশ্ন করতে পেরেছে জীবনের তারা কালকূট পান করেও ভীত হন না। প্রকৃতির অপার স্নেহের আবর্তনে ঢেকে দিয়েছে পুরোটা জীবন। যেন মায়ের কোলে আমি এক দুরন্ত কিশোর বসে বসে আদর কুড়িয়ে রঙ্গিলা অন্তরের গান ধরেছি।
যেসব ম্লান মিশে গেছে বাতাসের দেহে সেগুলো নিয়ে রাত্রির আলপনা রোজ রোজ এঁকে যাচ্ছি। জেনেছি, বাতাসের কাছে উদার মনে দুঃখ উড়িয়ে দেওয়া যায়। বৃষ্টির কাছে চোখের জল আর সময়ের কাছে ঘর্মাক্ত শরীরের দুর্গন্ধ নিয়ে বেঁচে থাকার ট্রাজেডি লক্ষ্য করা যায়। জীবন একটা জলসাঘর। সারাদিন উঠবস করে তাল মিলিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত ঝোঁক থেকেই যায়। পাগলের অভিনয় করে বেঁচেবর্তে থেকে একটা জীবনের পাঠ মুখস্থ করা মৃত্যু আগ মুহূর্ত পর্যন্ত।
বিস্তর সময় পড়ে আছে যাদের হৃদয়ে তারা যেন প্রদীপ নিভিয়ে ফিরে না আসে। ঐ জ্বলজ্বল শিখাটিই ধুক্ ধুক্ করে বাঁচিয়ে রাখে যতসব ইতিহাস।
নিজেকে পুষে পুষে ব্যামো ধরিয়ে দিলে তার আর কোন মূল্য থাকে না। একটু গুছিয়ে নিয়ে সময়ের সাথে তাল মেলাতে হয়। সকলকে কাছে টেনে মানবযোগের ধ্যানে মগ্ন হতে পারলে ভবিষ্যতকে ধরে রাখা যায়। একেকটা পৃষ্ঠা জুড়ে নিজেকে মেলা ধরা যায়। আমরা যাদের পাগল বলে, হৃদয়ের থেকে তাড়িয়ে দিয়েছি তারাই একদিন অমৃতকুম্ভ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে ব্যর্থতার বুনন শিখি। গতকাল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আজকের ইতিহাস মুছে ফেলে সময়ের কাছে অপরাধী হয়ে যাই।
গদ্য — ০২.
‘পহেলা বৈশাখ’ আপনি কি ভালো আছেন? কথাটির উত্তর আসতে খানিকটা বেগ পেতে হয় আমাদের মত সাধারণ মানুষের। বাংলা মাসের নাম মনে করতে গিয়ে ইংরেজি মাসের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করি। এসব লজ্জা গোছাতে গোছাতে একটা পরিপূর্ণ বাক্স করে ফেলেছি, কুলকুচি করে ফেলে দিয়েছি প্রতিটি সকাল। আর বৈশাখ এলে রঙের বালটি নিয়ে পথচারীর গায়ে ছিটিয়ে দিয়ে আনন্দের ভাগ নিতে গিয়ে আর হয়ে ওঠেনি।
‘বৈশাখ’ শব্দটি উচ্চারিত হলে মনের ভেতর দুর্বার সজাগ পাওয়া যায়। যেন নতুন করে শুরু করা পূর্বাসার সংসার। চারদিকে হইচই মেলা বাড়ির গুঞ্জনে শিশুর অজস্র বায়না পিতার পকেটে ভিড় ঠেলে যায়। মেঘেরা উৎপাত শুরু করে। চৈত্রের হাপিত্যেশ মুছে যায়। অথচ মনের মাঝে কোথায় যেন একটা লং দূরত্ব রোজ রোজ দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, পথ গিলে গিলে খাচ্ছে জীবন্ত মানুষ আর তার আধুনিকতা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে অহরহ জঞ্জাল। ভালো-মন্দের ফারাক খুঁজতে গিয়ে বারবার নিজের দিকে তাকাতে হয়। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি আস্ত একটা জীবন জুড়ে শুধুই রঙচালাকি।
আমরা শিখি কেমন করে, বিষকাঁটালী দিয়ে পোকামাকড় তাড়াতে হয়। মড়ক বলি মানুষের হৃদয়, হয়তোবা মানুষ নয় সে, গ্রাসে গ্রাসে তুলে খায় ভালোবাসার মতো কয়েকটি হৃদয়। নববর্ষ এসে চলে যায়, বাঙালির ভর্তা ভাতে মন বসে না, রেস্টুরেন্টের বিলাসীতা মুখে তুলে কি করে নাড়ির স্পন্দন ভুলে যায়? গেলাসে গেলাসে হরিৎ পান করে দেখেছি। ১লা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) এলে হাত গুটিয়ে বসে থাকে ঘরের কোণে— ওঁরা কারা? ভগ্নাংশের দোহাই দিয়ে আমাদের থেকে কেড়ে নেয় আস্ত একটা পৃথিবী। এত সব জটিল অংকের কোষাগারে ছোট ছোট প্রাণ কি করে বাঁচে? সংস্কৃতির আবহ ধরে মেলে ধরা যায় দুরন্ত সকাল। কাউকেই খুঁজে পাই না এই সকালের মাঠে। শূন্য মাঠ জুড়ে পড়ে থাকে বিস্তীর্ণ হৃদয়। হৃদয়ের কথা শুনে না কেউ। আর সেই সব শূন্যতা নিয়ে খেলা করতে করতে আমি থেকে যাই শূন্যের আবর্তনে। শূন্যতাকে নববর্ষের আনন্দে পূর্ণত্বে উন্নতি করা যায়। কিন্তু এমন একটা সময়ে এসে আমরা উপস্থিত হয়েছি, নববর্ষের কথা শুনলে গায়ে মোচড় দিয়ে ওঠে বিষম। পায়ে পায়ে এগোনোর পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। পুরাণকাররা যে রাহুকেতুকে ছুড়ে দিয়েছিল, তারাই এখন ফিরে এসে লন্ডভন্ড তাণ্ডব করছে। বৈশাখ হয়ে উঠেছে বিস থেকে বিষ।
রমনার বটমূল কিংবা কৃষ্ণচূড়া মঞ্চ থেকে দোয়েল পাখি আপন মনের কথা বলতে কি পারবে কোনদিন? সংস্কৃতির বাজারে লাটাই নিয়ে কোন শিশু উড়াল দেবে মেলা মেলা বলে? বাক্ দেবী জেনে রাখো, মুছে যাচ্ছে অতীতের উজ্জ্বল ইতিহাস।
চৈত্ গাজনের দিন থেকে হাসি উল্লাস নিয়ে নতুন বছরের শুভেচ্ছা বার্তা চলে আসে। নাড়ির স্পন্দনের সাথে মিলিয়ে নিতে পারি না সংস্কৃতির জোয়ার। চারদিকে হইচই যক্ষের দল, রাহুকেতুর সংক্রমণ নত হতে বাধ্য করছে কিন্তু বাঙালির প্রাণের উন্মাদনা সৃষ্টির অপূর্ব ঐশ্বর্য নিয়ে বেঁচে থাকে খেটে খাওয়া মানুষের অসহায়ের মত।
নববর্ষ নিয়ে এতসব বিষবাষ্প পেড়িয়ে বাঙালি তার উদার হৃদয় মেলে ধরেছেন মানুষের কাছে। সকাল হতে না হতেই মঙ্গল শোভাযাত্রা বিশ্ববাসীর কল্যাণে। বাঙালির চেয়ে এত ভালোবাসে কে? এত উদারতা কোথাও দেখিনি। বাঙালি সংস্কৃতির ছোঁয়া বিশ্ববাসীর হৃদয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ। পহেলা বৈশাখ শুধু নয়, সারা বছর জুড়ে উৎযাপিত হোক বাংলার সংস্কৃতির জলসা। যাতে করে কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হতে না হয় আগামী প্রজন্মের কাছে। আমাদের ঋণের বোঝা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাঁধে চাপিয়ে না দিয়ে সুকুমার শিল্পের চর্চার অব্যাহত থাকুক সে ব্যবস্থায় যেন আমরা করতে পারি। সহজ সরল অভিব্যক্তি দিয়ে বিশ্বের কল্যাণে বাঙালির উদার হৃদয় বেজে উঠুক।
১৩ এপ্রিল ২০২৪ — ৩০ চৈত্র ১৪৩০
চিলমারী , কুড়িগ্রাম
গদ্য—৩
হাজার ব্যর্থতা নিয়ে একটি সফলতা চোখ তুলে দাঁড়ায়। আর ব্যর্থ মানুষদের কাছে থাকে সফলতার চাবি। সারাদিন টইটুম্বুর নষ্ট মাথার চিবুক গুলিয়ে যারা বেদনার চাষ করে রেখে গেছেন অরণ্যের সাজ তারা এখন জলসা নিয়ে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ায়। ব্যর্থতা নিয়ে আমাদের অভিমান। আর অভিমান এলেই মনের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। সেই যাতাকল থেকে আমরা বের হতে পারি না। সবকিছু ভেঙেচুরে তার হৃদয় দেখায়।
মাঝে মাঝে শ্রাবণের পানিচক্রে মেঘ হয়ে থাকতে হয় মেঘের হৃদয়ে। একটা আকাশের বুকে এতটুকু অন্ধকার কাল ঘুম থেকে বাঁচিয়ে তোলে। যারা চলে গেছে, ব্যর্থ জীবন নিয়ে জীবনের থেকে বহুদূরে, হৃদয়ে লুকিয়ে ফেলেছে চাঁদের জোছনা ধার করা আলো নিয়ে আর যারা আবার ফিরে এসে সূর্য হয়ে মানুষের দুয়ারে দাঁড়াতে চায়। তাদের বকলসহীন জীবন দেখেছি সময়ের যাতাকলে চলে গেছে ব্যর্থতার হাপিত্যেশে।
