পাঠ পর্যালোচনা: নাদেজদা ক্রপস্কায়া’র ‘কীভাবে পড়তে হবে’ || অন্তর চন্দ্র















সমাজতান্ত্রিক অক্টোবর বিপ্লব বা জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব খেটে খাওয়া মানুষ অর্থাৎ শ্রমিক ও কৃষকদের জীবনের অন্যতম সেরা বিপ্লব। বহুযুগ আগে যখন বিচ্ছিন্ন গ্রামাঞ্চলের মানুষজনের প্রাথমিক জ্ঞানটুকু‌ও ছিল না। শিক্ষা ‌লাভের তেমন হেতু ছিল না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কি জিনিস তা তাঁরা জানত না। তাঁরা অজ্ঞানতার ভিতর ডুবে ছিল ‌ । যখন তাঁরা বুঝতে পারল তাদের জ্ঞানের প্রয়োজন। তখন তাঁরা সোভিয়েত সরকারের দ্বারস্থ হলেন। নিরক্ষরতা যখন চরম পর্যায়ে— ঠিক তখনই সোভিয়েত সরকার গ্রামাঞ্চল, গ্রন্থাগার এবং অসংখ্য বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার প্রসার ঘটান।  যখন তাঁরা বুঝতে সক্ষম হলেন— যে এতদিন ধরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যেখানে অগাধ শ্রম দিয়েছি সেই প্রতিষ্ঠানের কর্তা আমি।  নিজেদের প্রতি যখন এই বোধদয় হলো তখন তাঁরা শোধরানোর পথ খোঁজেন। তাঁরা অজানাকে জানার জন্য প্রস্তুত হলেন এবং জ্ঞানের চর্চায় মনোনিবেশ করলেন। কীভাবে জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে? এবং কীভাবে সমাজের ভালো দিকগুলোর প্রত্যেকটি জিনিসের মর্ম অনুধাবন করতে হবে।  সচেতন সমাজ করতে হলে কীভাবে জীবনযাপন করতে হবে? এগুলো প্রশ্ন নিজেকে করতে হবে। তাহলেই আমরা কোন নতুন দিশা খুঁজে পাব। সর্বশেষে নিজেকে একটা পর্যায় নিয়ে যেতে পারব।


এই সমাজ বিপ্লবের যুগে নতুন করে জীবন গঠনের জন্য মেহনতি মানুষের মন ব্যাপৃত। সমসাময়িক পুঁজিবাদ, সাম্যবাদ , রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ থাকা চাই। চিন্তাশক্তি জাগ্রত করে কঠিন জিনিসগুলো খুব সহজে বুঝতে সক্ষম করতে হবে।  ফেলা আসা দিনগুলোর বিভীষিকা মুছে নতুনের খোঁজ করা। প্রত্যেকটি জিনিস যথাযথভাবে বুঝে  সমস্যাগুলোর সঠিক সমাধান বের করতে হবে। প্রত্যেকটি জিনিসের মর্ম অনুধাবন করা। এদিকে  উপযুক্ত সাহিত্য, খবরের কাগজ পড়াও জরুরি। কারণ সমসাময়িক যেসব ঘটনা ঘটে সেগুলো খবরের কাগজে ছাপানো হয়। সেগুলো পড়তে হবে। এতে করে সমসাময়িক তথ্যগুলো সংগ্রহে থাকবে। তথাপি নিজের প্রতি যত্নশীল হওয়াটাও জরুরী।  প্রাকৃতিক ঘটনাবলী ও শক্তি অধ্যায়ন করে অতি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান সংগ্রহ করতে হবে।  বেশি বেশি করে ব‌ই অধ্যায়ন করতে হবে। আমরা বেশিরভাগ আদিম সংস্কৃতির চর্চা নিয়েই ব্যস্ত থাকি কিন্তু শুধু, আদিম সংস্কৃতির চর্চা করলেই হবে না, সমাজ বিকাশের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে, পুঁজিবাদ,  রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক  সমাজে কীভাবে সেগুলো কাজ করছে তাও দেখতে হবে। তবেই সমাজ কোন পথে যাচ্ছে তা বোঝা যাবে। এক্ষেত্রে পড়ার ও মননের চর্চা প্রয়োজন।


জীবনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব‌ই পড়লে যে আনন্দ পাওয়া যায় তা হয়তোবা আর অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। যারাই ব‌ইয়ের অতলান্ত সমুদ্রে একবার ঝাঁপিয়ে পড়েছে তারাই উপলব্ধি করতে পারেন ব‌ইয়ের মাহাত্ম্য। ছোটবেলা থেকে ব‌ই পড়ার যে অভ্যাস গড়ে ওঠে মা-বাবার হাত ধরে তখন থেকেই একজন মানুষ বুঝতে শুরু করে জ্ঞান আহরণের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে ব‌ই। আর এই ব‌ইয়ের সাথে সংসার করার সাধনাও  কঠোর সংগ্রামের মধ্যে নিজেকে তৈরি করা। নাদেজদা ক্রুপস্কায়া'র 'কীভাবে পড়তে হবে' ব‌ইটি অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন “ব‌ই ব্যাবহার করতে শেখা দরকার। নিজে নিজে বেশি ব‌ই পড়া এবং তাড়াতাড়ি পড়ার অভ্যাস করা প্রয়োজন। একাগ্র চিত্তে একেবারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব‌ই পড়তে শেখা প্রয়োজন। কিন্তু সেটাই যথেষ্ট নয়। পড়ে বুঝতে হবে ‌। সেটা আরো কঠিন, কারণ তার জন্য কিছু জানা-শোনা , ব্যাপকতর দৃষ্টি এবং শব্দ ও ধারণার ভালো জ্ঞান প্রয়োজন।” ব‌ইয়ের খুঁটিনাটি বিষয় বুঝতে হবে। তাড়াহুড়া করে কোনো লাভ হবে না। এটা, ব‌ইয়ের মধ্য দিয়ে নিজেকে জানার প্রচেষ্টা। যারা মনে করে ব‌ই হলো উৎপাদনশীল কাজের জন্য তাদের জন্য আমি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে দুঃখ প্রকাশ করছি। কেননা ব‌ই দ্বারা সুষম বিশ্বদৃষ্টি গড়ে তোলা সম্ভব। একটা আদর্শগত সমাজ গঠন করা সম্ভব। যে ব‌ই জ্ঞান আহরণের অন্যতম মাধ্যম তাকে উৎপাদনশীল কাজ ভাবাটা অর্থহীন।‌ ব‌ই থেকে অর্জিত জ্ঞানকে নিজের প্রয়োজনে লাগাতে হবে। মূল সারমর্ম কি বলা হয়েছে তা বুঝতে হবে। সময় ও শ্রম সঠিক কাজে ব্যাবহার করতে হবে। শুধু এলোমেলোভাবে পড়ে গেলেই হবে না, লেখক কি বলতে চেয়েছে? লেখক কোনদিকে মনোযোগ দিতে বলতেছে সেটা বুঝতে হবে। গভীরভাবে মনোনিবেশ করে মনোযোগ জাগিয়ে তুলতে হবে। খুঁটিনাটি বিষয়গুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যাতে করে আসল জিনিসটি হারিয়ে না যায়। সবচেয়ে ভালো হয় যদি ব‌ই পড়ার পর তার ছকটি লিখে ফেলা যায়। তাহলে ব‌ইয়ের বিষয়টি ছবির মতো পরিষ্কার দেখা যাবে।  


'নাদেজদা ক্রুপস্কায়া' অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় মনে রাখার জন্য বলেছেন। ব‌ই পড়ার ক্ষেত্রে এই সাতটি বিষয় মনে রাখতেই হবে। যা গণিতের সূত্রের মতো কাজ করবে। যা না পড়লেই নয়।
যথা :

ক) নিজের যেটুকু সময় আছে তাকে যথাযোগ্য নিয়মে বাঁধা;
খ) যতদূর সম্ভব কাজের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা;
গ) ব‌ই পড়ার অভ্যাস আয়ত্ত করা;
ঘ) অধ্যায়নের উপযুক্ত মালমশলা বাছাই করা;
ঙ) কাজ ঠিকভাবে ভাগ করে নেওয়া;
চ) সময় এবং শ্রম সংক্ষেপের দৃষ্টিকোণ থেকে দলগত কাজ কীভাবে চালাতে হবে, তা নির্ধারণ করা;
ছ) হাতের কাছে প্রয়োজনীয় সাহায্য পুস্তকাদি ও নির্দেশাবলী রাখা।


পরিশেষে বলতে হয়, জ্ঞানের কোন পরিসীমা নেই, জ্ঞান যেখানেই থাকুক না কেন তা অর্জন করতে হবে। নাদেজদা ক্রুপস্কায়া এমন একটি মূল্যবান ব‌ই উপহার দিয়েছেন , যা একজন মানুষকে সঠিক পথে চালিত করতে সক্ষম। 'কীভাবে পড়তে হবে' ব‌ইয়ে তিনি যে সূত্রগুলো উল্লেখ করেছেন জ্ঞানচর্চার জন্য আমার মনে হয় এর আগে কেউই এরকম প্রাঞ্জল ভাষায় সহজ সরল জ্ঞানচর্চার দিকনির্দেশনা দেননি। অবশ্য দেননি তা বলাটা ঠিক হবে না। তবে আত্মশিক্ষার জন্য নিজেকে আবিষ্কার করতে ' কীভাবে পড়তে হবে' ব‌ইটি আপনাকে পড়তেই হবে। নাদেজদা ক্রুপস্কায়া সত্যিই একটি অসাধারণ ব‌ই রচনা করেছেন। 


ব‌ই : কীভাবে পড়তে হবে

লেখক : নাদেজদা ক্রপস্কায়া

প্রকাশনা : বাঙ্ময় প্রকাশনা ১

তারিখ : ফাল্গুন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ খ্রিস্টাব্দ



( আমার লেখা প্রথম বুক রিভিউ এইটি)



Post a Comment

0 Comments