অশোকাষ্টমী বা ব্রহ্মপুত্র স্নানের কথা || অন্তর চন্দ্র




ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন তীর্থস্থানে চৈত্রমাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে মহাষ্টমী স্নান অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। চৈত্রমাসের শুক্লাষ্টমীর নাম অশোকাষ্টমী। এ পুণ্যলগ্নে ব্রহ্মপুত্রে স্নান করার বিধান রয়েছে। স্নানের মূহুর্তে অঞ্জলী, তর্পন ও পূজা-বিধির বিশেষ নিয়ম পালন করা হয়। শাস্ত্রে উল্লেখ আছে, অশোকাষ্টমীতে আটটি অশোকপুষ্পকলিকা পান করলে কোন কালে শোক হয় না। চৈত্রমাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে পুনর্ব্বসুনক্ষত্র ও বুধবার যোগ হলে বিশেষ অষ্টমী বা বুধাষ্টমীযোগ বলে। প্রতি চার বছর পর বুধাষ্টমীযোগ উপস্থিত হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীগণ এ মূহুর্তকে সর্বাপেক্ষা ফলপ্রদ মনে করেন।

হিন্দু পুরাণ অনুসারে, ব্রহ্মার পুত্র বলেই ব্রহ্মপুত্র নামের উৎপত্তি। ব্রহ্মার সাতজন পুত্র উদ্য, ভিদ্য, আদ্য, শোন, ঘর্ঘর, লৌহিত্য ও চৈত্রক এর মধ্যে লৌহিত্য‌ বা ব্রহ্মপুত্র সর্বাপেক্ষা পবিত্র। মুনি শান্তনু ব্রহ্মার ইচ্ছানুসারে মানুষের মঙ্গলের জন্য ব্রহ্মার পুত্রকে হিমালয়ের কৈলাস, গন্ধমাদন, জারুধি ও সম্বর্তক পর্বতের মাঝখানে রেখে আসেন। জায়গাটার নাম হলো ব্রহ্মকুণ্ড। ব্রহ্মকুণ্ড থেকেই পরবর্তীতে ব্রহ্মপুত্র চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ‘‘কামরূপের নদীকুণ্ড ও তীর্থগুলি গোপন করবার জন্য ব্রহ্মা এক জলময় পুত্রের জন্ম দিলেন। শান্তনুর পত্নী অমোঘা তাঁর মা।......সদিয়ার উত্তর-পূর্বে ব্রহ্মকুণ্ডের কাছে একটি স্থান আজও ঋষি কুঠার নামে পরিচিত।’’

‘‘...... ব্রহ্মপুত্রের জলে কামরূপের সমস্ত তীর্থগুপ্ত হয়ে গেল। কিন্তু এইসব তীর্থের কথা জেনে যারা ব্রহ্মপুত্র স্নান করেন। তাদের সমস্ত তীর্থস্নানের ফল লাভ হয়। এই তীর্থের মাহাত্ম্য অসামান্য।” (রম্যাণি বীক্ষা, কামরূপ পর্ব — শ্রীসুবোধ কুমার চক্রবর্তী, এ. মুখার্জী অ্যান্ড কোম্পানী প্রাঃ লিঃ, কলিকাতা, পৃষ্ঠা, ৪০, ৪১।


