১১⁰ তাপমাত্রায় শরীর অবশ হয়ে আসছে। প্রচণ্ড শীত ও ঠাণ্ডা বাতাস। অংকুর একাডেমির পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষে জয়নাল আবেদীন আমাদের বললেন... ‘বই পড়লে পৃথিবীর সমস্ত অস্ত্র কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।’ বইয়ের ভেতর জাদু আছে; একটা রহস্যময়ী অতিন্দ্রীয় উল্লাস পাঠকের মস্তিষ্ক চিবোতে থাকবে। মস্তিষ্কের স্বাদ গ্রহণে সক্ষম একদল লিপি বলে দেবে অনূভুতির ভাষা। ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছি। বাইরে পাঠাগারের জন্য নতুন বইয়ের তাক তৈরি হচ্ছে। বইয়ের তাকে বিগত আত্মার ঢেউখেলানো হাসি তোমাদের পৃথিবীর সমস্ত অস্ত্র গিলে খাচ্ছে। মলাটের একেকটি পাতায় ভবিষ্যতবাণী। সবুজ পৃথিবী।
একদল ছারপোকা বইগুলো খাওয়ার আগে আমাদের পড়তে হবে। সবচেয়ে কঠিন অস্ত্র তৈরি করতে হবে। হ্যাঁ! শিশুদের মগজে ঢুকিয়ে দিতে হবে— বস্তুতঃ উদাহরণ। অস্ত্রে আমাদেরও বিশ্বাস আছে, গুলির নির্দেশ দেবার আগে ফোটাতে হবে সবগুলো ফুল। প্রতিটি ফুলের বাগান মন্ত্রপূত অক্ষরের সাথে ভিজিয়ে নিয়ে— নরম বাতাসে আমাদের হৃদয়খেকো সমুদ্র মুছে দিতে হবে।
বোমা তৈরির সবগুলো মেটেরিয়াল খুঁজতে সার্চ করতে হবে না ফেসবুক, ইন্সট্রাগ্রাম, ইউটিউব, গুগল সবটা বাঁধাই আছে মলাটে। শুধুমাত্র, পাতা উল্টালেই সবকিছু পেয়ে যাবে। পাঠাগারে কয়েক হাজার বই তাকে সাজানো। অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। প্রতিটি পৃষ্ঠা যিনি পড়বেন, তার দখলে পুরো পৃথিবী চলে যাবে। বইয়ের সাথে একটু কথা বলুন.... সে আপনার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেবে। সব অস্ত্র তার কাছেই জমা আছে।
আমরা অস্ত্র জমা দেবো না। অস্ত্রে আমাদের বিশ্বাস আছে। লিপি ও ভাষার প্রতিটি অক্ষরে রক্ত, ঘাম, ক্লেদ ও মায়ের সন্তান হারানোর বেদনা আছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামীতে আমরাই প্রথম কৃষ্ণগহ্বর হব। ঠেকিয়ে দেবো পৃথিবীর সবগুলো অস্ত্র। কেউ আমাদের সাথে পারবে না। অন্ততঃ এখুনি বাড়ির পাশের পাঠাগারে যোগাযোগ করুন। প্লেটো, পাভলভ, বোদলেয়ার, অ্যারিস্টটল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল সবগুলো অস্ত্র এখনও লুট করতে পারেনি। পাঠাগারে ঢুকে পড়ুন। পৃথিবী বদলে দিন। আর দেখুন, আপনি কতটা ক্ষমতাবান। মলাটের একেকটি পাতায় গত শতাব্দীর সবগুলো মেটেরিয়াল এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আছে। পাঠাগার ছেড়ে মস্তিষ্কের অপচয় করবেন না। জন্মান্ধ কেউই জীবিত নন! মাথা কেটে পাঠানোর আগে অন্ততঃ একবার দু'বার বারবার ভাবুন, মাথা শিল্প তৈরির কারখানা। শিল্পের কাজ কি? সৃজনশীলতা; তোমার নেই, তাই তুমি জন্মান্ধ! বোধের ক্ষতি হলে অমানুষ হয়ে যাব— ওরা আমাকে নষ্ট করে দেবে তাই পাঠাগারের তাকে সাজানো বইয়ের গন্ধ শুঁকতে লাগলাম।
