মধ্যযুগীয় সাহিত্যে কবি ও কাব্যচিন্তা




মধ্যযুগীয় সাহিত্যের দিকে লক্ষ্য রাখলে দেখতে পাব, কৃত্তিবাস ওঝা, কাশীরাম দাস, বৃন্দাবন দাস, জ্ঞানদাস, চন্ডীদাস, বিপ্রদাস পিপিলাই, জৈনুদ্দিন, শাহ মুহম্মদ সগীর, দৌলত কাজী, ফকির গরীবুল্লাহ, শাকের মাহমুদ, দ্বিজ পশুপতি, চন্দ্রাবতী, রামপ্রসাদ সেন, ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক মধ্যযুগের সাহিত্যকে চিন্তার অনন্যমাত্রায় উপস্থাপন করেছেন। মধ্যযুগকে বাদ দিয়ে আমরা বাংলা সাহিত্যের কথা ভাবতে পারিনা। বলা চলে, বাংলা সাহিত্যের জন্ম হয়েছে মধ্যযুগকে কেন্দ্র করে। এ সময় এত মাত্রায় সমৃদ্ধ সাহিত্য রচিত হয়েছে যে আর অন্যকোন যুগে এরকমটা হয়নি। মধ্যযুগকে বলা যায়, বাংলা সাহিত্যের সূতিকাগৃহ। দেব-দেবীর মঙ্গল গুণকীর্তন ছিল সে যুগের সাহিত্যের অন্যতম উপকরণ। তার বাইরে ছিল, কিছু মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা, বেদনার কথা, না খেয়ে থাকার কথা, রাজ্যের দুর্গতির কথা ইত্যাদি। সে সময়কার কবিরা রাজার অধীনে লেখালেখি করতো। তাদের বলা হত, রাজকবি। রাজকবির বাইরেও অসংখ্য কবি ছিলেন, যারা উৎকৃষ্ট মানের সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। রাজকবিরা রাজা ও দেবতার গুণকীর্তন করতেন, আর অন্যরা সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা বলতেন। এভাবেই রচিত হয়েছিল, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম যুগের।


কবিতা ভাবতে হলে আমাদের প্রথমেই কবিতার ঊষালগ্নে উপস্থিত হতে হবে, দেখতে হবে সেসময়কার পারস্পরিক পরিবেশ, ভারসাম্য, গতিশীলতা, সমাজব্যবস্থা, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি। সে সময়কার কাব্যভাষা কিংবা পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যগুলো। বর্তমানকে পূর্বের কাছে যদিও টেনে নেয়া সম্ভব নয় তবুও পূর্ব ভাবনাকে পরিবর্ধিত করে নতুন অবয়বের মানসক্ষেত্র তৈরি করা যেতে পারে। সেটি হতে পারে, কোন উৎকৃষ্ট মানের সাহিত্য সৃষ্টির উপর ভিত্তি করে। সাময়িক সাহিত্যের মধ্যে মধ্যযুগীয় মিশ্রভাব কোন কোন ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়। চর্যাপদে যে-রকম আধ্যাত্মিকতা আমরা দেখেছি, বর্তমান সময়ের কবিতাতেও আধ্যাত্মিকতা জেঁকে বসেছে কিন্তু আমরা সহজে তা উপলব্ধি করতে পারছি না কারণ এই সময়ের কবিতাগুলোর গঠন নতুন মাত্রায় পরিশীলিত এবং ভাববিলাসিতায় পরিপূর্ণ।


মধ্যযুগের কবিতা মূলত প্রেম-বিচ্ছেদ এবং ধর্মবিষয়ক। বিদ্যাপতির লেখায় রাধা-কৃষ্ণের যে ভাবের উন্মেষ হয়েছে, চন্ডীদাসের লেখায় তার মাধুর্য পূর্ণতা পেয়েছে। বিদ্যাপতি অবাঙালি হয়েও বাঙালিদের মধ্যে নিখুঁতভাবে প্রভাব বিস্তার করেছেন, যা অন্যকোন কবির ক্ষেত্রে দেখা যায় না। বাংলায় চৈতন্যদেবের (১৪৮৬-১৫৩৩ ) জন্মের পর মঙ্গলকাব্য বিষয়ক কবিতার প্রভাব এতটা বিস্তৃত হয়— যে ওই সময়ে ভিন্নধর্মী কবিরাও বাংলায় মঙ্গলকাব্য রচনা শুরু করে দিয়েছিলেন। যেমনটা— রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক কবিতা মুসলিম কবিরাও নাম বদলিয়ে লেখা শুরু করে দিয়েছিলেন। সে সময়কার কবিতাগুলোকে মূলত মঙ্গলকাব্য বলা হয়। কারণ ঐ গ্রন্থগুলি ধর্মবিষয়ক দিকনির্দেশনা ও উপদেশমূলক হিসেবে রচনা করা হয়েছিল। প্রতিটি কাব্যের ভিতর ট্রাজেডি যেমনটা ছিল অনুরূপ রোমান্টিকতাও কম ছিল না। 


