শেষ বিকেলের গানে মৃত্যুর চোখ | অন্তর চন্দ্র
[ শ্রদ্ধেয় কবি কাজী জহিরুল ইসলামের ‘শেষ বিকেলের গান' বইয়ের রিভিউ নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক বাংলাদেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। মৃত্যু নিয়ে এরকম একটা লেখা লিখতে পেরে খুব ভালো লাগছে। কবিকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই, আমাকে সাহায্য করার জন্য।]
◾শেষ বিকেলের গানে মৃত্যুর চোখ ✓অন্তর চন্দ্র
মৃত্যু শব্দটি শুনলেই হৃদয় শিহরিত হয়। জীবের মহাভয় রূপে আবির্ভাব। মৃত্যুর হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার দুঃসাহস কারও হয়নি। অথচ কেউ কেউ বলে থাকেন, মৃত্যু আসলে নতুনের আহ্বান। মৃত্যু নিয়ে ভাবতে গেলে প্রথমেই মনে আসে মৃত্যু কী? এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো সবার জানা। কিন্তু কবি-মনের অভ্যন্তরে মৃত্যু-পরিধির যে দ্যোতনা, তাকে মাপা সহজ নয়! তাহলে কি কবি মৃত্যুকে অতিক্রম করেছেন? হ্যাঁ/ না দুটো উত্তর দিলে আপনারা পাগল বলে সম্বোধন করবেন। জ্যামিতিক মিটারে যদি মৃত্যুর একটা খণ্ডকালীন চিত্র আঁকা যায় তা সাধারণের অগোচর হবে না। কবি সত্তাকে কেন্দ্র করে জন্ম-মৃত্যুর একটা অতিমানসের চিন্তা করা যেতে পারে। ক্রৌঞ্চবধে রামায়ণকার বাল্মীকি যে কাতরতা বোধ করেছেন, সেখানে শুধু একটি মৃত্যু ছিল না, ছিল মৃত্যুকে অতিক্রম করে কাব্যতিহাসের অমর চিন্তাকে ধারণ করা।
তিনি শিষ্যকে বলেন...
পাদবদ্ধোঽক্ষরসমস্তন্ত্রীলয়সমন্বিতঃ।
শোকার্তস্য প্রবৃত্তো মে শ্লোকো ভবতু নান্যথা।।
‘এই বাক্য পাদবদ্ধ, এর প্রতি পদে সমাক্ষর, ছন্দের তন্ত্রীলয়ে এ আন্দোলিত; আমি শোকার্ত হয়ে একে উচ্চারণ করেছি, এর নাম শ্লোক হোক।’ ( কাব্যজিজ্ঞাসা - অতুলচন্দ্র গুপ্ত, পৃষ্ঠা ১)
একটি মৃত্যু-ব্যথিত প্রাণ যখন কবিতা রূপে আত্মপ্রকাশ করে, তখন তাকে অতিমানস বলাটা দোষের বলে মনে হবে না। কাজী জহিরুল ইসলামের ‘শেষ বিকেলে গান’ পড়তে গিয়ে মৃত্যুকে আরও নতুনভাবে জানা গেল। মৃত্যুর একটা ছক লক্ষ্য করা যায়। যা কবি মনকে তাড়া না করে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রেমে রূপান্তর হয়। পৃথিবীর প্রতি মানুষের ভালোবাসা জন্ম-জন্মান্তরের বন্ধন। কবি সেই সত্যকে ছন্দের দোলায় পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে চেয়েছেন।
“জামার ভেতর যে জন আছে তার কথা কেউ ভাবে না।
জামার মায়া ছেড়ে সে-কী অন্য কোথাও যাবে না?”