ভ্রাম্যমান পাঠচক্রে একবার রাস্তার ধারে, পথে-ঘাটে আমাকে পড়ছি নিবিড় প্রেমে— সাথে যারা একমত তারাও কিছু না কিছু পড়ছে লক্ষ্য ভেদ করাই একমাত্র উদ্দেশ্য। কিন্তু একটি বইয়ের নামের সাথে অস্ত্রের সম্পর্ক জানতে পারলে কেউ তোমাকে মুক্তি দেবে না— কারণ তুমি সবুজ ভালোবাসো! তোমার অস্ত্র সবুজাভ পৃথিবীর সবগুলো মানুষ তুলে আনে। তুমিই মুক্ত-বিহঙ্গ! তুমিই জানো, বই মস্তিষ্কের দখল নিলে তুমি শুধুই অস্ত্র পাবে— সমস্ত মানুষ তোমার নিয়ন্ত্রণে আসবে— যারা পড়বে।
সব অস্ত্র কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে— এটা বিশ্বাস করি না। অস্ত্রে সুসজ্জিত পাঠাগারের তাকে স্নিগ্ধতার ছোঁয়া, কোলাহলহীন নগরী ও সংস্কৃতির প্রবল উল্লাস। লালন-হাছন হরিনাথের মনের মানুষ খুঁজতে গিয়ে একবার দাঁড়িয়েছিলাম, পাঠাগারের একটি নির্জন বারান্দায়; দেখলাম, অশ্বথের নিবিড় সংলাপ ছায়ার সাথে, নদীর কূল কূল ধ্বনি, প্রিয়ার গদগদ কন্ঠ, কোকিলের কুহু কুহু আর আমাদের ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, রসতত্ত্বের সবগুলো মেটেরিয়াল সেখানে আছে— বায়ান্ন’র সবগুলো পা হেঁটে যাচ্ছে লাইব্রেরী’র শহরে মায়ের অব্যক্ত ভালোবাসা ওখানে গোছানো আছে। অক্ষরের নাড়িভুঁড়ি নিয়ে যখন কেউ কথা বলেন বস্তুতঃ মায়ের আঁচল নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, যার উৎকৃষ্ট স্থান পাঠাগারের তাকগুলোতে; আমাদের ছেলেমেয়েরা এসব অস্ত্র নিয়েই দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।
তুমি কি চাও? একটি সিগারেট পেলে খুশি হবে। হ্যাঁ! তুমি যা ইচ্ছা নিতে পার হাজার হাজার নেশা লুকিয়ে আছে বইগুলোর কলেবরে। একটু সময় দাও। তুমি একা নও। আমরাও তোমার সাথে নেশায় বুঁদ হব। খাতায় লিখে রাখো প্রত্যেকটি নেশাদ্রব্যের নাম। একদিন হঠাৎ করেই, সবগুলো নেশা তোমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তম মানুষে পরিণত করবে। আমার উপর বিশ্বাস রাখো, প্রত্যেকটি সময়ের চেয়েও মূল্যবান সময় তোমার কাছে হাজির হবে। অন্ততঃ ভালোবাস কিংবা নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয়ে বুক সেল্ফ সাজাও।
কর্ণাটকের আঙ্কে গৌড়াকে দেখো, ভিটেমাটি বিক্রি করে ২০ লক্ষ বইয়ের তাক্ সাজিয়েছেন, নাটোরের পলান সরকারের মতো বৃদ্ধ সদাচারী মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকো পায়ে হেঁটে মাইলের পর মাইল বইয়ের সাথে তার গোপন সংলাপ ২০টি গ্রামকে পড়ুয়ায় রূপান্তরিত করেছে। ভাবছো, পড়াশোনা করে কি লাভ? লেখাপড়া না জানা কুড়িগ্রামের ইটভাটার শ্রমিক জয়নাল আবেদীনকে দেখেছি, বইয়ের তাক্ সাজাতে; বই নিয়ে তার এতো উল্লাস তোমাকে