উপেক্ষিত: লিটলম্যাগ সাহিত্যের অবকাঠামো || অন্তর চন্দ্র

 


সাহিত্যের ছোট কাগজ। ছোট ঘর। আবাসভূমি। লিটল ম্যাগাজিন। তরুণ লেখকদের একমাত্র ঠাঁই গোঁজার জায়গা। এর বিস্তৃতি নেই! বাণিজ্য নেই! অধিক চাওয়া-পাওয়া নেই! কিন্তু কারু-বাসনার কি দারুণ শিল্পকর্ম। এদের বিষয়গুলো আশ্চর্যরকম ব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত; গাঢ় ও সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার অমায়িক যাত্রা। এ যাত্রা ক্ষণস্থায়ী অথচ কয়েক ফর্মা জুড়ে অনন্তকালের চিঠি গুঁজে দেওয়া আছে— মহাকালের। ছোট আশা, ছোট প্রাণ, বৃহৎতের ভাবনা এই নিয়েই ছোট কাগজ বা লিটলম্যাগ।‌

সাহিত্য-সংস্কৃতি, গবেষণা, নিরিক্ষাপ্রবণ ভাবনাগুলোর মলাটবন্দি বা ছাপানো লেখার গভীর ভাবনার ফলপ্রসূ লিটলম্যাগ ধারণ করে। ১৬৬৩ সালে জার্মান কবি Johann Rist কর্তৃক Erbauliche Monaths-Unterredungen শিরোনামে সর্বপ্রথম সাময়িকী প্রকাশ হয়। তারপর ফ্রান্স ইতালি এবং নেদারল্যান্ড থেকে আরো কয়েকটি পত্রিকা বের হয়। প্রতিভাবান শিল্পী-সাহিত্যিকরা এসব পত্রিকাগুলোকে সমৃদ্ধ অক্ষরের মালা পরিয়ে দেন। লেখকেরা নিজের লেখাকে অন্যের কাছে পৌঁছে দিতে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে থাকেন। পরবর্তীতে লিটল ম্যাগাজিনের প্রসারতা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বাণিজ্যিক সুবিধা না থাকায় লিটল ম্যাগাজিনগুলো মানুষের চাহিদা পূরণে অক্ষম। এক্ষেত্রে, নির্দিষ্ট বলয়ের ভেতর দিয়েই পত্রিকার গতিশীলতা রক্ষা করা হয়। 
লিটল ম্যাগের যাত্রা শুরু হয়, অনন্তকালের উদ্দেশ্যে কিন্তু হঠাৎ করে থমকে যেতে হয়; যেতে যেতে মনে হয় আর এগোনোর জায়গা নেই কিন্তু কেন? কারণ প্রান্তিক পর্যায়ে লিটলম্যাগ অনন্য কিন্তু সময়ের সাথে বয়ের চলা তার পক্ষে সম্ভব নয়! তার বেশ কয়েকটি কারণ থাকতে পারে তার মধ্যে প্রথমেই যে কথাটি আসে— প্রতিষ্ঠিত কবিদের অবহেলা এবং সম্পাদনার প্রচুর খরচ ও পত্রিকা বিক্রি না হওয়া। যারা প্রতিষ্ঠিত কবি ও সাহিত্যিক তাঁরা লিটল ম্যাগাজিনে সহজে লেখা ছাপেন না। একদিকে তরুণরাও নামিদামী সাহিত্য পত্রিকাগুলোতেও লিখতে পারেন না। লিটল ম্যাগাজিনের ক্ষেত্রে আরেকটি ঝামেলা হচ্ছে— লেখকদের লেখার বিনিময়ে উপযুক্ত অর্থ দিতে না পারা। পত্রিকা ছাপানো থেকে শুরু করে লেখকের বিনিময় দেয়া অব্দি পর্যন্ত আসতে ছোট কাগজের সবচেয়ে বড় ঝামেলা পোহাতে হয়। মূলতঃ‌ আর্থিক সাহায্য ব্যতীত ছোট কাগজ বের করা সহজ কথা নয়। তেম্নি ছোট কাগজ ছাড়া তরুণদের উঠে আসার পথ বা লেখক সৃষ্টি কোন মতেই সম্ভব নয়; এজন্য এইদিকটি আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ‌যারা সচেতনতার সহিত সৃজনশীলতা রক্ষায় যথেষ্ট ভূমিকা রাখছেন— তারাই মহাকালে অমরত্ব খোঁজেন। আর এই অমর মানুষগুলো উঠে আসেন— ছোট কাগজের হাত ধরে, বৃহৎতের সন্ধানে।