তৃতীয়া তিথির চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভেবেছি জীবনের পূর্ণকলা পূরণ হতে আরো অনেক দেরি তাই বলে কি অন্ধকারে কন্টকলতার মালাগাঁথব! তাই যদি হয়, জীবন কেন রুপার থালার মত ঝলমল করে অন্ধকারে? অতিমানসের চোখে চোখ রেখে অন্তর্হিত সত্যের দিকে ধাবিত জীবন দেখেছি বারবার উপেক্ষা করেছে। দাঁড়িয়ে থেকে অনভ্যস্ত আমি দাঁড়ানোর হ্যাবিট নিয়ে রোজ রোজ গল্প বলে যাচ্ছি। মহাকাল অবশিষ্ট কিছু রেখেছেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন করছি না! অর্বাচীন স্বপ্ন নিয়ে আকাশের হীরকদ্যুতি চেয়েছি ছোট ছোট স্বপ্নের বারুদ জ্বালিয়ে। কিন্তু থেমে থাকা জীবন নিয়ে যেসব প্রশ্ন মনের মধ্যে উথালপাথাল খেলে যায় তার জন্য দ্বিতীয় কেউ বরাদ্দ রাখিনি। দ্বিতীয় থাকতে নেই। ভগ্নাংশের দোহাই দিয়ে অনেকে বেঁচে যায়।
সময়ের কলকাঠি নাড়ালে চাঁদেরও অমাবস্যা হয়। ঝুম বৃষ্টির দরকার হয় না। পায়ে ভর দিয়ে চলতে গেলে শ্বাস ফ্যাংশনের অপারেটর হয়ে জ্যান্ত একটা মেদবাহী যন্ত্র চালাতে হয়। —এই একটা আস্ত যন্ত্র নিয়েই বেঁচে থাকা। বেঁচে থেকে থেকে একটা মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়া। তারপর যা থাকে, তা দিয়ে শ্রাবণ ধারার সাথে আপনজনেরা আকাশে নক্ষত্র বৃদ্ধির অলীক সূচনা করেন।
গায়ে পুলক লাগিয়ে যতসব গেছে জীবনের যাঁতাকলে। এক একটি পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখেছি, জীবনের অস্তিত্বের পাখাওয়ালা স্মৃতির সারাংশ বেঁচে থাকার ট্রাজেডি। অল্প অল্প করে বৃহৎ সময়ের সমাহার। মেঘে মেঘে বুনোট আকাশ ছেঁয়ে গেছে কাদামাখা মেঘরঙ শরীরের সমুদ্রযাত্রা। তবু একটা জীবন অস্ত পাড়ের সূর্য থেমে থাকার অবকাশ পায়নি কখনো তাই অন্ধকার আসে।
নিভে নিভে হঠাৎ জ্বলে উঠলে অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। শোনা যায়, টমাস আলভা এডিশন দশহাজার বার ব্যর্থ হয়েছেন কিন্তু আলোর সমুদ্র নিয়ে একদিন ঠিকই আমাদের সামনে হাজির হয়েছেন। এতটা স্পৃহা, এতটা দুঃখ, এতটা অপেক্ষা ছাড়া পূর্ণ জীবনের সংকেত পাওয়া যায় না। একটা রেখা ধরে এগোতে হয় অদৃশ্য রেখার পেছনে। অনন্ত আকাশের সমস্ত জুড়ে হৃদয়ানুভূতির স্পন্দন জাগাতে পারলে সার্থকতা পায়ে পায়ে এসে ধরা দেয়।
সার্থকতা কোথায়? জীবন যেখানে ব্যর্থ হয়েছে সেখানেই যিনি শুরু করেছেন ছন্দের দেদুল্যমান অভিযান ত্রাটক দৃষ্টি রেখে বলতে পারি, মহাকালের স্রোতে অভিষ্ট একদিন পূর্ণত্ব প্রাপ্তি পাবে। এর জন্য অম্লান সাধনার একান্ত প্রয়োজন। সমস্ত সুখ-দুঃখকে একটা গ্রন্থির মধ্যে এনে সেটাকে নিজের অস্তিত্বের উন্নতির পর্যায়ে উপস্থাপন করতে হবে। অতীত এবং বর্তমান সময়ের কালক্ষেপণকে একটা স্ট্রাকচারে নিয়ে ফলাফল বের করে কতটুকু লাভ হলো সেটা বের করে একটা উপায় আয়ত্ত করা যেতে পারে। এর জন্য একটু চিন্তা-চেতনার প্রয়োজন। ভাবনা শক্তিকে প্রগাঢ় করে হাপিত্যেশের একাল-সেকাল বিবেচনা করে একটা পূর্ণ উপলব্ধির জগত খুঁজতে পারি। যেটা—মানুষের একান্ত নিভৃত একটি কাজ।
গদ্য—৪ ব্রহ্মপুত্র স্নান, অষ্টমী ও চিলমারি
এইসব সংহিতা পুনর্বার খুলতে হয়েছে আমাদের। ব্রহ্মপুত্রের শরীরের ভেতর ঢুকে দুগ্ধস্নানে মত্ত হতে কে না চায়! সবাই চায়! মোহভঙ্গের, মড়ক থেকে উদ্ধারের; যাপিত জীবন ও মানুষের সুখানুভূতির প্রয়াস। প্রতিটি পৃষ্ঠা জুড়ে সংগ্রাম আর হাপিত্যেশ। আহা! ব্রহ্মপুত্র। আহা! চিলমারি। এইসব জীবনের আরতি শুধুই কি মোহভঙ্গের নাকি মানবিক মানুষ হওয়ার?
একটি দিনের সংহিতা খুলে এমন উল্লাসে থাকতে কাউকে দেখিনি! তবু রাতভর তোমার শরীর সকেটে নিয়তির নিশানা তাক হয়ে আছে— আবেগ, অনূভুতি ও প্রাচীন মানুষের কল্পিত উপমায়। হৃদযাত্রা, স্নানযাত্রা, ব্রহ্মপুত্র যাত্রা —এই কি অনাদিকালের রেখা ধরে আমাদের পদচারণা।
প্রশ্ন জাগে, কল্পিত প্রশ্ন, ব্রহ্মপুত্রের দেহ হতে নেমে আসা মোহের মাধুরী নিয়ে প্রশ্ন, কে এই ব্রহ্মপুত্র? পুরাণকার কি বলেন? কেন বলেন?
ব্রহ্মের পুত্র ব্রহ্মপুত্র। কেন তিনি ব্রহ্মপুত্র? তিনি অমোঘা গর্ভসম্ভুত শান্তনু মুনির পুত্র। ভগবান ব্রহ্মার অংশজাত। তিনি ‘ব্রহ্মকুণ্ড’ থেকে বের হয়ে ছড়িয়ে গেলেন দিগ্বিদিক। মানুষের জন্য, কল্যাণের জন্য এই ছুটে যাওয়া। কামরূপের অন্তর্গত অনেকগুলো তীর্থ আছে তার মধ্যে ব্রহ্মপুত্র অন্যতম প্রসিদ্ধ তীর্থ। পুরাণকার বলেন, শান্তনু মুনির স্ত্রী অমোঘা ব্রহ্মার শক্তি বলে ব্রহ্মপুত্রকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন এবং গর্ভ প্রসূত সন্তান (গর্ভে কোনো সন্তান ছিল না, সেটি কেবলমাত্র জল ছিল) কৈলাস পর্বতের এক কুণ্ডে রাখেন, যার নাম ‘ব্রহ্মকুণ্ড’ অথবা ‘লৌহিত্যাখ্য ব্রহ্মপুত্র।’
মাতৃহন্তারক পরশুরাম পাপ থেকে মুক্তির জন্য এবং ভগবান ব্রহ্মার আদেশে জীবেরমঙ্গল হেতু ব্রহ্মকুণ্ডকে জনসম্মুখে নিয়ে আসেন, তিনি পরশু অর্থাৎ কুঠার দিয়ে ব্রহ্মপুত্র খনন করে নারায়ণগঞ্জের নিকটে লাঙ্গলবন্দে পাপমুক্ত হন। বলা হয়ে থাকে, কুড়িগ্রামের চিলমারিতে ভগবান পরশুরাম ব্রহ্মপুত্র খননকালে ক্লান্ত হয়ে কিছুক্ষণ এখানটায় বসেছিলেন, তাই অনাদিকালের এই স্নানযাত্রা।
তাছাড়া অষ্টমী তিথিতে স্নানযাত্রায় পুণ্যফলের কথা শাস্ত্রকারেরা বলেন। এই দিন বসন্তকালীন দুর্গা অষ্টমীর শুভ মুহূর্ত। দুর্গাপূজা। অন্নপূর্ণা পূজা। অশোকাষ্টমী কিংবা বুধাষ্টমী। পুনর্ব্বসু নক্ষত্রযোগে। চৈতি শুক্লপক্ষে তর্পন ও স্নানে বাজপেয়ী যজ্ঞের ফল বা সকলতীর্থের ফল লাভ হয়।
চিলমারি অষ্টমীর কথা শোনেননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল, উত্তরের সবচেয়ে জনবহুল মেলা, প্রায় ১০ লক্ষ পুন্যার্থীর সমাগম, ঢোল, করতাল, জুরি, কাশি, শঙ্খধ্বনিতে মূখর দেবভূমিতে এইসব মানুষের কোলাহল। জনসমুদ্রের উত্তাল আয়োজন চিলমারিকে নবযৌবনা, রূপসী, ষোড়শী করে তোলে। বালিয়াড়ি চড়ে পড়ে থাকে মানুষের পায়ের চিহ্ন। ক্লান্তিরা হেঁটে হেঁটে স্বস্তি-কুড়ায়। পৃথিবী ডুব দিয়ে ওঠে ব্রহ্মপুত্রের রূপসী গতির ধারা লক্ষ্য রেখে। অমৃতস্নানে যেন সকল পাপ ধুয়ে যাবে, মানুষ জগবে ফের, মানবিক আয়োজনে।
ভারত থেকে মানুষ আসছে, নেপাল থেকে মানুষ আসছে, ভুটান থেকে মানুষ আসছে, মানুষ আসছে কাতারে কাতারে। গত রাত্রি যাপনের লঘিমা-দ্রাঘিমা অতিক্রম করে, মাটিতে মাথা ঠেকে, শিশু , বৃদ্ধ ও যুবকের দল শুয়ে আছে; পূর্বদিন হতে ক্লান্তির অবসরে, তবু ক্লান্তি নয়! জার্নি নয়! মানুষের মোহ; কাঠ-খড়ি দিয়ে পেটের হৃদ্যতা মেপে মেপে পুরোটা সময় পার করে দেন এইসব মোহমানবের দল। সারারাত আকাশে তারাদের ঝলকানি, চারদিকে কোলাহল মাঝখানে অপরূপ সৌন্দর্যে মোহিনী ব্রহ্মপুত্র। বারবার দেখে মনে হয়, কে যেন এঁকে দিয়েছে ভ্যান গগের ঈশ্বরীয় পোট্রেট।
