![]() |
| কবি ও লেখক অন্তর চন্দ্র |
বাঙালির গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রাণের উৎসব
বাঙালি জাতি তাঁর স্ব সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে আছে যুগ যুগ ধরে। গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় যে , উৎসব, আনুষ্ঠানিকতা, চলা-ফেরা সব মিলেমিশে একাকার। এখানে আলপথ বেয়ে হেঁটে গেলে দেখা যায়, আউশ কিংবা আমনের বাম্পার ফলন সবুজের সমারোহ। শীত পড়লেই আগুন জ্বালিয়ে ঠান্ডা নিবারণের চেষ্টা। জীর্ণ শীর্ণ মানুষের সূর্যের মিষ্টি রোদের অপেক্ষা কিংবা গ্রীষ্ম এলে গা বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ে। এমন দুঃসহ ক্লিষ্ট পরিবেশে গাছতলায় ছায়ায় বসে গায়ে হালকা বাতাসের জন্য প্রার্থনা। কোথাও দেখা যায়, কৃষক কাজ থেকে হালকা বিরতি নেওয়ার জন্য গাছের নিচে বসে আছে। মাছরাঙা তাঁর ঠোঁট ডুবিয়ে ছুঁই দিয়ে মাছ ধরছে। পদ্মরাঙা বিল থেকে ভেসে আসছে দারুণ সুগন্ধি পাশেই শাপলার বন। মন ভোলানো সব দৃশ্য দেখতে পাবেন এই ছবির মতো গ্রামে, যা আপনি কোথাও আর দেখতে পাবেন না। কিছুদূর পার হলেই দেখতে পাবেন ছায়াঘেরা বনানীর পাশে এঁকেবেঁকে চলে গেছে সরু নদী। সকাল হলেই প্রভাতী কোকিলের কুহুতান ভেসে আসে । চাঁদনী রাতে জোনাকির সাথে খেলা করে শিশু, দাদা কিংবা দাদীর মুখে হাজারো গল্প কিংবা চিন্তামূলক মজার মজার ধাঁধার আসর। রাত্রি গভীর হলে শোনা যায় শেয়ালের হাঁক। খুব সকাল সূর্য সবেমাত্র উঠেছে মানুষ যার যার কাজে যায় দু-মুঠো পান্তা ভাত খেয়েই। লাঙল, কোদাল, কাস্তে নিয়ে রৌদ্রে পুড়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছে কৃষক। চোখে এক বিশাল স্বপ্ন। সমস্ত জীবন সঁপে দিয়েছে জন্মভূমির মাতৃকার প্রতি। গরুর কাঁধে লাঙল চাপিয়ে তিনিই শুনতে পান জন্মভূমির ডাক। ভালোবাসায় সিক্ত এই মাটি । বিশাল খোলা মাঠে শিশু-কিশোররা খেলাধুলা করে। এ যেন নিত্য আনন্দের এক দারুণ জায়গা। অবশেষে সমস্ত স্মৃতি পরে থাকে এই উদ্যানের চৌদিক দিয়ে। গ্রামীণ সংস্কৃতির খেলাগুলোর মধ্যে জনপ্রিয় খেলাগুলো হচ্ছে বৌ ছি, গোল্লাছুট, হা-ডু-ডু, দাঁড়িপাল্লা, রান্নাবাটী, মোরগ লড়াই, নৌকা বাইচ ইত্যাদি। মানুষ সবসময়ই চায় নিজের অঞ্চলের সংস্কৃতির সাথে মিশতে, সেখান থেকেই শুরু হয় সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা। এই সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে বাঙালির প্রাণের স্পন্দন। প্রকৃতির রূপ লাবণ্য হৃদয়কে মোহিত করে। প্রকৃতির রূপ গ্রীষ্ম থেকে বসন্ত পর্যন্ত নানাভাবে সেজে ওঠে! এমন রূপের ঝলক কোথাও দেখতে পাবেন না। গ্রামের পথে পথে সুসজ্জিত ভাবে শোভা পাচ্ছে তাঁর নিজস্ব রূপ।