লিটল ম্যাগাজিন মূলতঃ পাক্ষিক, মাসিক, ষান্মাসিক ও বার্ষিক ভাবে বের হয়। এদের চিন্তা তরুণদের নিয়ে তাই তারা প্রতিষ্ঠিত লেখকদের ধার ধারেন না। ‌ তাদের নির্দিষ্ট একটা পথ রয়েছে— একটি সুপরিকল্পিত ভাবধারা রয়েছে যার মাধ্যমে তারা সমাজ সচেতনতায় অবদান রাখার চেষ্টা করেন। সমরেশ মজুমদার বলেন, “প্রতিষ্ঠিত লেখকরা লিটল ম্যাগাজিনে লেখেন না। লিটল ম্যাগাজিনের ছেলেমেয়েরা অহংকারী হয়ে তাদের লেখা ছাপতেও চায় না।” এই কথাটি চির সত্য। ‌ কিন্তু যারা ছোট ছোট কাগজের মাধ্যমে টিকে যায় তারাই ভবিষ্যতে নতুন রূপে, নতুন সৃষ্টিকল্পের সূচনা করেন।

লিটলম্যাগ অবহেলিত হওয়ার কয়েকটি মূল কারণ হলো:

১. বাণিজ্যিক সহযোগিতার অভাব: লিটলম্যাগ মূলত অবাণিজ্যিকভাবেই প্রকাশিত হয়ে থাকে— তাই বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া থেকে ব্যাহত হয়। এবং নির্দিষ্ট সীমারেখা ছাড়া বিস্তৃতি ঘটানো বেশ মুশকিল হয়ে পড়ে; তাতে করে পাঠক চাহিদা ঠিকঠাক পাওয়া যায় না এবং প্রচার ও বিপণনের তুলনা অনেকাংশে কম থাকায় —এর ব্যাপ্তি নাই। বাণিজ্যিক সহায়তা পাওয়া‌ও যায় না, ফলে লিটলম্যাগ অবহেলিত হয়ে শেষ অব্দি বন্ধ হয়ে যায়।

২. নির্দিষ্ট পাঠকশ্রেণী: স্বতন্ত্র, গম্ভীর এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চিন্তামূলক লেখা প্রকাশিত হ‌ওয়ায় লিটলম্যাগ সাধারণ পাঠকদের মাঝে ঠাঁই গুঁজতে পারেন না। এবং নির্দিষ্ট পাঠকশ্রেণী ছাড়া লিটল ম্যাগাজিন অন্যদের ততটা আকর্ষণ করে না। এজন্য প্রান্তিক পর্যায়ে পাঠকদের দ্বারে পৌঁছানো লিটল ম্যাগাজিনের সম্ভব হয় না। অন্যদিকে চিন্তাশীল পাঠকদের বা যারা প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক বা চিন্তক তাদের হাতে পৌঁছানো ছোট কাগজের অনেক ক্ষেত্রে সম্ভবপর হয় না। এজন্য ছোট কাগজের প্রচলন খুব কম হয়।

৩. প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব: প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা না পেয়ে ছোট কাগজগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রীক সহায়তায় প্রকাশিত করতে হয়। তাতে করে মিডিয়া বা সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো লিটলম্যাগকে সেভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে না। ফলে এসব প্রকাশনার জন্য অর্থায়ন ও প্রচারের সুযোগ সীমিত থাকে।

৪. সামাজিক অবহেলা: প্রথা বিরোধী সাহিত্য সৃষ্টিতে লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা অনন্য। উদাহরণস্বরূপ: হাংরি জেনারেশন —এর কথা বলা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগাজিনগুলো আত্ম প্রতিষ্ঠার জন্য বিতর্কিত এবং সমাজ বহির্ভূত। কিন্তু নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টিতে দৃষ্টিভঙ্গিকে রূপময় কল্পনার দ্বারা সৃষ্টিশীল সমাজ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। তারপরেও সামাজিক অবহেলা ছোট কাগজগুলোকে একঘেয়ে করে দেয়।