জানা যায়, জমদগ্নির আদেশে মাতা রেনুকাকে বধ করেন পরশুরাম। আসল নাম, রাম হাতে পরশু বা কুঠার ছিল বিধায় পরশুরাম। তিনি একুশবার পৃথিবীতে ক্ষত্রিয় নিধন করেছিলেন। রাম মাতৃহত্যা পাপের কারণে সে কুঠার আর হাত থেকে পড়ল না। সেই মাতৃহত্যা পাপের থেকে মুক্তি পেতে তিনি বহুতীর্থ ভ্রমণ শেষে অবশেষে জানতে পারেন ব্রহ্মপুত্রে স্নান করলে এ মহাপাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। পরবর্তীতে তিনি হিমালয়ের ব্রহ্মকুণ্ডে স্নান করে পাপমুক্ত হন এবং জগতের মঙ্গলার্থে ব্রহ্মপুত্রকে কুঠারের সাহায্যে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। ব্রহ্মকুণ্ড থেকে ব্রহ্মপুত্রের পবিত্র ধারা নিয়ে সর্বপ্রথম তিনি কামরূপে অবস্থান করেন। কামরূপের অপর নাম প্রাগজ্যোতিষপুর। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের কিছু অংশ তৎকালীন কামরূপের অংশ ছিল বলে জানা যায়। কবি শেখর কালিদাস রায় তার কবিতায় এই অঞ্চলকে প্রাগজ্যোতিষের ধাম বলে উল্লেখ করেন। পুরাণে উল্লেখ আছে, ব্রহ্মা কামরূপে অবস্থান কালীন সময়ে নক্ষত্র সৃষ্টি করেছেন। সেই হিসেবে চিলমারী‌ও তৎকালীন পবিত্র তীর্থস্থান কামরূপের অংশ ভূমি। জনশ্রুতি আছে, ভগবান পরশুরাম ব্রহ্মপুত্রকে এদিক দিয়েই নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দ পর্যন্ত নিয়ে যান। কামরূপে যখন তিনি ব্রহ্মপুত্রের ধারা নিয়ে এসেছিলেন, ঐসময়ে ভগবান পরশুরাম দেবী গঙ্গাকে আহ্বান করে ব্রহ্মপুত্রের উপর স্থিতা হতে বললেন এবং বরদান করলেন, ‘‘প্রতিবছর চৈত্র শুক্লা অষ্টমী তিথিতে তোমার মাঝে গঙ্গাদেবী স্থিতা হবেন। সেদিন যারা তোমার পবিত্র ধারায় অবগাহন করবে— তারা ব্রহ্মপদ প্রাপ্ত হবে।’’ প্রতিবছর ঐ পূণ্যতিথিতে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী ব্রহ্মপুত্রের পবিত্র ধারায় অবগাহন করে প্রণাম মন্ত্র উচ্চারণ করেন....

“ব্রহ্মপুত্র মহাভাগ শান্তনোঃ কুলনন্দন।
অমোঘা গর্ভসম্ভূত পাপং লৌহিত্য মে হর।”

—ব্রহ্মপুরাণ
অর্থাৎ হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র তুমি মাতা অমোঘার গর্ভসম্ভূত শান্তনু মুনির সন্তান তুমি আমার সকল পাপ হরণ কর।

ত্রিপুর-রাজন্যবর্গের ইতিবৃত্ত সংকলিত ‘রাজমালা’ গ্রন্থের বিজয়মানিক্য খণ্ডে পাওয়া যায় রাজা বিজয়মানিক্য বঙ্গদেশে পাঁচ হাজার নৌকা ও সৈন্যসহ অবস্থান কালে ব্রহ্মপুত্র নদে স্নান করেছিলেন।




“প্রথমে করিল রাজা ব্রহ্মপুত্র স্নান।

ধ্বজ আরোপিয়া ঘাটে করে বিধি দান।।

তীর্থরাজ লৌহিত্য দেখিল নরেশ্বর।

স্নানদান করিলেক পূর্ণ কলেবর।”

—শ্রীরাজমালা, বিজয়মাণিক্য খণ্ড, সেনাপতি রণচতুরনারায়ণ।





‘কামাখ্যা-মাহাত্ম্যম্’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে,

“চৈত্রে মাসি সিতাষ্টম্যাং যো নরো নিয়তেন্দ্রিয়ঃ।
চৈত্রন্তু সকলং মাসং শুচিঃ প্রযতমানসঃ।।
স্নাতি লৌহিত্যতোয়েষু স যাতি ব্রহ্মণঃ পদম্।
লৌহিত্যতোয়ে যঃ স্নাতি স কৈবল্যমবাপ্নুয়াৎ।।”



অর্থাৎ, যিনি শুচি ও প্রযতমানসে সম্পূর্ণ চৈত্র মাস বিশেষতঃ শুক্ল অষ্টমীতে লৌহিত্য জলে স্নান করেন, তিনি ব্রহ্মপদ প্রাপ্ত হন। লৌহিত্য জলে স্নান করিলে কৈবল্যপদপ্রাপ্তি হয়।

কামাখ্যা-মাহাত্ম্যম্ গ্রন্থ বলে, ব্রহ্মপুত্রের নাম সৃষ্টিকর্তা প্রথমে লোহিত রেখেছিলেন, পরবর্তীতে লোহিত্য সরোবর থেকে বেরিয়ে ব্রহ্মপুত্র নাম ধারণ করেন। ব্রহ্মপুরাণে ব্রহ্মা বলছেন,

“সপ্ত পরান্ সপ্ত পূর্ব্বান্ পুরুষানুদ্ধরেন্নরঃ।
লৌহিত্যস্য জলে স্নাত্বা সত্যং পুত্র বদাম্যহম্।।
উদ্যভিদ্যস্তথা ত্বাদ্যঃ শোণো ঘর্ঘর এব চ।
লৌহিত্যশ্চৈত্রকশ্চৈব সপ্তৈতে মৎসুতা মুনে।।
তেষাং মধ্যে তু লৌহিত্যঃ সর্ব্বেষাং পাবনোত্তমঃ।
কামরূপাদবিনিঃসৃত্য যাবদ্দক্ষিণসাগরম্।
স লৌহিত্য ইতি খ্যাতঃ পাদোনো জাহ্নুবীজলাৎ।।”

