নিষিদ্ধ লোবান এক নিবিড় পাঠের কথা II অন্তর চন্দ্র

 নিষিদ্ধ লোবান এক নিবিড় পাঠের কথা: অন্তর চন্দ্র 




১৯৭১ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের এক নিবিড় পাঠ ‘নিষিদ্ধ লোবান।’ এক দিশাহীন যুবকের মুখোমুখি লাশের পাহাড়। যার পিতা-মাতা লাশ হয়ে গেছে, বোন নির্যাতনের শিকার, ছিন্নভিন্ন লাশ পড়ে আছে গ্রামের তাগড়া জোয়ানদের, কুকুরেরা টানা হেঁচড়া করছে, ওদের চোখেও জলের ধারা গড়গড় করে পড়ে জলেশ্বরীর বুকে। জলেশ্বরী, উত্তরের হিমেল বাতাস আর পৌষের ঠান্ডায় হিম হয়ে যাওয়া এক নিবিড় জনপদের করুণ কাহিনী। জলেশ্বরীর পাশেই তো আধাকোশা ধরলা; যার বুক চিরে বেরিয়ে আসে তাজা রক্তের উত্তাল! সৈয়দ হক তাকেই এঁকেছেন, নিষিদ্ধ লোবানের নিবিড় পাঠে।

উপন্যাসের শুরুটা হয়েছে এক বীরঙ্গানার জীবনের অসহায়ত্ব দিয়ে। এ পর্বের মূল নায়ক বিলকিস এবং সিরাজ অর্থাৎ হিন্দুর ছেলে প্রদীপ যিনি নাম পাল্টিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে সিরাজ রেখেছেন। একটা পত্রিকা অফিসে কাজ করতো বিলকিসের স্বামী, সেই অফিস থেকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানো হতো; একদিন সেখানে পাকিস্তানি বাহিনী বোমা বিস্ফোরণ করে তারপর থেকে তার স্বামী আলতাফ উধাও হয়ে যায়। বিলকিস হয়ে পড়েন নিঃস্ব, একমাত্র অবলম্বন তার স্বামী যার কোন খোঁজ নেই, গ্রামে-গঞ্জে চলছে বর্বরতা, অসহায় হয়ে বিলকিস ট্রেনে করে ফিরতে চান গ্রামের বাড়ি জলেশ্বরীতে কিন্তু ট্রেন মাঝপথে এসে থমকে যায়, নবগ্রামে, ট্রেন আর এগোয় না; স্টেশন মাস্টারের কাছে বিলকিস শুনলেন জলেশ্বরীর ভয়াবহ দৃশ্যমান ছবি, রক্তক্ষয়ী বাস্তবতায় বিলকিসের হৃদয় শিহরিত হয়ে উঠল কিন্তু নির্জন ঝোপঝাড় পেরিয়ে তাকে পৌঁছাতে হবে ৪-৫ মাইল দূরের জলেশ্বরী। এখানেই আসে সিরাজের প্রসঙ্গ অর্থাৎ প্রদীপের সঙ্গে বিলকিসের পথচলা, নবগ্রাম থেকে জলেশ্বরী পৌঁছাতে একজন অচেনা-অজানা বালক একমাত্র সঙ্গী। বিলকিসের আপোসহীনতা এবং সিরাজের হঠাৎ ঢুকে পরা এক বিস্ময়কর ঘটনা, সাহায্যের জন্য অনির্দিষ্ট লোক বিপদের নাকি সময়ের প্রয়োজনে তা বুঝতে গোলমাল হয়ে যায়; এখানে লেখকের চমৎকৃত ভাবনার প্রকাশ এবং বৈচিত্র্যতা পাঠককে মুগ্ধ করে।