৫. প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ: ডিজিটাল মাধ্যমের প্রচলনেও লিটলম্যাগগুলো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকে। অনেকেই প্রিন্টেড ফরম্যাটে প্রকাশ করতে আগ্রহী, কিন্তু অনলাইন মাধ্যমে তারা পৌঁছাতে পারে না। আবার অনেকে অনলাইনভিত্তিক মাধ্যমে বেশ জনপ্রিয় কিন্তু ছাপানো পত্রিকায় তাদের পৌঁছানো সহজ হয় না। তাছাড়া অন্তর্জালভিত্তিক লিটলম্যাগে ব্যয় ছাড়া খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই লেখা প্রকাশিত করা যায়। এবং প্রত্যেকটি সংখ্যাকে ডিজিটালাইজ করে, মোহনীয় করে তোলা যায়। পাঠক বিশ্বের যে কোন প্রান্তে বসে লেখাগুলো পড়তে পারে এবং উপলব্ধির মাধ্যমে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হয়। বর্তমান সময়ে লিটলম্যাগ প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে; প্রযুক্তি হয়ে পড়ছে অন্যতম মাধ্যম।

৬. সৃজনশীলতা সৃষ্টিতে বাধা: নির্দিষ্ট লেখকের বাইরে কিছু কিছু লিটলম্যাগ তরুণ প্রজন্মকে তুলে ধরেন না। এমনকি প্রতিভার চর্চার জন্য নিবেদিত তরুণ সাহিত্যিকবৃন্দকে তাঁদের গন্ডির বাইরের মানুষ ভাবেন। তাতে করে দুটি পক্ষ সৃষ্টি হয়; কারো লেখা কেউ পড়তে চায় না— সৃজনশীল লেখক সৃষ্টিতে বাধা পড়ে। প্রতিনিয়ত লিটলম্যাগগুলোর আয়ু কমে আসে। 

৭. লেজুড়বৃত্তি: বহুসংখ্যক লিটলম্যাগ টাকার বিনিময়ে অপ্রয়োজনীয় লেখাকেও প্রাধান্য দেন, তাতে করে প্রয়োজনীয় লেখাগুলো জায়গা পায় না। এরকম অবস্থায় পাঠকবৃন্দ সৃজনশীল লেখার অভাবে সাহিত্য সাময়িকী পড়তে চান না। এজন্য স্বভাব দুষ্ট পত্রিকাগুলো বেশিদিন টিকে থাকে না।

লিটল ম্যাগাজিনের হাত ধরে হাংরি জেনারেশন, স্যাড জেনারেশন, কল্লোল যুগের মতো কবি-সাহিত্যিকরা উঠে এসেছে। এদেশের তরুণরাও ছোট কাগজের হাত শক্ত করে ধরে আছে; শুধুমাত্র ছোট কাগজ পারে তাদের সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করাতে কারণ ছোট কাগজ তরুণদের শক্তি স্বরূপ। সেই শক্তির জোরে তরুণরা নতুন করে জায়গা নেয়। 

লিটলম্যাগগুলো বেঁচে থাকে তার আত্ম-প্রতিভায়। মস্তিষ্ক প্রসূত শ্রুতিসাধনার কারিগররা এর ধারক ও বাহক। বৈশিষ্ট্যগত সমাজ চেতনার মধ্যে লিটল ম্যাগাজিনের দায়বদ্ধতা। প্রথা বিরোধী বা শাস্ত্র বিরোধী সাহিত্য সৃষ্টিতে চেতনার যে বহিঃপ্রকাশ তা লিটল ম্যাগাজিনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। এইসব জটিলতা ধারণ করে বহুমুখী চিন্তার অভিপ্রায় নিয়ে অনবদ্য ভূমিকা রাখেন ছোট কাগজ। তবুও কেন জানি একসময় উপেক্ষিত বা অবহেলিত হয়ে যায়। তার কারণ কি হতে পারে? এই প্রশ্ন কি কখনো নিজেকে করেছি! মুক্তধারার মানুষগুলো তার চিন্তাকে মুক্তভাবে ব্যবহার করতে চায়; এবং জনসচেতনতায় নিবেদিত সৃষ্টিসমূহ স্বতন্ত্র এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক কাজ প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম; এটি সাহিত্যিকদের মূলধারার সাহিত্য ও প্রকাশনার বাইরে নতুন ধারা এবং সাহসী লেখালেখির সুযোগ দেয়।


[উল্লেখ্য, পূর্বে লেখাটি নারায়ণগঞ্জ থেকে কাজী আনিসুল হক সম্পাদিত ‘কবিতার কম্পাস’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৪ সালে]






Post a Comment

0 Comments