ভোর রাত্রিতে কতবার যে পদযাত্রায় বের হয়েছি পায়ে পায়ে চলে গেছি চিলমারি হাজার বছরের কৌতুহল নিয়ে। অথচ কোন ক্লান্তিই যেন আমাকে শ্রান্তি দিতে পারেনি। রাতভর জলসার আয়োজন তাই নিয়ে মেতে থাকি সারাক্ষণ। একদিকে উত্তরের বৈঠকি পুরাতনী গানের ঝংকার অন্যদিকে কীর্তন, ভাওয়াইয়া, পাঁচালী গান, গুরু-শিষ্য তরজা ও রবিদাসী সম্প্রদায়ের ভিন্নভাষী গানও প্রাণের আর্তিকে বারবার ফিরিয়ে আনে হৃদয়ের কাছে, হৃদয় মেলে দেখা যায়, স্বচ্ছ পূর্ণিমার ছলে দাঁড়িয়ে আছে আমার মতই কয়েককোটি হৃদয়। যেসব হৃদয় অন্য হৃদয়কে আকুল করে, ব্যাকুল করে, অনূভুতির সারমর্ম বুঝায় সেইসব হৃদয়ের ভজনাও আমাদের করতে হয়। মেলায় আর যাই হোক না কেন, আমার সবচেয়ে ভালো লাগে হরিজন বা রবিদাসী সম্প্রদায়ের গাওয়া পদগুলো, যদিও সেগুলো হিন্দিভাষী গোত্রের কোনো একটি ভাষা হবে হয়তো তবুও তাঁদের ভাব-প্রয়াস বহুজনের মতো আমাকেও মুগ্ধ করে। ওদের নিজস্ব একটা ভাষা আছে, সে ভাষায় তারা গান করে রাত্রিযাপন করে। সে ভাষা বুঝতে আমি অক্ষম। আর অন্যদিকে এ অঞ্চলের প্রচলিত পুরাতনী গানের আসর বসে “দেহের আয়না খুলে দেখলাম হয়/মনের মানুষ কোথায় পাওয়া যায়” “হরি জনমে জনমে করি যেন তব গুণগান” “এপাড় থাকি না যায় দেখা ঐ পাড়ের কিনার” “গুরুর পদে প্রেম-ভক্তি হইলো না মন হবার কালে” “ও মোর প্রাণ সুয়া একদিন যাবু দেহার আন্দার করিয়া” ইত্যাদি গানের মধ্য দিয়ে নিজেকে ফিরে পাওয়া যায়। মস্তিষ্ক জুড়ে বসে থাকে ভালোবাসার আদিম দেবতা। ব্রহ্মপুত্রের নিবিড় কলরবে আমাদের পায়চারি একটি দিনের জন্য মানুষের সংহিতা খুলে।
চিলমারি অষ্টমী মেলাকে কেন্দ্র করে সারা মাস জুড়ে মানুষের মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। চিলমারি উপজেলার প্রতিটি বাজারে একেকদিন মেলা বসে। পরদিন নবমীর সন্ধিক্ষণে সিঁন্দুরমতির মেলা। অষ্টমীর আটদিন পর বসে মাদাইখালের কালীর মেলা, বৈশাখ মাসজুড়ে (শনি-মঙ্গলবার) ধামশ্রেণী ঠাকুরবাড়িতে সিদ্ধেশ্বরীর মেলা, তাছাড়া চ্যাঙড়ার মেলা, বালাবাড়ী, রাণীগঞ্জ, ফকিরেহাট, রমনাবাজার, ব্যাপারীরহাট, নয়াবাজার ইত্যাদি জায়গায় চিলমারি অষ্টমী উপলক্ষে মেলা বসে। মেলা আমাদের উৎফুল্ল মনে সুকুমার চিন্তা জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে। সংস্কৃতির বাহক, সুন্দরের পূজারী ও আনন্দ। মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় কারুশিল্পের সমহার, খই, বাতাসা, মুড়ি, মুড়কি আরো কতো কি! এ যেন মোহাবিষ্ট সংস্কৃতির ঈশ্বরীয় প্রতাপ। চোখ ধাঁধানো ভালোবাসা। এইসব ভালোবাসা আমাদের সংস্কৃতিমনা করে তোলে। নাড়ির স্পন্দন জাগায়, শুনতে পাই, আদিম দেবশিল্পের মোহ থেকে নেমে আসা মানুষের জয়ঢাক।
‘ওকি গাড়িয়াল ভাই হাকাও গাড়ি তুই চিলমারির বন্দরে...’ সভ্যতার প্রাচীর ডিঙিয়ে এইসব দিন আজও কতো আধুনিক, মায়াবী, মোহের মাধুরী, সুকুমার ঐশ্বর্য্য! একটা উৎসব একটা সংস্কৃতি বৃহৎ হৃদয়ের আয়োজন। সমস্ত অতীত এনে জড়ো করে নিজের বিরাট দেহ পুষ্ট করে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নতুন কিছু কথা বলতে ছোট ছোট জীবনের অভাবনীয় গাঁথাগুলো চোখের সকেটে রেখে যাওয়া আর ইতিহাসের মুখোমুখি দুরন্ত চিলমারির শুভেচ্ছা বার্তা মুঠোফোনে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বিশ্বের দরবারে। যাতে করে, সময়ের গোটা গোটা জুম উঠে আসে পৃথিবীর ছোট ঘরে।
[পুনঃ সংস্করণ ০৪ এপ্রিল ২০২৫]
১৬ এপ্রিল ২০২৪
মহাষ্টমীর দিন বাড়িতে।
গদ্য—০৫ • পৃথিবীর মায়েদের জন্য এই গদ্যটি
মা শব্দটি উচ্চারিত হলেই পৃথিবীর যাবতীয় সুখ তৎক্ষণাৎ এসে ধরা দেয়। —এই একটি মাত্র শব্দ দিয়ে বিশ্ব জয় করা যায়। প্রতিটি সন্তান চায় মাকে কাছে পেতে সবসময়ের জন্য যাতে অমোঘ সত্যকে তুড়ি দিয়ে সর্বতভাবে স্বর্গের কথা ভুলে গিয়ে মায়ের কোলে নতুন করে স্বপ্ন আঁকা যায়। শুনেছি, স্বর্গের চেয়েও নাকি মায়ের কোল সর্বোৎকৃষ্ট! —এজন্যই মায়ের কোন বিকল্প হয় না।
আর সবচেয়ে দুঃখী কে জানেন? —ওই হতভাগিনী মা। সন্তান জন্মানোর পূর্ব মুহূর্ত থেকেই দুঃখ ভোগ কিন্তু প্রকৃতির নিয়মের মতো তাঁর উজ্জল আভা ছড়িয়ে দিয়ে ঠিক যেন বটবৃক্ষ হয়ে নিতান্তই ছায়া দিয়ে যাচ্ছেন অবিরত। একটু একটু করে বড় করা —এই যে একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্তনদুগ্ধ পান করিয়ে আমাদের মৃত্যুঞ্জয়ী করে তুলেছেন, যাতে করে কয়েকটা যুগ অনায়াসে পেরিয়ে যাওয়া যায়। তাই আমার মাকে হিমালয়ের সাথে তুলনা করতে আমার সাহস হয় না। যিনি স্বর্গেরও উর্ধ্বে তাকে হিমালয়ের মত তুচ্ছ পর্বত দিয়ে অনুভব করে মা শব্দটির অপমান করতে চাই না।
সবচেয়ে আশ্চর্যকর তথ্য কি জানেন? —মা শব্দটি মুক্তাক্ষর। মা উচ্চারণ করতে গিয়ে শ্বাসাঘাত হয় না। একজন বোবা সন্তানও এত আবেগ দিয়ে মা শব্দটি উচ্চারণ করতে পারেন দেখে আপনি চমৎকৃত হবেন। মাঝে মাঝে গৃহপালিত পশুগুলোর গলার আওয়াজ শুনে মনে হয়, ওই বোবা পশুটিও যেন নির্দ্বিধায় মা শব্দটি বলতে পারছে। বিশ্বাস না হলে ট্রাই করে দেখতে পারেন।
আমার সাহিত্য সাধনার প্রথম লেখাটি ছিল মাকে নিয়ে। মাকে নিয়ে তাবড় তাবড় গ্রন্থ পড়ে শেষ করা যায় কিন্তু মাকে বিশ্লেষণ করা যায় না। মনের চৌহদ্দিতে যতসব অগোছালো ভাবনা তাড়না করে ফেরে —সেসব ভাবনাকে বুক পকেট থেকে বের করে আনে মায়ের স্নেহ। কিন্তু জীবন যেখানে স্তব্ধ সেখানে সব ভালোবাসার পরিণতি একই হয়ে থাকে। চলমান জীবনও কখনো কখনো থমকে দাঁড়ায় মানুষের দরবারে। আমি সেই জীবন দেখেছি, নিভৃতে যতসব নিষ্ঠুরতা ওত্ পেতে আছে ভবিষ্যৎকে বিগড়ে দেবে বলে। সেতুহীন খাদ পাড়ি দিতে বিরহীর কয়েকটি প্রজন্ম কেটে যায় অপেক্ষার আস্তরণে। অভিমান করে কেউ কেউ জমে রাখে চোখে সমুদ্রস্রোত —তাই বলে তো সমুদ্র শুকিয়ে যায় না, সমুদ্রের কাছে আবদার করে লাভ নেই জেনে বারবার তার অপরূপ নিষ্ঠুরতা সহ্য করেও বেঁচে থাকার মন্ত্র জপি। দুঃখ তখন হয়ে যায় ঐশ্বর্য্যমন্ডিত। দূরে থাকা ভালো, হৃদ্যতা বাড়ে।
মাকে নিয়ে আমার কোন অভিযোগ নেই। সৃষ্টির প্রথম অভিযানে তিনিই একমাত্র সঙ্গী ছিলেন। চারদিকের সমস্ত নাদধ্বনির মধ্যে একমাত্র কান্না ছিল আমার সঙ্গী। সময় পেরিয়ে গেছে নদীর স্রোতের মতো ধীরে ধীরে স্তনপান শেষে কর্মঠ সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছি। পৃথিবীর মানচিত্রের এপার থেকে ওপার অল্প অল্প জানা হয়ে গেছে ভূগোলের প্রকৃতিপুরুষ কাহিনীর সারাংশ খুঁজতে গিয়ে। এগিয়ে গিয়ে দেখেছি, বুনো ঘাসের মতো আমার জীবন জড়িয়ে আছে মাটির সাথে। যত দূরে যাই সৃষ্টির মহানন্দে তত কাছে আসি, মনে হয় যেন, মা ধীরে ধীরে কোলে তুলে নেন অবুঝ শিশু। সকালের সূর্য বন্দনা শেষে যিনি মুখে তুলে দেন অমৃতসুধা —সেই মায়ের চোখে চেয়ে কতবার দেখেছি আমার একান্ত নিজস্ব একটা পৃথিবী যেখানে দ্বিতীয় কোনো প্রভুত্ব নেই, ভালোবাসার অমোঘ স্রোতে ভেসে গেছে —সে জগৎ!
