মৃত্যু শব্দটির সাথে পরিচয় বহুদিন। মৃত্যু বলতে কী বোঝায়? মৃত্যুর সংজ্ঞা কি হতে পারে? শুধুই কি, নশ্বর দেহের চিরাচরিত নিয়মের প্রাকৃতিক ব্যাধি, এক্সিডেন্ট, হাসপাতালের বেড, লাশকাটা ঘর ইত্যাদি। নাকি মৃত্যু ব্যাপারটি রহস্যময় এবং প্রাসঙ্গিক। যোগীরা বলেন, মহাসমাধি, সুফিরা ফানা, সাধারণেরা মৃত্যু, দেশপ্রেমিক কিংবা যুদ্ধে শহীদ ইত্যাদি। এখানে যুক্তিবিদ্যা খাটে না, মৃত্যুর পর কাউকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়! বিজ্ঞানও অমরত্ব খুঁজে পায়নি। ধার্মিকেরা অমরত্বের কথা বললেও সেটি প্রক্ষিপ্ত।
মৃত্যু ব্যাপারটিকে কবি ও সাহিত্যিকগণ নানাভাবে উপস্থাপন করেছেন, কেউ দেখেছেন চেতনার বিনাশ রূপে, কেউ ভেবেছেন নশ্বর দেহের কথা কিন্তু মৃত্যু ধারনাটি থেকে গেছে পূর্বের চিরাচরিত নিয়মের মতোই। ‘মনসা-মঙ্গল’ কাব্যে লক্ষিন্দরের মৃত্যুর দীর্ঘ সংলাপ, বেহুলার আত্মত্যাগ, সতী হওয়া সবটাই দৈব্ প্রকরণের বিষয়বস্তু হলেও মধ্যযুগীয় সাহিত্যে স্বামীর মৃত্যু নিয়ে একজন নারীর স্বর্গ জয়ের কথা খুবই বিরল। এখানে এক গরীব কাঠুরের স্ত্রী সতী সাবিত্রী’র প্রসঙ্গও নিয়ে আসা যেতে পারে। সেইসব মৃত্যুকে জয় করার দুঃসাহস নারীদের অসহায়ত্বকে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিল। এটি আধ্যাত্মিকতার সংমিশ্রণে তৎকালীন সমাজ-ব্যবস্থার অবহেলা, নিপীড়ন ও বিশ্বাসের দ্বারা রচিত হয়েছে। কিন্তু কাব্যসাহিত্যে একজন নারীর মৃত্যুকে জয় করে ফিরে আসার কাহিনী— এই প্রথম।
বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম মৃত্যু নিয়ে হৈচৈ করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘জীবনস্মৃতি’ পড়লে, দেখা যায় তার পরিবারের সদস্যদের একেরপর এক চলে যাওয়া, এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অসহায়ত্ব এবং মৃত্যু চেতনার কথা। ব্রজবুলিতে তিনি লিখলেন, ‘মরণ রে, তুহু মানুষ শ্যাম সমান!’ এখানে মৃত্যু অসহায়ত্বের প্রতীক নয়! বরং আধ্যাত্মিক প্রেম ও মুক্তির প্রতীক। ‘মৃত্যু’ কবিতার প্রথম দুটি পংক্তিতে আছে, ‘মৃত্যুও অজ্ঞাত মোর। আজি তার তরে/ ক্ষণে ক্ষণে শিহরিয়া কাঁপিতেছি ডরে’ কিংবা ‘যাবার সময় হল বিহঙ্গের’ কবিতায় ‘পথচিহ্নহীন শূন্যে যাব উড়ে রজনীপ্রভাতে অস্তসিন্ধু—পরপারে/ কতকাল এই বসুন্ধরা আতিথ্য দিয়েছে’ কিংবা ‘যাবার দিন’ কবিতায় ‘যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই/ যা দেখেছি, যা পেয়েছি, তুলনা তার নাই’ অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় মৃত্যু অতিক্রমের একটা অতিলৌকিক ভাব পাওয়া যায়। ব্রহ্মবাদের বৈশিষ্ট্যগুলোও চোখে