১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধ। ধামরাই রথের কথা মনে আছে? বাংলাদেশের জন্মলগ্নের রথযাত্রা মোটেই সুখকর ছিল না। তখন সারাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর রক্তচক্ষু ও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। এমতাবস্থায় এদেশের দেশপ্রিয় মানুষজন নিরাপত্তাহীনতায় জীবন কাটিয়েছেন, কতশত মা-বোন ধর্ষিত-লাঞ্ছিত হয়েছেন তার ইয়াত্তা নেই! সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর। এর কারণ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প।
বাংলার হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক যাবৎকাল ভালোই ছিল কিন্তু সেটাও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে। ঢাকার রথযাত্রার প্রচলন ঘটেছিল কৃষ্ণ জন্মাষ্টমীকে কেন্দ্র করে। কৃষ্ণদাস জন্মাষ্টমীর মিছিল চালু করেছিলেন। পরবর্তীতে তারই বংশধর কৃষ্ণগোবিন্দ বসাক ১২৯৪ বঙ্গাব্দে রথযাত্রার জাঁকজমকপূর্ণ মিছিল বের করেছিলেন। এর সূত্রপাত নবাবপুরে। পরে, ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় বিশালাকারের রথযাত্রা পালিত হতে থাকে—এভাবেই হিন্দু সম্প্রদায়ের রথযাত্রা উৎসবে পরিণত হয়। উড়িষ্যার পুরীর জগন্নাথদেবের রথের আদলেই ধামরাইয়ে রথ নির্মাণ হতো। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হতো এ মেলাকে কেন্দ্র করে।
ধামরাই রথের প্রতিষ্ঠাতা রাজা যশোপাল। তার রাজ্যের নিকটে তিনি যখন হাতির উপর বসে যাচ্ছিলেন, ঐসময়ে হঠাৎ হাতি থেমে যায়। শত চেষ্টা করেও মাহুত হাতি নিয়ে এগোতে পারছিলেন না। হাতিটির অদ্ভুত স্বভাব রাজার চোখে পড়লে, সেখানে খননকাজ আরম্ভ হয় এবং শেষ পর্যন্ত একটি মন্দির ও মাধবমূর্তি আবিষ্কৃত হয়। দৈব্যবাণী হলো, ‘তুমি যদি আমাকে স্থানান্তরিত করো, তবে তোমার বংশ ধংস হবে।’ রাজা ধর্মপরায়ণ বিচলিত না হয়ে বলেন, ‘তুমিই আমার সব মাধব, তুমিই শিরোমণি।’ স্থানান্তরিতের কারণে রাজার বংশ ধংস হলো কিন্তু রাজার নামের সাথে মাধবের নাম জুড়ে যশোমাধব নাম হইল।
১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাবানল যখন প্রখর, ঠিক তখনই ধামরাইয়ের হিন্দু জনগোষ্ঠীরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। এমনকি হিন্দুরা পূজা করতেও ভয় পেত ঐসময়ে। এতটাই বিষবাষ্প ছড়িয়েছিল। দক্ষিণারঞ্জন বসু ‘ছেড়ে আসা গ্রাম’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন...“সর্ব্বক্ষণ সরগরম থাকত সারা গ্রাম সকাল-সন্ধ্যায় দেবালয়ে দেবালয়ে শঙ্খ-ঘন্টার আরতি-বাজনায় ও উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠত সমস্ত পল্লী। পূর্ব বাঙলার শান্ত পল্লী-সন্ধ্যা আজ কি কাঁসর-ঘন্টার বাজনায় তেমনি চঞ্চল হয়ে উঠবার সুযোগ পায়? সেদিনও শুনেছি, আমার গাঁয়ের দেবালয়ে এখনও নাকি পূজারতি চলে, কিন্তু নীরবে! বাজনা নিষিদ্ধ না হলেও ভয়ের কারণ, তাই বাজনা বন্ধ। প্রহরে প্রহরে শেয়াল ডাকে, ঝিল্লিরব উঠে—কিন্তু কীর্তন গান আর শোনা যায় না। অথচ এই কীর্তনগান ছিল মাধব-ক্ষেত্র ধামরাই গ্রামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শ্রীমাধবের কৃপার ওপর ভরসা করে আজও যেসব কীর্তনীয়া পড়ে আছে গ্রাম-মায়ের মাটির বুকে তাদের কন্ঠ আজ রুদ্ধ। সমস্ত ভয়ভীতি ও নিষেধাজ্ঞার বাঁধ ভেঙে কবে সেই রুদ্ধকন্ঠ আবার সেই নাম কীর্তনে মেতে উঠবে কে জানে?” এ কথা বলে দেয়, দেশভাগের সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেদের উপর কিরকম নির্যাতন হয়েছিল।