যারা আকাশ দেখলেই হাজার নক্ষত্রের ভিড়ে খুঁজে নেন একটি নিজস্ব নক্ষত্র। যাতে মাথা তুলে তাকিয়ে থেকে অনুভব করেন হাজার দিনের শৈশব স্মৃতি! —সেসব স্মৃতির ফাঁকে লুকিয়ে থাকে হৃদয়ানুভূতির স্পন্দন জাগানো মায়ের ঝলকানি। যাদের মা নেই, তাদের এক বুক আকাশ আছে যেখানে বলাকারূপী শৈশবস্মৃতি জোর দিয়ে উড়ে আসতে চায় টেলিপ্যাথি ভেদ করে কিন্তু কোথায় যেন থমকে যায়?—ক্ষণিকের নক্ষত্র থেকে থেকে যারা হাজার দিনের নক্ষত্র হয়ে যায় তাদের দিকে ফিরে তাকানোর অভ্যাস কারো থাকে না কিন্তু একমাত্র সে অভ্যাস সন্তানের থেকে যায়। তাইতো আকাশ এত বিশাল হৃদয় নিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ অতিক্রম করে হাজার হাজার দিনের গ্রাস করে।
দেয়ালের ওই কর্নারে বাক্সবন্দি হৃদয় নিয়ে যে ছবিটি ঝুলে থাকে তার দিকে তাকিয়ে থাকি —তাকিয়ে তাকিয়ে বলি একটা আধার পেরিয়ে এলাম। মাঝে মাঝে শ্রীরামপ্রসাদের ওই গানটি কেন জানি মনে পড়ে “মা হওয়া কি মুখের কথা/ (কেবল প্রসব ক'রে হয় না মাতা)/যদি না বুঝে সন্তানের ব্যথা/দশমাস দশদিন, যাতনা পেয়েছেন মাতা/এখন ক্ষুধার বেলা সুধালে না, এল পুত্র গেল কোথা” কিংবা “মাতা বর্তমানে, এ দুঃখ সন্তানে/মা বেঁচে তার কি ফল বলনা” কেন মনে পড়ে? —এ প্রশ্নের উত্তর দিতে চেয়ে পরক্ষণেই আরেকটি গান মনে পড়ে যায় “কুপুত্র অনেক হয় মা/ কু-মাতা নয় কখনও তো ” ধীরে ধীরে কোথায় যেন সব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়। আমাদের সব অভিযোগ প্রাণযোগে পরিণত হয়ে নতুন নতুন সৃষ্টিকল্পের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আবার প্রনয়ের পৃষ্ঠা মেলে ধরে। মা মা বলে ডেকে কোথায় যেন হারিয়ে যাই, হারিয়ে যেতে যেতে নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন আঁকি যেখানে আমি এবং মা নিভৃত যতনে শ্বাস নিই।
পৃথিবীর হাজার শব্দের ভিড়ে যখন একটি মাত্র শব্দ ‘মা’ আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয় তখন যাবতীয় শব্দকে তুচ্ছ মনে হয়। এলোপাথাড়ির দিকে চলে যেতে যেতে চোখ মেলে দেখি, মাকে নিয়ে একটি শব্দও লিখতে পারিনি। অনন্ত আকাশকে মেলে ধরা যায় কিন্তু সীমারেখা পরিমাপ করা যায় না। শুয়ে শুয়ে ভাবা যায় একটা ক্ষণিকা প্রকৃতিপুরুষ খেলার ছলে সৃষ্টির মহানুভবতা শুরু করেছিল, সেই থেকে আমি মহাকালের রথে মা শব্দটির সাথে পরিচিত। প্রকৃতির অপার লীলাময় জগতে আমি কোন তুচ্ছ কিছু নই, প্রকৃতির অংশজাত। মাঝে মধ্যে দূরে থেকেও বাতাসের কাছে গিয়ে মায়ের স্পর্শ লক্ষ্য করা যায়। টেলিপ্যাথির জগৎ ঘিরে মা এবং সন্তানের মধ্যে অতিমানসের মতো স্নেহ কাজ করে। হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের সংযোগ। রক্তের সাথে রক্তের বহতা। সময়ের সাথে সাথে বিরাট দেহ নিয়ে মহাকালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়।
মহাকাল যাকে নাড়ির সাথে যুক্ত করেছে তাকে নাড়ি ছেঁড়া ক্রন্দনের উপহাস দিয়ে বরণ করা যায় না। অদৃষ্টে কত কিছুই ঘটে যায় কিন্তু সন্তানের সঙ্গে মায়ের স্নেহভরা জীবন আজনম বহতা থেকে যায়। পৃথিবীর সব মায়ের কাছে সন্তানের আকুল আবেদন স্নেহমাখা শৈশবস্মৃতি! —যেটা সাথে থাকলে সারাটা জীবন অনায়াসে পার করে দেওয়া যায়। হৃদয় খুঁড়ে খুঁড়ে আমরা আবিষ্কার করেছি, মায়ের চেয়ে বড় কিছু নাই। তবুও কেউ কেউ এই হৃদয়ের কাছে প্রশ্ন রাখে নিভৃতে যতনে? —যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জলাকার পৃথিবীর টইটুম্বুর বালিশে মাথা রাখতে হয়। হৃদয়ের কথা কেউ জানে না, কেউ জানতেও চায় না, তাই অহর্নিশি ভেসে যায় —এই হৃদয়।
মাকে ভালোবাসার কথা মুখ ফুটে বলা হয়নি কখনো হৃদয়ের মেঘ সরে আসতে আসতে সব ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। নির্মল বাতাসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে কবে যে নিজেই আকাশ হয়েছি, জানিনা! —এখন সব নক্ষত্রেরা ডেকে ডেকে আমাকে ভীষণ ব্যস্ত করে দেয়। এখন আমি মাটির গান শুনি, মাটির পৃথিবী গড়ে তুলে প্রকৃতির ঘরে ঠাঁই নিই। যেসব গল্পের সমাধি হয় না সেসব গল্পের বাক্সবন্দী হৃদয় নিয়ে বসে আছি মহাসুখে।
( মা দিবসের জন্য এই লেখাটি “মনমানচিত্র” পত্রিকায় প্রকাশিত ১২ মে ২০২৪ )
গদ্য — ৬ অপেক্ষা
এক বগি থেকে আরেক বগি লাফিয়ে লাফিয়ে কয়েকটি স্টেশন পার হয়ে তোমার কাছে আমার ফুলের তোড়া রেখে গেলাম। আর তুমি গতকালকে ফিরিয়ে দিলে অবহেলায়। কারণ আজ তোমার রাত্রিকে বড় প্রয়োজন। যিশুখ্রিস্টের জন্মের আগে থেকে —এ রাত্রি তোমার জন্য একটি অসমাপ্ত পৃষ্ঠা ক্রুশ কাঁধে নিয়ে ভালোবাসা বিলিয়ে ফিরে। অথচ আমি পাথর বুকে কয়েকটি যুগ অনায়াসে কাটিয়ে দিয়ে বালতি বোঝাই দুঃখ নিয়ে ফিকিরি করি। কেউ কি কখনও শোনে, হৃদয়ের কথা। বুদ্ধের কাছে গিয়েছিলাম অথবা দীপঙ্করের বিশাল হৃদয়ের কাছে একগুচ্ছ ফুলের আবেদনে লালনের মনের মানুষের সন্ধানে। কোথাও তোমাকে তো রেখে আসিনি, ‘অপেক্ষা।’
যারা লাল ফুল ভালোবাসে তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছি একটা যুদ্ধ স্থির হয়ে আছে। ফুলেরা গন্ধ মুছে দাঁড়িয়ে যায় সম্মুখে। কখনও কখনও এড়িয়ে গিয়ে একেকটা সোনালী দিনের গল্পে তাল মিলায়। এতসব গল্প তো আমি হাসন রাজার কাছে দিয়ে এসেছি। কোন একজন ডাকিনীর অপেক্ষায় থেকে থেকে মেঘেদের আহ্বান ভুলে যেতে আসিনি। প্রকৃতির উদার হৃদয়ের কাছে আমার প্রতীতি রেখে রোজ রোজ সৃষ্টি করি সম্ভোগের সূত্রঃ —তাই ওরা সৃষ্টি করে, তাই এত রহস্যময় দেখায় ভ্যান গগের জল রঙ কিংবা লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’ পোর্ট্রেট করুণ কিংবা স্মাইল দৃষ্টিতে বিশ্বের তাবড় তাবড় হৃদয় জুড়ে আকাশের নীল ছুঁয়ে দেন। খানিকবাদে এলোপাথাড়ি জীবন নিয়ে হইহুল্লোড় ব্রহ্মপুত্রের নিবিড় আহ্বান আসে ছিনিয়ে নিতে বর্তমানের ইতিহাস। আহা! ভালোবাসা বাষ্প হয়ে উড়ে যায় মেঘেদের দেশে। কখনো কখনো কালিদাসের “বিধিনা বৈরিণা রুদ্ধমার্গঃ” মনেতে খাদ ফেলে হঠাৎ ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আজগুবি মনে হয়, বেতালের সব গল্প নিমিষেই বলা যায় নাকি? —এইতো বৃষ্টি হতে এখনো অনেক দেরি।
সন্ধ্যার কালসিটে দাঁড়িয়ে আছে আমার বেকলসহীন জীবন। তুমি লাইন টেনে টেনে বাড়িয়ে দিলে সমস্ত যৌবন। তবুও আমি উকিল মুন্সির গান ছাড়তে পারলাম না। গানের ভিতরে ঢুকে জাহাজের হালের মত ডুবে গেছি সমুদ্রের নীল জোছনায়। সমুদ্র তোমাকে চেনে? অথবা সমুদ্র নিয়ে তুমি বসে থাকো সভ্যতার কালসিটে। আর আমি বাউলের আখড়া থেকে একতারা নিয়ে ফিকিরি করে হরিনাথ মজুমদারের কাছে গিয়ে পরপারের খবর নিয়ে আসি। হরিনাথ মজুমদার আমাদের জন্য গান লিখেন...“হরি দিনতো গেল, সন্ধ্যা হলো, পাড় কর আমারে...” —এসব বৈঠকী আসরের প্রাণ। ভাঙা ভাঙা গর্ত থেকে হাপিত্যেশ তুলে এনে বর্তমানের কাছে হ্যান্ডসেক করায়।
‘অপেক্ষা?’ তোমার জন্য ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে হৃদয়ের নিকটে চলে আসি। তবুও তুমি স্রোতের মানে বোঝো না! নদীরও ভাষা আছে, চিরচেনা যৌবন আছে রুপার থৈ থৈ বাক্সে নিয়ে চলে সংগ্রামী জীবন অদ্ভুত আঁধারের দেশে। আর আমি বইয়ের ফাঁকে ফাঁকে গুছিয়ে রাখি অজস্র লাইনের ভেতর থেকে একটি লাইন ‘অপেক্ষা।’ তারপর তৃতীয়া তিথির চাঁদ সরে গেল ভূত চতুর্দশীর ঘনকালো অন্ধকার ভালোবেসে। মৃগশিরা, তোমাকে দিব না আমার অধিকার। হক সাহেবের জলেশ্বরীর কাছে রেখে যাব গোপন চিঠির শেষ স্লোগান। বর্ষামঙ্গল শুরু হওয়ার আগে আরেকবার যেতে চাই হুলিগানের আসরে। যেখানে কয়েকশো রাত কেটে গেছে নিশাচর ভেবে। অপেক্ষা? তুমি বুঝি আর ভালো নেই!
কত কাজ পড়ে আছে পৃথিবীর বুকে নিজ হাতে সেসব করে যেতে গিয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর পংক্তি লিখে কতকগুলো পৃষ্ঠা জড়িয়েছি অনায়াসে চলে যাব দূর অন্ধকারে। এইতো ক্ষণিকের ‘অপেক্ষা’ তুমি! তোমার জন্য মেলে দিয়েছি শৈশব, যৌবন, বৃদ্ধ আর উদরপূর্তি দুঃখ নিয়ে উকিল মুন্সীর হৃদয়ের কাছে পরাণের কথা কই! মন ভালো নেই। আজ রাতে আবুল হাসানের কাছে গোপন চিঠির প্যাডে লুকিয়ে রাখা কবিতার খবর নিতে হবে। এতসব কবিতা বন্যা হয়ে ফিরে যাবে সমুদ্রের কাছে —আহা! সমুদ্র ভার বইতে পারবে কি হৃদয়ের? নাকি ফিরে এসে হেলাল হাফিজের একাকিত্বের সঙ্গী হয়ে আজনম কাকতাড়ুয়া জীবন কাটাতে হবে! —এ কথার পূর্বাপর কোন উত্তর আছে কি জানা?