—ব্রহ্মপুরাণ



অর্থাৎ হে পুত্র! আমি সত্যই বলিতেছি যে, লৌহিত জলে স্নান করিলে, পূর্বের সাত পুরুষ ও নিম্নের সাত পুরুষ আত্মসহ পঞ্চদশ পুরুষ উদ্ধার পায়। উদ্য, ভিদ্য, আদ্য, শোন, ঘর্ঘর, লৌহিত্য ও চৈত্রক এই আমার সাত পুত্রের মধ্যে লৌহিত্য‌ই সর্বাপেক্ষা অধিক পবিত্রকারক; এই লৌহিত্য কামরূপ হইতে দক্ষিণ সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। ইহার মাহাত্ম্য গঙ্গা হইতে একপাদ নূন্য।

কালিকাপুরাণে ব্রহ্মপুত্রকে নদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। “ব্রহ্মপুত্র নদশ্রেষ্ঠ জামদগ্ন্যাবতারিত। পর্শুনা দত্তমার্গেন আগচ্ছ বরদো ভবঃ।” লিঙ্গপুরাণ বলেন, পৃথিবীতে যত তীর্থস্থান রয়েছে সমস্তই চৈত্র মাসের শুক্ল অষ্টমী তিথিতে ব্রহ্মপুত্রে আগমন করে। তাই বারাণসী, গয়া, প্রয়াগের মতো ব্রহ্মপুত্রের মাহাত্ম্য কম নয়! চৈত্রমাস হলো মধুমাস এ মাসে তীর্থস্নানের তাৎপর্য সংস্কৃত শাস্ত্রগুলোতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে।

‘‘যে ব্যক্তি জীতেন্দ্রিয় হ‌ইয়া চৈত্রমাসের শুক্লাষ্টমীতে লৌহিত্য জলে স্নান করে, সে ব্রহ্মপদ প্রাপ্ত হয়।’’ (কালিকাপুরাণ, ৮৩/৩৬)
“ত্বং ব্রহ্মপুত্র ভুবনতারকতীর্থরাজ, গম্ভীরনীরপরিপূরিতসর্ব্বদেহ।
ত্বদ্দর্শনাদ্ধরতু মে ভবঘোরদুঃখং, সংযোগতঃ কলিযুগে ভগবন্নমস্তে।।”

—পুরোহিত দর্পণ


“অশোকাষ্টমী যাত্রা ইহা চৈত্রমাসের শুক্লাষ্টমীতে হইয়া থাকে ঐ দিবস ভুবনেশ্বরে ভোগমূর্ত্তি চন্দ্রশেখরকে সুন্দর রথে আহরণ করাইয়া অর্দ্ধক্রোশ দূরে বয়ুকোণস্থিত রামেশ্বরের মন্দিরে আনয়ন করা হয়। তথায় ইন্দ্রদুম্নের পাটরাণী গুণ্ডিচার ভবনে ৫ দিন থাকেন। ইহা ঠিক পুরীর রথযাত্রা সদৃশ্য। রথটীর পরিমান দীর্ঘে প্রস্তে ১৬ হস্ত ও উচ্চে ২১ হস্ত রথের ৪টি ঘটক ও ৪টি চাকা আছে, ধ্বজায় ত্রিশূল বৃষ অঙ্কিত।” ( সেতুবন্ধ যাত্রা, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, ১৩৩৭ সাল, বেঙ্গল মেডিকেল লাইব্রেরী পৃ. ৩৮)

বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্র স্নান তীর্থস্থানগুলোর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দ ও কুড়িগ্রামের চিলমারী বিখ্যাত। এ ছাড়াও ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী বহু জায়গায় স্নান উৎসব পালিত হয়। দুটো তীর্থস্থানের কাহিনী পুরাণখ্যাত ভগবান পরশুরামকে কেন্দ্র করে। লাঙ্গলবন্দে বহু মহাপুরুষ অষ্টমীস্নানের জন্য এসেছিলেন কারণ পরশুরাম এখানে মাতৃহত্যাজনিত পাপ থেকে মুক্তি লাভ করেন। এ কারণেই এ তীর্থক্ষেত্র মাতৃতীর্থ। তীর্থ লাঙ্গলবন্দ ও ব্রহ্মপুত্র স্নান গ্রন্থে উল্লেখ আছে, “সুদূর হিমালয় থেকে একাধিক্রমে হাল চালনায় ক্লান্ত হয়ে পরশুরাম বিশ্রাম করার জন্য যেখানে কর্ষণের লাঙ্গল বন্ধ রাখেন সে স্থানের নাম হয় লাঙ্গলবন্দ।” ১৯০১ সালের ১৮ মার্চ স্বামী বিবেকানন্দ যখন ঢাকায় এসেছিলেন ঐ সময়ে আগত বুধাষ্টমী তিথিতে তিনি লাঙ্গলবন্দে স্নানযাত্রায় তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের সাথে অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায়।

