সেইসব দিন ও বর্তমান পহেলা বৈশাখ || অন্তর চন্দ্র


“কবি তুমি এতো বুঝ, এইটুকু বুঝ না
নববর্ষের মোরা করি শুভ সূচনা।”— কালিদাস রায়

শুধুই, সূচনা করে কি লাভ? যদি না সংস্কৃতির বাহকেরা —এর মূলমর্ম না বোঝেন। বাংলার সংস্কৃতির মত রূপময়-বৈচিত্র্য আর কোথাও নেই; —এ কথা সত্য কিন্তু সংস্কৃতিকে গলাধঃকরণ করা, ক্যানিবালিজমের চর্চা বাংলা সংস্কৃতির মেজাজ নষ্ট করে দেয়।

চৈত্র সংক্রান্তির পরদিন পহেলা বৈশাখ অর্থাৎ নতুন বছরের শুভ সূচনা। প্রত্যেক বাঙালির জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। অথচ এই দিনগুলোর মেজাজ কালেরপ্রবাহে হারিয়ে যাচ্ছে; আমরা বসে আছি তার ছাইভষ্ম জীবন দেখতে, নিরুপায়, নিদারুণ এইসব ভয়াবহ আরতি মোহমানবের দলে ছড়িয়ে দিয়েছে কেউ কেউ, যারা জেগে আছি অনাদিকালের সাইরেন শুনবার জন্য তাদের‌ও নিঃশেষ করা হয়েছে। এই ক্রমবর্ধমান কালের ভয়াবহ আরতি আর কতদূর এগোলে ক্ষান্ত হবে, আর কত বেদনা চাষীরা ব্রংকাইটিস ভালোবাসা পুষবে? —সময়ের বিপরীতে কখনো কখনো আমাদের যেতে হয় নয়তো সময় আমাদের বিপরীতমুখী হয়।
প্রশ্ন জাগে, এইসব শৃঙ্খল পায়ে হাঁটার উদ্দেশ্য কি কোনো নিরুপায় বৈশাখের ছিল? যে শৃঙ্খল ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের উপর গড়ে ওঠে! হোঁচট খায়, ভেঙে পড়ে, মুছে যায় কোন একদিন —সেইসব শৃঙ্খল। আমাদের ছোটবেলা থেকে চুরি হয়ে গেছে সেইসব দিন রঙ মিছিল, প্রভাতী সংগীত, পান্তা ভাত আর আনন্দ উল্লাস।
এখন প্রশ্ন জাগে, ‘পহেলা বৈশাখ’ আপনি কি ভালো আছেন? আপনার জরাজীর্ণ শরীর কতটুকু সুস্থ-সবল? কথাটির উত্তর দিতে খানিকটা হতভম্ব হয়ে তিনি বললেন, ‘আর মনে হয় বেশিদিন বাঁচবো না’ বেঁচে থেকে কি বা লাভ? প্রকৃতি বন্দনার প্রথমদিনে ডিজে পার্টি, হুল্লোড় উত্ত্যক্ত করে, দ্বিধাদ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে, কোথাও বসবার নেই, হিংসা-বিবাদ, সমন্বয়ের গোঁ ধরার মতো মানুষটিও নেই; অথচ তোমরা আমাকে সংস্কৃতিচর্চার কথা বল, মগজে মড়কের বদলে কর্ষণ করতে বল কিন্তু চেয়ে দেখ, আমি কতটা নিরুপায়; নিরুৎসাহিত করা হয়েছে আমাকে, দোহাই দিতে হয়েছে।

বাংলা মাসের নাম মনে করতে গিয়ে ইংরেজি মাসের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করি। এইসব লজ্জা গোছাতে এতটুকু বেগ পেতে হয়নি, এতটুকু বেদনাও অনুভূত হয় না, লজ্জার পরিপূর্ণ বাক্স খুলেও লাভ হয়নি, কুলকুচি করে ফেলে দিয়েছি প্রতিটি সকাল। আজকাল বুকে হাত দিয়ে কে বলতে পারে আজ বাংলা মাসের ক'দিন? —একজন নেই যে বাংলার সংস্কৃতির ধারক ও বাহক; শুধুমাত্র, নিরক্ষর গ্রামীণ মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতিতে এইসব আয়োজন কিছুটা গোছানো, সেটিও প্রায় অতি জীর্ণশীর্ণ অবস্থা। পুরাণকার, যে রাহুকেতুকে ছুড়ে দিয়েছিল, তারাই এখন ফিরে এসে লণ্ডভণ্ড তাণ্ডব করছে। বৈশাখ হয়ে উঠেছে বিস থেকে বিষ। 
বৈশাখ এলে রঙের বালটি নিয়ে পথচারীর গায়ে ছিটিয়ে দেওয়ার আনন্দ ক’জন বোঝে! অথচ আমাদের ছোটবেলা কত সুন্দর ছিল, না ছিল বাঁধা, না বিপত্তি; শুধুমাত্র সংস্কৃতি ছিল ভালবাসার পরিপূর্ণ উপাদান। রবি ঠাকুরের গানে রুক্ষ বৈশাখকে পূর্ণ করে তোলার আমেজ এখন আর নেই; বৈশাখ এলে বুঝতে পারি না, পরাণ মাঝির গান‌ও শোনা যায় না, লোকে বলে, যুগের হাওয়া বদলে গেছে কিন্তু আমি বলি, নতুন যুগের সূচনা হোক প্রকৃতির আবহ-সঙ্গীতে।