আমি আর থেমে থাকতে পারছি না, অপেক্ষা, মিলটনের অন্ধত্ব গতিরুদ্ধ করতে পারেনি কবিতার। দিবোরা, তুমিও থেমে থেকো না অলসতার শিকল পরে, লিখে যাও অবিরাম সবিতার রুদ্ররূপে মিলটনের ফাঁকা খাতা। এখন জরুরি হয়ে পড়েছে, দিব্য চেতনার আলো। আমাদের চৈতন্য ফিরিয়ে দাও, আনত রক্তিম পথ। সূর্য ডোবার পালা এখনো আসেনি। পথ রুদ্ধ হয়ে যায়নি।
তোমাকে রেখে বহুদূর এগোতে চেয়েছি, অথচ তুমিই বারবার বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছ। এখন আমার চলবার পা আরো প্রশস্ত হয়েছে, বিশ্বস্ত হয়েছে ক্ষতবিক্ষত হৃদয়। বঙ্কিম আঁখি রক্তজবার পথ অতিক্রম করে কবেই পেরিয়ে গেছে, অতিমানসের সন্ধানে। এখন আমি গ্যালিলিওর জন্য অপেক্ষা করে আছি, সীমাহীন অর্ঘ্য পেতে পৃথিবীর দ্বারে আমিও একজন। পৃথিবী ঘুরছে এই মহাসত্য একদিন বলেছিল সে, তার জন্য এ হৃদয় পাতা সীমাহীন হৃদয়ের কাছে। অথবা টমাস এডিশনের দশ হাজার ব্যর্থতা নিয়ে সাজানো আলোর রেখা ধরে আমাদের চলতে হবে নতুনের সন্ধানে। আমরা তো থেমে থাকতে আসিনি, অপেক্ষা, তুমি থেমে থাকো আজীবন! আমাদের পথ রুদ্ধ কর না।
শ্মশানের পথ দিয়ে ফিরে যেতে হবে জগতের ইতিহাসে, মহাকাল দাঁড়িয়ে থেকে হিসাব-নিকাশের সেরেস্তা খুলে বসে আছেন। এভাবে কলম থামালে চলবে না, কলম কত নিবিড়, কত সচ্ছ, কত মিষ্ট, অবিরত মানুষের ইতিহাস লিখে চলেছেন। ইতিহাসেরও ইতিহাস লিখতে হয়। ফাঁকা মাঠের জিপসি তাঁবুর ইতিহাস জানার আগে, মহাকালের পৃষ্ঠা খুঁজে নিজেকে বের করে আনতে হয়। চিরযৌবনা ঘাসের হৃদয়ে তুমি এঁকে দাও সৃষ্টির আলপনা। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাক মৃত্যুর কবিতা। ফিরে যাব নজরুলের বিদ্রোহী ধুমকেতুর আহ্বানে, দুর্গমগিরি লক্ষ্য করে খুলে ফেলব কারার কপাট। রুদ্রমঙ্গলের সবকটা পৃষ্ঠা দুর্দিনের যাত্রীর কাছে অর্ঘ্য তুলে দেবো, তবুও নজরুল বিদ্রোহী পৃষ্ঠাগুলো গুছিয়ে রাখবে মহাকালের কাছে, মহাকাল সেসব জানে হয়তোবা অতিমানস। রবীন্দ্রনাথ তোমাকে উন্মাদ বলে কেন? —এ কথার উত্তর নেই! গুরুদেব বলে কর প্রণাম তারে, সে যে বজ্রঘোষ বাণী আগুন থেকে উঠে আসার দুঃসাহসিকতা। এখনো অনেক পথ বাকি আছে, সেসবের সন্ধান দিতে গিয়ে কত হৃদয় ফেলে এসেছি চাপা মাটির তলে। এই মাটিতে রক্তজবা ফুটে। এই মাটিতে বকুল। গন্ধরাজ। শাপলা। শালুক। কেউ থেমে থাকে না আজীবন, দেখ ফুটে ওঠে ফাল্গুনী শিমুলের বনে, গন্ধহীন ভালোবাসা যদিও সৌন্দর্যের মোহ নিয়ে বসে থাকে। দৃষ্টিপটের গোপন রহস্য নিয়ে, পৃথিবীর ইতিহাসে।
মাথায় জমাট বাঁধে অস্থিরতার ক্লেশ। এতসব আয়োজন এড়াতে পারিনা, আমাকে নিঃসঙ্গ করে দিয়ে যায় প্রতিরাত এবং দিন। হাঁটতে হাঁটতে আবারও ফিরে যাই লালনের আখড়ায় নির্মম নিয়তির সন্ধানে হয়তোবা মনের মানুষ গোপন চিঠির প্যাডে নিরর্থক বীভৎস পাঠিয়ে দিয়েছে চুপ কথার ফাঁকে। মানুষ কাঁদে কেন? সুন্দরী ঝর্ণা চেয়ে চেয়ে দেখে আধারের যাত্রীরা ঘুমিয়ে আছে অস্তপারের পানে। যারা ছুটি নেয় সময়ের কাছে তাদেরও জীবন দেখেছি, যাঁতাকলের বীভৎস আয়োজনে ভেঙেচুরে হৃদয় দেখায়।
আর কতটা পথ পেরোলে লাটিমের ঘূর্ণি থেমে যাবে। গগন হরকরা ছুটে যাবে নিভৃত পল্লীর অন্তরালে গোপন প্রিয়ার সন্ধানে আর মনে মনে টুকে নিবে ‘আমি কোথায় পাব তারে/ আমার মনের মানুষ যে রে’ অথচ কোথাও কেউ নেই! অপেক্ষার কালসিটে ভেসে গেছে কত হৃদয়যমুনা ঝড়ের রাত্রি অতিক্রম করে শূন্য সিংহাসনের হইচই আসরে।
পৃথিবী যদি অবসর পায় কোনদিন? কবিতাকে ঋণী করে যাব সময়ের কাছে। দুর্দান্ত ঋষির চোখে দেখে নিব উপনিষদের সব পংক্তি যেহেতু কবিতার ভাষা বোঝা বড় দায়। এখনই তো সময়, দিন যত গড়িয়ে যায় ততই মূল্যবান হ্রাস হয় পিছে! আমরা তো কেউ খোঁজ রাখি না সময়ের, সময় আমাদের খুঁজে নেয় কখনো কখনো, আমরা অভিশাপ ভেবে জীবনকে ফেলে দেই নির্মম গ্রাসে।
এখন আমাদের ঘোড়া দৌড় দেওয়ার সময় এসেছে, দাঁড়িয়ে পড়লে পুরোটা ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে আশঙ্কা করা যায়। অনেকটা পথ আরো বাকি আছে। যেতে হবে সমুদ্রমন্থনে, আমরা তো অমরাবতী চাই না, আমরা চেয়েছি ঘুমন্ত শিশুর বুকে যাতে অভিশাপ নেমে না আসে। তাই কত রাত্রি পেরিয়েছি কবিতার ছলে, আসলে, ভগ্নাংশ খুলে খুলে হৃদয় খুঁড়ে নিয়েছি ভালোবাসার অপূর্ব নিয়তি। যারা ছাইপাশ আছে ভেবে চলে গেছে বহুদূর, আমি গাছের মতো দাঁড়িয়ে থেকেছি, ছায়া দেবো বলে পথিকের ক্লান্ত শরীরে অথচ সূর্য আমাকে বারবার পীড়া দেয়। শুধুই কি সূর্য! কত বাদলার রাত্রি পার হয়েছি তিস্তার কালস্রোতে ভেসে ভেসে ব্রহ্মপুত্রের ওইপারের পাহাড়টায় আড্ডা জমিয়েছি মেঘের মতো। অপেক্ষাগুলো দাঁড়িয়ে গেল, আমরা ফিরে এলাম যৌবনের ব্যস্ততম শহরে, কোথাও যেন হারিয়ে ফেললাম কল্পিত কাহিনীর অবশেষ দিনগুলো। অপেক্ষা, অবশেষে তোমাকে ফেলে রেখে বহুদূর পাড়ি দিলাম কিন্তু বিবর্তনের কালস্রোতে যাতে তৃতীয় অধ্যায় খুলে ফেলতে না হয় সে দিকটা লক্ষ্য রাখা বড় প্রয়োজন।
গদ্য—০৭ একজন দিনবদলের মানুষ
এই পার্টগুলো নষ্ট হয়ে যায় খুব শিগগিরই! —কারণ অসচ্ছ জায়গায় স্বচ্ছ জিনিসের বোধহয় স্থান হয় না। কলম ঘোরানো আর চাকা ঘুরানো দুটোর মধ্যে পার্থক্য যথেষ্ট! তবুও আমরা কলমের দিকেই স্বার্থের হাতছানি মেপে থাকি। মেঘের পরেই নাকি সূর্যোদয়ের আভাস পাওয়া যায়, তাই যদি হয় তো একজন দিনবদলের মানুষ খোঁজার সে তো আমাদের জয়নাল আবেদীন। মেঘ মেঘে লেপ্টে থেকে আলোর ধারা যে নির্গত করে দিনদিন, করুন সূর্যও তাকে এতটা ভালোবাসে ইটভাটার জ্বলন্ত পীড়া এনে দেয় সময়ের হাতে তবু কত নির্মল, স্বচ্ছ হৃদয় নিয়ে আগুন থেকে উঠে এসে প্রদীপ হয়ে ঘরে ফিরে যান প্রতিটি শিশুর হাত ধরে। এক আকাশ হৃদয় যার সংকীর্ণতা তাকে রূদ্ধ করতে পারে কি? —তাইতো ভোর হয়, সূর্য ওঠে, সকাল হয়! নির্ভীক অদম্য চিত্তের প্রামাণ্য আহ্বানে দুর্গমগিরি লক্ষ্য করে শিরদাঁড়া রেওয়াজ তুলে প্রভাতের পদাবলী যুক্ত করে হৃদয়ের আয়োজনে।
সাতভিটা গ্রন্থনীড়। আকাশ যেন নেমে পড়েছে ওইখানটায়, পথ কেমন সরু হয়ে গেছে, গাভীগুলো গোধূলির থেকে ফিরে গেল, শিশুরা ফিরে এলো ছোট্ট ঘরটিতে। চারদিকে সাজানো বুক সেলফে অশেষ জ্ঞানের ভাণ্ডার! যারা তুলে নেয় তারা ভবিষ্যৎ বাঁচিয়ে রাখে, যারা ছুঁড়ে দেয় তারা গোপনে এর ফল ভোগ করে। বই যেন নিত্য সঙ্গী। জননীর পরে যার অবস্থান। ঘরে পড়ে থাকা হাজার স্মৃতির মাঝে সবচেয়ে জরুরি এবং সুখকর পরিণতির আগাম ভবিষ্যৎ বাণীর প্রবক্তা প্রিয়তম বই। যারা এখানে আসেন, মগজ করে নিয়ে যান বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রকরণের ঔষধ! জয়নাল আবেদীন যেন সেখানকার ছোট্ট একজন পথনির্দেশক। যিনি পথ দেখাতে দেখাতে একটা বনানীর দুটি পথের একটির দিকে লক্ষ্য রেখে হাজার পথের সন্ধান পাওয়ার চেতনা এনে দেন অবুঝ পৃথিবীর কন্টকপূর্ণ শহরের ফিরে যাওয়া পথে। সে জানে, কন্টকপূর্ণ পথ আমাদের জন্য নয়! আমরা তো মানুষ নই, আমরা দেবতাও নই, আমরা তারও ঊর্ধ্বে উঠে যেতে চাই! নতুন করে সূর্য গড়ে তৃতীয় নয়ন খুলে সমাজের প্রতিকূল পরিবেশ রক্ষা করে শান্ত স্নিগ্ধ উপশম উপহার দিতে চাই।
এই পথে বড় জঞ্জাল, কোন গাড়ি চলে না, পাশেই ব্রহ্মপুত্রের নিবিড় আহ্বান, সাতটি ভিটার বা স্থানের সমন্বয়ে যে গ্রাম সেই সাতভিটা এখানে কে থাকেন? আমাদের জয়নাল ভাই, জয়নাল আবেদীন। এই লোকটা মেঘে মেঘে সুতো বুনে সজীব করে তোলে মানুষের মন। নদী এলাকা বুড়োবুড়ির আকাশে এখন সন্ধ্যা হলেই আরেকটি সূর্য ওঠে সে সূর্যের প্রখর তেজ অথচ সবাই শীতলতা প্রাপ্ত হয়। আমিও গিয়েছিলাম, চিলমারীর পথ অতিক্রম করে উলিপুরের এক নিভৃত পল্লীর অন্তর্হিত হৃদয়ে, অসুস্থ শরীর নিয়ে গুরু আবু হেনা মুস্তফা সবুজ চাদরের ছায়াঘেরা বনানীর সরুপথে গাড়ি করে পৌঁছে দিলেন অজানার জানার গন্তব্যে। যেন প্রথম শ্বাস নিলাম, কাঙ্খিত জনপদের দুর্গম মাটিতে।