পড়ে। মূলতঃ পৃথিবীতে কেউই বেঁচে থাকার জন্য আসেনি মরণকে বরণ করে নিতে হয়েছে প্রত্যেককে। কিন্তু পৃথিবীর সুখ ঐশ্বর্য্যের মোহ থেকে কেউই বের হতে চাননি। কেউ কেউ পৃথিবীকের স্বর্গের উপমায় ধন্য করেছেন। তাই কবিরা পৃথিবীর প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করেন। কিন্তু ব্যক্তি জীবনে যখন মৃত্যুকে বড় করে দেখা হয়, তখন সেটি হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে বড় করুণ অসহায়ত্ব। রবীন্দ্রনাথের ঠিক পরেই, জীবনানন্দ দাশের কবিতায় কিংবা তার ব্যক্তিগত জীবনের দিকে তাকালে মৃত্যুর যে চিত্রপট ফুটে ওঠে তা দেখলে মনে হয় বাংলার আর কোন কবির লেখায় মৃত্যুপ্রসঙ্গ এতো তীব্র হয়ে ফুটে উঠেনি। তিনি যখন বলেন, ‘শোনা গেল লাশ কাটা ঘরে/ নিয়ে গেছে তারে কাল রাতে/ ফাল্গুনের রাতের আধাঁরে/ যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ/ মরিবার হ’ল তার সাধ।’ অথবা অন্য আরেকটি কবিতায় লিখেছেন, ‘মৃত্যু জেনেছি, তবু অন্য সম্মুখীন মৃত্যু আছে’ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা বাংলা সাহিত্যে অন্তত কোন কবিকে এত সাহস নিয়ে বলতে শুনিনি। তিনি মৃত্যুর পাড়ে থেকেও পৃথিবীর বৈচিত্র্যকে উপভোগ করতে চান। মৃত্যু নিয়ে এত মাতামাতি তিনি করেছিলেন, যে তার ব্যক্তিগত জীবনের শেষ দিনগুলির কথা মনে হলে, শম্ভুনাথ পন্ডিত হাসপাতাল কিংবা লাবণ্য দাশের সেই লেখাগুলির কথা মনে পড়ে যেখানে কবি নিজেই হয়েছিলেন মৃত্যুর দেবতা; দেবতা এই অর্থে যে তিনি মৃত্যুকে তিলে তিলে শৈল্পিতভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, সে জন্য আজও জীবনানন্দীয় মৃত্যু চেতনার বাস্তবতা নিয়ে এতো আলোচনা-সমালোচনা। লাবণ্য দাশ বলেন, ‘মহাকালের ডাক যখন আসে, তখন ধরিত্রী মায়ের বুক খালি করে নিরুদ্দেশের পথে বেরিয়ে আমাদের পড়তেই হবে। আশা, আকাঙ্ক্ষা, ভালবাসা সব কিছুই মায়াবী মৃত্যুর হাতে তুলে দিয়ে সমস্ত চিন্তা ভাবনার পরিসমাপ্তির রেখা টানতেই হয়। ’ জীবনানন্দ দাশের লেখাতেও আমরা দেখতে পাই, ‘আমরা মৃত্যুর আগে/ কি বুঝিতে চাই আর?/ জানি না কি আহা সব/ রাঙা কামনার শিয়রে/ যে দেয়ালের মতো এসে/ জাগে ধুসর মৃত্যুর মুখ/ একদিন পৃথিবীতে স্বপ্ন/ ছিলো–সোনা ছিল যাহা/ নিরুত্তর শান্তি পায়/ যেন কোন্ মায়াবীর/ প্রয়োজনে লাগে।’ এই কথার সূত্র ধরে যদি মৃত্যুকে বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে দেখা যায়, জীবনের বৈচিত্র্যতা, বেদনা, ভালোবাসা সমস্ত কিছুর আয়োজন আঠার মত লেগে থেকে জীবনকে মায়াবী করে তোলে— সে জীবন ছেড়ে কেউ আর বেরোতে চায় না, এজন্যই বুঝি দুঃখ। ‘ক্রন্দসী’ কাব্যগ্রন্থে ‘মৃত্যু’ নামক কবিতায় সুধীন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন, ‘মৃত্যুর সৈকতে মহত্ত্ব কল্পনামাত্র।’ অথচ স্বার্থসিদ্ধির জন্য জীবনে কত ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়। রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ দাশের মতো সুধীন্দ্রনাথও মৃত্যুর পরও পৃথিবীর সুখভোগ করতে চান। পৃথিবী নামক সৌরজগতের এই গ্রহে ফিরে আসতে চান। তার ‘মৃত্যু’ নামক কবিতার শেষ দিকটায় লক্ষ্য করলে বিষয়গুলো চোখে পড়ে। নজরুলের কাছে মৃত্যু ছিল জীবনের পরিপূর্ণতা। তার কবিতা ও গানে জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও মৃত্যু অনিবার্য সত্য। তবে এই মৃত্যু মানুষকে অমরত্ব দেয়- সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে, আত্মত্যাগ ও প্রেম-আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমেই। তিনি বলেন, ‘আমার যাবার সময় হলো, দাও বিদায়/ মোছ আঁখি, দুয়ার খোলো, দাও বিদায়’ কিন্তু তার লেখা পড়তে গিয়ে দেখেছি তিনি শেষ বিদায়ের পরেও বেঁচে থাকতে চান মানুষের চেতনারূপে। তাই হয়তোবা তিনি লিখেছিলেন, ‘‘যেদিন আমি চলে যাব, সেদিন হয়তো বড় বড় সভা হবে। কত প্রশংসা কত কবিতা বেরুবে হয়তো আমার নামে! দেশপ্রেমিক, ত্যাগী, বীর, বিদ্রোহী বিশেষণের পর বিশেষণ! টেবিল ভেঙ্গে ফেলবে থাপ্পড় মেরে—বক্তার পর বক্তা। এই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের শ্রাদ্ধ-দিনে— বন্ধু! তুমি যেন যেও না। যদি পার, চুপটি করে বসে আমার অলিখিত জীবনের কোনো একটি কথা স্মরণ কোরো। তোমার ঘরের আঙিনায় বা আশেপাশে যদি একটি ঝরা, পায়ে-পেষা ফুল পাও, সেইটিকে বুকে চেপে বলো— “বন্ধু আমি তোমায় পেয়েছি।”” নজরুলের এই আত্মবিলাপ নিজের প্রতি অসন্তোষ থেকেই নাকি মানুষের চেতনার ভয়াবহতা দেখে। তিনি মানুষের কাছে পৌঁছতে গিয়ে যে আঘাত পেয়েছেন বলা যায় এটি তারই একটি চিত্র। তিনি ভালোবাসা দিতে চান কিন্তু আমরা ক’জন গ্রহণে সক্ষম। নজরুলের মৃত্যু ভাবনায় সুফিবাদ ও আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তার গানে ও কাব্যে মৃত্যুকে আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণের আবদার রাখে। তখন মৃত্যুও মধুর হয়ে ওঠে! এটি বড়ই আশ্চর্যের। অন্যত্র জসীমউদ্্দীনের ‘কবর’ কবিতায় মৃত্যুপ্রসঙ্গ প্রাকৃতিক ব্যাধি কিংবা স্বাভাবিক। এখানে মৃত্যুর হলস্থুল কান্ড আছে কিন্তু আধ্যাত্মিকতা নেই; তীব্র হাহাকার আছে কিন্তু অমৃতের স্বাদ নেই; অথচ মৃত্যুর অন্তিম শয্যায় মানুষের আর্তনাদ ও স্বজনপ্রীতি খুবই কষ্টের ও রহস্যময়। সত্যও সে নয়! মিথ্যাও সে নয়!