মহাপ্রভু চৈতন্যদেব, অদ্বৈতচার্য্য, বঞ্চিত ঘোষ, রামকৃষ্ণ গোঁসাই প্রমুখ সারা ভারতবর্ষের তীর্থস্থান দর্শনকালে লাঙ্গলবন্দে ব্রহ্মপুত্র স্নানে অংশগ্রহণ করেন বলে ‘শ্রীহট্ট পরিচয়’ গ্রন্থে রণেন্দ্রনাথ দেব উল্লেখ করেন।
আসামের কবি হরেশ্বর শর্মা’র কবিতায় অশোকাষ্টমীর কথা পাওয়া যায়।

“পুণ্যময় সোঁহাতেবে পাতিলোঁ অশোকাষ্টমী
তোমাবেই আগমন গণি;
ঘোর শিলাবৃষ্টি আহি অকালতে মেলা ভাঙি
দিলে মোক শোকৰ অগণি!”

—ব্ৰহ্মপুত্ৰৰ অভিযান, শ্ৰীহৰেশ্বৰ শর্ম্মা


কিংবা খনার বচন

“শয়ন-উত্থান-পার্শমোড়া
তার মধ্যে ভীমাছোঁড়া
দুই ছাওয়ালের জন্মতিথি
অষ্টমী নবমী দুটি
পাগলার চৌদ্দ পাগলীর আট
এই নিয়ে কাল কাট
ইহাও যদি না পারিস
ভগার খাদে ডুবে মরিস।”



অর্থাৎ শয়ন-উত্থান-পার্শ-ভীমা চারটি বিশেষ একাদশী। দুই ছাওয়ালের জন্মতিথি অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী ও রামচন্দ্রের রামনবমী। পাগলার চৌদ্দ অর্থাৎ শিবচতুর্দশী ও পাগলীর আট অর্থাৎ দুর্গাষ্টমী তিথি এগুলো যদি নাও পালন করে তাহলে একদিন গঙ্গায় ডুব দিতে বলেছেন।

এ সময় বসন্তকালীন দুর্গোৎসব হয়। দুর্গার অপর নাম বাসন্তী। সে উৎসবের অষ্টমী তিথিই অশোকাষ্টমী বা মহাষ্টমী তিথি। এ সময় শক্তি আরাধনার মূহূর্ত। লীলাবতি খনাও বলেন, অষ্টমী তিথিতে স্নান করার কথা। অষ্টমী তিথিতে পরশুরামের কাহিনী যেরকম পাওয়া যায় ঠিক তেমনি বাসন্তী দুর্গাষ্টমীও উল্লেখযোগ্য। পূর্বে কালিকাপুরাণক্ত দেবী কালীর উদ্ধৃতি অনুসারে দেবীও অষ্টমীতে ব্রহ্মপুত্রে স্নানের কথা বলেছেন। দেবী ভাগবতের নবম স্কন্ধের একাদশ অধ্যায়েও অশোকাষ্টমীতে স্নানের কথা উল্লেখ আছে।

হরেশ্বর শর্মা তার কবিতায় এ সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা বলেছেন, যা প্রতিবছর প্রাকৃতিক নিয়মানুযায়ী ঘটে; অনেক সময় প্রবল বৃষ্টিতে তীর্থযাত্রীদের অস্বস্তির কারণ লক্ষ্য করা যায়। তাছাড়া নদের জোয়ারের কারণে মেলা ভঙ্গ হ‌ওয়ার একটা ভীতি থাকে। এসব উপেক্ষা করেই যুগ যুগ ধরে মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