আহা! এত আনন্দ! শুধু আনন্দই নাকি, এক জয়নাল আরেক জয়নাল আবেদীনকে আবিষ্কার করলেন! একজন পাঠাগার উদ্যোক্তা আরেকজন পুঁথিকার। ‘তাইজান মুল্লুক গোলেবাহার’ পুঁথি থেকে অনর্গল সুর মিলাচ্ছেন জয়নাল আবেদীন বয়সে প্রবীণ। কন্ঠ থেকে যেন সুরেলা গুঞ্জন ঝরে যাচ্ছে। কোথায় কোন পৌরাণিক কাহিনীর অন্তমিল খুঁজে পাওয়া মুশকিল! একদিন এক রাত না শুনলে নাকি শেষ হয় না, —এই কথা বলেছিল পুঁথিকার। একই উপজেলার অনন্তপুরের গাবুরজান গ্রামে থাকেন। পুঁথিপাঠ যেন এই প্রথম শুনলাম। ভেসে চলেছি অন্তহীন অনন্তের পথে, ধীরে ধীরে প্রবেশ করছি গোলে বাহারের কাল্পনিক রাজ্যে এতটা রুপশ্রী কোথায় যেন অনিমেষ লেগে আছে? —এর উত্তর শ্রোতারা নিজস্ব করে নিয়েছেন। মুখস্ত পুঁথিপাঠ আবেগের ঘোর লাগাবেই! এদিকে সন্ধ্যাতারার আয়োজনে অন্ধকার নেমে এলো কাদামাখা পথের চারিধারে, জোনাকিরা আলো দিয়ে ফিরে গেল নিজ নিজ ঘরে, আমরা ক্ষণিকা গেঁথে নিয়ে ফুলঝুরি ফোঁটালাম মনের আকাশে। সাথে ছিল অনেকেই, পলাশ স্যারের কথা ভুলে গেছি নাকি? একটু শুনেই যে ফিরে গিয়েছিল করুণ কোন রাজ্যে! আমরা তো বসে বসে ভেবেছি, ছন্দের কারুকার্য কন্ঠের মাধুরীতে কি আশ্চর্য ঝর্ণা নিয়ে দুর্গমগিরি ভেদ করে চলে যায় সমতলে। অথবা ঊর্ধ্বে ওঠে! ভেদ করে সাত আকাশের গন্ডি।
লোকটা পঞ্চম শ্রেণী পাস। সাতভিটা গ্রন্থনীড় পাঠাগার খুলে বসে আছেন। হাজার নক্ষত্রের মাঝে একটি চাঁদের আশা করেন এই রাত্রিতে। ইট ভাটার কাজের ফাঁকে বইয়ের সুগন্ধি মেখে এসব আয়ত্ত করে ফেলেছেন জগতের ইতিহাসে। ইতিহাসের ভিতরেও যে ইতিহাস তার থেকে আমরা খুঁজে দেখেছি, প্রথম আলোর গন্ডি পেরিয়ে দুর্ভিক্ষ পীড়িত অঞ্চলে আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে একজন রাতের অবসান চেয়ে বসছেন সমস্ত রাতের কাছে। এগিয়ে গিয়ে হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন, কালো অক্ষরের মালা, যে মালার জন্য প্রতীক্ষা করেছিল সময়ের বিধাতা একদিন ফিরে যাবে বর্তমানকে সাক্ষী রেখে ভবিষ্যতের তিলোত্তমার সমারোহে।
জয়নাল আবেদীন ভাইকে দেখে মনে হয়, অনেকটা পথ এগিয়েছি তাই অতীতে ফিরে যাওয়ার অবকাশ পাইনি। মাঝে মাঝে দেখা হয়, কথা হয়, জমজমাট আড্ডা হয়। আড্ডার ভেতর থেকে উঠে আসে অজানা পথের সন্ধান যেখানে জোনাক হয়ে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। আমাদের পথ রুদ্ধ হয় না। এ পথ চির-যৌবনা পথ! বইয়ের সমুদ্রে গা ভাসানোর মতো সৃষ্টিশীল স্বপ্নের অর্বাচীন ঠিকানা। চায়ের টেবিল আমাদের জন্য নয়, পড়ার টেবিল আমাদের জন্য, বই ভরা ঘর যত্ন করে রেখে দিয়েছি। এ আলো ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হয়ে মহাকাশ ছাপিয়ে দূর থেকে দূরে চলে যায় অবাধ নিয়মে। জয়নাল আবেদীন একটা খুঁটি, যে খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে মস্তিষ্ক প্রসার করি। ক্লান্তিহীন সংগ্রামের মধ্য থেকে উঠে আসা একটি অযাচিত আলো ফের দাঁড়িয়েছে সূর্য হয়ে শত সূর্যের জন্ম দেবে বলে। পকেট থেকে বের করে এনে ভালোবাসার চাদর দিনমজুরের টাকা বাঁচিয়ে আলোকবর্তিকা হাতে অন্ধকার পেরিয়ে জয়নালের হ্যাজাক আলো মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণায় কোণায় ভরে দেয়। আমরা এসেছি, শুধরে নিতে আমাদের ভুলগুলো যেহেতু, খানিকটা আলো আমাদেরও প্রয়োজন। বই বন্ধুর কারিগর যিনি তমসার তীরে একবিন্দু প্রাণ ঢেলে দেন। আমরা হারানো পথের দিশা খুঁজে পাই, সেই পথেই কুসংস্কার পেরিয়ে, গোঁড়ামির নাড়ি ছেড়া ক্রন্দন এড়িয়ে খুঁজে নেই আপন ঠিকানা। যেহেতু, বই বন্ধুর কারিগর জয়নাল আবেদীন।
গদ্য. ০৮ তেমন কিছু নয়
সংহিতা খুলে বসা হয় না কতদিন। তীব্র দাবদাহে অতিষ্ঠ পৃথিবী কার কাছে ভিক্ষা চাইবে জীবন? জনসংহিতা খুলে যায় আর আমি বাউল হয়ে পথে পথে ফিরি— কাঙ্গাল বলে ফিরিয়ে দিও না পৃথিবী। তোমার বুকে ওম পেতে শুয়ে গ্রহ-নক্ষত্র-তারা ছুঁবো; ‘লালন তোমার আরশিনগর আর কতদূর?’— খেয়া কবে পৌঁছে যাবে যমালোকের ঘরে, সেখানে হুল্লোর হবে, মাতাল কবিতা বৃক্ষেরা গাইবে হাওয়ালোকের পরমযত্নে শুদ্ধাত্মার পরশভূমি হবে— তোমার সুখের অবগাহন।
উত্তরের হাওয়ায় ভেসে আসবে ভাবের ভাওয়াইয়া; দক্ষিণের পটগানের রেওয়াজ তুলে শরৎ মেঘের ভেলা চলে যাবে— কাঙ্খিত বন্ধুর অভিমানী খোপায়! অথচ গম্ভীরার আসরে কতরাত জেগে ছিল আমার জীবনের পদাবলী। জয়নাল আবেদীনের পুঁথিপাঠের আসরে আর বসা হবে কি কখনো?— শহরে-বাজারে-রাস্তার মোড়ে কিংবা চায়ের আড্ডায় হয়তোবা হবে না, যেহেতু পৃথিবীর শ্বাসরোধে ব্যস্ত সবাই। নিকোটিনে পুড়ে যায় তার ঠোঁট। ভালোবাসা পুড়ে যায়। তবুও ভূপতি স্যারের রেওয়াজ শুনি দূর্গাপুরে...। গাড়িয়াল ভাইয়ের দেশে। সহজ কথার ফাঁকে অজস্র কথা গেঁথে দেন বিষাদ চন্দ্র; পৃথিবীর হৃদস্পন্দনে মায়াবী অনুরাগ জাগে কন্ঠের দোতনায়। বৈঠকী আসর কোথায় এখন?— সুনীল বাবু আর মুরলী বাবুর ঘেয়ামী তর্ক; যেখানে সারারাত জেগে মজে যেতাম অর্বাচীন আবেগে এবং কথার সূত্র খুঁজতে গিয়ে ঊষা রানী এসে দেখা দিতো পুব আকাশে তবুও গানের আবেশ থেকে যেত; সে সময় কি আর আছে?— পৃথিবী কোথায় দাঁড়াবে?— নিয়ত ফানুস ওরে ভিনগ্রহী মানুষের আবেদনে।
শীতের রাতের ‘মনসামঙ্গল’ মালতিবালা গাইবে কি আর কোনদিন? আর হবে কি কখনো কুষাণপালার আয়োজন? কৃপাসিন্ধু কিংবা গোপাল দোহার গাইবে কি কুষানপালা দেশে-বিদেশে? মরীচিকাময় পৃথিবীতে জীর্ণ জীবনের ছকে কবিতারা অসহায় হবে? ভাবতে ভাবতে আমার নিকোটিন ফুরিয়ে যায়। অবজ্ঞা করে সকল প্রতীক্ষা। অমানুষ হয়ে যাই। পৃথিবী অক্সিজেন পাবে না। এই সত্য বলেছিল বাতাসে ভাষা। কতবার সংহিতা খুলতে হবে— লিখিত রাত্রির আয়োজনে। আমার কলম শোবার সময় পায় না কখনো; দিনরাত খেটে যায় ঘটন-অঘটন। হরিনাথ মজুমদার কবে এসে বলবেন...“হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হলো/পাড় কর আমারে...” পৃথিবী শুয়ে পড়বে দক্ষিণ শিয়রে উপুড় করা নদী ফেনা তুলে যাবে—সময়-অসময়ে। মনমোহন দত্ত এইসব কথা জানেন, তাই আমাকে তার কাছে যেতে হয় বেলা-অবেলায়। কথামালার আয়োজনে উৎসব করে পৃথিবীর ভাষা। সেখানে পৃথিবী আছে গানে গানে মনের পিপাসা মেটায়। মিঠা সরোবর। আলেক সাঁই আছে, তন্ত্র আছে, সাধু-সন্ত আছে যোগান দেয় অমাবস্যায় পূর্ণচন্দ্রের। অদ্ভুত লাগে সব কথা। সব গাঁথা। আহা! পৃথিবী মানুষ তোমারে চেনে, মানুষ তোমারে ভোলে, সুখের সংসার বাঁধে অথচ তোমাকেই পর করার আয়োজনে মাতে।
আমি নির্গুণ হয়ে যাই। ছাই এবং ভস্ম। পরমাপ্রকৃতি হৃয়ানুভূতির পরমপ্রকাশ। সমস্ত ঘটনাবলির ভগ্নাংশ জুড়ে দহন-বাষ্প ক্রোমাগত আমাকে বাউল করে তোলে। বিশ্বজনীন ধর্মে দীক্ষিত করে। অমৃতসমান কথামালার আয়োজনে ষোলকলা পূর্ণ হয়। চন্দ্রাঙ্কিত কপালের ভাঁজে শুয়ে আছে মহাজাগতিক ক্রিয়ার প্রেমানুভূতি।
প্রেম এবং দ্রোহের সম্মিলিত আয়োজনে যে রূপকথার অবয়ব ভেসে ওঠে! শেফালীর করুণ ডালে মোহময় শীতের শরীর। বাউলের আসর থেকে ডেকে তুলে পৌষের সন্ধ্যায় নিয়ে যায়— শ্রোতা এবং শ্রুতির সম্পর্ক অনাদিকালের। এই নিয়ে গণ্ডগোল! আমার প্রিয়ার সাথে ধৃতরাষ্ট্রের; আমি অনাথ প্রতিমবন্ধু তোমার মহাকালে রেখে গেছি কয়েকটি অযাচিত পঙক্তি— যার কোন প্রয়োজন ছিল না, কারণ ছিল না, শুধুমাত্র বাউলের আখড়ার পরমশান্তি —এই নিয়ে কাল যাপন। কন্ঠে তোলো সামগান! অধীর আগ্রহে বসে আছে পৃথিবী। সব ফুল ঝরে যাওয়ার আগে, সব প্রেম মরে যাওয়ার আগে, আমাকে জাগ্রত করো মহাকাল। গান হবে, গান , দূর দেশ থেকে কবীর আসবেন, সুরদাস আসবেন, আবারও আসর হবে। আরশিনগর আবার ফিরে পাব। গীতিগঞ্জের কেদার সন্ধ্যায় বিজয় বাদ্য বেজে উঠবে বর্ণিল আয়োজনে। আর রবি বাউল ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গাইতে গাইতে গগনের সাথে মিশে যাবে প্রাণের আহ্লাদে আর ওদিকে মনোহর শাহী’র গলা শোনা যায় ‘হরিনাম দিয়ে জগৎ মাতালো আমার একলা নিতাই’ পরমানন্দের পরম ঐশ্বর্যময় বাউলের দ্যোতনা; রবি বাউল সেখানে মধু মিশিয়ে দিলেন— ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’ একা একা আর কতকাল চলব বলুন?... বাউলের সাথে বাউলের হৃদয় পরম চৈতন্যের উন্মেষ ভূমি! তাই বৃষ্টি হয়, সৃষ্টি হয় এবং লয় হয়! নীড় সাধনার ক্রিয়াকলাপ পরমযত্নে শুদ্ধাত্মার পরশভূমি ছুঁয়ে যায়। আমি পাগল হয়ে যাই... ফুল এবং পাখি আমার হৃদয়। নির্বাণ পাব কি? হে বুদ্ধাত্মা! আমি পাগল হয়ে যাব... —এই হৃদয় মোহহীন মানভূমে পরিণত হয়েছে; অসার হয়েছে সমস্ত সংসার— মুক্তি পাব এই আশা নিয়ে অবশেষে বাউল হয়ে যাব।
—এই শরৎতের সৌন্দর্য কাশবন আমার হৃদয় চুরি করেছে— মোহময় নদ বাতাসের কানে অমৃত ঢেলে স্মৃতিগন্ধার অমরাবতী সেজে ওঠে! তুমি-আমি দুজনে এক-অহমের দোসর হয়ে উঠি! হিমেল বাতাস ভেসে আসে গারো পাহাড়ের থেকে— শুষ্ক ঠোঁটে জোয়ার ওঠে লীলাবতী শরৎতের। এপারে বাউল হাঁটে, হাতে একতারা, নদের ঢেউ এসে বুঝে নেয় বাউলের ভাষা। পানকৌড়ি উড়ে যায় বাউলের দেশে— ওইদিকে ধুধু পাথার, এদিকে পরম যাপন রোদ আর বৃষ্টির খেলা। বাউল চলে যাচ্ছে একতারা হাতে, ‘নয়নে লাগলো যারে, কেমনে ভুলিব তারে...’ মোহময় সৃষ্টিকলার অপূর্ব উচ্ছাস!
