
জেমস রবার্ট ব্যালান্টিন তার NYAYA PHILOSOPHY EMBRACING THE TEXT OF THE TARK SANGRAHA গ্রন্থে তর্ক সমন্ধে বিস্তর আলোচনা করেছেন, যদিও এটি ১৭ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে অন্নংভট্ট রচিত ‘তর্ক সংগ্রহ’ গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ। ‘তর্ক সংগ্রহ’ গ্রন্থটির ভাষ্য লিখেন গ্রন্থকার নিজেই যেটি ‘তর্ক সংগ্রহ দীপিকা’ নামে পরিচিত। তর্কশাস্ত্র মূলত তিনটি বিষয়ের উপর প্রাধান্য পেত ১. উদ্দেশ্য ২. লক্ষণ ৩. পরীক্ষা। তর্কশাস্ত্র একপ্রকার বিশেষ জ্ঞান। এই জ্ঞানের মাধ্যমে উঠে আসে বস্তুর বিচারিক কাঠামো ও প্রত্যক্ষ চিন্তা। অন্নংভট্টের তর্কের বিষয় বৈশেষিক ন্যায় দর্শনের উপর নির্ভর করে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশেষ জ্ঞানের পর্যালোচনা মূলক সমাধানের উপর ভিত্তি করে তর্কের কাঠামোগত নীরিক্ষার কথাই হতে পারে— তর্কের স্বরূপ। তর্ক কথাটি বিতর্ক কিংবা ন্যায় সঙ্গত প্রণালীর মাধ্যমে আমাদের সামনে উঠে আসে। যুক্তিবিদ্যা যত প্রখর ন্যায় ততো দ্রুত সম্ভব। পক্ষ ও বিপক্ষ যুক্তি উপস্থাপনের উপকরণসমূহ সম্পর্কে নেতিবাচক কিংবা ইতিবাচক মন্তব্য আসতে পারে—কিন্তু তর্ক যখন আলোচনার প্রাণস্বরূপ, তখন যথার্থ জ্ঞানের সত্যকে সম্ভাবনা বলে ধরে নিতে হবে। অর্থাৎ যথার্থ জ্ঞান বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সম্ভব।
অন্নংভট্টের তর্কসংগ্রহে প্রত্যক্ষের লক্ষণ চার প্রকারের যথা— প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দ। এই বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করেই প্রত্যক্ষের পরিমাপ করা যায়। অন্নংভট্ট প্রথমেই প্রত্যক্ষের কথা বলেছেন? ‘প্রত্যক্ষজ্ঞানকরণং প্রত্যক্ষম্’ অর্থাৎ প্রত্যক্ষ জ্ঞানের করণই হল প্রত্যক্ষ। কিন্তু কেন? কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় প্রত্যক্ষ দর্শনের মধ্যে অন্যগুলো উপাদান জড়িয়ে আছে—তিনি আরও বলেন, ‘ইন্দ্রিয়ার্থসন্নিকর্ষজন্যং জ্ঞানং প্রত্যক্ষম্’ অর্থাৎ দশইন্দ্রিয় দ্বারা যে জ্ঞান উপলব্ধ হবে তাই প্রত্যক্ষ জ্ঞান।
জ্ঞানের উপর নির্ভর করে অন্যরূপ যে অনুমান বা চিন্তা করা হয় তাকে অনুমান বলা যায়। ধরুন, দূরে কোথাও ঢাক বাজছে কিন্তু কে বাজাচ্ছে, কিসের জন্য বাজাচ্ছে কেউ জানে না তাই অনুমান।
বাৎসায়ন নামযুক্ত বিষয়ের প্রত্যক্ষকে সবিকল্প এবং নামঅযুক্ত বিষয়ের প্রত্যক্ষকে নির্বিকল্প বলেছেন। জয়ন্ত ভট্ট দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য আলাদা আলাদা করে প্রত্যক্ষ করাকে নির্বিকল্প এবং এদের সম্বন্ধে নামযুক্ত জ্ঞান সবিকল্প বলে উল্লেখ করেছেন। এদিকে অন্নংভট্ট নিষ্প্রকারক জ্ঞানকে নিরবিকল্প ও সপ্রকারক জ্ঞানকে সবিকল্প বলেছেন। ‘নামজাত্যাদিযোজনা, শব্দজ্ঞানানুপাতি শব্দশূন্যো বিকল্পঃ’—এইভাবে প্রকাশ করেছেন।
২.