ব্রহ্মপুত্র নদে স্নান উৎসব শুধুমাত্র আসামের কামরূপে নয় বরং এর ধারা যতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে ততদূর পর্যন্ত উৎসবের আমেজ জমেছে। কুড়িগ্রামের চিলমারীতে যে অষ্টমী মেলা হয়, তা উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ লোকসমাবেশ দশ থেকে পনের লক্ষাধিক মানুষ পূর্বরাত্রি থেকে সমবেত হন। স্কুল-মাদ্রাসাগুলো তীর্থযাত্রীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। খাবার জল ও তাঁবুর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন মেলা কমিটি। প্রশাসনের তরফ থেকেও ব্যাপক সহায়তা প্রদান করা হয়। লাঙ্গলবন্দে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রস্থ কম, ঠিক নালা বা খালের মতো; কিন্তু চিলমারীর ব্রহ্মপুত্র নদ এতটাই বিশাল যে সাহিত্যিক ও কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেন কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদ প্রায় সাগরের মত। নদের তীরবর্তী বিস্তৃর্ণ চরে প্রায় ৫/৬ কি.মি এলাকা জুড়ে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। দেশ ও বিদেশের সাধু-সন্ন্যাসী ও সাধারণ মানুষের ব্যাপকতা লক্ষ্য করা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, নেপাল ও ভুটানসহ বহু দেশের থেকে লোকজন এখানে আসেন। কেউ কেউ বলেন, এখানে নাগা সন্ন্যাসীদের‌ও উপস্থিতি দেখা গেছে। তবে লাঙ্গলবন্দের যে শাস্ত্রীয় ব্যাপকতা বা প্রাচীন তীর্থের ভূমিকা সে অনুযায়ী চিলমারী বন্দরের অষ্টমী নিয়ে তেমন আলোচনা পাওয়া যায় না। জনশ্রুতি অনুযায়ী, পরশুরাম ব্রহ্মপুত্র খননকালে এখানে ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নিয়েছিলেন বলে লোকমুখে শোনা যায়। হাজার হাজার বছরের কালের বিবর্তনেও মেলার জৌলুস হারিয়ে যায়নি। আর এ অঞ্চল কামরূপের অন্তর্গত হ‌ওয়ায় এ তীর্থের মাহাত্ম্য অধিক ফলপ্রদ মনে করা হয়। তীর্থযাত্রীগণের বিশ্বাস ও পৌরাণিক কাহিনী সবমিলিয়ে ব্রহ্মপুত্র স্নান সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মূহূর্ত। তাই যুগ যুগ ধরে মানুষ ব্রহ্মপুত্রের পবিত্র ধারায় অবগাহন করে আসছেন।


গ্রন্থপঞ্জি:

১. অমরাবতী আসাম, প্রথম প্রকাশ, অগ্রহায়ণ ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ।

২. শ্রীরাজমালা, সেনাপতি রণচতুরায়ন, সম্পাদক: শ্রীকালীপ্রসন্ন সেন বিদ্যাভূষণ, তৃতীয় সংস্করণ, জুন ২০২০, উপজাতি গবেষণা ও সংস্কৃতিকেন্দ্র, আগরতলা।

৩. রম্যাণি বীক্ষা, কামরূপ পর্ব — শ্রীসুবোধ কুমার চক্রবর্তী, এ. মুখার্জী অ্যান্ড কোম্পানী প্রাঃ লিঃ, কলিকাতা

৪. কামাখ্যা-মাহাত্ম্যম্ — শ্রীশিবকৃষ্ণশর্ম্মা পাণ্ডা ও শ্রীবিষ্ণুকান্তশর্ম্মা পাণ্ডা কর্তৃক সংগ্রহীত ও প্রকাশিত এবং মহামহোপাধ্যায় ধীরেশ্বর ভট্টাচার্য্য কবিরত্ন কর্তৃক সংশোধিত তৃতীয় সংস্করণ, ১৩২৯ মাঘ, শীতলা প্রেস, কলিকাতা।

৫. কালিকাপুরাণ, পঞ্চানন তর্করত্ন

৬. পুরোহিত দর্পণ

৭. ব্রহ্মপুত্র-মাহাত্ম্য

৮. স্বামী বিবেকানন্দ (জীবন চরিত), চতুর্থ খণ্ড, শ্রীপ্রমথনাথ বসু।

৯. শ্রীহট্ট পরিচয়, রণেন্দ্রনাথ দেব, প্রথম প্রকাশ, ১৯৮৩ সাল।

১০. ব্রহ্মপুত্রৰ অভিযান, শ্ৰীহৰেশ্বৰ শর্ম্মা।

১১. সেতুবন্ধ যাত্রা, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, বেঙ্গল মেডিকেল লাইব্রেরী, ১৩৩৭ সাল।

১২. তীর্থ লাঙ্গলবন্দ ও ব্রহ্মপুত্র স্নান, সম্পাদক: মনঞ্জয় কৃষ্ণ দত্ত।

Post a Comment

0 Comments