ডঃ সব্যসাচী ঘোষদস্তিদার রচিত ‘এই বাংলা ওই বাংলা’ গ্রন্থে ধামরাই রথ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে...“....১৯৭৫ এ পুনর্মুদ্রিত দক্ষিণারঞ্জন বসুর ‘ছেড়ে আসা গ্রাম’ -এ পরিচিতিতে লেখা...... ‘স্বাধীন বাংলাদেশের.... এই গ্রন্থখানি পাবার জন্য গভীর আগ্রহ প্রকাশ করতে থাকেন।’ হয়তো ঠিকই, এবং আমি মনে করি এইরকম দলিল আরও অনেক অনেক লেখা উচিৎ ছিল। তবে বাংলাদেশের মনে সত্যিই কি সেরকম ছাপ ফেলেছে? সেখানের হিন্দুদের অবস্থা কি ১৯৪৭ থেকে অনেক ভালো? ধামরাই-এর পাশ দিয়ে ক’বার গেলেও সেখানে দাঁড়ানো হয়নি। আমাদের বন্ধু আ. মা. দাউদ বেশ অনেকবার গর্বভরে বলেছে যে তাদের ধামরাই এ দেশের সবচেয়ে বড় ছয় তালা রথ ছিল। ১৯৭১ এ মিলিটারি সেই কাঠের রথগুলোকে পুড়িয়ে দেয়,...... এবং এখন ছোট্ট নামমাত্র রথ আছে। এই ধামরাইয়ে কথা পড়ে ও অনেককিছু জানতে পারে, তবে ওর ধারণা গ্রামের সবাই মনে করে, ‘হিন্দুরা এমনিই চলে গেছে।” সত্যিই তো! এখনকার প্রজন্মকে সেকথা বলা যেন এক ধরণের পাপ; মুক্তিযুদ্ধে হিন্দুদেরই যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছিল—সেকথা এখন কে বিশ্বাস করবে? ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কার আবারও জেঁকে বসেছে—মধ্যযুগ যেতে যেতে যেন ফিরে তাকিয়েছে সে ভাবখনা ঢ়ের চোখে পড়ে। তৎকালীন হিন্দু নির্যাতন ও সাময়িক হিন্দু নির্যাতনের তফাৎ খুঁজে পাইনা। কারণ সবটাই উগ্র ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতা থেকেই ছড়িয়েছে। ’৭১ পরবর্তী সময়েও হিন্দু নির্যাতন কমেনি বরং বেড়েছে; হিন্দুরা তাদের ধর্মরক্ষার জন্য নির্যাতনের শিকার, আবার কেউ কেউ নির্মমতা সহ্য করতে না পেরে ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়।
১৯৭১ সালে ধামরাই রথ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা পুড়িয়ে দেন, পরবর্তীতে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা প্রতিষ্ঠিত কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের অর্থায়নে নির্মিত হয়। রথের সূচনা সাল ১০৭৯ বঙ্গাব্দ। রাজাদের আমলে ৬০ ফুট উঁচু রথ নির্মাণ হতো। কারুকার্য ও নকশা অসামান্য ছিল। ’৪৬ এ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে যেরকম ভাবে হিন্দু শূন্য করতে চেয়েছিল, ’৭১ এ একই কায়দায় ধামরাই রথ পুড়িয়ে তারা উল্লাস করেছিল।
’৭১ বাঙালির জীবনে আশীর্বাদ নিয়ে এসেছিল কিন্তু হিন্দু বাঙালি হয়েছিল কোনঠাসা। পাশ্ববর্তী দেশে ভারতে আশ্রয় খুঁজেছিলেন উদ্বাস্তুরা। কেউ কেউ ফিরেছেন, কেউ কেউ থেকে গেছেন। জসীম উদ্ দীন ‘গীতারা কোথায় যাবে’ ‘গীতারা কোথায় গেল’ কবিতায় সে নির্মমতার কথা তুলে ধরেছেন। এক উদ্বাস্তু হিন্দু পরিবার কিভাবে ঠাঁইহীন হয়ে পড়ল। সে দুঃখের কথাই তিনি এ কবিতার ভেতরকার কথামালায় গেঁথেছেন।
পল্লিকবি জসীম উদ্ দীন রচিত ‘ভয়াবহ সেই দিনগুলোতে’ কাব্যগ্রন্থে ১৬ মে রচিত ‘ধামরাই রথ’ কবিতায় তিনি ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ধর্মীয় ভণ্ডামি, সাম্প্রদায়িকতা, নির্মমতা ও হিন্দু-নিধনের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে লিখেছেন...