মৃত্যু নিয়ে রামায়ণের বাল্মিকীর যে ভাবনা সেটি দুটি পাখিকে ঘিরে; গাছের ডগায় মিলনরত দু’টি পাখির একটিকে শিকারি তীরবিদ্ধ করে মেরে ফেলে— অন্য পাখিটি শোকে হাহাকার করতে থাকে এরপরেই বাল্মিকী রাগান্বিত হয়ে শিকারীকে অভিশাপ দেন। বলা হয়ে থাকে এই কাহিনী থেকেই কবিতার জন্ম। অর্থাৎ কবিতা জন্মের প্রাক্কালে মৃত্যুভাবনা ছিল। কিন্তু মহাভারতের কালে এসে আমরা দেখি তীরবিদ্ধ ভীষ্মের যে করুণ পরিনিতি তার জন্য সূর্যের দিকে অর্থাৎ উত্তরায়ণের অপেক্ষা করতে হচ্ছে, এখানে মৃত্যু মুক্তির প্রতীক। রামায়ণ ও মহাভারতের মৃত্যু Symbol নিয়ে সাহিত্যিক অন্বেষণ করলে দেখা যাবে— মৃত্যু ব্যাপারটি শুধুমাত্র নশ্বর দেহের পরলোকগত ব্যাপার নয় বরং এটি চেতনার পরাজয়। চৈতন্যবোধ না থাকলে প্রত্যেকেই মৃত। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ঐ বিখ্যাত পংক্তিটির কথা যদি ধরি, ‘জন্মিলে মরিতে হবে/ অমর কে কোথা কবে/ চিরস্থির কবে নীর/ হায় রে, জীবন-নদে?’ সত্য তো তাই বলে কিন্তু জীবনের মূলমন্ত্র কোথায়? শুধুই কি আধ্যাত্মিকতা বা মোহ মুক্তির পথ খুঁজতে জীবনের সর্বস্ব ব্যয় করা নাকি চার্বাকের মতো বলতে হবে— ‘যতদিন বাঁচো সুখে বাঁচো। ঋণ করে হলেও ঘি খাও। মৃত মানুষ আর কখনো পৃথিবীতে ফিরে আসবেন না।’ আসলে জীবনের মানে কি? এই কথাটি খুঁজতে গিয়েই মৃত্যুর মতো একটা ভয়াবহ প্রসঙ্গ উঠে আসে। প্রাকৃতিকগতভাবে সেটি স্বাভাবিক কিন্তু মানুষের মানসিক নিয়মের কাছে তার বাধা আছে। চিরায়ত কাল থেকেই সে বাধা পঙ্গু হয়ে আছে— মৃত্যুর পাড়ে তাই দাঁড়িয়ে সত্যকে স্বীকার করে নেয়।
হাংরি আন্দোলনের প্রবক্তা মলয় রায়চৌধুরী ‘আমার মৃত্যু চেতনা’ নামক প্রবন্ধে বলেছেন, ‘‘বাংলাদেশের বহু কবির কবিতায় যে মৃত্যুচেতনা পাই, তাও কাব্যিক মৃত্যুচেতনা, তাতে খান সেনাদের হত্যালীলায় যে ধরণের প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত, বুদ্ধিজীবিদের দেহাবশেষ দেখার পর, যত্রতত্র ছড়ানো তরুণীদের ধর্ষিত শব দেখার পর, যে ধরণের ক্রোধোন্মত্ত মৃত্যুচেতনার প্রকাশ হওয়া উচিত ছিল, তা পাই না।’’ অর্থাৎ তিনি মৃত্যুর ভয়াবহতাকে গ্রহণ করে বিদ্রোহী সাহিত্য রচনার কথা বলতে চান কিন্তু কাব্য-সাহিত্যক্ষেত্রে লেখকের কাব্যিক অভিব্যক্তির যথার্থতা তো লেখকের নিজস্ব অভিমত। অবশ্য পাঠকের মন্তব্যের প্রতি কটাক্ষ করতে পারি না। কিন্তু মৃত্যু ব্যাপারটিকে কাব্য-সাহিত্যে বিশ্লেষণের দায়ভার কেনইবা একজন সাহিত্যিক বা কবিকে নিতে হবে! যদি সেটি করতেই হয় সেখানে মৃত্যুর রহস্যমেদুর কল্পলোকের ছাপ থাকবে। মৃত্যু বলতে আমরা যা বুঝি তা যদি কাব্যিক অভিব্যক্তির যথার্থতা প্রকাশ হয় তাতেও বাধা দেবার কিছু নেই; মূলতঃ উপলব্ধির চরম সীমায় তাকে ব্যখ্যা করা যেতে পারে। মৃত্যু কথাটির অর্থবোধক উচ্চারণের সাথে সাথেই অনুভূতির চরম সীমায় পৌঁছে যাওয়া যায়। সেখানে মৃত্যুপ্রসঙ্গকে তিনি পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম শৈল্পিক বলবেন কি-না সে বিষয়ে যাচ্ছি না। আমার মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মূহূর্ত হচ্ছে বেঁচে থাকা স্বপ্ন দেখা কারণ মৃত্যুতে সবকিছুর শেষ হয়ে যায়। তাই মৃত্যু ব্যাপারটি আমার কাছে খুব ছোট্ট একটা ব্যাপার। বেঁচে থাকাটাই অস্বাভাবিক ও বৈচিত্র্যময়। সিলভিয়া প্লাথ যখন বলেন, “আমি নিজেকে হত্যা করতে চাই।.... ফিরে যেতে চাই মাতৃজঠরে, শোচনীয় হামাগুড়ি দিয়ে।” তখন তিনি পৃথিবীকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন, অথবা তার সমাজব্যবস্থাকে কিংবা সমাজের সেই সব লোকেদের যারা সৃষ্টির বৈচিত্র্যতা সম্পর্কে অনভিজ্ঞ কিন্তু হিংস্র। তখন মৃত্যু হয়ে ওঠে তার জীবনের দুর্বিষহতার উদাহরণ। মলয় রায়চৌধুরী সেইসব মৃত্যুর কথা বলেছেন, যে মৃত্যু হিংস্রতা থেকে; সেই মৃত্যুকে শক্তিতে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন, সেটি হতে পারে আমাদের বেঁচে থাকার দিকনির্দেশনা।
কবি অনন্য রায়ের কাব্য-সাহিত্যে মৃত্যুভাবনা জীবনের জটিল সময়গুলোকে ঘিরে, নারীকেন্দ্রিক কিংবা কাঙ্খিত বস্তুর প্রতি মোহ থেকেই জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ! তার কবিতায় তিনি মৃত্যু প্রসঙ্গ বারবার নিয়ে এসেছেন, নিজেকে খুঁজেছেন কবিতার শরীরবিদ্যায়। ‘মার্কি দ্য সাদ’ কবিতায় উচ্চারণ করেন, “যদি না বিবাহ করো/একদিন স্নানের ভ্রমে সব গ্লানি ধুয়ে ফেলে আত্মহত্যা করে/ পরজন্মে, কথা দিচ্ছি, অ্যামিবাওসিস হয়ে তোমাকে ভীষণ কষ্ট দেবো!” তার কবিতার সৃষ্টিশীল হাহাকার হয়তোবা পাঠকের মনে পীড়া জাগাবে কিন্তু একজন সমালোচক খাঁ খাঁ দুপুরে দাঁড়িয়ে মৃত্যু ব্যাপারটিকে বিশ্লেষণের আবদার রাখে, তখনই মৃত্যু হয়ে ওঠে দর্শনের মূলমন্ত্র। মলয় রায়চৌধুরী যখন বিখ্যাত হাংরি কবিতা ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতায় বলেন... “আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই/মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না” তখন মৃত্যু হয়ে উঠে হাহাকারের প্রতীক। নিজের মৃত্যুকে দেখে যাওয়ার ভাবনা অবমানবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অথবা