কাশফুলের পাশে দাঁড়িয়ে যায় আমার ফটো সেশন; আধুনিকায়ন তন্ত্রে চিহ্ন রেখে যায় মহাকাল। অন্তর্জালে স্মৃতিকথা হয়! মেঘ এবং বর্ষার। দিন আসে দিন যায়— বেহাগ নিয়ে পড়ে থাকি আমি। চাঁদ আর তারা দেখে মনে হয় তার চেয়ে সুখী বাউলের জীবন। সূর্য তো আমাদের জন্য নয়! প্রচন্ড প্রতাপ! সহ্য করতে হয়! প্রকাশ এবং ঐশ্বর্যের জন্য নিয়ত দরকার পড়ে। সুর ও ছন্দের ক্রিয়ার যাপন। মহাজাগতিক স্পন্দন। চূড়ান্ত উপলব্ধির কথা বলে বারবার চাঁদ দেখে ফেলি— তমসার জলে যেহেতু জোৎস্নার উন্মেষ হয় সাধন ক্রিয়ার বরমাল্যে।
আমার ভ্রান্তির পথে হে বাউল একতারা কাঁখে মাঠে মাঠে গান চড়াও! আধুনিকায়নতন্ত্রে পাগল বলে লোকে— এই সত্য কেউ কি কখনো বলেছিল কোনদিন?... ওখানে হৃদিতার যাপন সৃজিতের পরম মমতায়। অর্বাচীন হৃদয় তা বুঝে না, অথচ পরম সত্য বলে। ভেদ-অভেদের তত্ত্ব খুলে ফিরে আসো লালন। মাঠে-ময়দানে কবিতা চাড়াবো— বাউল এবং বিন্দু সাধনায় এক্কা দুক্কা থিসিস করে ঠাঁয় দাঁড়াবো। সং এবং সার থেকে জীবনের মহত্ত্ব তুলে এনে অমৃত সম্ভার তুলে দেবো— মহৎ জীবন! সহজ সাধনার ক্রিয়া বাউল। অথচ জীবনটা সবচেয়ে কঠিন করে তুলেছি আমরা সহজ করে সহজ কথা ভাবতে পারিনা। হৃদয়ে অমৃতলোকের সুখানুভূতি তাই খুঁজে পাওয়া যায় না। এখন আমি পূর্ণ! টইটুম্বর রসময়ের রসে দীপালোকে নিজেকে জ্বালাই। আলো ও বাতাসের সালোকসংশ্লেষণে।
গদ্য — ০৯ কীভাবে কবিতা লেখা যায়?
আমরা সম্ভাবনাময় ছিলাম না, সম্ভাবনা আমাদের এগিয়ে নিয়ে চলেছে। ছোট ছোট প্রাণ, ছোট ছোট আশা, বহুমুখী প্রতিভার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ ভিতরকার অনিন্দ্যকে ডেকে তুলছে— চলো বেড়িয়ে পড়ি আলোর মিছিল হাতে। আমরা বেরিয়ে পড়লাম, সাথে একটা কবিতার ঝোলা, তাতে মুঠো মুঠো শব্দগুচ্ছ ভর করে ঝুলে আছে মনের কোঠায়। এভাবেও একটা রাতকে কাভার করে দেওয়া যায় নিমিষেই; মন তুই এও পারিস? পৌষের বোধকে মধুমাসে রূপান্তর করতে তোর বুঝি বয়স লাগে না, মিঠা জলের ঝাপটা লাগে না, ফড়িং উড়া বিকেল লাগে না, শুধু একটা হৃদয় লাগে মিহি কাজলের মতো হৃদয়।
দেহের খোলস নিয়ে কত কবিতার ছড়াছড়ি, মাঠের বাইরে হুড়োহুড়ি, ধরলার জলে কুলকুচি আর এদিকে বামনী শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল তার দিকে তোমার খেয়াল নাই। বোধের কবিতা ঐপাড়ে মাটি হয়ে গেল— এদিকে তোমরা শার্টের বোতাম মজবুত করো। তারপর একদিন আমাকে ডেকে বলবে, ‘কি রে তোর কবিতার খবর কি?’ কবিতা বুঝি বোধের পেরেক নাকি বাবু চত্বরের শেয়ার বাজার; এতসব ভাবতে ভাবতে কবে একদিন মরে যাব— তারপর তুমি এসে হাত বোলাতে বোলাতে একটা মিথ্যা সভা করবে। ক্ষীর সমুদ্রের পাড়ে যে তুমি যেতে পারবেনা তা আমি বুঝে গেছি কারণ ঘুঘু, বাবুই-চড়ুই, দোয়েল, শালিক এমনকি কাক, চিল ছুটি নিয়েছিল কেন? তার কি অপরাধ? সে কথা তুমি জানতে চাওনি, নদীর বহমান কান্না শুনে। নদী তো কাঁদে না রে পাগলা, নদী তার খোলস ছেড়ে অজগর হয়ে যায়।
কার যেন ব্যাগে একটা চিঠি দেখেছিলাম, টসটসে ডালিমের মতো টগবগ করছে— তার ভেতরের মোহনভোগ; আমাকে দেখিয়ে বলল, একটা কবিতা লিখে দাও! আমি মশাই, পাগলের ডিগ্রি নিয়ে আসা একজন কাপুরুষ; বাইরের দিকে যে একটা খোলস আছে তারদিকে খেয়ালই নেই। মধুপর্ণী দিয়ে বেঁধে কবিতাকে আটকে রাখা যায় না, এ বিদ্যা শিখতে হলে বনে যেতে হয়, সুন্দরবনে যেতে পারো বাঘের সাথে দেখা হওয়ার আগে চিঠিতে কি লেখা ছিল বুঝতে পারবে না। আমি যে বার প্রথম নিহত হলাম, ঠিক তখনই বুঝলাম কবিতার মানে— মানে ছাইপাশ পাশ করে একটা জলাকার হ্রদ।
ডিভাইসে ঝটপট আগাগোড়া লিখে ফেলা যায়। রাস্তার পাশে, টংয়ে, টেবিলে, শোবার ঘরে, ভ্রমণ সময়ে, মাটির দেয়াল দেখে, মিউজিয়াম দেখে, পাড়ার দীঘিরপাড়ে, নদের কিনারায় একটি আঙুল ছুঁয়ে মনন আঁকা যায়। শব্দ শৃঙ্খল পরিয়ে ক্ষীরোদ সাগর ভেবে তোমাকে তুলে ধরা যায়; অথচ সেই কাজ আমি পারবো না, কেননা তোমাকে আমি সিগারেট ধোঁয়ার মতো দেখেছি, যতই কাছে টানছি ততই আগুন হয়ে জ্বলছো; জ্বলতে জ্বলতে যদি একদিন ছাই করে ফেলো সমস্ত কবিতার খাতা। এজন্য আমাকে বলছি, চন্ডীদাস, কৃত্তিবাস, রায়গুণাকর কবে চলে গেছে— ছিঁড়ে গেছে কবিতার খাতা, অসমাপ্ত বেমালুম, মাটির আকাশ, জলবিবির সাদা মনটা কালো করে গেল। তার জন্যে আবার একটা কবিতা লিখে ভুল করো না। তার চেয়ে রামপ্রসাদী গাও, গতর থেকে খাঁকি পোষাক নামাও, তারপরেও আমরা চলবো, মেঘের সিঁড়ি মতো তাঁর চোখের সিঁড়ি দিয়ে— এসব আমার প্রেম আসার আগেই মরে গেল; তার জন্য শোকসভার আয়োজন করা গেল না, ফার্স্ট চিঠির পর মিসিং হাপিশ, ফুটো কলস, কাক ডাকা ভোর, ডুমুর ফুল আর ফিটিং স্টাইল সবটা চেঞ্জ হয়ে যায়।
স্বীকার করলাম আমি শব্দ শ্রমিক তাই বলে, দিনরাত বিনা পারিশ্রমিকে খাটাবে— রাস্তায় ফেলে মারবে, তারপর বিনা অপরাধে একদিন জেলে পুড়বে; এরকমটা হেঁয়ালিপনা এখানে চলে— মানে, পথে-ঘাটে-মাঠে, বাথরুমে, কথার আসরে, পাঁচালির সভায়, মঞ্চের মাউথ অর্গানে আরও আরও বাউলিয়ানার উদাসী একতারায়। শব্দকে যারা জ্বালানি ভেবে আগুন জ্বালায় তারা আমার পোষা কুকুরটারো মানে জানেনা, এরকম একটা পরিস্থিতিতে আমাকে মানায়, যেহেতু শ্রমিক আমি, বিনা পারিশ্রমিকে পৃথিবী সাজাচ্ছি।
কাঁধে ব্যাগ নিয়ে রাস্তা হাঁটলে আর হাতে যদি দুই-এক কপি বই থাকে অথবা জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতার পঙক্তি পাঠ করতে করতে অভাগা সময় চলে যায় তার জন্য আমার আফসোস হয় না। আফসোস হয় ওই ছেঁড়া পাতাটার জন্যে কারণ যেটা পড়ছি সেটা এক বাদাম বিক্রেতার ঠোঙ্গা থেকে পাওয়া। দশ টাকা দিয়ে একটা মূল্যবান সময় কিনলাম যেটা দিয়ে কয়েকটা প্রহর অনায়াসে কেটে যাবে; তার জন্য আমাকে প্রশ্ন করো না, এরকম একটা ফাঁকা হৃদয় চাই, ফাঁকা জায়গায় আড্ডা জমাতে ভালো লাগে, সুখ ও দুঃখের পরিপাটি বিষয়ে কি একটা দস্যি বিকেল সূর্যটাকে ধীরে টেনে নিচ্ছে গোছালো গ্রামটির শেষে স্বর্ণলতায় ছেয়ে যাওয়া ফাগের দোয়াত।
এক প্যাকেট বিস্কুটের জন্য হাডুডু, একগুচ্ছ হাসির জন্য গোল্লাছুট, একগাদা কান্নার জন্য ইয়ার্কি, হলুদ ও আটা গুলিয়ে গু তৈরি, চোত্তার পাতা লাগিয়ে চুলকানি ওসব পেড়িয়ে এসে— একটা ফাজলামির দুনিয়ায় কবিতা লিখতে হচ্ছে, যার জন্য লিখছি সে হাসছে, ফটো তুলছে, চেহারার হেভি দেখাচ্ছে, তার জন্য আমি দুঃখিত। ইয়ের জন্য মোটর-বাইক মানে বিয়ে, একটা চুক্তি করে একজনকে উদাস করা, বিনিময়, মুদ্রা, আবাল মুনাফা, মিহি কান্না, চন্দ্র হরণ বোকা মনীষীর ওৎ পাতা হুলোই বীজ; চাঁদ ও পৃথিবীর মধ্যেকার অন্ধকারের মধ্যে একটা সুচালো পেরেক ঠুকে অন্ধ হয়ে যাওয়া। তার জন্য কবিতা লিখতে হবে? রক্ত ঘাম মিশিয়ে ক’শ্লোক দোঁহার ঘন্টা বাজানো যায়? যার জন্য লিখছি সে পড়ছে না, উপহার উপহাস, গাধা মগজ, ধোলাই পেরেক ঠুকে অন্ধ ফিকির হচ্ছে; বোঝা যায় আমি বেঁচে আছি।