...বছরে দু-বার বসিত হেথায় রথ-যাত্রার মেলা,রাজনৈতিক সময়ে সময়ে ধামরাই রথযাত্রার রথকে বাহিনীসে- কবিতা পুঁই দিয়েছিল পল্লীবিবির সামনে ফুটে উঠেছে। এ কবিতায় তিনি বাঙালি সনাতনী হিন্দুর সাথে একাত্ম প্রকাশ করে, প্রতিবাদের ভাষা ছিল। তৎকালীন সময়ে থেকে শুরু করে বর্তমান অবধি বিশ্লেষণ, বাংলা সম্প্রদায়ের বারংবার নিগৃহীত কথা। শত শত মঠ-মন্দির ছাত্রলীগ উগ্র মৌলবাদী কাউন্সিল। এখনইও সে চুলচুলি নিয়মনি, কারণ বিচার রাষ্ট্র মৌলবাদী সমর্থন তৎপরতা। সনাতনী সম্প্রদায়কে যতবারই কোনঠাসা করে দেওয়া হয়েছে—ঠিক বারই তারা স্ব-মহিমায় পাথরে পড়েছিল। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের 'আমরা' কবিতায় এপন্থি পঙ্ক্তির মধ্যে বাঙালি দিয়ে হিন্দুত্বশা, আত্মদান ও পুলিশের ছবি ফুটে উঠা থাকার।
কত যে দোকান পসারী আসিত কত সার্কাস খেলা।
কোথাও গাজীর গানের আসরে খোলের মধুর সুরে।
কত যে বাদশা বাদশাজাদীরা হেথায় যাইত ঘুরে।
শ্রোতাদের মনে জাগায়ে তুলিত কত মহিমার কথা,
কত আদর্শ নীতির ন্যায়ের গাঁথিয়া সুরের লতা।
পুতুলের মত ছেলেরা মেয়েরা পুতুল লইয়া হাতে।
খুশীর কুসুম ছড়ায়ে চলিত বাপ ভাইদের সাথে।
কোন যাদুকর গড়েছিল রথ তুচ্ছ কি কাঠ নিয়া,
কি মায়া তাহাতে মেখে দিয়েছিল নিজ হৃদি নিঙাড়িয়া।
তাহারি মায়ায় বছর বছর কোটী কোটী লোক আসি,
রথের সামনে দোলায়ে যাইত প্রীতির প্রদীপ হাসি।
পাকিস্তানের রক্ষাকারীরা পরিয়া নীতির বেশ,
এই রথখানি আগুনে পোড়ায়ে করিল ভস্মশেষ।
শিল্পী হাতের মহা সান্ত্বনা যুগের যুগের তরে,
একটি নিমেষে শেষ হয়ে গেল কোন বর্বরে৷
”....মন্বন্তরে মরিনি আমরা মারি নিয়ে ঘর করি,
বাঁচিয়া গিয়েছি নিয়মর আশিসে অমৃতের টিকা পরি।”
তথ্যসূত্রঃ
১. এই বাংলা খুলি বাংলা / ডঃ সব্যসাচি ঘোষিত, প্রথম প্রকাশ, অক্টোবর ১৯৯১, ফার্মা কে। এল এম. প্রাইভেট লিমিটেড কলকাতা
২. পুরাণ/মীজানুর ঢাকা রহমান, প্রথম প্রকাশন
৩. ইতিহাস ইতিহাস/ শ্রীযতীন্দ্র মোহন রায়, দ্বিতীয় খন্ড, ১৩২২ বঙ্গাব্দ
৪. নারী সেই দিনগুলো/জসীম উদ্দীন
৫. ছেড়ে আসা গ্রাম/ দক্ষিণারঞ্জন বসু, প্রশ্ন, ১৩৮২ বাঙ্গাব্দ
৪. নারী সেই দিনগুলো/জসীম উদ্দীন
৫. ছেড়ে আসা গ্রাম/ দক্ষিণারঞ্জন বসু, প্রশ্ন, ১৩৮২ বাঙ্গাব্দ
0 Comments