ভালোবাসতে শেখাবে। জাভা দেশের রেদোয়ান সুরুরি দুর্গম এলাকায় বই পৌঁছে দিতে তার জীবন্ত ঘোড়াকেই লাইব্রেরী বানিয়ে দিয়েছেন— পাড়ায় পাড়ায় বই বিনিময় করেন। তার থেকে শিখো পৃথিবীতে টিকে থাকার প্রয়োজনীয় সমাধান। দই বিক্রেতা জিয়াউল হক যদি পারে তুমিও পারবে। তুমি বরং ভালোবাসো। একটি বইয়ের মোহে পৃথিবীর সবকটা যুদ্ধ থামিয়ে দাও! যুদ্ধে মানুষ মরে আর তুমি মরা মানুষ বাঁচাবে। আনন্দ কর। অমৃত তোমার কাছেই আছে। তুমি শুধু, পান করতে শিখে নাও! বেঁচে যাবে।
ওরা তোমাকে পড়তে দেবে না। বন্দুকের নলে তোমাকে বারবার ক্ষতবিক্ষত করবে। শিক্ষার মান বেড়ে যাবে ভয়ে ওরা তোমাকে গাধার মত খাটাবে। ওদের ব্যক্তিগত পাঠে তোমাকে মগ্ন করাবে, তারপর রেজাল্ট সিট হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবে তুমিই সেরা কিন্তু যখন তুমি পৃথিবীর দীর্ঘতম দিনগুলোর দিকে তাকাবে তখন দেখবে তোমার কিছুই শেখা হয়নি। ওরা পাঠাগারের উন্নয়ন চায় না। গ্রন্থাগারগুলো ধুলো ধূসর জগতে পড়ে থাকে। ওরা তোমাকে কূটনৈতিক জালে হিংস্র করে তুলবে। ওরা বন্দুকের নলে গরীব মানুষের কদর করে। তুমি ওদের কাছে যেও না বরং পাঠাগারের জন্য একটু সময় দাও। তুমি তোমার থেকে বেরিয়ে এসো দেখো—আমরা সবাই মুক্ত-বিহঙ্গ।
আমি এক ঝাড়ুদারকে চিনি যিনি প্রতিদিন পাঠাগারের ধুলো জমা বইগুলো ঝাড়ু দেন। তিনি আমাকে বলেন, ‘প্রতিদিন আমি বইয়ের তাকের ধুলোবালিই ঝাড়ি না বরং হৃদয়ের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা ঘৃণার স্তুপ ঝেড়ে ফেলি।’
এক শতবর্ষী পাঠাগারের কাছে দু’জন বৃদ্ধ খবরের কাগজ পড়ছেন। ঐ দু’জন বৃদ্ধ যাদের বুকের হাড় গোনা যায়, মুখের চামড়া ঝুলে গেছে তারা পড়ছেন পৃথিবীর দুরন্ত শিশু আগামীকাল কি করবে? তাদের সামনে কি? ফাঁদ? ওরা বুঝে ওঠার আগেই পড়ার টেবিলে যেতে হবে তোমাদের— পাঠাগারের সামনে অন্ততঃ কান রাখতে বলা যাবে। আমরা বৃদ্ধরা সকল জায়গা ছেড়ে দিব যদি তোমরা পড়ার টেবিলে মাথা খাটিয়ে গড়ে তোলো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নিকেতন।
কি নেই তোমার? হাত, পা, চোখ, কান সব আছে— তুমিই পার একটা দেশ, একটা পৃথিবী, একটা সৌরজগতের সবচেয়ে শক্তিধর মানুষ হতে। এতটুকু বিশ্বাস রাখো সমস্ত দুর্নীতি, সংস্কৃতির অভিশাপ, মব-সন্ত্রাস নিমিষেই শেষ হয়ে যাবে। আমাদের সেই শক্তি সঞ্চিত আছে পাঠাগারের বইয়ের তাকে। রক্তিম পৃথিবীকে আমরাই সবুজের আবরণে সাজিয়ে দিতে পারি। আমরাই মধূকূপী ঘাস।
পাঠাগারের নির্জন টেবিলে মাথা ঠুকে চেতনায় তুলে আনি বস্তুতঃ বেঁচে থাকার উদাহরণ। নির্মল আনন্দে কেটে যাক সারাজীবন। সব পাঠাগারের নির্জন টেবিলে জমা থাকুক— পৃথিবীর ঋণ।
( ছোটনদী পত্রিকার দ্বাদশ বর্ষ, ১ম সংখ্যা, এপ্রিল এ প্রকাশিত হয়েছে । )


0 Comments