কবি মাঝে মাঝে ব্যথিত হয়েছেন। কারণ যে দেহকে লালন করার জন্য নিয়ত সংগ্রাম করার নিমিত্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। অথচ একদিন সেই দেহকেই মাটির সঙ্গে গেঁথে দিতে হয়। তিনি বলতে দ্বিধাবোধ করেন না, ‘পাখি হৃদয় মূলত খুব নিষ্ঠুর ’ চিরকালীন স্তব্ধতাকে বরণ করে পরিস্ফুট জীবনের পরিণাম।
মানুষ তার সারা জীবনের সত্যকে একটি বন্ধনে রাখতে চায়। একরৈখিক পরিসীমার ভেতর গজিয়ে ওঠে অমৃতের লোলুপ বাসনা। স্বজনপ্রীতিভাবকে প্রগাঢ় করে তোলে চাওয়া-পাওয়ার দুঃসাহস। দৈহিক মৃত্যুর সাথে সাথে অনেকের মানসিক মৃত্যু হয়ে থাকে। আর এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে জীবন-পরিধি। মৃত্যুকে যদি একটি সুতোয় ঝুলিয়ে রাখা হয় খণ্ডকালীন অবকাশ হিসেবে, তাহলে মৃত্যু তাই।
“পৃথিবীতে জন্ম নেয়া মানেই হলো
যানবাহনের অপেক্ষাতে বসে পড়া।”
স্বরবৃত্তে ৪+৪+৪ মাত্রার ছন্দে রচিত এই পঙ্ক্তিতে পুরো একটা জীবনকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একশ'টি কবিতা শুধুমাত্র স্বরবৃত্ত ছন্দেই রচিত হয়েছে। যা জন্ম-মৃত্যুর চক্রবূহে আসা-যাওয়ার অসামান্য পরিস্থিতির দ্যোতনা আনে। আধ্যাত্মিকতার সরল সূত্রে পঞ্চভৌতিক অবসান। ষড়রিপু অন্তর্দাহে ঘনায়মান হয় দেহতরী। দিশাহীন পথচলা শেষে কবি চেয়ে দেখেন ফেলে আসা ইতিহাস জুড়ে কেবলই আমার অস্তিত্ব পায়চারি করছে। কাজী জহিরুল ইসলাম তার কাব্য দর্শনে যে নান্দনিকতার আয়োজন ঘটিয়েছেন তা আমাদের কাব্যপ্রীতিকে আরও রহস্যময় করে তোলে মনোজগতের স্বাভাবিক নিয়মের মতো।
পাঠক মহলের খণ্ডিতভাবগুলির একত্রীকরণ 'শেষ বিকেলের গানে' এসে যুক্ত হয়ে ভিন্ন মাত্রার পরিস্ফুট জগতের নিজস্ব ধারাকে আঁকড়ে ধরে। জীবনকে স্বচ্ছ কাচের দেয়াল মনে হয়। মৃত্যু জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি। আচ্ছা, কয়েকটি গুচ্ছ গুচ্ছ সকালকে নির্বাসন দেয়ার নামই কি মৃত্যু! নাকি দমকা হাওয়ার জীর্ণ শরীর! আসলে মৃত্যু বুকপকেটে রাখা শ্বাসের খেলা। কবি তার 'শেষ বিকেলের গানে' মৃত্যু উৎসবে মেতে ওঠেন। জীবনকে ধরতে চান একটা খাঁচার পাখির ডানার থেকে অতিমানসের চোখে।
“তুমি খাঁটি, তুমি আমার মাটি
তোমার উষ্ণ স্পর্শে আমি ফাটি
দুই ডানাতে ভর দিয়ে চোখ মেলি
ভোরের আলোর সঙ্গে আমি খেলি।”