গঞ্জে-গাঁয়ে, বাবুর মোড়ে অথবা মোড়ল বাড়িতে একটা কবিতা দরকার; একছত্র বেহিসেবি কবিতা, হেভি ব্রঙ্কাইটিস কবিতা, লোলজিহ্বা কবিতা, করাল রূপসী কবিতা তার জন্যে মুনাফা; গলাধঃকরণ পদ্ধতিতে দুধেলা পোষা সাপ সাদা আকাশের নিচে ঘন সবুজের পাথার নীল নাচের নকশা এঁকে দিতে পারে। কবিতা বদহজমের জন্য বারবার উপেক্ষা করেছে ভেতরের পাথর; ঘানি টানতে টানতে বছর গেছে কালো পর্দার আড়ালে— অথচ কবিতার মুণ্ডুহীন ছবি দেখিয়ে লিখিয়ে নিতে চাও একটি অজগর। কবিতা বয়সে বড় হাতিয়ার, সরু ছিদ্রপথে চুপচাপ ধ্বংস করে দিতে পারে একটা হাজার বছরের সভ্যতা আবার বাঁচাতে একটি পঙ্ক্তির বিনিময়ে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় ফাইলগুলোও।
একটা অবসর লেখা যায়, কোলাজ পদ্ধতিতে, সমুদ্র গর্জনে, ছিপছিপে গড়নের হলকা তুলে— কিন্তু তার জন্য অবরোধ, ব্যহত কবিতা, কবি এবং শিল্পী মিথেন ক্রিয়ার যাপন পাবে, ডালিমের মঞ্জুরীর ভুলে দাঁতাল বর্শা ফণায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন শব্দের কারিগর। পাখিকে উড়তে দাও, নদীকে টলতে দাও, ঝড়কে আসতে দাও একটা অবসর পাওয়া যাবে।
কবিতা বাইসাইকেল হাতে চলে যাক স্কুলের মাঠে, সেখানে প্রেমিক যুগল হাতে হাত রেখে— রেওয়াজ করুক শব্দের দ্যোতনা। কবি তাকিয়ে দেখুক, শব্দ শৃঙ্খল পরিয়ে কতদূর ক্ষীরোদ সাগর; আমাকে কবিতা লিখতে বলো, অথচ আমি কবিতার ক অক্ষর জানি না, ঠাট্টা কর, উপহাস, সংঘাত, প্রহসন আমিই কবিতা। প্রগতিশীল তকমা দিয়ে যাকে অবরুদ্ধ করা যায়। উত্তরের বানে, দক্ষিণের জলোচ্ছ্বাসে, হাওর অঞ্চলে, মেঘালয়ের পাহাড়ে, ভাটি গানের আসরে, পট গানের ছবিতে, ভাওয়াইয়ার ক্ষীরলে, কুশানপালার আসরে, পাঁচালির ঝুমুর তালে, নৃত্যরত কবিতা আমার পূর্বপুরুষ; আমি তার চন্দ্রবিন্দু জাত একটি রোদেলা দুপুর।
গদ্য — ১২ অভিবাদন প্রিয়তমা বাংলাদেশ
আগত ডিসেম্বরে তোমাকে লিখছি, যেরকম তোমাকে দেখেছি মাঠে ময়দানে, যুদ্ধের রাইফেল হাতে, ছেঁড়া আচ্ছাদনে, ভাতের হাঁড়িতে, শিশুর কান্নায়, লাশের গুদামে, বায়স্কোপে আর হ্যারিসনের কনসার্টে; বুদ্ধিজীবীর ডায়েরির পাতায়, রোদে ঘামা কৃষকের কাস্তে হাতে, বৈঠকী আসরে, গোয়ালির পাঁচালিতে, মালির পাঁচালিতে, স্বাধীন বাংলা বেতারের ধারাভাষ্যে; তুমি কি তার চেয়ে সুখে আছো? ভালোবাসো? ভালো আছো?
ডিসেম্বরের জাদুকরকে দেখে তাই কি মনে হয় তোমার, অনন্তকালের শপথ লাল নিশান! রক্তের সাথে ইয়ার্কি করে ঢুকে যায় আমার শরীরে একেকটা বুলেট ঝাঁঝরা করে দেয় নিমিষেই বুকের পিঞ্জর; শকুনের উৎপীড়ন, পাকিস্তানি হানাদার, লুটেরা, বুট জুতোয় ছাপিয়ে যায় লাশের গুদাম। মাটিতে উদ্ভিদের বদলে রক্তের রোপণ, লাশের বদলে জীবনের সংগ্রাম, অনুনয়ের বদলে সংগ্রাম, দেশের জন্য লাশের পাহাড়, ধর্ষিতার দেহের বিনিময়ে অর্জিত লাল নিশান উড়তে দাও মুক্ত আকাশের নিচে পাখির ডানার মতো উড়তে থাকুক; হারানো স্বপ্নের মাঝে মায়ের বেদনা, বোনের ইজ্জত, ভাইয়ের পঁচা লাশ নিয়ে কুকুরের টানাটানি সবকিছু সাক্ষী থাকুক লাল সবুজের ছায়ামাঠ; এসে দেখে যাক হাজার শকুন মারিয়ে যেতে পারে বীর যুবকের দল।
নয় মাস পেরিয়ে গেছি তবুও ৭১ পেরিয়ে যাওয়া যায় না, ৭১ ঘরের পাশে, চেয়ারে-টেবিলে, রাস্তার মোড়ে, চায়ের দোকানে, মিটিং, মিছিলে, বুলেটের করাল গ্রাসে বারবার ফিরে আসে; আমারা চেয়ে চেয়ে দেখি, মাটির প্রদীপ কালো উর্দি পড়েছে, অভিনয়ের মঞ্চে, ডেস্কে, লিভিং স্টাইলে, ডিজিটালাইজ পদ্ধতিতে একাত্তর এসে গেছে— মাটির পকেটে হাত দিয়ে দেখো ভূকম্পন অনুভূত হয় কি না? মাটি তো বাঁচতে শেখায়, মাটির জন্য যুদ্ধ, কথা বলার জন্য যুদ্ধ, জয় বাংলা স্লোগানের জন্য যুদ্ধ, মায়ের রক্তের সমান দেশ তার জন্য যুদ্ধ আরও কত কত যুদ্ধ করতে হয়েছে দেশমাতৃকার মুক্তির দাবিতে; সেসব কি প্রজন্ম ভুলে যায়? না, সেজন্য ডিসেম্বর আসে বাংলাদেশে, অগ্রহায়ণ আসে, শীতের আমেজ পড়ে, মেঘেরা দলছুট হয়, ভীরুরা দৌড়ে পালায়।
জাতিগত বিদ্বেষ নয়, শ্বাপদের হিংস্র আহ্বান নয়, লাল নিশান উড়ে সবুজের সমারোহে; বিজয় মিছিল হেঁটে যায় রক্তের কাফনে— ওখানে গরীবুল্লাহ মেঘের তালুক পেতেছে, এখানে হিতেশ বড়ুয়া, হরিয়া, বিমল রায়, হায়দার মিয়া একই স্তনের অধিকারী, একই মাটি, একই ছাঁদ , হাওয়া, পাহাড়, রোদ-বৃষ্টি, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী মিলেমিশে একাকার; সবার ঘরে বিজয়ের আমেজ, লাল সবুজ পতাকার স্বপ্ন, একাত্তরের জয়গান, ষোলই ডিসেম্বর, মুক্তি নিশান।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চ কালরাত্রি, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির নেতৃত্বাধীন বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় ৯১,৬৩৪ সদস্যের আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ যৌথবাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে; নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষ গেরিলা কায়দায়, নারীদের স্বকীয় অবস্থান, বিদেশী সাহায্য আর বাঙালির সৎ সাহসের বহিঃপ্রকাশ এবং প্রায় ৩০ লক্ষ শহীদ ও দু'লক্ষ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত একটি বাংলাদেশ।
ইতিহাস যাকে নিয়ে খেলেছে, গড়েছে এবং সমৃদ্ধ করেছে; সেখানে বসে তোমাকে পড়ছি, লাল-সবুজের মোহনায়; প্রিয় বাংলাদেশ, আমার অস্থিতে অস্থিতে তোমার যাপন, প্রিয়তমার হাসি, সম্মোহন, মিলন উৎসব, স্বাধীনতা সংগ্রাম আর বিজয়ের আনন্দ মিছিল। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি...’ রবি ঠাকুরের নরম হাতের ছোঁয়ায় গগন হরকরার সুরে সুরে বিভোর তোমাকে দেখছি, প্রিয় বাংলাদেশ।
রবিশঙ্করের সুরে সুরে, শিল্পীর তুলিতে, সিনেমা হলে, কবিদের সভায়, নাট্যমঞ্চে, প্যারেডে, স্কুল-কলেজে, মাঠে-ময়দানে, ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী’, মায়ের সাথে সন্তানের, মাটির সাথে মানুষের টান, নাড়ি ছেঁড়া টান, লালন, হাসন, জয়নুলের দেশে, কাঙাল হরিনাথের দেশে, ‘নজরুলের খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি বাংলাদেশের মাটি’র দেশে, লাল সবুজের পতাকা উড়ে; বিজয়ের মাসে, ডিসেম্বরে তোমাকে অভিবাদন বাংলাদেশ।


0 Comments