‘বৈশাখ’ শব্দটি উচ্চারিত হলে মনের ভেতর দুর্বার সজাগ পাওয়া যায়। যেন নতুন করে শুরু করা পূর্বাসার সংসার। চারদিকে হইচই, মেলা বাড়ির আনাগোনা, শিশুর অজস্র বায়না পিতার পকেটে ভিড় ঠেলে যায়। মেঘেরাও অহরহ উৎপাত শুরু করে, বাতাসে মেঘের পাহাড় টলে, টনক নড়ে বজ্র দেবতার তাই এতো ঝমঝম দিনরাত। অথচ মনের মাঝে কোথায় যেন একটা লং দূরত্ব রোজ রোজ দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে, পথ গিলে গিলে খাচ্ছে জীবন্ত মানুষ আর তার আধুনিকতা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে যতসব জঞ্জাল। ভালো-মন্দের ফারাক খুঁজতে গিয়ে বারবার নিজের দিকে তাকাতে হয়; তাকিয়ে দেখি আস্ত একটা জীবন জুড়ে শুধুই রঙচালাকি।
নববর্ষের এই দিনটি থেকেই আম খাওয়ার অনুমতি মেলে। আমরা শিখি কেমন করে, বিষকাঁটালী দিয়ে পোকামাকড় তাড়াতে হয়। মড়ক বলি মানুষের হৃদয়, যে হৃদয়ে ভালোবাসা থাকে, প্রেম থাকে, ঘৃণা থাকে, অনুনয়-বিনয় থাকে সেই হৃদয়ের ভজনাও হয়। 

নববর্ষ এসে চলে যায়, বাঙালির ভর্তা ভাতে মন বসে না, রেস্টুরেন্টের বিলাসীতা মুখে তুলে নাড়ির স্পন্দন ভুলে যায়? অথচ এখনো আমি গেলাসে গেলাসে হরিৎ পান করি, উল্লাস করি, পাগল হ‌ই। সেইসব দিন এখন স্মৃতির তলাতে এলোমেলো যতসব গল্পবুনে যায়। চারদিকে হইচই যক্ষের দল, রাহুকেতুর সংক্রমণ কিন্তু বাঙালির প্রাণের উন্মাদনা সৃষ্টির অপূর্ব ঐশ্বর্য্য নিয়ে বেঁচে থাকে অনাদিকালের রেখা ধরে।

নববর্ষ নিয়ে এতসব বিষবাষ্প পেড়িয়ে বাঙালি তার উদার হৃদয় মেলে ধরেছেন। বাঙালি সংস্কৃতির ছোঁয়া বিশ্ববাসীর হৃদয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ। পহেলা বৈশাখ শুধু নয়, সারা বছর জুড়ে উৎযাপিত হোক বাংলা সংস্কৃতির জলসা। যাতে করে কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হতে না হয় আগামী প্রজন্মের কাছে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ধারাবাহিকতায় সংস্কৃতির রেখা বয়ে চলুক; সুকুমার শিল্পের চর্চার অব্যাহত থাকুক সে ব্যবস্থা যেন আমরা করতে পারি। নতুন বছরের আবহ সংগীতে বাঙালির উদার হৃদয় বেজে উঠুক। 


 [সকলকে বাংলা ১৪৩২ নববর্ষের শুভেচ্ছা 🎉]

৩০ চৈত্র ১৪৩০ বঙ্গাব্দ 
১৩ এপ্রিল ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ 
চিলমারী , কুড়িগ্রাম 
🌿🍂🎉
x

Post a Comment

0 Comments