কালীপূজা আসলে আমার ভয় হয়— ক্রমাগত নরমুণ্ডের ব্যাবহার। অথচ কি শৈল্পিক কারুকার্য! শিল্প যেন সেখানে মাথা নুয়ে পড়েছে। ভয় হয়— পাঠাবলি’র নির্মম শাস্ত্রপাঠ! রক্ত-যজ্ঞের ভয়াবহ আরতি। অথচ এ পথই শিব জাগানোর পথ, রক্ত-যজ্ঞের নির্মম ভুলে গেলে, মঙ্গল ছিনিয়ে নেয়া যায় না।
উলঙ্গ নারী মূর্তির চিন্তা প্রথম বাঙালিরাই করেছিল। এটিই প্রথম নারীবাদী মতবাদ। পুরুষতন্ত্রের সমাধির উপর— এক ভীষণ দর্শনা নারীর পায়ের আলতো ছাপ। সমাজের স্থবিরতা ভেঙেচুরে— দিগন্ত প্রসারিত করেছিল।
খাঁড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ে— মাতৃতান্ত্রিক সভ্যতার দর্শন এনে যখন দাঁড় করায়, আমি দেখি, আমার ভেতর জেগে ওঠা সুপ্তশক্তি! মুক্ত-মনোবৃত্তির উল্লাস। জাগরণ। চিন্তার প্রখর সজীবতা।
কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ হাঁটু মুড়ে বসে আছেন— এক ঘুঁটে পাকানো মেয়ের লকলকে জিহ্বার সামনে। ভোরের স্নিগ্ধতা গিলে ফেলছে সকল স্থবিরতা। আমি দেখি, গ্রাম্য বধূর নিত্য উন্মাদ! ঘুঁটে দেয়া সকাল! আলোর বিচ্ছুরণ!
আলোর অপেরা। সূর্যের সাতটি বর্ণের মতোই একাকার। উন্মাদ করে তোলে— সৃষ্টিসুখ! দীপাবলি’র আকাশে তার নোটবুক। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে নিপীড়িতা পৃথিবীর আর্তনাদ। মা’র ঘুম ভেঙে যায়, নিদ্রিত শিবের বুকে লাঠি মেরে, জাগিয়ে তোলো— মঙ্গলময়।
নিপীড়িতা পৃথিবী— গলা ছেড়ে চিৎকার করে, ঘুমের ভেতর দেখে লাশ, ধর্ষণের অভিযোগ, ধর্ষক ও শ্লীলতাহানির নির্মম। —এর জন্য চাই, নরমুণ্ডের ক্রমাগত ব্যবহার।
রাক্ষসী বলে, মা, তোকে যারা গালি দেয়— তাদের ভীতির সামনে এসে দাঁড়াও! দেখবে, তাদের গলা থেকেও উচ্চারিত হবে— শবসাধনার মন্ত্র। দেখবি, শবের মাঝে তাথৈ উল্লাস।
মৃতদের বুকে তাণ্ডবের চিহ্ন হতে পারে— প্রকৃতির উদার আমন্ত্রণ। শ্মশানের শব কাষ্ঠ হতে পারে— প্রতিবাদের মশাল মিছিল। জলন্ত চিতা— ধক্ ধক্ করে, বেড়ে ওঠা আত্মশুদ্ধি।
রামপ্রসাদের মেয়ে— বেড়া বেঁধে দেয়া এক দুরন্ত কিশোরী। কৃষ্ণানন্দের ঘুঁটে দেয়া— কূলবধূ। প্রেমিকের হৃদকমলে ধূম লাগা— শিহরণ। কাজী নজরুলের নিপীড়িতা পৃথিবীর ডাকে নেমে আসা— শ্মশানবাসিনী অন্নপূর্ণা।
রূপসী শিরসি শশী, হরোরসি এলোকেশী;
মুখজ্বালা সুধাঢালা কুলবালা নাচিছে।। (রামপ্রসাদ)
মেয়েটি পৃথিবীকে টলাতে চায়! পৃথিবী তার পায়ের কাছে নত হয়ে আসে— খাবলে খেতে চায় কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড; সে একা উল্টে দেবে সমস্ত কলঙ্কিত অধ্যায়। দেবতারাও পায়ের কাছে আর্তি জানাবেন— এক নারীর চরণকমলে।
শিল্পে কদর্যের স্থান নেই; আছে প্রেম, আছে শক্তি! শৈল্পিক দক্ষতার নিপুণ কারুকার্য। শিল্প মানেই ভেঙেচুরে— নতুন করে সৃষ্টি করা। বাংলার কালী মূর্তির দিকে তাকালে, পঞ্চাশৎ বর্ণময়ী মুণ্ডের আড়ালে মনে হয়, ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থা, বর্ণভেদ, রাজনৈতিক জটিলতার। পায়ের তলায় মঙ্গলময় শিবের আর্তনাদ; যেন সমাজের ভয়ঙ্কর দিনগুলোর কথা, অমঙ্গলের আভাস। অঘটনঘটনপটিয়সী মূর্তির আদিম প্রকাশে মরা শিবও জেগে ওঠেন! কল্যাণের সূচনা হয়। সজীবতা ফিরে পায়।
২০ অক্টোবর ২০২৫
কালীপূজা, নারায়ণগঞ্জ


0 Comments