একটু ইতিহাসের দিকে চোখ রাখলে দেখতে পাব, চর্যাপদ রচিত হওয়ার পরেই বাংলা সাহিত্যের জগতে নেমে আসে অন্ধকার যুগ ১২০০ অব্দ থেকে ১৩৫০ —এই দেড়শো বছর সময়ের মধ্যে আমরা কোন সাহিত্যের হদিস পাইনি। এই সময়টাকে ইতিহাসে অন্ধকার যুগ বলে আখ্যায়িত করেছেন। যেহেতু, আমরা বাংলা কবিতা সম্পর্কে কথা বলব তাই ঐতিহাসিক বর্বরতা সম্পর্কে কম বলাটাই শ্রেয় মনে করি। যারা জানতে আগ্রহী তারা মধ্যযুগীয় ঐতিহাসিক গ্রন্থ খুলে পড়তে পারেন। আমরা কবিতার দিকটায় যাব। ১৩৫০ সালের পরেই আমরা চন্ডীদাসের মতো আরো অনেক কবিকে খুঁজে পাই এবং তাদের গ্রন্থগুলি আমাদের সম্পদ। বডু চন্ডীদাস লিখলেন, ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য’ —এটি মূলত লিরিক কাব্য অর্থাৎ গাওয়ার জন্য গ্রন্থটি রচনা করা হয়েছে। সেদিক থেকে বডু চন্ডীদাস হচ্ছে গীতি-কবিতার জনক। মধ্যযুগের প্রথম কাব্যটি তার হাত ধরেই রচিত হয়। গ্রন্থটি আবিষ্কার করেন বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বলভ। বাঁকুড়া জেলার বনবিষ্ণুপুরের নিকটে কাকিল্যা নামক গ্রামে দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির গোয়ালঘর থেকে ১৯০৯ সালে আবিষ্কৃত হয়।  ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ নামে বসন্তরঞ্জন রায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ।  ওই সময় চন্ডীদাসের লেখা এতটা জনপ্রিয় ছিল যে তৎকালীন যুগবতার মহাপ্রভু চৈতন্যদেব‌ও চন্ডীদাসের গানের ভক্ত ছিলেন। এদিকে চৈতন্যদেবের ভক্তি আন্দোলন যখন প্রখর হচ্ছে, ঠিক তেমনি চন্ডীদাসের গাঁথাও যেন চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রোমান্টিকতা, বিরহ-বিচ্ছেদ ঐশ্বরিক প্রেমের উপাখ্যান যা পারমার্থিক জগতের সাথে যুক্ত।


মোঞঁ ত সুন্দরি রাধা      আতি বড় বুঢ়ীল

             বেড়ায়িতেঁ মোতে বল নাহী।

মোঞঁ যে বোলোঁ উত্তর    তাত অনুমতি কর 

আপণেঞিঁ চাহত কাহ্নাঞিঁ।। ( শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকাব্য/ বড়ু চণ্ডীদাস )


শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের এক জায়গায় আছে, “বিণি দোষে কেহো নাহিঁ তেজে রমণী। সিতা রামে দুখ পাইল সুণ চক্রপাণী।।” এই হচ্ছে দুঃখের ছড়াছড়ি। যেমন— ভাগবতীয় সাহিত্যে প্রেমের জন্য রাধারাণী কাঙাল, প্রেম প্রেম করে সারা বৃন্দাবন মাতালেন, অতঃপর, কৃষ্ণ চলে এলেন হস্তিনাপুর রচিত হলো এক ঐশ্বরিক বিচ্ছেদী প্রকরণের নিয়মতান্ত্রিক স্বার্থ‌; এটি কৃষ্ণলীলা বিষয়ক রচনা কিন্তু চণ্ডীদাসের কাব্যে বিরহের আর্তি ভিন্নরূপ অথচ মোহময় যেন এই কাব্যকে আরো ঊর্ধ্বমুখী করেছেন। ডক্টর নীলিমা ইব্রাহিম বলেছেন, “এ কবির নিসর্গপ্রীতি ও চেতনা সম্পর্কে আমরা শ্রদ্ধার্ঘ্য না দিয়ে পারি না। বডু চন্ডীদাস কাহিনী চিত্রণ ও চরিত্র রূপায়ণ সম্পর্কে যে—বাস্তব সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন, নিসর্গ-বর্ণনাতেও তার সেই বস্তুনিষ্ঠ মনের পরিচয় পাই। এখানে স্বর্গ বৃন্দাবনের পরিজাত নেই—আছে মর্ত্যের যুথী, মাহলী, মালতী। কবির বাস্তব জীবনে দুচোখ ভরে যে ফুল-ফলের সৌন্দর্য তিনি উপভোগ করেছিলেন, তারই রূপ পরিগ্রহ করেছে তার শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের সৌন্দর্য অনুশীলনে।” 



এদিকে আমরা পাই, মনসামঙ্গল কাব্যের জনক কানাহরি দত্তকে। মনসামঙ্গল কাব্যের আদি কবি তিনি। ‌ বিজয় গুপ্ত হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। তার পরবর্তীতে আমরা পাই, নারায়ন দেব, দ্বিজ বংশীদাস, বিপ্রদাস পিপলাই, কেতুকা দাস, ক্ষেমানন্দ প্রমুখ। মনসামঙ্গল কাব্যে উঠে এসেছে বাঙালির নৌ-বাণিজ্য ব্যবস্থা, সমাজতন্ত্রের শৃঙ্খল, কুসংস্কার, রীতিনীতি ও বর্ণ বৈষম্যের প্রকরণ। অন্যদিকে স্বর্গপুরী থেকে মর্ত্য অব্দি দেবতাদের জয়গান, আচার অনুষ্ঠান এবং দীর্ঘ ট্রাজেডি। এই কাব্যের মূল দেবতা হচ্ছে মনসা দেবী। তিনি সর্প দেবী নামেও খ্যাত। বলা হয়ে থাকে, চাঁদ সওদাগরের হাত ধরেই বাংলায় মনসা পূজার সূচনা হয়। তাছাড়া গ্রামবাংলায় মনসামঙ্গল গানের আয়োজন নজর কাড়ার মতো— সেখানে মূল জায়গাটা জুড়ে বেহুলা-লক্ষিন্দর, চাঁদ সওদাগর এবং মনসার চরিত্র স্থান পেয়েছে। গ্রামবাংলায় এখনো মনসামঙ্গল গানের আয়োজন দেখতে পাওয়া যায়। মনসামঙ্গল বাঙালিকে এমনভাবে আকৃষ্ট করেছিল যে পরবর্তীতে পুরো বাংলা জুড়ে মনসা পূজার প্রচলন বেগবান হয়।


চম্পক নগরে রাজা নাম চন্দ্রধর।

পদ্মার বিবাদে সে হারাইল সকল ॥

পুত্রহীন লোকের নাহিক পরলোক।

প্রভাত সময়ে কেহ না দেখিবে মুখ ॥

চান্দের বংশে না রহিবে বীজের বেগুন।

চান্দর পিণ্ডদান করিবে কোন জন ।

এতকালে এত সুখ ঘুচাইল গোসাঞি।

পরকালে জলাঞ্জলি দিবে হেন জন নাই ॥

কহে বিজয় গুপ্ত সোনাই না কর বিষাদ।

আরো কত কত আছে নাগের বিবাদ ॥ ( মনসামঙ্গল/ বিজয়গুপ্ত )



মনসাদেবীর আক্রোশে বেহুলার মত আদর্শ নারীকে সতীত্বের পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। দেব স্বার্থ রক্ষার জন্য মনসার চক্রান্ত একজন সাধারণ নারীকে আদর্শ নারীতে পরিণত করেছিল। বাংলা সাহিত্যে কিংবা গ্রামাঞ্চলে সর্পদেবী মনসাকে নিয়ে যতটা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে— তা পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত অন্য কোন সাহিত্য নিয়ে এতটা আগ্রহভরে সাধারণ মানুষ চিন্তা করেনি। গ্রামাঞ্চলের মানুষদের মধ্যে মনসামঙ্গলের প্রাপ্যতা এতটা প্রখর যে অশিক্ষিত ব্যক্তিও নির্দ্বিধায় অনর্গল মনসামঙ্গলের পুরো কাহিনী বলে দিতে পারেন। আমি স্বীকার করি, বাংলা ভাষার সাহিত্যের ইতিহাসে লোক সাধারণের দ্বারা সর্বাধিক পঠিত কাব্য মনসামঙ্গল। 