বাঙালির গ্রামীণ সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে গ্রামীণ উৎসব। যাতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মিলিয়ে একাকার। গ্রামীণ সংস্কৃতির দিকে লক্ষ্য রাখলেই আমরা দেখতে পাব, তাঁর সুরঞ্জিত রূপ। গ্রামীণ সংস্কৃতির উৎসব হয় হৃদয়ের টানে আর শহুরে উৎসব হয় টাকার বিনিময়ে। তাই গ্রামীণ উৎসবের সাথে শহুরে বাবু উৎসবের চত্ত্বরে কখনই গ্রামীণ উৎসবের তুলনা করা চলে না। খেটে খাওয়া মানুষের প্রাণের উৎসব তাতে উঁচু - নীচু ভেদ থাকে না। সেই উৎসবে যোগ দেওয়ার সম-অধিকার সবার রয়েছে। তাইতো এখন বাঙালির প্রাণের উৎসব গ্রামীণ সংস্কৃতির গণ্ডি পেরিয়ে শহরে গিয়ে পৌঁছেছে। আমরা জাতিগত ভেদ দূরে রেখে একে অপরের উৎসবের আনন্দ উপভোগ করি। হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সব মিলেমিশে একাকার। এই উৎসবগুলোর মধ্যে দিয়েই বাঙালি পূর্ণতা পায়। হৃদয়ের খোরাক যোগায়, সমস্ত তৃষ্ণা মিটে যায়। বাঙালির গ্রামীণ সংস্কৃতির সবচেয়ে জনপ্রিয় উৎসবগুলো হলো, পহেলা বৈশাখ, নবান্ন, পৌষ পার্বণ, দোল উৎসব ইত্যাদি। বাঙালির নিজস্ব গ্রামীণ সংস্কৃতি এর মধ্যে দিয়েই প্রাণ পায়।
পয়লা বৈশাখ: গ্রামীণ সংস্কৃতির সবচেয়ে মূল্যবান যে উৎসবগুলি পালিত হয় তার মধ্যে পয়লা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ অন্যতম। এই দিনটি দিয়েই বাঙালি তাঁর স্ব-সত্ত্বাকে উজ্জ্বল করে তোলে। বৈশাখের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় গ্রামে-গঞ্জে মেলার ধুম। ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি , আধুনিক, জারি-সারি, কুশান পালা ইত্যাদি গানের আসর বসে। হাজারো লোক জমায়েত হয়ে সেই অনুষ্ঠানে আনন্দ উপভোগ করেন। পুরো মাস জুড়ে নানান আয়োজনের মধ্য দিয়ে পয়লা বৈশাখ পরিপূর্ণতা লাভ করে। হাজারো রঙ -এর ভিড়ে সেজে ওঠে এই দিনটি। গ্রামে-গঞ্জে, স্কুল-কলেজে কিংবা নিজ বাড়িতে ভর্তা, মাছ, পান্তা ভাত খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। বিশাল আয়োজনে এই অনুষ্ঠান করা হয়ে থাকে । এরপর, নতুন জামা - কাপড় পরে বৈশাখী মেলায় যাওয়া। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হচ্ছে, পান্তা ভাত খাওয়া, রং মিছিল এবং রেলিতে অংশগ্রহণ করা। উঁচু-নীচু সব ভেদাভেদ ভুলে আমরা একে অপরের রং মিছিলে মেতে উঠি। বাঙালিরা নানান আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে এই দিনটিকে বরণ করে নেন। সাধারণত এ সময় দেখা যায়, গ্রামে যে হিন্দু ধর্মালম্বীগণ বসবাস করে তাঁরা অশুভ, রোগ-শোক, জরা-ব্যাধি দূর করার জন্য বিশেষ এক গাছের ব্যবহার করে। সকাল বেলা সূর্য উঠার সাথে সাথেই বিষ কাঁটালি নামক একটি গাছের পাতা জলে মিশিয়ে বাড়ির অমঙ্গল দূর করার জন্য সারা জায়গায় সেই জল ছিটিয়ে দেওয়া হয়। যাতে করে নতুন বছরটি সুখে শান্তিতে কেটে যায়। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে বৈশাখের এই প্রথম দিনটি থেকেই আম খাওয়ার নিয়ম দেখতে পাওয়া যায়।বৈশাখী মেলায় সবচেয়ে অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে নাগরদোলা। শিশু-কিশোরদের মন মজানোর জন্য নাগরদোলা সহ নানান কিছু দেখতে পাওয়া যায়। বেশিরভাগ মানুষ তো নাগরদোলাতে দোলা খাওয়ার জন্যই আসে। আবার দেখা যায়, এই দিনটিকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীগণ তাঁদের পুরনো হিসাব-নিকাশ ঝেড়ে ফেলার জন্য হালখাতা করে থাকেন এবং নতুন করে ব্যবসার খাতা খুলে বসেন। সব মিলেমিশে এইদিনটি আমাদের জীবনে দারুণ প্রভাব ফেলে।