যখন তিনি বলেন, পৃথিবীতে তার কোন প্রয়োজন নেই; অথচ তিনি জন্মেছেন, তার মানে তাকে কর্ম করতে হচ্ছে, নিজের চাহিদা-আকাঙ্ক্ষা রয়েছে— এসব কিছু থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি মানুষ শান্তি চায়। কিন্তু সে শান্তি কোথায়? কেউ জানে না। নিজের ভেতরের দুর্বলতাকে মৃত্যু বললে বোধহয় ভুল হবে না। দুর্বলতা জীবনের সমস্ত সুখ কেড়ে নেয়। শামশের আনোয়ারের ‘এই কলকাতা আর আমার নিঃসঙ্গ বিছানা’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে গেল, ‘খোলা ব্লেড দেখলেই তৃষ্ণায় আমার গলা জ্বলে/ পাখার হুক দেখলে মনে পড়ে যায় সোনালী ফাঁসের কথা’ একই কবিতায় বলেছেন, ‘বৃষ্টি আর কুয়াশায় বাইশ বছর এরকম দাঁড়িয়ে থাকার পর/একদিন আমি ঘুমের মধ্যেই খুন হয়ে যাব।’ অথবা ‘মরুভূমি ও মায়াবী জ্যোৎস্নায়’ তিনি লিখলেন, ‘ অশ্রুপাত... অশ্রুপাতের চেয়েও মর্মান্তিক সংগীত আর কিছু নেই পৃথিবীতে’ কিংবা ‘অনুগামী’ কবিতায় ‘আমি মুখে ব্লেড নিয়ে ঘুরি/সাজিয়ে রাখা বেনারসীর জরি ছিঁড়ে/ চলে যাব—/ আয়না, তোমার গায়ে ফেলে যাবো স্থায়ী দাগ।’ এ ধরনের কবিতার ভিতর থাকে এক ধরণের নিস্তব্ধতা। নিঃসঙ্গতা। একাকীত্ব। এই একাকীত্ব থেকে বের হওয়ার জন্য আমাদের হৃদয় ব্যাকুল হয়ে ওঠে! কিন্তু মৃত্যু যখন জীবনের অংশ তখন সুন্দরের ঐশ্বর্য খুঁজতে গিয়ে কে নিজেকে হারাতে চায়? মৃত্যুই ধ্রুব সত্য। এ সত্য থেকে নিস্তার পাওয়ার উপায় নেই।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে শামসুর রাহমানের কাব্যগ্রন্থ ‘বন্দি শিবির থেকে’ -এর কবিতাগুলোতে মৃত্যুর ধ্বংসস্তূপ, নির্মমতা, পরাধীনতা ও শোষণের তীব্র প্রতিবাদ লক্ষ্য করা যায়। এখানে মৃত্যু হয়ে উঠছে দেশমাতৃকার প্রতি আত্মসমর্পণ। এ দৃশ্য ভয়ঙ্কর! কিন্তু জয়ের; তাই এখানে চারিদিক থেকে মৃত্যু আসে, ঝোপে-ঝাড়ে, নদী-নালায় মৃত্যুকে খুঁজে পাওয়া যায়। এখানে আধ্যাত্মিকতা নাই আছে সচেতনতা। ভালোবাসা। দেশপ্রেম। মলয় রায়চৌধুরী, যদি শামসুর রাহমানের এই কবিতাটি পড়তেন, তবে তিনি আফসোস করতেন না, যে বাংলাদেশের কবিতায় মৃত্যুর নির্মমতা নিয়ে তীব্র কবিতা লেখা হয়নি। হুমায়ূন আজাদ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ সহ বহু কবির লেখায় নির্মমতার চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে হাহাকার, নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার তীব্র প্রতিবাদী কন্ঠস্বর পাওয়া যায়। শামসুর রাহমানের ‘আমাদের মৃত্যু আসে’ কবিতাটি একবার পড়ে আসি।...