পৃথিবীর কাছে মানুষের ঋণ নিয়ত গাঢ় হচ্ছে। কেউ কোথাও নেই, মূলত ঘুরে ফিরে নিজের অস্তিত্বের কাছেই ধরা দিতে হয়। ফিরে আসতে হয় অতীতের আহ্বানে। নিজ জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা প্রাণকে আন্দোলিত করে। কবি বারবার সেখানেই ফিরে আসার আর্তি জানান। গতিময় জীবনের ইতিহাস শেষ হলে নতুন খাতা খুলে বসেন ঘাসের চাদর বুকে জড়িয়ে। মাথার উপর ঘাসের ঝুঁটি, পায়ে ঘাসের মোজা, হাওয়ার মশারি, সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। রবিঠাকুর বলেন...‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’ কখনো কখনো আপনভোলা মনে গেয়ে ওঠেন ‘মরণ...রে, তুহু মম শ্যাম সমান’ কে মরতে চায় বলুন? এত সাহস কার? সকলেই জীবনের মোহ ত্যাগ করতে পারে না।
“মাথায় বাড়ে সবুজ ঝুঁটি পায়ে ঘাসের মোজা,
পাতার নিচে শুয়ে শুয়ে বাংলাদেশের গন্ধ খোঁজা,
লোকটি হলেন কবি,
বাংলাদেশের ঘাসে ঘাসে আঁকা আছে সেই মানুষের ছবি।”
বাংলাদেশের চিরসবুজের কলকাকলি মুখর এক বিকেলের উদ্যানে কবি অন্তর্হীত হতে চান। কবির ভাষায় ‘রুয়ে দিও আমাকে এই বাংলাদেশের চরে’ একদম মাটির কাছেই ফিরে আসার আর্তি জানান দেন। পৃথিবীর অবাক সংসারে নীরব খুনসুটি রেখে যান। 'পঞ্চভাগে বিভক্ত আজ আমি’ কবির বাণী ভেসে আসে। মিশে যেতে চান অর্বাচীন আঁধারের জগতে। এরকম একটা পঙক্তি শুধু হতাশাকে নয়, জীবনের মৌলিকতা খুঁজে ফেরে। পঞ্চভাগ= মাটি, জল, আগুন, বাতাস, আকাশ। এই পাঁচটি বস্তুতে মিশে যাওয়ার তাগাদা নিয়ে মানুষ ঘরে ফেরে; সেই চিরচেনা সত্যকেই কবি নতুন করে বলতে চেয়েছেন। আবারও সেই আধ্যাত্মিকতার জগতে প্রবেশ করে নিজের অস্তিত্বের সন্ধ্যানে যান। কবি ছুঁতে চান মানুষের মনোলোক এবং সেই মনের দ্রষ্টা রূপে আবির্ভূত হয়ে দৃষ্টির আলোকধারায় সুন্দরের বিচ্ছুরণ ঘটান।
কাজী জহিরুল ইসলাম শুধু মৃত্যুর পঙক্তিতে মেতে উঠতে চান না, তিনি দেখাতে চান মানুষের বয়ে চলা পথের সঠিক সন্ধান। মানুষকে গড়ে তুলতে চান তার ভিতরে থাকা সত্যকে আঁকড়ে ধরে। ফের বলতে চান, ‘এই পৃথিবী আর কিছু নয় সুবৃহৎ এক বন্দিশালা’ সত্যিই তো তাই যাকে আপন করতে পারবো না তাকে জড়িয়ে স্মৃতিবাহিত রোগে ভুগে লাভটাই বা কী! পরক্ষণেই বলেন, ‘জন্ম নিয়েই শিশু জানে মৃত্যু তাকে ঠিকই খাবে’ এ জন্যই হয়তো এত এত কান্নার আয়োজন।
যত দিন এগুচ্ছে পৃথিবী তত প্রখর, তীক্ষ্ণ এবং ভীত হচ্ছে। চারদিকে আহাজারি মৃত্যুর নীরব খুনসুটি। মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব, ঘৃণা আরও জটিল হয়ে উঠছে। কোথাও শান্তির অবকাশ নেই। দিশাহীন জীবন শুধু ছটফট করে বেড়াচ্ছে। জীবনানন্দ দাশের ভাষায় ‘ক্লান্তির পরে ঘুম, মৃত্যুর মতন শান্তি চাই ’ এই শান্তি কোথায়? কী এই শান্তি? শুধু ভালোবাসা; 'শেষ বিকেলের গানে'র কবি ভালোবাসার পরাগরেণু ছড়িয়ে দেন মধুকরদের চৌদিকে। সব ক্লান্তিকে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রেমে ছড়িয়ে দিয়ে এক লীলাময় জগতের সূচনা করেন। যেখানে কবির সুপ্ত মনে মানবিক পৃথিবীর আহ্বান আসে।