তারপর আসে চণ্ডীমঙ্গলের কথা। চণ্ডীমঙ্গলের জনক মানিক দত্ত। ১৪ শতকে কাব্যগ্রন্থটি রচিত হয়।  এই গ্রন্থটিতে মূলত দেবী চণ্ডীর রূপ বর্ণনা, গুণকীর্তন এবং পূজা প্রচারের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। চন্ডীমঙ্গল কাব্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী এবং সর্বশেষ কবি অকিঞ্চন চক্রবর্তী। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গলের ‘কালকেতু উপাখ্যান’ সর্বাধিক পঠিত। এখানকার অসংখ্য প্রবাদ-বচন বাংলার মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।


পিপীড়ার পাখা উঠে মরিবার তরে।

কাহার ষোড়শী কন্যা আনিয়াছ ঘরে।।

বামন হ‌ইয়া হাত বাড়াইলে শশী।

আখেটির ঘরে শোভা পাইবে ঊর্বশী।। ( কালকেতু উপাখ্যান, চণ্ডীমঙ্গল/ কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী  )


চণ্ডীমঙ্গলকাব্য তিনভাগে বিভক্ত : ১. দেবখণ্ড  ২. আক্ষেটিক খণ্ড ৩. বণিক খণ্ড। এটি লিরিক কাব্য। গাওয়ার জন্য রচিত হয়েছে। সংস্কৃত পুরাণের উপাখ্যান পড়তে পড়তে অধৈর্য্য পাঠক মুকুন্দরাম চক্রবর্তী’র চণ্ডীমঙ্গলকাব্য পাঠে আগ্রহ প্রকাশ করতে পারেন। এ কাব্যের পরিধি ব্যাপক হলেও শ্রুতিমধুর।‌ বর্তমান সময়ে দুষ্প্রাপ্য কাব্যগুলোর মধ্যে চণ্ডীমঙ্গলকাব্য অনেক আগেই চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশে এমন শ্রুতিমধুর কাব্যসাহিত্য পূর্বেকার লোকেদের মতো আগ্রহ ভরে কেউ পড়তে চায় না। পাঠকের অনীহা ও প্রকাশকদের না ছাপানোর ভীড়ে হারিয়ে যাচ্ছে এসব সাহিত্য। 


বিদ্যাপতি ছিলেন ব্রজবুলি কাব্যের জনক। মিথিলায় ছিল তার আবাস। তিনি রাজকবি ছিলেন। চৈতন্যদেব থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত তার গানে মুগ্ধ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন, ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ ‘মরণ রে তুহু মম শ্যাম সমান’ ইত্যাদি। অবাঙালি বিদ্যাপতির রচিত কাব্য সারা বাংলার মানুষের কাছে আদরণীয়। মিথিলার ব্রজবুলি ভাষা একটি কৃত্রিম ভাষা। যা বিদ্যাপতির হাত ধরে মধ্যযুগীয় সাহিত্যে উঠে এসেছে। 


সামরি হে ঝামর তোর দেহ।

কী কহ কইসে লাবলি নেহ ॥ 

নীন্দে ভরল অছ লোচন তোর।

অমিয় ভরমে জনি লুবুধ চকোর ।।

নিরসি ধুসর করু অধর পবার।

কোনে কুবুধি লুড় মদন ভণ্ডার ।।

কোনে কুমতি কুচ নখ খত দেল।

হাএ হাএ সত্ত্ব ভগন ভএ গেল ।।

দমন লতা সম তনু সুকুমার।

ফুটল বলয় টুটল গৃম হার ॥

কেস কুসুম তোর সিরক সিন্দুর।

অলক তিলক হে সেহও গেল দূর ॥ 

ভনই বিদ্যাপতি রতি অবসান।

রাজা সিবসিংহ ঈ রস জান ॥ ( বিদ্যাপতির পদাবলী )