তর্ক বলতে চিন্তা; এক কথায় চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। শ্রীভোলানাথ রায় কর্তৃক রচিত ‘সংক্ষিপ্ত তর্কবিদ্যা প্রবেশিকা’ (১৯৬১) গ্রন্থে তর্কের নানান শ্রেণীবিভাগ, পদ্ধতি, কলা ও বিজ্ঞান সম্পর্কিত আলোচনা উল্লেখিত রয়েছে। তর্কবিদ্যা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন...‘‘ভাষায় প্রকাশিত চিন্তা সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক আলোচনার নামই হলো তর্কবিদ্যা বা লজিক।’’ তর্কের কৌশলগত পার্থক্য বিচার ও নিজস্ব আর্ট রয়েছে, এজন্য তর্কবিদ্যা ‘কলা’, পদ্ধতিগতভাবে নিরীক্ষা প্রবণ হওয়া স্বত্ত্বে এটি বিশেষ জ্ঞান দ্বারা প্রলুব্ধ তাই এটি বিজ্ঞান। সর্বশেষ বলা চলে, তর্ক হল বিজ্ঞান ও কলা।
উক্ত গ্রন্থ বলে, ‘‘প্রত্যক্ষ জ্ঞানের উপর নির্ভর করে পরোক্ষ জ্ঞান এ উপনীত হবার নামই তর্ক পদ্ধতি।” উদাহরণস্বরূপ বলা চলে— আবহাওয়া অধিদপ্তর নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখলো আজ রাতে বৃষ্টি হবে, এজন্য নির্দিষ্ট সময়ে বাড়ির বাইরে বেরোনো যাবে না। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ চিন্তায় প্রবেশ করা না গেলে, পরোক্ষ চিন্তা অযৌক্তিক! অতুলচন্দ্র গুপ্ত বলেন, ‘‘প্রত্যক্ষ নিয়ে তর্ক চলে না, আর তর্কের ভূমিই হ’ল অনুমান।” সোজা কথায় বলা চলে, অনুমানকে প্রত্যক্ষ জ্ঞান দ্বারা সিদ্ধ করা। তাত্ত্বিকেরা তর্কবিদ্যা নিয়ে যথার্থ বোধের সৃষ্টি করেছিলেন, আধুনিক যুগের প্রথমভাগে সবচেয়ে বেশি তর্ক নিয়েই আলোচনা হয়েছিল। এজন্য হয়তোবা হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর মত তরুণ তাত্ত্বিককে বলতে হয়েছিল, ‘যে তর্ক করে না, —সে দাস’ কথাটি অন্য অর্থেও প্রযোজ্য হতে পারে কিন্তু আমরা অন্নংভট্টের দর্শনের বাস্তবতার দিকে লক্ষ্য রেখেই বলি। প্রত্যক্ষ জ্ঞান বা দর্শন এখানে আত্মদর্শন স্বরূপ অর্থাৎ নিজেকে সঠিকভাবে জানা এবং সেইসাথে পারিপার্শ্বিক অবস্থার সম্পর্কে অবগত হওয়া। শ্রীযুক্ত যাদবেশ্বর তর্করত্ন বলেন, “আলস্যের প্রশ্রয় দিলে হইবে না। নিদ্রিত সমাজকে জাগাইতে হইবে। শয্যাশয়ন সমাজের সুখসুপ্তি ভাঙাইতে হইবে।” অর্থাৎ আত্মজ্ঞানের সন্ধান খুবই জরুরী। আর এই আত্মজ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কিংবা প্রত্যক্ষ দর্শন দ্বারা সিদ্ধ হতে হবে।
৩.
সমকালীন তর্কালাপ অবৈজ্ঞানিক অযৌক্তিক কিছুর সমন্বয়ে কোথাও কোথাও হচ্ছে—সেখানে তর্কবিদ্যা বিদ্রুপাত্মক; অশালীন দৃষ্টিভঙ্গির সম্মিলন। আলোচ্য বিষয়ের বাইরেও তার প্রভাব যথেষ্ট। বর্তমানে তর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বস্তুটির অনুমানের দিকসকল কিন্তু প্রত্যক্ষ জ্ঞান দিয়ে সেটিকে যাচাই করবার প্রয়াস করা হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আক্রমণ দ্বারা অনুমানকে প্রত্যক্ষ বলে প্রচার করা হয়। এর কারণ চিন্তার সুযোগ স্বল্পতা নয় বরং চিন্তাবিচ্যুত ভাবনার পরিধি— এরা হয়, তর্ক বোঝে না নয়তো ভেক ধরে থাকে। একজন তার্কিক যোগ্যতা দিয়ে প্রমাণ করবেন বস্তুটির রূপ, গুণ, স্পর্শ ইত্যাদি যা ইন্দ্রিয় দ্বারা প্রত্যক্ষ করা যায়।
মৌলিক তর্ক সমন্ধে কতটুকু জ্ঞান আহরণ করা যায় সে সমন্ধে গবেষকগণ ব্যতীত সাধারণ তর্কবিদের পার্থক্য লক্ষ্য করলে, বোঝা যায় এরা বিশেষ জ্ঞানের ভিতর কুসংস্কার ঢুকিয়ে দিয়ে— ছল, চাতুরির জ্ঞানকে আপন করে নিয়েছে; যা আত্মপক্ষের প্রকাশে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্যদেরও ক্ষতি করে।
তর্ক মূলতঃ প্রতিপক্ষকের সামনে যথার্থ যুক্তি উপস্থাপন করার মাধ্যমে আসল সত্যটিকে তুলে আনা—কিন্তু আধিভৌতিক মিথ্যাচারের প্রভাব থামানোর দ্বায়িত্ব প্রত্যেককে নিতে হবে। সত্যের উন্মেষ হলে, দাসত্ব শৃঙ্খল, কুসংস্কার টুকরো-টুকরো হয়ে যায়।
৪.
তর্কই আলোচনার প্রাণ। অর্ধকুম্ভের জ্ঞান দ্বারা শ্রেণীবিভক্ত সমাজ কাঠামো, রাজনৈতিক অপতৎপরতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও হতাশা—এ সমস্ত চিন্তুকদের নাজেহাল করে ফেলেছে। পূর্ণকুম্ভের পূর্ণ অভিষেক না হওয়া পর্যন্ত সমাজ জাগ্রত সম্ভব নয়! সমালোচনা ও বাস্তবিক আলোচনার মাধ্যমে প্রাণের প্রতিষ্ঠায় তর্কের বিষয়।
১৮ অক্টোবর ২০২৫
0 Comments