সৈয়দ হক উপন্যাসে শুধুমাত্র ভয়াবহ বর্বরতার কাহিনী উপস্থাপন করেছেন, অস্ত্র ধরতে উৎসাহ দিচ্ছেন না, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যের ছবিও আঁকেছেন না বরং একজন যুবতী ও কিশোরের স্বজন হারানোর অসহায়ত্বকে এখানে উপস্থাপন করছেন। পাকিস্তানি বাহিনী সে সময় পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারছে, গ্রামে গ্রামে রাজাকারের উৎপাত, হিন্দুর ছেলে প্রদীপ নাম পাল্টিয়ে সিরাজ রেখেছেন এসব তো অহরহ; আশ্চর্য হতে হয় যখন সিরাজ তার আসল পরিচয় বিলকিসের কাছে বলেন এবং বিলকিস তা নিয়ে মৌন থেকে গেলেন, তার হৃদয়ে কোনো অনূভুতি পরিলক্ষিত হলো না বরং তার চিন্তা চেতনা যেন পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর হাতে বন্দি ছোট ভাই খোকাকে নিয়ে। সিরাজ পারতেন অন্যদের মতো ইন্ডিয়ায় চলে যেতে কিন্তু সিরাজ তা করেননি বরং জীবনকে বাজি রেখে, দেশকে ভালোবেসে, দেশের মানুষকে বুকে জড়িয়ে এখানেই সমাধিস্থ হতে চেয়েছিলেন, সিরাজের এ শপথ একদিন সত্যি হয়েছিল কিন্তু তার হৃদয় থেকে দেশপ্রেমের মহত্ত্বকে বর্বরতা দিয়ে ঢাকা যায়নি। সিরাজ: ‘সিরাজ অপ্রস্তুতভাবে একটুখানি হাসে। তারপর গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলে, বাবা-মা-বোন সবাই চলে যাবার পর, আপনাকে বলেছি তো, ইন্ডিয়ায় চলে যেতে চেয়েছিলাম। সাহস হয় নি। কয়েক সপ্তাহ পালিয়ে বেড়িয়েছি। একদিন কী একটা সোর উঠল, রাতদুপুরে উঠে পালাতে হলো। জানেন দিদি, এমন জায়গা দিয়ে ঘোর অন্ধকারের ভেতরে আমাকে পালাতে হয়েছিল, যেখানে গোক্ষুর সাপের আস্তানা! সবাই জানে। দিনের বেলাতেই আমরা কেউ ওদিকের ধারে কাছে যেতাম না। সেখান দিয়েই আমাকে পালাতে হয়, আপা।
সিরাজের মুখে একবার আপা একবার দিদি এই প্রথম কানে লাগে বিলকিসের। জলেশ্বরী হিন্দুপ্ৰধান জায়গা ছিল এক সময়। এখনো এখানে অনেক মুসলমান পরিবার দাদা-দিদি ব্যবহার করে। আপা চল হয়েছে পাকিস্তান হবার পর। তার আগে বুবু চলত। বুবু ডাক আশা করে নি বিলকিস, কিন্তু আপা আর দিদি এর কোনো একটা হলে তার কানে লাগত না। সম্বোধনের দুটোই ব্যবহার করাতে সিরাজকে তার বয়সের চেয়েও ছোট মনে হয়, বেড়ে ওঠা একটা কিশোর মনে হয়, যে এখনো ঠিক অভ্যস্ত নয় অচেনা কোনো মহিলার সঙ্গে দীর্ঘকাল কথা বলতে।
সিরাজ বলে চলে, প্রতি মুহূর্তে ভাবছিলাম, এই সাপের কামড়ে মরব, এই সাপ ছোবল দেবে। জানেন তো রংপুর গোক্ষুর সাপের জন্যে কেমন বিখ্যাত? কিন্তু কী আশ্চর্য কী করে বেঁচে গেলাম! পরদিন মনে হলো, কেন যাব। ইন্ডিয়ায়? যাব না। এখানেই থাকব। আমার বাবা-মা-ভাই-বোন যেখানে গেছে, সেখানেই থাকিব, শেষ দেখব।’