আমাদের মৃত্যু আসে ঝোপে ঝাড়ে নদী নালা খালে
আমাদের মৃত্যু আসে কন্দরে কন্দরে
আমাদের মৃত্যু আসে পাট ক্ষেতে আলে
গ্রামে গঞ্জে শহরের বন্দরে
আমাদের মৃত্যু আসে মাঠে
পথে ঘাটে ঘরে
আমাদের মৃত্যু আসে হাটে
সুডৌল ট্রাফিক আইল্যান্ডে ধু-ধু চরে
আমাদের মৃত্যু আসে কাদায় মাটিতে
আমাদের মৃত্যু আসে ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে
পরিখায় বিবরে ঘাঁটিতে
আমাদের মৃত্যু আসে বরিশাল, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, ঢাকায়
আমাদের মৃত্যু আসে কুমিল্লা, সিলেট, চাটগাঁয়
আমাদের মৃত্যু আসে প্লেনে চেপে, জাহাজ বোঝাই করে আসে
আমাদের মৃত্যু আসে সুপরিকল্পিত নকশারূপে
আমাদের মৃত্যু আসে ইসলামাবাদ থেকে
আমাদের মৃত্যু আসে কারবাইনে বারুদের স্তূপে
আমাদের মৃত্যু বিউগলে যায় ডেকে
( আমাদের মৃত্যু আসে // বন্দি শিবির থেকে ~ শামসুর রাহমান )
দেশপ্রেম, স্বাধীনতা, পরাজয় কিংবা ব্যক্তিগত চেতনার ভয়াবহতা বা প্রাকৃতিক ব্যাধি বিপর্যয়ের মুখে মৃত্যুর যে চিত্রপট লক্ষ্য করা যায় তা আমাদের নিয়তি থেকে নয়! বরং জীর্ণ-ক্লিষ্ট জীবনের অবহেলা ও সহমর্মিতার অভাব থেকে আসে আর প্রাকৃতিক ব্যাধি, এক্সিডেন্ট এসব জীবনের নিরাপত্তা কেড়ে নেয়। আজ যিনি এত মূল্যবান, কাল তিনি নাও হতে পারেন। যাকে এত ভালোবাসি, সে কাল ছেড়ে যেতে পারে। এ নিয়ে কেন এত প্রশ্ন! আমরা তো কেউ ত্রিকালদর্শী নই যে মৃত্যুর খুঁটিনাটি সম্পর্কে জানব কিন্তু এটুকু বলতে পারি, মৃত্যু মানে শুধু মহাকালের শেষ নয়! পুনরুজ্জীবন। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থটি তোমাকে এ বিষয়ে সাহায্য করতে পারে। মৃত্যু শব্দটির ভেতরেই অমরত্ব! চেতনা না থাকলে সকলেই মৃত। আজকে যে এত দম্ভ, প্রতিপত্তি, অহংকার— একদিন সব চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে। মধ্যযুগের কবি রামপ্রসাদ গাইলেন, ‘দিন দুই-তিনের জন্য ভবে/ কর্তা ব’লে সবাই মানে/সে কর্তারে দেবে ফেলে/ কালাকালের কর্তা এলে’ অর্থাৎ অহংকার থেকে বেরিয়ে আসলে আসল সত্যকে জানা যায় না। সে— সত্যই মৃত্যু।
বাংলা কাব্য-সাহিত্যে মৃত্যুর বিস্তর আলাপচারিতা বারংবার আমাদের ক্লান্ত-শ্রান্ত করেছে। নায়ক-নায়িকার প্রেম, একাকিত্ব, প্রতিহিংসা, রণ-হিংসা, ধর্ষণ, জবরদস্তি, খুন-খারাপি ইত্যাদি বিষয়গুলো সাহিত্যের বারবার উঠে এসেছে। যেখানেই মানুষ নির্যাতিত হয়েছেন জীবনের অভাববোধ করেছেন, সেখানেই সাহিত্যের সৃষ্টি হয়েছে। আর সাহিত্য আছে বলেই মৃত্যুও দর্শনের মূলমন্ত্র হয়ে গেছে। মৃত্যু আছে বলেই পৃথিবী এতো বৈচিত্র্যময়।


0 Comments