ষোড়শ শতকের শেষ ভাগে বাঙালি মহিলা কবি চন্দ্রাবতী নারী হিসেবে প্রথম রামায়ণ রচনা করেন। পিতা— দ্বিজ বংশীদাস ভট্টাচার্য মনসামঙ্গলের রচয়িতা। প্রথম জীবনে জয়ানন্দের প্রেমে পড়েছিলেন কিন্তু স্বামীর পরকীয়া ও ধর্মান্তরকরণ চন্দ্রাবতীকে উদাসীন করে তোলে। পিতার আদেশে রামায়ণ রচনায় মনোনিবেশ করেন। সেখানে রামের গুণগানের চেয়ে সীতার দুঃখ, দুর্দশার কথা সবচেয়ে বেশি বলা হয়েছে।‌ বাল্মিকী রামায়ণের বাইরে রাবণের মেয়ে হিসেবে সীতাকে উপস্থাপন করা বাংলার ইতিহাসে এই প্রথম। চন্দ্রাবতীকে বলা যায়, মধ্যযুগীয় প্রথম নারীবাদী লেখিকা। গবেষকরা মনে করেন, রামায়ণ রচনার বহু পরে তিনি মলুয়া ও দস্যু কেনারামের পালা নামে দু’টি গীতিকা লিখেন। নয়নচাঁদ ঘোষ চন্দ্রাবতীকে নিয়ে সুচারু কাব্য রচনা করেছেন।  চন্দ্রাবতীর দুঃখ, দুর্দশার কথা বলেছেন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। 


আমার দুঃখের কথা গো কহিতে কাহিনী।

কহিতে কহিতে উঠে গো জ্বলন্ত আগুনী॥

জনম-দুঃখিনী সীতা গো দুঃখে গেল কাল।

রামের মতন পতি পাইয়া গো দুঃখেরি কপাল॥ ( চন্দ্রাবতী রামায়ণ )



মন্দ্যান্যা আইশনারে পানি ভাটি বাইয়া যায়।

চান্দ বিনোদে ডাক্যা কইছে তার মায়।।

উঠ উঠ বিনোদ আরে ডাকে তোমায় মাও।

চান্দ মুখ পাখলিয়া মাঠের পানে যাও।।

মাঠের পানে যাওরে যাদু ভালা বান্দ আইল।

আগণ মাসেতে হইবে ক্ষেতে কার্তিকা সাইল।।

মেঘের ডাকে গুরু গুরু ডাক্যা তুলে পানি।

সকাল কইরা ক্ষেতে যাও আমার যাদুমণি।।

আশমান ছাইল কালা মেঘে দেওয়ায় ডাকে বইয়া।

আর কত কাল থাকবে যাদু ঘরের মাঝে শুইয়া।। ( দস্যু কেনারামের পালা / চন্দ্রাবতী )



মধ্যযুগীয় সাহিত্যের আরেকজন মহারথী শাহ্ মুহম্মদ সগীর। সুফি ভাবনার সাহিত্য সৃষ্টিতে যার অবদান অনস্বীকার্য। তার ‘ইউসুফ জোলেখা’ চতুর্দশ শতকে রচিত। বাংলা সাহিত্যে সুফি ধারার সূচনা তার হাত ধরেই শুরু হয়। ইউসুফ জোলেখার প্রেমালাপন ঘিরে শাহ্ মুহম্মদ সগীরের যুগান্তকারী রচনা। রোমান্টিকতা, বিরহ-বিচ্ছেদ, ঐশ্বরিক স্পর্শ ও অনুপম নৈস্বর্গিক চিন্তার প্রকাশ বাংলা সাহিত্যকে উৎকৃষ্ট মানের সাহিত্য সৃষ্টিতে সাহায্য করছে। মুসলমান কবিদের মধ্যে তিনিই প্রথম শৈল্পিক দক্ষতায় নিপুণ চিত্রকল্পের ন্যায় রোমান্টিকতার উপাখ্যান তুলে ধরেছেন। 


প্রেমের সাগর মধ্যে মজি গেল মন।

বুদ্ধি সুদ্ধি হারাইল দেখি সে বদন।।

চৈতন্য পাইয়া কন্যা হইল নিঃশব্দ। 

ভাবিতে ভাবিতে মনে হইলেক তব্ধ।। ( ইউসুফ জোলেখা/ শাহ্ মুহম্মদ সগীর )


