১. জীবন রথে আনন্দ ভ্রমণ ~ অন্তর চন্দ্র
____________________________
ঈদের ছুটি মানে শুধুই ঘোরাঘুরি। লোকে বলে, জীবনটা একটা রঙ্গমঞ্চ । যেখানেই যান না কেন মনকে প্রফুল্ল রাখতে ঘুরতেই হবে। শুধু শুধু ঘরে বসে থাকলে চলবে না। আনন্দ চাই , আনন্দ ভ্রমণ। দলাই লামা বলেছেন, "প্রতি বছর এমন একটি জায়গায় ভ্রমন করা উচিৎ যেখানে এর আগে কখনই যাওয়া হয় নি ।" আমিও ঠিক করলাম এ বছর অন্য জায়গায় ঘুরতে যাব। যেসব জায়গা আগে গিয়েছিলাম সেসব জায়গা বারবার না যেয়ে, নতুন কোন জায়গায় বেড়াতে যাব। অপরূপা পল্লীবালারকে বিদায় জানিয়ে দূরে, বহুদূরে এক মহানগরীর পথে বেড়িয়ে পড়লাম। সেদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬ টায় গাড়িতে উঠলাম উলিপুরে । গাড়ি চলছে, গাড়ির জানালা দিয়ে দেখতে লাগলাম অপরূপাকে, ভীষণ চমৎকার! এক্কেবারেই মন ছুঁয়ে যায়। গাড়ি চলছে রাত্রির আঁধারে উচ্চঃশ্রবা হাক দিয়ে। প্রথমেই, খরস্রোতা তিস্তার বুক ছুঁয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি। বহু নদ-নদী, নালা, পল্লী-গ্ৰাম, নগরী পেড়িয়ে যেতেই যমুনার আলিঙ্গন । যমুনা নদীর বুকে " বঙ্গবন্ধু সেতু "র মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। শ্রান্তিহীন দীর্ঘ ১৩ ঘন্টা যাত্রার পর চলে আসলাম নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা উপজেলার কাঠেরপুল নামক জায়গায়। সেখানে চাকুরী সূত্রে বাবা- মা থাকেন । সেখানে ৮ তলা বাড়ির মধ্যে ২য় তলায় একটা রুম ভাড়া নিয়ে সেখানে থাকেন। মনে মনে ঠিক করলাম ঈদের আগের দিন দূর- দূরান্ত ঘুরবো পরে না হয় , কাছের জায়গাগুলো ঘুরব। এমন উঁচু-নিচু অট্টালিকা , অসংখ্য লোকের পদচারণা, মাথার উপর দিয়ে বিমান উড়ে যাওয়ার দৃশ্য সব মিলিয়ে খুব চমৎকার লাগলো। সেখানে যাওয়ার দু'দিন পর মামাসহ ঘুরতে গেলাম খান সাহেব ওসমান আলী স্টোডিয়াম মাঠ বাসা থেকে ১০ মিনিট হাঁটলেই হয়। না, ভিতরে কখনোই যাইনি। শুধু বাহির থেকে বেশ কয়েকবার দেখেছি। তখন রাত হয়ে এসেছে পরদিন গেলাম ফতুল্লা নৌবন্দরে শীতলক্ষ্যা নদীর অপরূপ সৌন্দর্য। লঞ্চ, স্টিমার, নৌকা সব মিলিয়ে খুব ভালো লাগলো। নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। ভো ভো শব্দ কাণে এসে লাগে। নদীর জল কালচে হয়ে গেছে। কলকারখানার আবর্জনা বর্জ্য পদার্থ নদীতে ফেলার কারণে নদীর বেহাল অবস্থা। জানিনা সেখানে স্নান করা ঠিক কি না তবুও কিছু লোক সেখানে স্নান করে। নদীর পাড়ে আসলেই মনটা ভালো হবে এটা কিন্তু খাঁটি কথা। এদিকে বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। বাসা ফিরে আসলাম আকাশ মেঘাচ্ছন্ন কখনো কখনো প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে রাস্তা কাঁদা বৃষ্টিতে গাঁ ভিজে গেছে। হালকা সর্দি লেগেছে ঠান্ডার কারণে মায়ের কাছে মাথায় তেল মালিশ করে নিলাম। শুয়ে পড়লাম রাত পেরোলেই ঘুরতে যেতে হবে অনেক দূরে, সবার প্রস্তুতি শেষ। বাবা-মা ছোট ভাই এবং বাসার অনেকেই ঘুরতে যাওয়ার প্লানে সম্মত হয়েছে। ছোট ভাই আনন্দে ঝম্প দিল, খুশিতে আত্মহারা। কবে যে