আপা বা দিদি ডাক প্রসঙ্গ নিয়ে বিলকিসের মনে সন্দেহ জাগলেও সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায় নি বরং আমার মনে হচ্ছিল, সিরাজকে সাথে পেয়ে বিলকিস কিছুটা ভয় থেকে নিজেকে সামলে নিয়েছিল এবং চুপিচুপি সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতো; যেটা সিরাজ ছাড়া সম্ভব হতো না। কিশোর সিরাজের উদ্দাম সাহস আর বীরাঙ্গনা বিলকিসের ২৫ মার্চ কালরাতের পর ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বহন করে। উপন্যাসের অন্তিম পর্যায়ে দেশপ্রেমের জন্য খোকাকেও জীবন দিতে হয়েছে, কুকুরেরা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন লাশের স্তূপ টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, পাকিস্তানি বাহিনীর বাঁধা পেরিয়ে গোপনে খোকার লাশকে সমাধিস্থ করতে গিয়ে বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেন বিলকিস ও সিরাজ। 
ওরা লেংটা করে প্রমাণিত করল সিরাজ হিন্দু, বিলকিসকেও হিন্দু মনে করে নির্যাতন করে, শেষ পর্যন্ত ওরা সিরাজকে অর্থাৎ প্রদীপকে হত্যা করে ফেলল; একটি সাহসী ছেলে যে কিনা নিজের জীবন বাজি রেখে দেশকে ভালোবেসে বিলকিসের সঙ্গী হয়ে বাকী জীবনটায় ভয়াবহ বর্বরতার শিকার হয়েছে।

মেজরের নির্মম অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে তাদের, এক নারীকে উলঙ্গ করে তাদের উল্লাস, আগুন হয়ে জ্বলতে থাকে, যেন ডালিমের পেটের মধ্যভাগ, বিলকিস দেখতে পায় নিজের ভিতরের তেজদীপ্ত মানুষটাকে মেজর কু কথা বলে ক্ষেপাতে চায় কিন্তু বিলকিসের কঠোরতা রুখতে পারে না।
মেজরের বয়ানে: ‘আমি তোমোয় সন্তান দিতে পারব। উত্তম বীজ উত্তম ফসল। তোমার সন্তান খাঁটি মুসলমান হবে, খোদার ওপর ঈমান রাখবে, আন্তরিক পাকিস্তানি হবে, চাও না সেই সন্তান? আমরা সেই সন্তান তোমাদের দেব, তোমাকে দেব, তোমার বোনকে দেব, তোমার মাকে দেব, যারা হিন্দু নয়, বিশ্বাসঘাতক নয়, অবাধ্য নয়, আন্দোলন করে না, শ্লোগান দেয় না, কমিউনিস্ট হয় না। জাতির এই খেদমত আমরা করতে এসেছি। তোমাদের রক্ত শুদ্ধ করে দিয়ে যাব, তোমাদের গর্ভে খাঁটি পাকিস্তানি রেখে যাব, ইসলামের নিশান উড়িয়ে যাব।’


উপন্যাসের বীরঙ্গনা বিলকিস একজন তেজদীপ্ত নারী, যার কঠোর ধৈর্য সরলতা এবং সৎ সাহসের বহিঃপ্রকাশ ‘নিষিদ্ধ লোবান।’ যে নিজের স্বামীর মৃত্যু দেখেছে, ভাইয়ের মৃত্যু দেখেছে, সিরাজের মৃত্যু দেখেছে কি নির্মম! সেই বিলকিস উপন্যাসের অন্তিম সময়ে পরাজিত শিকার করল নাকি মেজরের অত্যাচারে আগুন হয়ে উঠেছিল তার পরিপূর্ণতা বোঝা মুশকিল। আসলে, বিলকিস একটি সময়ের নাম আর সিরাজ সেই সময়ের একজন যোদ্ধা; পাকিস্তানি বর্বর আলবদর, আলশামস, রাজাকার ইত্যাদি বর্বর বাহিনী মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে নয়টি মাস; তারপর আসে ডিসেম্বর বিজয় দিবস। বিলকিস এবং সিরাজ সেই বিজয়ের বলিদান।

সৈয়দ হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাসকে কেন্দ্র করে ২০১১ সালে নাসির উদ্দীন ইউসুফের পরিচালনায় নির্মিত হয়েছিল ‘গেরিলা’ চলচ্চিত্রটি। ‘নিষিদ্ধ লোবান’ মুক্তিকামী মানুষের বর্বরতার চিহ্নকে ধারণ করে। আমরা দেখেছি বিলকিসের যাতনা, সিরাজের উদ্দাম সাহস আর মানুষের মৃত্যুর এই সৃজনশীলতা একটি দেশের পতাকা।


Post a Comment

0 Comments