এবার আসি মধ্যযুগের শেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য প্রসঙ্গে। দেবী চণ্ডীকা এখানে অন্নদাত্রী। মহামায়া। কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীকামঙ্গল’ কাব্যের সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায় ভারতচন্দ্রের রচনায়। মুকুন্দরামের প্রায় দুইশত বছর পরে অন্নদামঙ্গল রচিত হয়। সমাজতন্ত্র, অর্থনীতি, রাজনীতি ইত্যাদি যুদ্ধং দেহী ভাবের মধ্যেই অন্নদামঙ্গলের আত্মপ্রকাশ। শাক্ত ঘরোনার নিয়মের মধ্যে চণ্ডীমঙ্গলকাব্যের মতোই অন্নদামঙ্গলের কাহিনীর মিল পাওয়া যায়। এ কাব্যের মূল বিষয় দেবীবন্দনা। গবেষক রমেশচন্দ্র দত্ত মন্তব্য করেন, ‘ভারতচন্দ্রের কাব্যের কোন মৌলিকতা নাই। তিনি পত্রে পত্রে কবিকঙ্কনকে নকল করিয়াছেন।’ একথা অবশ্যই ঠিক কিন্তু ভারতচন্দ্রের ঈশ্বরী পাটনীর কথা, সমাজের ভয়ঙ্কর দিনগুলোর কথা, অনাহারী মানুষের কথা ইত্যাদি’র দিকে নজর দিলে দেখতে পাই, রায়গুণাকরের কাব্যগরিমা। 


প্রণমিয়া পাটুনী কহিছে যোড় হাতে।

আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে।।

তথাস্তু বলিয়া দেবী দিলা বরদান।

দুধে ভাতে থাকিবেক তোমার সন্তান।।

বর পেয়ে পাটুনী ফিরিয়া ঘাটে যায়।

পুনর্বার ফিরি চাহে দেখিতে না পায়।। ( অন্নদামঙ্গল/ ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর )



যদি করি বিষ পান         তথাপি না যাবে প্রাণ 

              অনলে সলিলে মৃত্যু নাই। 

সাপে বাঘে যদি খায়     মরণ না হবে তায়

          চিরজীবী করিলা গোসাঁই।।  ( অন্নদামঙ্গল/ ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর )



নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়। 

বিস্তর ধার্মিক লোক থেকে গেল দায়।। ( অন্নদামঙ্গল/ ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর )


মধ্যযুগীয় শেষ সময়ে বিদ্যাসুন্দর কাব্যের রচনাও দেখা যায়। শাক্ত দেবীকে কেন্দ্র করে, এইসব উৎকৃষ্ট মানের সাহিত্য সৃষ্টি আজও বাংলা সাহিত্যের আইডল হিসেবে কাজ করে।‌ রামপ্রসাদ কিংবা ভারতচন্দ্রের রচনায় বিদ্যাসুন্দর কাব্যের শব্দার্থময় গাম্ভীর্য কাব্যভাণ্ডারকে আর‌ও বেগবান করতে সাহায্য করেছিল। এভাবেই ধীরে ধীরে রচিত হতে থাকে অন্যান্য মঙ্গলকাব্যগুলো, যেমন— ময়ূরভট্টের ‘ধর্মমঙ্গল’, কবিকঙ্কনের ‘কালিকামঙ্গল’, কৃত্তিবাস ওঝার ‘রামায়ণ’, চন্দ্রাবতী’র ‘রামায়ণ’, বৃন্দাবন দাসের ‘শ্রীচৈতন্য ভগবত’ , শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ-জুলেখা’, শেখ ফয়জুল্লাহর ‘সত্যপীর বিজয়’ ‘গোরক্ষবিজয়’ , ‘ফকির গরীবুল্লাহর ‘ইউসুফ জোলেখা’ ‘জঙ্গনামা’ ‘সোনাভান’ রামকৃষ্ণ দাসের ‘রায়মঙ্গল’, রুদ্র দেবের ‘রায়মঙ্গল’, ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের ‘অন্নদামঙ্গল’ , রামপ্রসাদ সেনের ‘চৌতিশাস্তব’ ইত্যাদি মঙ্গলকাব্যগুলো পাওয়া যায়। এই মঙ্গলকাব্যগুলো থেকেই আমরা সাহিত্যের ধারাকে ঋদ্ধ রূপে পেয়েছি। তাই আমরা বলতে পারি যে, বাংলা কবিতার ঊষালগ্ন বা সূতিকাগৃহ মধ্যযুগ।


০৭ অক্টোবর ২০২৫ পরিমার্জিত।


Post a Comment

0 Comments