রাত পেরোবে তারই অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকলাম। ঊষার আলোয় আলোকিত হলো দিক - দিগন্ত আমরা ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। ঘুরতে যাব আনন্দ হয় কিন্তু কোথায় যাব ? তা এখনও ঠিক হয়নি। কেউ বলছে বারদী যাব আবার কেউ বলছে ঢাকেশ্বরী যাব! কিন্তু যাবটা কোথায়? হঠাৎ করেই মাথায় আসলো , এবারে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ঘুরতে যাব। না, সেখানে কখনও যাইনি, এটি বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির । তাড়াহুড়ো করে একটু খেয়ে সকাল দশটার মধ্যেই বেরিয়ে পড়লাম। কিছুদূর হেঁটে গেলাম। এদিকে বৈশাখের তীব্র রৌদ্রে গা পুড়ে যায়। আপাদমস্তক ঘর্মস্নান হল। শিবু মার্কেটে গিয়ে সিএনজিতে উঠলাম সাইনবোর্ড এর উদ্দেশ্যে, তারপর সেখানে গিয়ে গাড়িতে উঠে সোজা চলে গেলাম ঢাকেরশ্বরী মন্দিরে। প্রথমে মন্দিরের বাইরের দিকে প্রাচীরে ব্যানারে খুব চমৎকার কিছু উক্তি দেখতে পেলাম। কয়েকটি কবিতার লাইন, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সৈয়দ সামসুল হক, জসীমউদ্দীন ছাড়াও অনেকের মনোমুগ্ধকর উক্তি তাছাড়াও কারুশিল্প অঙ্কিত ব্যানার। মন্দিরের গেট পেরুতেই দশভূজা , একটু সামনে গিয়ে দেখি ছোটবেলায় পাঠ্যবইয়ে পড়া সেই ঢাকেরশ্বরী মাতার মন্দির। আহা! অপূর্ব দেখেই যেন হৃদয় টা জুরিয়ে গেল। মামার কাছ থেকে মোবাইলটা নিয়ে কিছুটা ভিডিও করলাম এবং সবাই মিলে ক্যামেরা বন্দি হলাম। চারদিকে অগণিত মানুষের পদচারণা , দেখতে পেলাম কিছু ভিনদেশী লোকও এসেছে। তারাও আমাদের মত আনন্দ করছে, ছবি তুলছে। এটা বলে রাখা ভাল যে, দুপুর ২ টা থেকে ৪ টা পর্যন্ত মন্দির বন্ধ থাকে। কারণ তখন ভোগ আরতি হয় । খুব মজা করে ঘুরলাম, কারণ আজকে দলটা ভারী ছিল, মা - বাবা , মামা বৃষ্টি, সাথী,বর্ণা,শুভ্র, আকাশ,অনন্ত সহ ছোটবড় মিলে ২৩ জন। ঢাকেশ্বরী মন্দির ঘোরার পর, অবশেষে ফিরতি পথে গাড়ি না পেয়ে কিছুদূর হাঁটতে লাগলাম। এটা বলে রাখা ভালো যে, বাস সবসময় পাওয়া যায় কিন্তু বাসে যাত্রা করব না কয়েকজনের সমস্যা আছে। তাই হাঁটতে লাগলাম সামনে যেতেই বাংলাদেশ উচ্চ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পাশেই বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ হাফ কি.মি হেঁটে ড. শেখ ফজলে রাব্বী হলের কাছে অন্য কোন গাড়ি না পেয়ে বাসে উঠলাম বাসার উদ্দেশ্যে। কিন্তু ভ্রমণের নেশা এখনো কাটেনি এবার ভাবলাম বারদী যাব লোকনাথ বাবার আশ্রমে। সবার এতে সম্মতি ছিল প্রথম থেকেই যদিও বাবার সম্মতি ছিল না কারণ বাবা বাসে উঠলে বমি করে। এটাই তার একমাত্র সমস্যা। বাসের মধ্যেই ঠিক করলাম বারদী যাব। কাঁচপুর ব্রিজ পার হয়েই মদনপুরে এসে বাস থেকে নেমে অটোগাড়িতে উঠলাম বারদী উদ্দ্যেশ্যে । এটি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলায় মনোরম প্রকৃতির আচ্ছাদনে আবৃত্ত একটি গ্রাম । শহর ঘুরতে ঘুরতে হাঁপিয়ে পড়েছি, এবার গ্রামের অপরূপ দৃশ্য যেন নজর কেড়ে নেয়। এ যেন জীবনানন্দের রূপসী বাংলা" রুপের নাইকো শেষ"। মাঠ - ঘাস , নদী- নালা অপরূপ ক্ষেতেরবন , সত্যিই অসাধারণ। এখানে না আসলে কখনোই বুঝতে পারতাম না। মেঠো পথের সারি সারি গাছ, জঙ্গল, আর নির্মল পবন বায়। ছবির মতো সুন্দর গ্রামখানি। এক্কেবারেই আমাদের গ্রামের মতো সুন্দর। গাড়িতে বসে গ্রামের দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে বারদী এসে গেছি, মনেই হয়নি। অবশেষে লোকনাথ বাবার আশ্রমে আসলাম , প্রথমে গেটের সামনেই লোকনাথ বাবার সমাধি মন্দির। এখানেই লোকনাথ বাবা ভবলীলা সাঙ্গ করেন। কাছে যতেই আরো কয়েকটি মন্দির দেখতে পেলাম। আরেকটা জিনিস এখানে লক্ষ্য করলাম, জাতিভেদ বলে কিছু নেই। আমরা সবাই মানুষ একে অপরের বন্ধু। এটা অনুভূত হতে থাকলো। কারণ এখানে হিন্দু - মুসলমান ,বৌদ্ধ- খ্রিষ্টান কোন ভেদাভেদ নেই। বিদ্রোহী কবি বলেছেন... " গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।" লোকনাথ বাবার চোখে সবাই সমান ছিল এবং এখনো তা আছে। "জয় বাবা লোকনাথ" বলে সবাই সেখানে গিয়ে যার যা মনের ইচ্ছা তাই চেয়ে নিচ্ছে। মানুষে মানুষে যে প্রেম এখানে না আসলে কখনোই বুঝতে পারতাম না। আমরা একই রক্ত মাংসের মানুষ, সকলেই সকলের বন্ধু। বারদীতে এসে মনে তৃপ্তি পেলাম, সত্যিই অবাক হয়ে গেলাম! বিবেকানন্দের সেই বিখ্যাত "সখারপ্রতি" কবিতার শেষ লাইনটি মনে পড়ে গেল " জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ইশ্বর।" অতঃপর সন্ধ্যা ৬ টায় রওনা দিলাম বাসায় উদ্দেশ্যে ফিরে আসলাম। পরদিন অর্থাৎ ঈদের দিন নারায়ণগঞ্জ শহর ঘুরতে গেলাম চারদিকে বড় বড় ভবন দেখে মন ভরে গেল। সামনেই শহীদ মিনার সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম মামা , ছোটভাইসহ অনেকেই ফুচকা খাচ্ছে। আমার পেটের সমস্যার কারণে সেদিন খেলাম না। শহীদ মিনারের দিকে তাকিয়ে আছি। এমন সময় দেখি হাতে ফুল নিয়ে এক ফুলওয়ালী ফুলের মালা বিক্রি করছে ১৩-১৪ বছর বয়স হবে । পাশেই দেখি আরও একটি ছেলে বয়স আর কতইবা হবে ৫-৬ বছর কোলে দু'এক বছরের একটি বাচ্চা হাতে ফুলের মালা বিক্রি করছে। যে বয়সে তাদের কলম ধরার কথা। আজ অভাবের টানে তারা কতটা নিঃস্ব । মানুষ ফুল ছিঁড়ে ফেলে আর তারা ফুল পুঁজি করে থাকে। বড় বড় বাবুদের পিছনে গিয়ে বলতে থাকে "ফুল নেবে গো " একটি মালা নাও। কিন্তু কয়জনই বা তাদের মালা নিয়ে নেয়। ফুলের মালা বিক্রি করে তাদের পেট ভরে। গায়ে নোংরা পোশাক ধূলোয় জীর্ণশীর্ণ। সেই শিশুদের এরকম অবস্থা দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। হায়রে, জীবন চোখে জল এসে যায়। তারপর শহরে কিছুদূর হেঁটে বাম পাশেই একটি গীর্জা ২ নং রেলগেট পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে দেখে বাসায় ফিরলাম। তারপর সেখানে কিছুদিন থেকে তিশা গাড়িতে করে প্রাণের শহর চিলমারীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বাড়ি ফিরে এসে মনে হলো , চিফ স্যাটেলের সেই কথাটি," পদচিহ্ন ভুলে যাও আর সৃতিগুলো নিয়ে নাও ।"
তাং: ২৮.০১.১৪২৯ বঙ্গাব্দ
১২.০৫.২০২২ ইং
দক্ষিণ শিয়াচর, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ
২.


0 Comments