নবান্ন: শীতের আমেজ পড়তে না পড়তেই শুরু হয়ে যায় নবান্ন আসার ধুম। কৃষাণ বধূর মুখে হাসি। সকালের সূর্য ওঠার সাথে সাথেই কৃষক ছুটছে মাঠের দিকে, কার্তিকের শেষ সবেমাত্র, এবার নতুন ধান ঘরে তুলতে হবে। যেখানেই তাকাই সোনালী শস্যে ভরে গেছে সবুজের প্রান্তর। তাইতো কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বলেছেন...
"এই হেমন্তে কাটা হবে ধান,
আবার শূন্য গোলায় ডাকবে ফসলের বান।"
কৃষক তার মনের উল্লাসে ধান কাটে আর বাড়িতে কৃষাণি ধান মাড়াই করে আনন্দে মেতে ওঠে! তারপর ধান থেকে চাউল ছাঁটাই করার জন্য ঢেঁকিতে ধান ছাঁটা হয়। তারপর ঢেঁকিতে চাউল গুঁড়ো করে আলপনা, পিঠা-পুলির আয়োজন করা হয়। এখন আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়ে আমরা হারিয়ে ফেলেছি গ্রামীণ ঐতিহ্যের ঢেঁকি। এখনও কারো কারো বাড়িতে জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থায় কিছু ঢেঁকি দেখা যায়। কিন্তু আগের মতো আর ঢেঁকির প্রচলন নেই। এক সময় এই ঢেঁকিতে ধান ভানে কত মানুষের ক্ষুধা মিটত, তা আর বলার অপেক্ষা রাখি না। অগ্রহায়ণ মাস পড়ার সাথে সাথেই চারদিকে নবান্ন উৎসবের ধুম পড়ে যায়। নবান্ন কথাটির অর্থ নতুন অন্ন। এ সময় পিঠাপুলির আয়োজন করা হয়। নতুন ধানের, নতুন ভাত খাওয়ার আয়োজন। নতুন জামাইসহ আত্মীয় স্বজনদের নিমন্ত্রণ দিয়ে নবান্ন উৎসব ভাগ করার জন্য বিশেষ ভাবে অনুষ্ঠান করা হয়ে থাকে। এ সময় নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে নানান স্থানে মেলা হয়ে থাকে। মেলায় পাওয়া যায় পিঠা, মিষ্টি, সন্দেশ, মণ্ডা মিঠাই, খেলনা-পুতুল , বাঁশের তৈরি নানান জিনিস ছাড়াও আরও অনেক কিছু। মেলায় কেচ্ছাকাহিনী, পালাগান, বাউলের আসর বসে। নাচে গানে মুখরিত হতে থাকে মেলা প্রাঙ্গণ। প্রকৃতির সাথে ধুলোমাটির মানুষের সম্পর্ক খুব নিবিড়।
সাধারণতঃ গ্রামীণ সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় উৎসব বলতে পারি নবান্ন উৎসবকে কারণ বাঙালির প্রাণের স্পন্দন জেগে ওঠে এই উৎসবের মধ্য দিয়ে। এই উৎসব খেটে খাওয়া মানুষের প্রাণের উৎসব। আনন্দে মাতোয়ারা হওয়ার সুন্দর একটি সময়। যখন প্রকৃতির সোনালী রূপ বাঙালির ঘরে শোভা পায়। কৃষক তাঁর দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পান। কৃষকরা এই শ্রেষ্ঠ সময়কে উৎসবে পরিণত করে। প্রতি ঘরে ঘরে এই নবান্ন উৎসব পালিত হয়। বাঙালির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলির মধ্যে এটি একটি।
পৌষ পার্বণ: খুব তীব্রভাবে জেকে বসেছে শীত। শীতের কনকনে ঠান্ডায় ঘর থেকে বের হওয়া যায় না। এমন সময় খুশির খবর নিয়ে আসে পৌষ পার্বণ। সাধারণত পৌষ সংক্রান্তির দিন সকাল থেকে এই উৎসবটি পরিপূর্ণ হতে থাকে। প্রত্যেক ঘরে ঘরে পিঠা-পুলির আয়োজন। নানান ধরনের পিঠা দেখা যায় এই উৎসবে। আত্মীয় - স্বজনদের নিমন্ত্রণ করে খুব জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে অনুষ্ঠিত হয় পৌষ পার্বণ। এই উৎসবকে আমরা পিঠা উৎসবও বলতে পারি কারণ এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পিঠা উৎসব। সমাজের উঁচু-নিচু সবার মধ্যে এই কলতান পাওয়া যায়। এমনকি গ্রামের গণ্ডি ছাড়িয়ে আজ জনবহুল শহরেও এই উৎসবের কদর বাড়ছে। এই পিঠা উৎসব নিয়ে চমৎকার একটা ভাওয়াইয়া গান আছে তাঁর কয়েকটি লাইন তুলে ধরছি...
"কয় সের আলো চাউল পাড়িয়া
সোনা মোর বানেয়া কর আটা,
কাল বিয়ানে বানেয়া দেন
মোক গামলা কয়েক পিঠা
ওকি হায়রে, হায়,
মনটায় মোর পিঠা খাবার চায়।"
আমি যখন ছোট ছিলাম ঠিক তখন দেখেছি, সেদিন গ্রামের সকলে মিলে খুব বড় ধরনের একটি অনুষ্ঠান করে। যেহেতু, এই উৎসব পৌষ মাসে পালিত হয় সেজন্য আমাদের গ্রামের ভাষায় এই উৎসবকে 'পুষ্না' বলা হয়। গ্রামের সকলের বাড়ি থেকে চাউল কালেকশন করে রাতে খোলা মাঠে খাওয়ার এই আয়োজন করা হয়। শীতের কনকনে ঠান্ডায় পুরো গ্রামবাসী মিলে এই আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে! এখন আর সেরকম আয়োজনে 'পুষ্না' উৎসব পালিত হয় না। নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামীণ সংস্কৃতির আগের সেই উৎসব এখন আর প্রাণে তেমন সারা ফেলে না। তবে এই উৎসবের রেস আজীবন থেকে যাবে। এই আধুনিকতার যুগে মানুষ অনেকটা বদলে গেছে তাই উৎসবগুলোও দিন দিন ভিন্নতা পাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ সংস্কৃতির ঐতিহ্য।
পৌষ সংক্রান্তির এই উৎসব গ্রামীণ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, যা এখন শহরেও পালিত হচ্ছে।
বাঙালির গ্রামীণ সংস্কৃতির নানান উৎসবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হচ্ছে এই তিনটি। যে উৎসবগুলি ছাড়া বাঙালি আর অন্যকিছু ভাবতেই পারে না। আমার বিশ্বাস সর্বজনবিদিত এ উৎসব একদিন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে গিয়ে পৌঁছাবে । বাঙালির গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রাণের উৎসব শুদ্ধ ভালোবাসার গভীর নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক সকলের হৃদয়ে। যুগের হাওয়া বদলে যাবে আরও নানান কিছু পরিবর্তন আসবে কিন্তু বাঙালির প্রাণের উৎসব আজীবন থাকবে। বাঙালির গ্রামীণ সংস্কৃতির উৎসবের মধ্য দিয়েই বাঙালি অন্তরাত্মা জাগ্রত হোক। অবশেষে বলতে হয়,
"ধরণীর সমস্ত ফুলে বরণীয় হোক
বাঙালির হৃদয়ের প্রাণের উৎসব।"
© অন্তর চন্দ্র (কবি ও লেখক)


0 Comments