“কর্ম পাপে ধর্ম গেল চতুর্দিকে পাপের সমুদ্দুর
জলের ওপর নৃত্য করে বৈকুন্ঠের হুর।”
মাঝে মাঝে বলি, আমার শ্বাস নিতেও ভয় করে। কারণ মানুষ আর পশুর তুলনা প্রায় সমান হয়ে গেছে। মুক্ত ডানা মেলে বাঁচার স্বপ্ন অতলে হারিয়ে গেছে। সৃজনশীল কাজের জন্য জন্ম নিয়েছি অথচ কত লোক হন্তারকের কাজ করেছে। আর সেই পাপের বোঝা সারাটা জীবন ঘানি টেনে নিয়ে বেড়াতে হয়। পূণ্য সঞ্চয় করতে এসে শূন্য হাতে ফিরে যেতে হয়। কবি নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে সুন্দর এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন। সবাইকে একসঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন দেখান।
'শেষ বিকেলের গান' সম্পর্কে বলতে গেলে, কাজী জহিরুল ইসলাম এখানে যে, ১০০টি স্বরবৃত্ত ছন্দের কবিতার উপস্থাপন করেছেন তা অত্যন্ত ধৈর্য্য এবং গভীর চিন্তার ফসল। এখানে এমন সব কবিতা আছে যেগুলোর একটি লাইন পুরো কবিতাটিকে বহন করে চলে। মাঝে মাঝে মনে হতে পারে, ঐ একটি পঙক্তিই যথেষ্ট। কবিতায় যে নান্দনিকতা ফুটে উঠেছে তা কাব্যদর্শনের পথকে আরো সুগম করে তোলে।
একজন পাঠক হিসেবে বলতে চাই, কবিতার সাথে যখন ঘর সংসার, তখন মানুষের চিরন্তন সত্যের সুস্পষ্ট বাণী আমার কানে ফিসফিস করে। মৃত্যুর গণ্ডি পেরিয়ে মৃত্যুকে অমৃত করে তারই ঘরে বসত করার প্রেরণা জাগে। জীবনকে আরও সচ্ছ ও সুন্দর দেখায়। কাজী জহিরুল ইসলাম যেন নতুন করে সেই আত্মপ্রবণতাকে জাগিয়ে দিলেন।
কবিতার ভাবকে অতো সহজে হৃদয়ে ধারণ করা যায় না। ধীরে ধীরে এর মধু পান করতে হয়। পাঠক সেই মধুর সন্ধ্যানে অন্তর্জাল ভেদ করে চূড়ায় পৌঁছান। এবং কবি তার দৃষ্টিরূপে অবতীর্ণ হয়ে দিক নির্দেশ দেন। পাঠক খুঁজে পান অমৃতের সন্ধান। 'শেষ বিকেলের গান' এমন একটি বই যা শুধু নিজেকে পরিস্ফুট করেনি বরং মানুষের একটা পুরো জীবনকে প্রতিনিধিত্ব করে।
![]() |
| Weekly Bangladesh News pepper 28 Dec 2023 |
#সাপ্তাহিক বাংলাদেশ পত্রিকার পাতার ছবি দুটি যুক্ত করা হয়েছে।
__________________
অন্তর চন্দ্র
কবি ও প্রাবন্ধিক
চিলমারী, কুড়িগ্রাম ।
২৮ ডিসেম্বর ২০২৩ নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক বাংলাদেশ ’ পত্রিকায় হয়েছে এবং দেশ পত্রিকায় ০৩ জানুয়ারি ২০২৪ এ প্রকাশিত।
💞🥰
#পত্রপত্রিকা #বইময়
আরও পড়ুন....
সুবীর সরকারের 'লোকশোলক' পাঠ পর্য্যালোচনা | অন্তর চন্দ্র
কয়েকটি মৃত্যুর পংক্তি | অন্তর চন্দ্র
মোনাজাত উদ্দিন এবং উত্তর জনপদের মর্মান্তিক ঘটনা | অন্তর চন্দ্র
![]() |
| দেশ পত্রিকা ০৩ জানুয়ারি ২০২৪ |








0 Comments